25/08/2026
◻️ রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা বনাম আবেগ: কুরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ড:-
আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ।
নবী কারীম (ﷺ)-এর পৃথিবীতে আগমন মানবজাতির জন্য আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ। রবিউল আউয়াল মাস এলেই তাঁর জন্মবার্ষিকী বা ‘ঈদে মিলাদুন্নাবি’ পালন কেন্দ্রিক আবেগ আমাদের সমাজে প্রবল হয়ে ওঠে। রাসূল (ﷺ)-কে ভালোবাসা ঈমানের অপরিহার্য অঙ্গ। কিন্তু এই ভালোবাসা প্রকাশের পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত?
আবেগের বশবর্তী হয়ে আমরা কি সুন্নাহ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি? আসুন, কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিষয়টি অনুধাবন করি।
১. দ্বীন ইসলাম পরিপূর্ণ, নতুন প্রথার অবকাশ নেই
বিদায় হজ্জের দিন আল্লাহ তায়ালা একটি আয়াত নাজিলের মাধ্যমে ইসলামি শরীয়তকে কিয়ামত পর্যন্ত পরিপূর্ণ ঘোষণা করেছেন।
কুরআনের ঘোষণা:
ٱلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِى وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلْإِسْلَٰمَ دِينًۭا
অনুবাদ: "আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নেয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।"
(সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩)
যেহেতু রাসূল (ﷺ)-এর জীবদ্দশাতেই দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে গেছে, তাই তাঁর ইন্তেকালের পর দ্বীনের নামে ঘটা করে জন্মদিন পালনের মতো নতুন কোনো প্রথা বা ইবাদত (যা সাহাবায়ে কেরাম করেননি) তৈরি করার কোনো অবকাশ শরীয়তে নেই।
২. দ্বীনের নামে নতুন সংযোজন (বিদআত) সম্পর্কে সতর্কতা:
ইসলামে ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো তা রাসূল (ﷺ)-এর নির্দেশিত পদ্ধতিতে হতে হবে। আবেগের বশে নতুন কোনো আনুষ্ঠানিকতা উদ্ভাবন করাকে শরীয়তে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
হাদিসের নির্দেশনা:
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ
অনুবাদ: "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের (শরীয়তের) মধ্যে এমন নতুন কিছু উদ্ভাবন করল যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত (বাতিল)।"
(সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৭১৮)
অতএব, যে আনুষ্ঠানিকতা আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী (রা.)-সহ কোনো সাহাবী পালন করেননি, তা কখনো প্রকৃত ভালোবাসার মাপকাঠি হতে পারে না।
৩. রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ:
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি ভালোবাসার একমাত্র প্রমাণ হিসেবে তাঁর ‘ইত্তেবা’ বা নিঃশর্ত অনুসরণকে নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
কুরআনের ঘোষণা:
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِى يُحْبِبْكُمُ ٱللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَٱللَّهُ غَفُورٌۭ رَّحِيمٌۭ
অনুবাদ: "(হে নবী!) আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
(সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ৩১)
বছরে একদিন জাঁকজমকপূর্ণ মিছিল বা আনুষ্ঠানিকতা করে বাকি ৩৬৪ দিন সুন্নাহকে অবহেলা করা প্রকৃত ভালোবাসা নয়। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে— পোশাকে, লেনদেনে, পরিবারে ও সমাজে সুন্নাহর বাস্তবায়নই হলো আসল ভালোবাসা।
৪. জন্মদিবস উপলক্ষে শরীয়ত সমর্থিত আমল:
রাসূল (ﷺ) তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জাঁকজমকপূর্ণ কোনো উৎসব পালন করেননি। তবে তিনি সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে রোজা রাখতেন, যা আমাদের জন্য একটি চমৎকার সুন্নাহ আমল।
হাদিসের নির্দেশনা:
আবু কাতাদা আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ)-কে সোমবার রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:
ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ، وَيَوْمٌ بُعِثْتُ، أَوْ أُنْزِلَ عَلَيَّ فِيهِ
অনুবাদ: "এটি এমন এক দিন, যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং যেদিন আমাকে নবুওয়াত দেওয়া হয়েছে অথবা (তিনি বলেছেন) আমার ওপর ওহী অবতীর্ণ শুরু হয়েছে।"
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)
অর্থাৎ, রাসূল (ﷺ)-এর জন্মের শুকরিয়া স্বরূপ বছরে একদিন উৎসব না করে, বরং প্রতি সোমবার রোজা রাখা একটি প্রমাণিত সুন্নাহ।
আমাদের করণীয় (আমল):
▫️সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা: মিলাদ বা উৎসবের আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে প্রতিদিনের জীবনে রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নতগুলোকে জীবিত করার চেষ্টা করা।
▫️দরূদ পাঠ: একাকী ও ইখলাসের সাথে রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি বেশি বেশি দরূদ ও সালাম প্রেরণ করা।
▫️সিরাত পাঠ: শুধু জন্মের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে রাসূল (ﷺ)-এর গোটা জীবনের সংগ্রাম, আদর্শ এবং আখলাক নিয়ে অধ্যয়ন করা।
প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোনেরা, আসুন আমরা ভিত্তিহীন আবেগের চেয়ে শরীয়তের দলিলকে প্রাধান্য দিই। বিদআতের পথ পরিহার করে, রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহর আলোকে আমাদের জীবনকে সাজাই।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং খাঁটি সুন্নাহর অনুসারী হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।
— ইসলামিক স্টাডিজ ক্লাব