মিকশিমিল স্কুলের ইতিহাস ও জীবন্ত কিংবদন্তীঃ
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রুদাঘরা ইউনিয়নের মিকশিমিল গ্রামের তৎকালীন হোমিও ডাক্তার হিরণ কুমার মিত্র নিজ উদ্যোগে, তিনজন শিক্ষক দিয়ে মিকশিমিল বাজারের একটি দোকান ঘরে মাত্র সাত জন ছাত্র জোগাড় করে ১৯০০ সালের জানুয়ারিতে সেখানে স্কুল কার্ষক্রম শুরু করেন । মিকশিমিল গ্রামের সীতানাথ চক্রবর্তী প্রধানশিক্ষক এবং আজগড়া গ্রামের প্রিয়নাথ ঘোষ ও মিকশিমিলের মৌলভী আবদুর রহমান
শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর স্থানীয় দু’টি কাঁচা ঘরে স্কুল চালু হয়, মিকশিমিলের বিখ্যাত কালাচাঁদ ফকিরের বাড়ির পাশে। পরবর্তীতে ১৯০৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিকশিমিল হাই ইংলিশ স্কুল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ওই সময় স্কুলটির উন্নতির জন্য স্থানীয় আত্মারাম কর, চারু চন্দ্র মিত্র, দেবেন্দ্র নাথ প্রামাণিক ও মৌলভী রিয়াজ উদ্দিন আহম্মদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় চলতে থাকে স্কুল কার্যক্রম।
উল্লেখ্য, উপজেলার ধামালিয়া গ্রামের জমিদার বাড়ির মৌলভী আহাদ সরদার স্কুলের জন্য মুক্তহস্তে অনেক অর্থ দান করে গেছেন। প্রতিষ্ঠাতা হিরণ কুমার মিত্র ১৯১০ সালে মারা যাওয়ার পর স্কুলের উন্নতি কিছুটা থমকে যায়। ওই সংকট মুহূর্তে মিকশিমিলের ঐতিহ্যবাহী ঘোষ পরিবারের শিক্ষানুরাগী শশধর ঘোষ স্কুলের হাল ধরেন। উপজেলার শাহাপুর, আন্দুলিয়া, মধুগ্রামের মানুষের সহানুভূতির আশায় স্কুলটি মধুগ্রামের ডাকবাংলা নামক স্থানে স্থানান্তর হয়। এ সময় মধুগ্রামের বাসিন্দা যশোর জেলার সিভিল কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত সেরেস্তাদার মৌলভী আফেজ জোয়ার্দার স্কুল পরিচালনায় বিপুল অর্থের জোগান দেন। এভাবে স্কুল কার্যক্রম বছরখানেক চলার পর রুদাঘরা জমিদার পরিবারের উকিল বসন্ত কুমার হালদার, সাব-জজ হেমন্ত কুমার হালদার, চারু চন্দ্র হালদার ও জিতেন্দ্র নাথ হালদারের উদ্যোগে স্থানান্তর করে রুদাঘরা ইউনিয়নের কেন্দ্রস্থলে তথা বর্তমান অবস্থানে আনেন এবং স্কুলের নাম পরিবর্তন করে মিকশিমিল-রুদাঘরা হাই ইংলিশ স্কুল রাখা হয়।
এ সময় স্কুলের উন্নতির জন্য শশধর ঘোষ দার্জিলিং পর্ষন্ত চেষ্টা করে অনেক দাতা ব্যক্তির সাহাষ্য লাভ করেন এবং বিভিন্ন জনের অনুদানের টাকা দিয়ে স্কুলের উত্তর পাশে তিন কক্ষের একটি পাকা ঘর তৈরি করা হয়। এরপর থেকে ওই স্কুলের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা আসতে শুরু করে। ১৯০৯ সালে এ স্কুল থেকে ছাত্ররা প্রথমে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং ১৯২৬ সালে স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শশধর ঘোষের ছেলে নলিনী রঞ্জন ঘোষ ওই স্কুলের প্রধানশিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের এমএনএ রুদাঘরা গ্রামের মৌলভী তাজমাহমুদ সরদার স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৬১
সালে প্রধানশিক্ষক নলিনী রঞ্জন ঘোষ পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। অতঃপর এএফএম আবদুস সালাম বিএবিএড প্রধানশিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯৬৩ সালে আবদুস সালামের পদত্যাগের পর তারই ছোট ভাই আবদুস সোবাহান প্রধানশিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মাত্র তিন মাস পর তিনিও পদত্যাগ করেন। এ সংকট মুহূর্তে ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরের মতিয়ার রহমান বিএসসি ১৯৬৩ সালের ১ সেপ্টেন্বরে তিনি প্রধানশিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনিও পদত্যাগ করেন। তারপর চেঁচুড়িয়া গ্রামের আবু জাফর এমএ প্রধানশিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন উৎসাহী তরুন যুবক। তার সময় স্কুলের অবকাঠামোর কিছু উন্নতি হয়। ১৯৬৬ সালে তার পদত্যাগের পর গোনালী গ্রামের ধীরেন্দ্র নাথ প্রধানশিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯৬৭ সালে ধীরেন্দ্র নাথের পদত্যাগের পর মিকশিমিল গ্রামের মো. তকিম উদ্দিন বিএবিএড স্কুলের প্রধানশিক্ষক নিযুক্ত হন। তিনি (তকিম) ২০০৫ সালের ১০ অক্টোবরে অবসরে যাওয়ার পর ওই স্কুলের (বর্তমান) প্রধানশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন স্থানীয় দক্ষ শিক্ষক আবুল কালাম জোয়াদ্দার।
খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরিশাল ও ফরিদপুর থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে পড়তে আসছে প্রতি বছরই। এ বিদ্যালয় বর্তমান ৬৫৭ জন ছাত্র-ছাত্রী। যষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্ষন্ত প্রত্যেক শ্রেণীতে ক, খ, গ তিনটি শাখা এবং প্রত্যেক শ্রেণীতে ৪০ থেকে ৪৫ জনের ঊর্ধ্বে শিক্ষার্থী নেয়া হয় না। ১৯৭২ সালে এই স্কুলের ছাত্রী প্রমীলা সরকার যশোর বোর্ড থেকে মানবিক বিভাগে অষ্টম স্থান অধিকার করেন। ১৯৭৪ সালে আনোয়ারুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার মানবিক বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৭৮ সালে জিএম শহিদুল ইসলাম মানবিক বিভাগে চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। ২০০৩ সালে ডুমুরিয়া উপজেলা কর্তৃক শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অর্জন করে এবং ২০০৪ সালে সাবেক তকিম উদ্দিন স্যার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হন।