01/05/2021
যে সময়ের কথা বলছি সেটা ২০১৯ সালের রমজান মাস।
কলেজে ভর্তি হয়েছি কয়েকদিন হয়েছে মাত্র। এতো বন্ধু-বান্ধব এখনো হয়ে ওঠেনি। অল্পবিস্তর যেটুকু জ্ঞান ছিল তা নিয়ে উদ্ভাসে কোচিং করা শুরু করি। কলেজ রমজানের ছুটি দিয়ে দিয়েছে। সপ্তাহে চার দিন উদ্ভাসের কোচিং করি আর তিনদিন ইংরেজি প্রাইভেট পড়তাম। সোমবার দিনটায় আমার ইংরেজি প্রাইভেট আর কোচিং দুটোই থাকত। তেমনি এক সোমবারের কাহিনি গল্প বলব আজকে।
রমজান মাস বলে আমাদের উদ্ভাসের ক্লাস টাইম কিছুটা এগিয়ে দেয়া হয়। আগে শুরু হতো আড়াইটায় এখন দেড়টা থেকে, আবার ১২টায় আমার ইংরেজি প্রাইভেট। সেদিন আমি সাড়ে এগারোটা বেজে বাসা থেকে বের হই। আমার বাসা থেকে কলেজ পর্যন্ত সরাসরি কোনো যানবাহন নেই শুধু রিকশা আর লেগুনা ছাড়া। লেগুনায় প্রথমদিন উঠেই যে ভয় পেয়েছিলাম সেই ভয় আর কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আর রিকশা ভাড়াটাও আমাদের মত মধ্যবিত্তের জন্যে বেশিই ছিল। তাই হেঁটেই যাতায়াত করতাম। বাসা থেকে কলেজে প্রাইভেট পড়ে বাসে করে সোজা মতিঝিল, গন্তব্য উদ্ভাস কোচিং সেন্টার। সেদিন উদ্ভাসের ক্লাস শেষ হতে হতে ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসছিল। ইফতারের আধঘন্টা আগে ক্লাস শেষ হল। হেঁটে হেঁটে আরামবাগ মোড়ে এসে আমার প্রথম প্রেম মিডলাইনের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু শাপলা চত্বরে আমার গার্লফ্রেন্ডকে একনজর দেখার জন্যে অন্যদের যে ভিড় আমি দেখে এসেছি তাতে আজকে তার সাথে আমার প্রণয়ের আশা শিকেয় তুলতে হলো। অগত্যা কি আর করা হাঁটতে শুরু করলাম। মতিঝিল থেকে খিলগাঁও চৌরাস্তা হেঁটে আসতে সর্বনিম্ন বত্রিশ মিনিট লাগে। ইতোমধ্যে কিছু সময় নষ্ট করেছি প্রেমিকার জন্যে অপেক্ষা করে। এখন দৌড়েও কাজ হবে না জেনে আমি আস্তে আস্তেই হাঁটছি। পকেটে কুড়ি টাকা ছিল এই দিয়ে আমি এক বোতল পানি (কিনলে) আর একটা বনরুটি কিনলাম। রাস্তায় আমার মতো আরো অনেক মানুষই ছিলো। আমার একটা বাতিক হল আমি যখন রাস্তায় হাঁটি আশপাশ দিয়ে যারা যাচ্ছে তারা কে, কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, কোত্থেকে এসেছে- এসব চিন্তা করা। চিন্তা করতে করতে ভালোই হাঁটছিলাম আমি। কমলাপুরের সামনে দিয়ে এসে যখন আমি রাজারবাগ মোড়ে তখন আযান পড়ল আমি রাস্তায় পা রেখে আর ফুটপাতে পশ্চাৎদেশ রেখে বসে পড়লাম। বিনম্রচিত্তে খোদাকে স্মরণ করে এক ঢোক পানি পান করলাম। প্যাকেট থেকে বনরুটি বের করে যখনই কামড় বসাতে যাব ওমনি পেছন থেকে কে জানি ডেকে উঠলো এই ছেলে? রাজারবাগ মোড়ে ঢাকা ব্যাংকের এটিএম বুথের পাশে দুইটা ফাস্ট ফুডের দোকান আছে দেখলাম সেগুলোর একটা থেকেই একজন মধ্যবয়স্ক লোক আমাকে ডাকছেন। আমি আমার রস টসটসে বনরুটিতে কামড় প্রত্যাখ্যান করে এগিয়ে গেলাম লোকটির দিকে। সত্যি কথা বলতে বনরুটি কখনো রস টসটসে হয় না কিন্তু সারাদিন রোজা রেখে আর এতদূর হেঁটে এই আটা-ময়দার বনরুটিকে অতিশয় রস টসটসে বলেই মনে হয়েছিল আমার। যাই হোক কাছে যেতেই লোকটি বলল সোডো ভাই তুমি একলা একলা ইফতার করতাস ক্যান, আও ভিতরে আও একলগে ইফতার করি। লোকটার এমন কথায় আমার চোখে পানি আসার কথা ছিলো কিন্তু পানি চলে আসলো জিহ্বায়। কিন্তু তারপরও মুর্খ হলেও বাঙালী আমি কিছু লেখাপড়া আদব কায়দা জানি। সলজ্জিতভাবে বললাম, যদি আপনাদের কোনো অসুবিধা না হয় আরকি। শুনে উনি বললেন, আরে অসুবিধা কের? হেইনো তুমি এক ফানি আর রুডি দিয়া ইফতারি করতাস আর আমরা এইনো অতো কিছু লয়া বইসি আমরা যুদি তুমারে বাদ দেয়া ইফতার করি আল্লাহ কি মাফ করব আমরারে। এভাবে কেউ আমাকে রাস্তা থেকে ডেকে নিয়ে ইফতার করাবে তা আমি ভাবিই নি। তার ওপর আবার এত সুন্দর কথা আমি বুঝতে পারছিলাম আমার কান গরম হয়ে উঠেছে ঘাড়ের লোমগুলো দাড়িয়ে গেছে। অনেক বইয়ে পড়েছি কান লাল হয়ে যাওয়া আমি কালো তাই আমার কান লাল না হলেও যে গরম হয়েছিলো সেটা আমি খুব ভালোভাবেই বলতে পারি। আমি উনার সাথে দোকানের ভিতরে যেয়ে বসলাম, দেখলাম আরো দুজন বসা। খেতে খেতে সবার সাথে পরিচিত হলাম। এরকম অভিজ্ঞতা আমার জীবনে প্রথম। এক অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছিল মনের ভিতরে। উনি আমাকে অনেক কথা বললেন। এই সময়ে কেন আমি বাইরে আমার বাসা কোথায়, বাসায় কে, কে আছেন এইসব প্রশ্ন করলেন। একজন মুসলিম আসলে আরেকজন মুসলিমের কত আপন সেটা আমি সেদিন বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারি। আমি দোয়া করি, আল্লাহ উনাদের সবাইকে যেনো জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।
পরিশেষে, এই কথা বলব- রমজান রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস। এই দুর্যোগের দিনেও যতটা সম্ভব পারুন অন্যের হক্ব আদায় করুন। আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা করুন।
- মুনিব মুসান্না
এসএসসি ব্যাচ-১৮