28/07/2026
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ছাড়াও র্যাবের তদন্তে উঠে এসেছে ওসি প্রদীপের ধ*র্ষ*ণ-সম্পৃক্ততার এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, প্রদীপ ও তার সহযোগীরা ৫০ জনের বেশি নারীকে ইয়াবা কারবারি বলে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এসে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ধ*র্ষ*ণ করেছেন।
সিনহা হ*ত্যা পরবর্তী টেকনাফে প্রদীপ আমলের কথিত ব*ন্দু*কযুদ্ধে ১৬১ জনকে হ*ত্যা ও ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওইসময় ভুক্তভোগীদের কেউ মামলা না করায় ধামাচাপা পড়ে প্রদীপের বিরুদ্ধে সিরিয়াল ধ*র্ষ*ণের অভিযোগগুলো।
টেকনাফ নাজিরপাড়ার ধ*র্ষ*ণের শিকার এক গৃহবধূ অভিযোগ করে জানান, স্বামীকে ধরে নিয়ে গিয়ে ৪৫ লাখ টাকা দাবি করেন ওসি প্রদীপ। নগদ ৩ লাখ টাকা, ব্যবহারের স্বর্ণালংকার নিয়ে স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতে থানায় যান তিনি।
স্বামীকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে তিনদিন আটকে রেখে ওসি প্রদীপসহ কয়েকজন মিলে তাকে টানা ধ*র্ষ*ণ করেন। তিনদিন পর স্বামীকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে তাকে বাড়ি চলে যেতে বলা হয়। পরদিন তার স্বামীর গু*লিবি*দ্ধ লা*শ পাওয়া যায়। ওই সময় ধ*র্ষ*ণের বিষয়ে মুখ খুললে পরিবারের সবাইকে হ*ত্যার হুমকি দেন ওসি প্রদীপ।’
ওসি প্রদীপের কাছে ধ*র্ষ*ণের শিকার হওয়ার অভিযোগ করে টেকনাফের হৃীলার আরেক গৃহবধূ জানান, তার স্বামীর কাছে চাঁদা দাবি করে স্থানীয় সন্ত্রাসী গিয়াস বাহিনীর লোকজন। চাঁদা না দেওয়ায় একদিন সন্ধ্যায় এসআই মশিউর বাড়িতে এসে তাকে ইয়াবা কারবারি বলে ধরে নিয়ে যায়। পরে অজ্ঞাত স্থানে টানা তিনদিন আটকে রেখে ওসি প্রদীপ ও সন্ত্রাসীরা তাকে ধ*র্ষ*ণের পর মরিচের গুঁড়ো দিয়ে গোপন স্থানে পাশবিক নির্যাতন চালায়। এরপর ইয়াবা দিয়ে আদালতে চালান করে দেয়।
ওই নির্যাতিত পরিবারের আলম নামের এক সদস্যের দাবি, তাদের পরিবারের ৬ নারীই প্রদীপের হাতে একইভাবে ধ*র্ষ*ণের শিকার হয়েছেন।
উখিয়া কোর্টবাজার এলাকার এক মেয়ের অভিভাবক জানান, ২০১৯ সালের শেষের দিকে তার পরিবারের কলেজ পড়ুয়া ১৭ বছরের এক তরুণী টেকনাফে প্রেমিকের সাথে দেখা করতে গেলে প্রেমিকসহ কয়েকজন মিলে তাকে সংঘবদ্ধ ধ*র্ষ*ণ করেন। ঘটনাক্রমে বিষয়টি ওসি প্রদীপ পর্যন্ত গড়ায়। ওইসময় ধ*র্ষ*কদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে প্রদীপ নিজেও কয়েক দিন আটকে রেখে একাধিকবার ধ*র্ষ*ণের পর ইয়াবা দিয়ে ওই মেয়েকে চালান করে দেন।
অভিযোগ আছে, টেকনাফ হোয়াইক্যং এলাকার আনোয়ার নামের এক ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে গিয়ে অর্ধকোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন ওসি প্রদীপ। টাকা দিতে না পারায় তিনদিন পর কথিত ব*ন্দু*কযুদ্ধের নামে তাকে হ*ত্যা করা হয়। এ বিষয়ে প্রতিকার পেতে নিহতের মেয়ে এবং বোন কক্সবাজার আদালতে যান। খবর পেয়ে ওই দুই নারীকে তুলে নিয়ে যায় ওসি প্রদীপের লোকজন। তাদের থানায় আটকে রেখে টানা ৫ দিন গণধ*র্ষ*ণের পর ইয়াবা দিয়ে চালান দেওয়া হয়।
এদিকে ধামাচাপা পড়ে যাওয়া অসংখ্য নারীর ধ*র্ষ*ণের অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। ভুক্তভোগী নারীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বের করা হয় কক্সবাজার জেলা কারাগারের তৎকালীন মেডিকেল রাইটার হাজতি মো. ইউসুফকে। তিনি কারাগারে থাকাকালীন প্রদীপের কাছে ধ*র্ষি*তা অসংখ্য নারীকে চিকিৎসা দিয়েছেন বলে তথ্য দিয়েছেন।
ইউসুফ জানান, ঘটনাক্রমে একটি মিথ্যা মামলায় ফেঁসে গিয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ২০২০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। হাসপাতালের টেকনোলজিস্ট ও চিকিৎসার বিষয়ে অভিজ্ঞতা থাকায় তাকে কারা মেডিকেলের রাইটার হিসেবে দায়িত্ব দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। সেই সুবাদে কারাগারে থাকা সব রোগীদের তিনি দেখভাল করতেন।
ইউসুফ জানান, টেকনাফের ১৬ বছরের এক তরুণী তাকে জানিয়েছিলেন বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে এসে তাকে থানায় ১৫ দিন আটকে রাখেন ওসি প্রদীপ। এসময়ের মধ্যে একাধিকবার প্রদীপ তাকে ধ*র্ষ*ণ করেন। পরে একইভাবে আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্যও তাকে ধ*র্ষ*ণ করেন। ধ*র্ষ*ণের পর প্রত্যেকবার গোপনা*ঙ্গে মরিচের গুঁড়ো দিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয় তাকে। এসময় যন্ত্রণায় চিৎকার করলে প্রদীপ ও তার সহযোগীরা উল্লাসিত হতেন বলে জানান ওই তরুণী। ধ*র্ষ*ণ-পরবর্তীতে তাকে ইয়াবা দিয়ে চালান করে দেওয়া হয়েছিল।
কারাগারে অসুস্থতার কারণে মৃ*ত্যুর কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন ওই তরুণী। পরবর্তীতে সদর হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তার বুকে-পিঠে অমানসিক নির্যাতনের চিহ্ন ছিল বলে জানান ইউসুফ।
একইভাবে কারাগারে আসা টেকনাফের রঙ্গিখালীর এক তরুণী ইউসুফকে জানিয়েছিলেন, বাড়ি থেকে তুলে এনে একমাসের বেশি সময় আটকে রেখে একাধিকবার ধ*র্ষ*ণ করেন ওসি প্রদীপ। পরে মরিচের গুঁড়ো দিয়ে তাকেও মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়। সর্বশেষ ইয়াবা দিয়ে তাকেও চালান করে দেওয়ার ভয়াবহ বর্ণনা ওই তরুণীর মুখে শুনেছেন ইউসুফ।
এভাবে কারাগারে আসা অগণিত নারী চিকিৎসা নিতে এসে প্রদীপের কাছে ধ*র্ষ*ণের লোহম*র্ষ*ক বর্ণণা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইউসুফ।
ইউসুফের দেওয়া তথ্যমতে, প্রায় অর্ধশতাধিক তরুণী প্রদীপ কর্তৃক ধ*র্ষ*ণের শিকার হয়েছেন জানিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। অবস্থা জটিল হলে ধ*র্ষ*িতাদের পাঠানো হত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে তাদের চিকিৎসা। এর বাইরেও অনেকে গর্ভবতী না হওয়ার জন্য চিকিৎসা নিলেও লজ্জায় ধ*র্ষ*ণের কথা স্বীকার করেননি।
ইউসুফ আরও জানান, কারাগারে অন্তত ১৭ জন ধ*র্ষ*িতার লোমহ*র্ষ*ক বর্ণনা এখনো তিনি ভুলতে পারেন না। তারা সবাই প্রদীপের ধ*র্ষ*ণ-পাশবিকতার শিকার বলে দাবি করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রদীপ আমলে বাড়ি থেকে যেসব মেয়েদের টেকনাফ থানা পুলিশ ধরে আনতো তাদেরকে কমপক্ষে তিন থেকে ১০ দিন, কখনো এক মাস পর্যন্ত থানায় বা অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হতো। এসময়ের মধ্যে অভিভাবকদের কোনও ধরনের দেখা-সাক্ষাত বা তথ্য দেওয়া হতো না। বরং এ বিষয়ে কাউকে জানালে ক্রসফায়ারের হুমকি দেওয়া হতো।
এদিকে প্রদীপের সিরিয়াল ধ*র্ষ*ণের বিষয়ে অবগত ছিলেন টেকনাফের স্থানীয় সাংবাদিকরাও। ওসি প্রদীপ টেকনাফের সুন্দরী মেয়েদের ইয়াবা কারবারি দাবি করে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে এসে টানা কয়েকদিন আটকে রেখে ধ*র্ষ*ণের পর ইয়াবা দিয়ে চালান করে দিতেন বলে জানান সাংবাদিকরা। তবে প্রাণের ভয়ে নীরব ছিলেন বলে দাবি তাদের।
স্থানীয় সংবাদকর্মী রহমত উল্লাহ জানান, টেকনাফের রঙ্গিখালীর মেয়েরাই প্রদীপের পাশবিকতার শিকার হয়েছেন বেশি। ওই এলাকার মেয়েরা একটু সুন্দরী এবং ভীতু বলে পরিচিত।
কক্সবাজারের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ আবদুল মন্নান বলেন, আমি শুনেছি, প্রদীপ কর্তৃক ধ*র্ষ*ণের শিকার হয়ে ৫ থেকে ৬ জন নারী প্রেগনেট অবস্থায় বর্তমানে কারাগারে অবস্থান করছেন। নির্যাতিতা পরিবার থেকে আমি এসব শুনেছি। বিষয়টি তদন্ত করলে প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে। এ আইনজীবীর মতে, ভুক্তভোগীরা এ বিষয়ে মামলা না করলেও রাষ্ট্র চাইলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনীন সরওয়ার কাবেরী বলেন, আমি ওসি প্রদীপের পাশবিকতার শিকার প্রায় নারীর ঘরে গিয়েছি। টেকনাফের অগণিত মেয়ে আমাকে জানিয়েছেন তারা প্রদীপের মাধ্যমে কীভাবে ধ*র্ষ*ণের শিকার হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, এক পরিবারের দুই বোনকে থানায় তুলে নিয়ে ১৫ দিন আটকে রেখে একাধিকবার ধ*র্ষ*ণ করেছেন এমন অভিযোগও পেয়েছি। তবে নির্যাতিত এসব পরিবারগুলো প্রদীপের শাস্তির দাবি জানালেও ধ*র্ষ*ণের ঘটনা প্রকাশ হওয়া ও লোকলজ্জায় মামলা করতে আগ্রহী নয় বলে জানান তিনি। কাবেরী এ বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও স্বপ্রণোদিত মামলা করে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে মেজর সিনহা হ*ত্যা মামলার তদন্ত সংস্থা র্যাবের তদন্তেও অসংখ্য নারীকে থানায় তুলে এনে ওসি প্রদীপের ধ*র্ষ*ণ সংক্রান্ত ঘটনার সত্যতা মিলেছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসপি খায়রুল ইসলাম বলেন, আমরাও অনেক নারীর কাছ থেকে ওসি প্রদীপের থানায় ধরে এনে শ্লীলতাহানির অভিযোগ পেয়েছি। এসব বিষয় অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালত চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
—
(পার্বত্য নিউজ পত্রিকায় ৮ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে প্রকাশিত)