24/07/2025
যদি হতে চান গবেষক
বিজন কুমার
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৫,
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে তরুণদের গবেষক হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়। কারণ, তহবিলের সীমাবদ্ধতা, উন্নত গবেষণা সরঞ্জামাদির অভাব এবং দক্ষ তত্ত্বাবধায়কের অভাবসহ আরও কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ এদেশের গবেষণার পরিবেশকে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করছে। এছাড়াও বর্তমান সমাজ উদ্ভাবন বা গবেষণার চেয়ে চাকরিপ্রাপ্তিকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে, এতে খুব কম তরুণই গবেষণামুখী হচ্ছে, যা অদূর ভবিষ্যতে জাতিকে মেধাশূন্য করে দিতে পারে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও একজন শিক্ষার্থী চাইলে গবেষণার পথে অনেকদূর যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে তার কিছু গুণাবলি এবং দক্ষতা অর্জন করা অপরিহার্য।
অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্ভাবনী চিন্তা
একজন তরুণ গবেষককে গভীর কৌতূহলী ও বাস্তব সমস্যার সমাধানে সর্বদা আগ্রহী হতে হবে। সমাজের চারপাশে কী ঘটছে সেসব নিয়ে তাকে ভাবতে হবে এবং তা সমাধানের প্রয়াস করে যেতে হবে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য সংকট, খাদ্য নিরাপত্তা ও নগর সমস্যার মতো নানা স্থানীয় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা গবেষণার মাধ্যমে সমাধানের জন্য তরুণদের উদ্যোগী হতে হবে। যেমন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী লবণ-সহিষ্ণু ফসল নিয়ে গবেষণা করতে পারে। তাহলে উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট কৃষিজ সংকট মোকাবিলায় তা বড় ভূমিকা রাখবে। এই ধরনের সমস্যা-নির্ভর চিন্তাধারা একজন তরুণ শিক্ষার্থীকে পরিণত গবেষক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে।
প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার
ডিজিটাল যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করা অপরিহার্য। তবে তা যেন অবশ্যই নৈতিক হয়। তরুণ গবেষকদের শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শী হলেই চলবে না বরং সততা ও নৈতিকতা বজায় রেখে তা প্রয়োগ করতে হবে। ধরা যাক, বুয়েটের একদল শিক্ষার্থী একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাস মডেল তৈরি করতে চায়। এক্ষেত্রে তাদের অবশ্যই তথ্যের গোপনীয়তা, মডেলের স্বচ্ছতা ও পক্ষপাতহীনতা মাথায় রেখেই কাজটি করতে হবে। এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বা আন্তর্জাতিক সংস্থা বিনামূল্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের নৈতিকতা বিষয়ক অনলাইন কোর্স করায়। তরুণ গবেষকের শুরুতেই এসব শিখে নেওয়া উচিত।
গবেষণা শেখার প্রশিক্ষণ
ভালো গবেষক হতে গেলে গবেষণা পদ্ধতির ওপর স্বচ্ছ জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। কিন্তু, অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, বাংলাদেশে স্নাতক পর্যায়ে গবেষণা পদ্ধতি, পরিসংখ্যান বা অ্যাকাডেমিক লেখালেখির কোর্স সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে একজন শিক্ষার্থী চাইলে সহজেই কোর্সেরা, এডেক্স, বিকে স্কুল অব রিসার্চ, ফিউচারলারনের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে গবেষণা পদ্ধতির ওপর অনলাইন কোর্স সম্পন্ন করে এই ঘাটতি পূরণ করতে পারে। এমআইটি, হার্ভার্ড, জন হপকিন্সসহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার মৌলিক বিষয় নিয়ে অনলাইনে চমৎকার কোর্স করিয়ে করে থাকে। এ ধরনের কোর্স গবেষণার মান উন্নয়নের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় স্কলারশিপ বা গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সাহায্য করে। এই কোর্স থেকে অর্জিত দক্ষতা গবেষণা প্রকল্পের প্রস্তাবনা তৈরি, অ্যাকাডেমিক প্রকাশনা ও নীতিনির্ধারণ সংক্রান্ত কাজে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
নেটওয়ার্কিং ও কোলাবরেশন
আমাদের দেশের গবেষণার পরিবেশ এখনো আন্তর্জাতিক মানের হয়নি, এ কারণে তরুণদের উচিত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। রিসার্চগেট, লিঙ্কেডইন, অ্যাকাডেমিয়া এডু, সাইপ্রোফাইল ও টুইটারের মতো অ্যাকাডেমিক প্ল্যাটফর্মগুলো গবেষণা সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র ও লেখা পাওয়ার পথ খুলে দেয় এবং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করে। তরুণ গবেষকদের দেশের অভ্যন্তরে ও ভার্চুয়ালি দেশের বাইরে কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করা উচিত। এসব কনফারেন্সে পেপার বা পোস্টার উপস্থাপনার সুযোগ থাকে, যা নতুনদের জন্য দারুণ অভিজ্ঞতা ও ফিডব্যাক পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। এছাড়াও, আন্তর্জাতিক পরিম-লের গবেষকদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে সহ-লেখক, ডেটাসেট অ্যাক্সেস বা পদ্ধতিগত পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এভাবে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীও আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে পরিচয়ের সূত্র ধরে সুদূর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরের সঙ্গে একটি গবেষণাপত্র সহ-লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এর পাশাপাশি তরুণ গবেষকদের নিয়ে কাজ করে এমন কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েও নেটওয়ার্কিং ও কোলাবরেশন বৃদ্ধি করে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে গবেষণা উপস্থাপন ও প্রকাশনা করা যেতে পারে। ২০১৫ সাল থেকে বিকে স্কুল অব রিসার্চ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণদের নিয়ে এ ধরনের কাজ করে যাচ্ছে।
নেতৃত্বগুণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
গবেষণা খুব একটা সহজ কাজ নয়। প্রচলিত চাকরির পথে না গিয়ে গবেষণাকে বেছে নিলে তাকে বেশ সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক চাপের মধ্যে পড়তে দেখা যায়।
এছাড়াও অপর্যাপ্ত ফান্ড ও গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশের অভাবে একজন তরুণ গবেষক অল্পতেই অনুৎসাহিত হয়ে পড়ে। এসব চালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনে এগোনোর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় প্রত্যয় ও স্থিতিশীল লক্ষ্য। তাৎক্ষণিক সাফল্যের আশা না করে, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করে ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সামনে অগ্রসর হতে হবে। সেইসঙ্গে, ছোট ছোট অর্জনগুলো উদযাপন করতে হবে, এতে তরুণ গবেষকদের মানসিক স্থিতি বজায় থাকবে। যেমন একটি প্রস্তাব জমা দেওয়া, কনফারেন্স অ্যাবস্ট্র্যাক্ট গ্রহণ হওয়া, গবেষণা উপস্থাপনা করা, ছাত্র গবেষণা জার্নালে লেখা প্রকাশ, তরুণ ফোরামে উপস্থাপন, উদ্ভাবন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, সিড ফান্ডিং বা ফেলোশিপের জন্য আবেদন প্রভৃতি একজন তরুণ গবেষককে দারুণভাবে উজ্জীবিত করে। The Great Bangladesh
সৃজনশীল লেখায় দক্ষতা
একটি গোছালো গবেষণাপ্রবন্ধ লিখতে ও প্রকাশ করতে পারা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কারণ, একটি ভালো মানের প্রকাশনার মাধ্যমে সহজেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও নীতিনির্ধারণে নিজের অবস্থান তৈরি করা যায়। তরুণ শিক্ষার্থীদের শুরুতেই অ্যাকাডেমিক লেখালেখিতে হাত ভালো থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। তাই, অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে বা অভিজ্ঞ মেন্টরের সাহায্য নিয়ে অ্যাকাডেমিক লেখার কৌশল দ্রুত রপ্ত করা খুব জরুরি।
আমাদের দেশের মতো দেশে গবেষণার ক্ষেত্রে প্রচুর অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তারপরও একজন শিক্ষার্থী নিজে থেকে চাইলে গবেষণার পথে অনেকদূর যেতে পারবে। এক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই অনুসন্ধিৎসু ও উদ্ভাবনীমূলক চিন্তাধারার হতে হবে। সেই সঙ্গে গবেষণা পদ্ধতির ওপর পর্যাপ্ত জ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারে দক্ষ হতে হবে। দেশের টেকসই উন্নয়নে গবেষণা তথা সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার করার কোনো বিকল্প নেই। তবে তার পাশাপাশি অবশ্যই তরুণ প্রজন্মকেও আত্মপ্রত্যয়ী, নিষ্ঠাবান এবং দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন হতে হবে। তাহলেই বৈশ্বিক উন্নয়নে তরুণদের অবদান আরও বেশি দৃশ্যমান হবে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠাতা, বিকে স্কুল অব রিসার্চ
সোর্স দেশ রুপান্তর