06/10/2025
ভোটঃ ইসলামের অনৈতিক দ্বন্দ্ব
====================
আসাদুজ্জামান
ভোট" একটি প্রক্রিয়া বা পদ্ধতির নাম। এর মাধ্যমে ক্ষমতার স্বীকৃতি তুলে দেয়া,মর্যদাবান ব্যক্তিত্ব তৈরি করা ,প্রতিনিধি বাছাই করা, কোন ব্যক্তিকে দায়িত্বে নিয়োজিত করা । ইত্যাদি কাজ গুলো সু-চারুরুপে সম্পন্ন করা হয়।
"ভোট"( vote ) শব্দটি ইংরেজি ভাষার শব্দ । এর সমার্থক বা প্রতিশব্দ গুলো হলো। ---
রায় দেয়া ,
মতামত দেয়া,
সথর্থন করা ,
সাক্ষ্য দেয়া,
পক্ষ্যাবলম্বন করা ,
সুপারিশ করা,
বাছাই করা,
ইত্যাদি।
ভোট এর আরবী হলো I 6 ( আত তাসভীত,বা তাসওয়িত ) এটি একটি ক্রিয়া মূল শব্দ । যার অর্থ ভোট প্রদান করা।
মূলত: এ সবকিছু'র সামষ্টিক অর্থ হলো "ভোট" ।
আল কোরআনে ভোটের নির্দেশনা আছে কি-না ?
---------------------------------------
কোরআনের সাথে ভোট এর সম্পর্ক কতটুকু। তা প্রত্যকের একান্ত-ই জানা দরকার। কোরআনে ভোটের সুস্পষ্ট নির্দেশনা বিদ্যমান রয়েছে। যেমন--
ان الله يامركم ان تؤدوا الامنت الى اهلها- واذا حكمتم بين الناس ان تحكموا بالعدل--
অর্থ : নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের (জনগন) কে আদেশ করেছেন, আমানত ( ভোট ) তার হকদার (যোগ্য লোক) দের কাছে অর্পণ করতে । যা পেয়ে সে মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে। এবং সে ন্যায়পরাযনতার সাথে মানুষের কল্যাণে কার্য সম্পাদন করবে । [ সুরা নিসা আয়াত - ৫৮]
কোরআনে অন্যত বলা হয়েছে, -------
من يشفع شقاعة حسنة يكن له نصيب منها- ومن يشفع شفاعه سيىٔة يكن له كفل منها-وكان الله على كل شىٔ مقيبا-
অর্থ : কেহ ভালো কাজে সুপারিশ করিলে, এতে তার অংশ থাকবে । আর কেহ মন্দ কাজে সুপারিশ করলে ,তাতে ও তার অংশ থাকবে। আল্লাহ তায়ালা সব বিষয়ে দৃষ্টি রাখেন । [সুরা নিসা আয়াত--৮৫ ]
বলা বাহুল্য যে,আপনার রায় বা সমর্থনে কেহ নির্বাচিত হয়ে ভাল কাজ করলে। তার ভালো কাজের সু-ফল আপনি ও পাবেন । অপর দিকে আপনার রায় বা সমর্থন নিয়ে কেহ মন্দ কাজ করলে, মন্দ কাজের কু-ফল আপনাকে ও নিতে হবে ।
অন্যদিকে দুনিয়াতে আপনাকে কাজের দায়িত্ব নিতে হবে এবং কাউকে না কাউকে আপনার সমর্থন দিয়ে যথাযথ ভাবে দায়িত্বভার দিতে হবে ।
ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী ভোটের বৈধতা।
------------------------------------------
ইসলামী শরিয়াহ সূচক ভোট প্রক্রিয়া নাজায়েজ এ কথা বলার সুযোগ নেই। শুরুতেই বলা হয়েছে এটি একটি প্রক্রিয়া মাত্র। তা বিচিত্র উপায়ে সম্পাদিত হতে পারে । মানুষের মন ,মত, মগজের চিন্তা-চেতনা ভিন্নতর হওয়ায় নির্বাচন সম্পাদন প্রক্রিয়া ভিন্ন হয় । তাই বলে ভোটের কাজের অর্থ ,উদ্দেশ্য ভিন্ন নয় ।
ইসলামী যুগেও ভোট প্রক্রিয়া বিদ্যমান ছিল। তবে আধুনিক প্রক্রিয়া থেকে ভিন্ন আকারে।
হযরত আবু বকর রা. যে প্রক্রিয়ায় শাসক নির্বাচন হয়েছে। তা সুস্পষ্ট ভোটের অংশ ছিল। হযয়ত ওসমান রা.তা থেকে যদিও ডিন্ন পন্থা অনুসরণ করে শাসক নির্বাচিত হয়েছেন। তাও এক প্রকার ভোট-ই ছিল । উভয়েই ভিন্ন ভিন্ন ভোটৈর মাধ্যমেই শাসক রূপে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
যাক , আধুনিক ভোট প্রক্রিয়া গুলো ইসলামের অনুমোদন আছে কিনা। এটা জানার বিষয়। এটি জানতে হলে, আগে ভোট শ্রেণী বিন্যাস জানতে হবে।
ভোট দুই প্রকার।
ক. ইসলামীক ভোট
খ. গনতান্ত্রিক ভোট।
ক. ইসলামীক ভোট প্রক্রিয়ার শ্রেণী বিন্যাস।
-----------------------------------
ইসলামীক ভোট প্রক্রিয়া আবার দূই প্রকার ।
১. নির্বাচন কমিশন কতৃক মনোনীত এবং
২. সরাসরি জনগন কতৃক মনোনীত।
এই দূই-ই পদ্ধতি ব্যবহার করে ইসলামী যুগে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়। হযরত আবু বক্কর সিদ্দিক রা.সরাসরি জনগণের ভোটে ও হযরত উসমান রা. নির্বাচন কমিশন কতৃক ভোটে মনোনীত হয়ে খলিফা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
পি. আর পদ্ধতিতে ভোট। এটি আধুনিক প্রযুক্তির অন্তর্গত হলেও এটি কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট গুলোতে প্রচলিত আছে। এই প্রক্রিয়ার আদল হলো , সব দল ভোটে অংশ গ্রহণ করবে । যেমন -- দল গুলো হল A,B,Y,X ও S । এদের মধ্যে ভোট ফলাফলে A পেয়েছে ৪০ শতাংশ , B পেয়েছে ৩০ শতাংশ ,Y পেয়েছে ২০ শতাংশ, X পেয়েছে ৭ শতাংশ ও S পেয়েছে ৩ শতাংশ ভোট। এর ভিত্তিতে আসন বিন্যাস হতে পারে । যাতে করে সকলের অংশ গ্রহণ নিশ্চিত হ'ল। অন্যথায় পূনরায় ভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে এবার শুধু A ও B তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এদের মধ্যে ৫০ শতাংশের অধিক যে দল ভোট পাবে তারা সরকার গঠন করবে । অন্যদলটি বিরোধী দল হিসেবে গন্য হবে। এ নিয়ম তুরস্ক সহ বিশ্বের নব্বইটির মত দেশে প্রচলিত আছে।
এবার আসুন গনতান্ত্রিক ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করি। এই প্রক্রিয়াটি কবে শুরু হয়েছে তা স্পষ্টত জানা যায়নি, তবে প্রথম গ্রীসের এ্যথেন্সে চালু হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।। পরবর্তীতে এটি মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন এর মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে আধুনিক বিশ্বে বিস্তার লাভ করে ।
গনতান্ত্রিক ভোট প্রক্রিয়ার শ্রেণী বিন্যাস
----------------------------------
আধুনিক গনতান্ত্রিক ভোট প্রক্রিয়া আবার ৮ (আট) প্রকার । যা হলো ---
১.ব্যলট পেপার এর মাধ্যমে ভোট প্রদান করা।
২.প্রচীন পদ্ধতিতে হাত তুলে ভোট প্রদান করা।
৩. হ্যাঁ-না পদ্ধতি অবলম্বন করে ভোট প্রদান করা
৪.খেলাফতি পদ্ধতি। যা বায়াত পদ্ধতি ব্যবহার করে নিস্পন্ন হয় । কোরআনের সূরা ফাতাহ এ পদ্ধতির কথা উল্লেখ আছে ।
৫.পক্ষাবলম্বন করা । যেমন খেলার মাঠে পক্ষ নেয়া ।
৬.সমর্থন প্রদর্শন করা। যেমন ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলের সমর্থন জানানো ।
৭.মেশিনের মাধ্যমে ভোট দেয়া । যেমন ই ভি এম ।
৮.লেখনীর মাধ্যমে ভোট প্রদান করা। যেমন কাগজ কলমে ভোট দেয়া ।
গনতান্ত্রিক ভোট প্রক্রিয়া মানে সকল জনগনের স্বকীয় অংশ গ্রহণের মাধ্যমে শাসক নির্বাচন করা। এটি ইসলামী শরিয়াহ সূচক মাপকাঠি থেকে খুব বেশি দুরে নয় । যেহেতু আল্লাহ রাসূল সা. এর ওয়াফাতের পর আনসার ও মুহাজির সাহাবাদের মাঝে খিলাফত নিয়ে দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হয়। তখন অধিকাংশ জনগণের সমর্থন ও একটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে মুহাজির সাহাবাদের মধ্যে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. শাসক রূপে খিলাফতে অধিষ্ঠিত হন। পক্ষান্তরে আনসার সাহাবীদের দূর্বল সমর্থনে বা কম সংখ্যক মানুষের সমর্থন থাকায় তাদের মনোনীত প্রার্থী নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হন ।
এই পদ্ধতির দ্বারা নিঃশর্ত প্রমানিত হয়, ভোট ইসলামে অনুমোদন আছে এবং সাহাবা আজমাইনরা প্রথম এই পন্থা অবলম্বন করেছেন।
তাহলে আলেম, ওলামা-মাসায়েখদের ভোট নিয়ে আপত্তি কেন?
-------------------------------------------
তাদের আপত্তির জায়গাটিতে বেশ অস্পষ্টতা আছে। কারণ ,কোরআনে অনেক জায়গায় উল্লেখ আছে ।
اكترهم الكفرؤن
তাদের অধিকাংশ কাফের।
اكترهم الفسقون
তাদের অধিকাংশই ফাসেক ।
এই "অধিকাংশ" শব্দটিতে যত আপত্তি। জড়ালো আপত্তি। ঘোরতর আপত্তি। যুক্তি যুক্ত আপত্তি। কোরআনে বর্ণিত এই শব্দ নিয়ে অনেক আলেম ওয়ালামাদের ভোটৈর ব্যপারে গায়ে এলার্জি ভাসে । তারা অজ্ঞতার বশে কিংবা হিংসার আড়ালে ফতোয়াবাজি করে । তাদের পুঁজি হলো----
اكثر.
অর্থ্যাৎ "অধিকাংশ" শব্দটি কোরআনে কাফের , ফাসেক , জালেমদের বুঝাতে নিদৃষ্ট করা হয়েছে।
অতএব অধিকাংশ জনগণ যাকে ভোট বা সমর্থন দিয়ে নির্বাচিত করবে, তারাই কাফের ,ফাসেক, জালেম । কারণ, কোরআনে "অধিকাংশ" শব্দটিকে কাফের , ফাসেক , জালেমদের সমর্থনে স্পষ্টত ব্যবহার করা হয়েছে।
এটি তাদের খরা যুক্তি। অনৈতিক দ্বন্দ্ব। যারা বলেন, ভোট হারাম । ক্ষমতা হারাম । এইসব কথার ফুল ঝুড়ি দিয়ে জাতিকে বিকিয়ে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করার চেষ্টায় সর্বদা লিপ্ত। তাদের হৃদয় রয়েছে ব্রক্রতায় যূক্ত। আল্লাহ তায়ালার ভাষায়-++
اولىٔك كالانعام بل هم اضل
অর্থ: উহারাই পশুর ন্যায়, উহারাই বিভ্রান্ত,পথভ্রষ্ট। [ সুরা আরাফ ১৭৯ ]
-------- ======== ---------