16/03/2022
প্রশ্নঃ সার্কিট ব্রেকার কি?
সার্কিট ব্রেকার হচ্ছে ইলেকট্রিক সার্কিটকে নিরাপত্তা প্রদানকারী অর্ধ স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র বিশেষ। এটি এমন একটি ইলেকট্রিক্যাল বা ইলেকট্রনিক যন্ত্র যা অপর কোন ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রকে নিরাপদ রাখে। কোন কারণে এসি লাইনে যদি অতিরিক্ত পরিমান বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় তাহলে দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। যন্ত্রপাতি পুড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে আগুন লাগাও বিচিত্র নয়। যেমন-
কোন কারণে যদি এসি লাইনে শর্ট সার্কিট(Short Circuit) ঘটে,
মাত্রাতিরিক্ত লোড লাগানো (ওভার লোড), কিংবা
যদি কোন কারণে আপনার বাসার লাইন ভোল্টেজ বেড়ে যায় (ফলে কারেন্টের প্রবাহ বৃদ্ধি হয়)।
এসমস্ত ক্ষেত্রে সার্কিট ব্রেকার নিজে থেকেই ট্রিপ (Trip) করে বা বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে মূল্যবান যন্ত্রপাতি কে রক্ষা করে।
বাসা-বাড়িতে ব্যবহৃত সার্কিট ব্রেকার গুলো মিনিয়েচার সার্কিট ব্রেকার (MCB) নামেও পরিচিত। সেগুলোর আকার বেশ ছোট। চালু ও বন্ধ করার জন্য তার সামনে একটি লিভার (lever) মত থাকে যাকে অপারেটর (Operator) নামে ডাকা হয়।
পাওয়ার সাবস্টেশনে ব্যবহৃত হাই ভোল্টেজ সার্কিট ব্রেকার
এছাড়াও ইলেকট্রনিক সার্কিট ব্রেকারও আছে। নিচে পিসিবি তে তৈরি এমনি একটি ইলেকট্রনিক ব্রেকারকে দেখতে পাচ্ছি-
পিসিবি তে প্রস্তুতকৃত ইলেকট্রনিক সার্কিট ব্রেকার যা আলাদা ব্যাটারি পাওয়ার দিয়েও চলতে সক্ষম
আভ্যন্তরীন গঠন
সাধারণ সার্কিট (MCB) ব্রেকারের অভ্যন্তরীণ গঠন
নিচের চিত্রে একটি হাই ভোল্টেজ সার্কিট ব্রেকারের পার্শ্বচ্ছেদের চিত্র ও তারই পাশে ইলেকট্রিক্যাল পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের কে তা পাওয়ার সাবস্টেশনে বসানোর চিত্র দেখতে পাচ্ছি।
হাই ভোল্টেজ সার্কিট ব্রেকারের আভ্যন্তরীন ও প্রায়োগিক চিত্র
নিচের ড্রইংটিতে আমরা ২৫ কিলো ভোল্ট সিংগেল ফেজ এয়ার সার্কিট ব্রেকারের আভ্যন্তরীন বিভিন্ন অংশ সমূহ দেখতে পাচ্ছি-
২৫ কিলো ভোল্ট সিংগেল ফেজ এয়ার সার্কিট ব্রেকারের আভ্যন্তরীন বিভিন্ন অংশ সমূহ
সার্কিট ব্রেকারের সিম্বল
নিচে এর ইলেকট্রকাল সিম্বল দেখতে পাচ্ছি যেখানে-
A – ম্যানুয়েল টাইপ
B – থার্মাল ওভার লোড টাইপ ও
C – ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ওভার লোড টাইপ
সার্কিট ব্রেকারের সিম্বল সমূহ
সার্কিট ব্রেকারের ইলেকট্রিক্যাল/
ইলেকট্রনিক সিম্বল সমূহ
সার্কিট ব্রেকার কত প্রকার
সার্কিট ব্রেকারকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা যায়-
লো ভোল্টেজ সার্কিট ব্রেকার
ম্যাগনেটিক সার্কিট ব্রেকার
থার্মাল ম্যাগনেটিক সার্কিট ব্রেকার
কমন ট্রিপ ব্রেকার
মিডিয়াম ভোল্টেজ সার্কিট ব্রেকার
হাই ভোল্টেজ সার্কিট ব্রেকার
সালফার হেক্সাফ্লুরাইড হাই ভোল্টেজ সার্কিট ব্রেকার
ডিসকানেক্টিং সার্কিট ব্রেকার
কার্বন ডাই অক্সাইড হাই ভোল্টেজ সার্কিট ব্রেকার
অন্যান্য
লোড বা শর্ট সার্কিটের হাত থেকে বাঁচায়।
ইলেকট্রনিক ওভার লোড টাইপ সার্কিট ব্রেকার
ইলেকট্রনিক সার্কিট ব্রেকার গুলো মূলত তড়িৎ প্রবাহের পরিমাণ সেন্স করবার মাধ্যমে ওভার লোড বা শর্ট সার্কিট কে সনাক্ত করতে পারে এবং তদানুযায়ী পূর্ব নির্ধারিত কোন কাজ করতে পারে (যেমনঃ লোড কে পাওয়ার থেকে বিচ্যুত করা, এলার্ম বাজানো, মোবাইলে এসএমএস পাঠানো, ইত্যাদি)। প্রয়োজনে এগুলোতে ডিজিটাল ডিসপ্লে সংযুক্ত করবার ব্যবস্থাও থাকে যার মাধ্যমে প্রবাহিত কারেন্টের পরিমাণ, ওভার লোড সিচুয়েশনে নির্দিষ্ট কাজ সেট করবার ব্যবস্থা, বিশেষ কোন বার্তা প্রদর্শন ইত্যাদি করা যায়। ক্ষেত্র বিশেষে এসমস্ত তথ্যগুলো কে কম্পিউটারে স্থানান্তরের জন্য ডাটা পোর্ট (ইউএসবি বা অন্যকোন) ও ব্যবহার করা হয়। ক্ষুদ্রাকৃতির ইলেকট্রনিক সার্কিট ব্রেকার গুলোকে ইলেকট্রনিক ফিউজ, ওভারলোড প্রোটেকশন সার্কিট হিসেবেও ডাকা হয়।
ইলেকট্রনিক সার্কিট ব্রেকার ও তার বাহ্যক বিভিন্ন অংশ সমূহ
ইলেকট্রনিক সার্কিট ব্রেকার ও তার বাহ্যক বিভিন্ন অংশ সমূহ
এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে, বোঝার সুবিদার্থে এই লেখায় বেসিক ও মূল কার্য প্রণালী দেখানো হয়েছে যা প্রাযুক্তিক উন্নয়নের সাথে সাথে আরো উন্নত হচ্ছে। এখন এসকল পদ্ধতির সংকরায়নে আরো আধুনিক ও দ্রুত গতির সার্কিট ব্রেকার ও নির্মিত হচ্ছে।
সার্কিট ব্রেকার ব্যবহারের সুবিধাবলী
সার্কিট ব্রেকার ব্যবহারের বিশেষ কিছু সুবিধা আছে-
সার্কিট ব্রেকার ফিউজের তুলনায় খুব দ্রুত কাজ করে
এগুলি ফিউজের তুলনায় বেশি নির্ভরযোগ্য
সার্কিট ব্রেকার বেশি পরিমাণ সেন্সেটিভ হয় ফিউজের তুলনায়
ফিউজ একবার নষ্ট হলেই পাল্টাতে হয় যেখানে সার্কিট ব্রেকার একের অধিক বার ব্যবহার করা যায়
সঠিক ও উপযুক্ত মানের সার্কিট ব্রেকার ব্যবহার করলে তা দীর্ঘদিন টেকার নিশ্চয়তা দেয়
অপেক্ষাকৃত দ্রুত সময়ে লোডের বিদ্যুৎ পুনর্বহাল করা যায়। অর্থাৎ ডাউন টাইম (Down time) কম হয়
ক্ষেত্রে বিশেষে লোডের জন্য আলাদা ভাবে সুইচ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা থেকে বাঁচায়
অধিকাংশ ভালো সার্কিট ব্রেকার গুলোতে টেস্ট বাটন থাকে যার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় সার্কিট ব্রেকারটি ঠিকমত কাজ করছে কিনা। ফিউজে এমন ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।
সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ (Trip) করে কখন?
মিনিয়েচার টাইপ সার্কিট ব্রেকার (MCB) গুলো সাধারণত ৩ ধরণের হয়। এই ধরন বা টাইপ অনুযায়ী এদের ট্রিপিং কারেন্ট ও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে, যথা-
টাইপ B সার্কিট ব্রেকার – ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি কারেন্ট প্রবাহিত হলে এগুলো ট্রিপ করে;
টাইপ C সার্কিট ব্রেকার – ৫ থেকে ১০ গুন বেশি কারেন্টে এগুলো ট্রিপ করে;
টাইপ D সার্কিট ব্রেকার – লোড কারেন্ট ১০ থেকে ২০ গুণ হলে এগুলো ট্রিপ হয়।
মূলত কোন সার্কিট ব্রেকার কখন ট্রিপ করবে তা তার ম্যানুয়েল বা ডাটাশিট এ উল্লেখ থাকে।
সার্কিট ব্রেকার লাগানোর ওয়্যারিং ডায়াগ্রাম
সাধারণত সার্কিট ব্রেকার কে কোন লোডের সিরিজে সংযোগ দিতে হয়। কি ধরণের লোড ব্যবহার হচ্ছে এবং লোডের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পরিমাণ কারেন্ট রেটিং অনুযায়ী সার্কিট ব্রেকার লাগাতে হয়।
কত মানের সার্কিট ব্রেকার ব্যবহার করা উচিৎ
রেজিস্টিভ লোডের ক্ষেত্রে – লোডের মোট গৃহীত এম্পিয়ারের ৩ গুণ ব্যবহার করা শ্রেয়। উল্লেখ্য রেজিস্টিভ লোড হচ্ছে – টাংস্টেন বা ফিলামেন্ট লাইট, হিটার, আয়রন প্রভৃতি।
ইন্ডাক্টিভ লোডের ক্ষেত্রে – লোডের মোট গৃহীত এম্পিয়ারের ৬ গুণ ব্যবহার করা উচিৎ। কারণ ইন্ডাক্টিভ লোড সমূহ, সুইচ অন করবার সময় ৩-৬ গুণ পরিমাণ কারেন্ট টানে এবং আস্তে আস্তে তার কারেন্ট টানার পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে আসে। ইন্ডাক্টিভ লোড হচ্ছে সে সকল লোড যাদের মধ্যে ইন্ডাক্টর/কয়েল আছে। উদাহরণ – সিলিং ফ্যান, টেবিল ফ্যান, ইলেকট্রিক মোটর, ছোট ট্রান্সফরমার চালিত যন্ত্রপাতি, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি।
ক্যাপাসিটিভ লোডের ক্ষেত্রে – ক্যাপাসিটিভ লোড গুলোও প্রাথমিক ভাবে বেশি কারেন্ট টানে কিন্তু তা ক্ষণিক সময়ের জন্য এবং ইন্ডাক্টিভ লোডের মত দীর্ঘ সময় ব্যাপীও না। একে ইনরাশ কারেন্ট বলে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লোডের মোট কারেন্টের ৬ গুণ পরিমাণ ব্যবহার করাই শ্রেয়। এরফলে ইনরাশ কারেন্টে সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ করবার সম্ভাবনা কমে।
সার্কিট ব্রেকার লাগানোর নিয়ম
যে লোডের সাথে সার্কিট ব্রেকার লাগানো হচ্ছে সেটি কত এম্পিয়ার কারেন্ট টানে তা হিসেব করে বের করতে হবে। তার জন্য, I = W÷V সূত্র প্রয়োগ করা যেতে পারে। যন্ত্রের গায়ে/পেছনে অনেক সময় ওয়াট ও এম্পিয়ার মান খোদাই/লেখা থাকে।
যে লোডে সার্কিট ব্রেকার লাগানো হচ্ছে সেটি কি টাইপের তা নির্ণয় করতে হবে। যদি এমন হয় যে উক্ত লাইনে বা উক্ত সার্কিট ব্রেকারে ভিন্ন ভিন্ন টাইপের লোড লাগানো হবে (বাসা বাড়িতে যেমন থাকে) সে ক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য সর্বোচ্চ মান ধরে হিসাব করতে হবে।
ইন্ডাকটিভ লোডে ব্যবহারের জন্য লোডের এম্পিয়ার মানের চেয়ে ৩-৬ গুণ বেশি রেটিং সম্পন্ন সার্কিট ব্রেকার ব্যবহার করতে হবে।
ক্যাপাসিটিভ লোডের ক্ষেত্রে সার্কিট ব্রেকারের মান হবে লোডের এম্পিয়ার মানের ৬ গুণ।
রেজিস্টিভ লোডের ক্ষেত্রে সার্কিট ব্রেকার লাগানোর নিয়ম হচ্ছে লোড যত এম্পিয়ার টানবে তার চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি ধরা। অর্থাৎ লোড যদি ১ এম্পিয়ার টানে তাহলে সার্কিট ব্রেকার টি ১.২ এম্পিয়ারের হলেই চলবে। যদিও রেজিস্টিভ লোড চালু থেকে বন্ধ হবার আগে পর্যন্ত একই এম্পিয়ার টানে তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সার্জ কারেন্টের ফলে যেন অযথাই সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ না করে তাই কিছুটা অতিরিক্ত মানের লাগানো ভালো।
হাই এম্পিয়ার প্রতিটি লোড আলাদা আলাদা সার্কিট ব্রেকারে সংযোগ দিতে হবে। হাই এম্পিয়ার লোড যেমন – হাই পাওয়ার মোটর, পানির পাম্প, এয়ার কন্ডিশনার, ইলেকট্রিক হিটার, ইস্ত্রি লাগানোর প্লাগ পয়েন্ট ইত্যাদি।
এখানে উল্লেখ্য যে- যদি হিসাবকৃত মান বাজারে না পাওয়া যায় তাহলে কাছাকাছি বেশি মানের ব্যবহার করা যেতে পারে। (যেমন – লোডের কারেন্ট ১১ এম্পিয়ার পাওয়া গেল কিন্তু বাজারে এই মানের সার্কিট ব্রেকার পাওয়া যায় না। কিন্তু ১৬ এম্পিয়ারের ব্রেকার সহজ লভ্য। কাজেই ১৬ এম্পের ব্রেকার ব্যবহার করা যেতে পারে)
ওয়্যারিং ডায়াগ্রাম আগেই এই পয়েন্টে উল্লেখ করেছি বিধায় তা আর এখানে লিখছি না।
পাদটিকা
ট্রিপ (Tripp)
সার্কিট ব্রেকারের প্রেক্ষাপটে “ট্রিপ” অর্থ বন্ধ হওয়া।
ট্রিপিং কারেন্ট (Tripping current)
যে পরিমাণ কারেন্ট প্রবাহিত হলে একটি সার্কিট ব্রেকার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় তাকে ট্রিপিং কারেন্ট বলে।
ইনরাশ কারেন্ট
সুইচ অন করার সাথে সাথে কোন লোড যে কারেন্ট গ্রহণ করে তাকে ইনরাশ কারেন্ট বলে। স্বাভাবিক ভাবে ইন্ডাকটিভ ও ক্যাপাসিটিভ লোডে এই ইনরাশ কারেন্ট তার স্বাভাবিক গৃহীত কারেন্টের তুলনায় অনেক বেশি হয়।
সার্জ ভোল্টেজ
অল্টারনেটিং কারেন্ট বর্তনিতে অর্ধ সাইকেল বা তার কম সময়ের জন্য মাত্রাতিরিক্ত ভোল্টেজের উপস্থিতি কে সার্জ ভোল্টেজ বলে।
সার্জ কারেন্ট
ইনরাশ কারেন্টের অনুরূপ।
সেফটি ডিভাইস হিসেবে সার্কিট ব্রেকার এর ভূমিকা অপরিসীম।