06/05/2022
ইতিহাসের শুদ্ধ পাঠ নেওয়া বেশ কঠিন। এর প্রধান কারণ, ইতিহাস বিশুদ্ধ নয়। রচিত ইতিহাসের পেছনে, রাজনীতি, দর্শন, সমাজতত্ত্ব, এমন কি ব্যক্তিস্বার্থও অনেক ভূমিকা রাখে। সৃষ্টি করে জঞ্জাল। এই জঞ্জাল সরিয়ে একটি মোটামুটি ধারণা দাঁড় করাতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। খোলা মনের প্রয়োজন। বদ্ধ মন নিয়ে ইতিহাসের ঠিক পাঠ নেওয়া যায় না।
জ্ঞানের রাজ্যে অন্তত সাড়ে পাঁচশো বছর (৭০০ থেকে ১২৫০ খ্রিষ্টাব্দ) টানা মুসলিমরা রাজত্ব করেছে। এরপর আব্বাসীয় শাসনের পতন, অটোমান খেলাফতের শুরু, বাইজান্টিয়ান শাসনের সমাপ্তি, ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের উত্থান, যে রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়ন সৃষ্টি করে সেখান থেকেই ইউরোপীয় বিজ্ঞান চর্চার সূচনা। বলা যায় কোপার্নিকান রেভুলেশনের পর থেকেই ইউরোপীয় বিজ্ঞানের জয়জয়কার। আজ পাঁচশো বছর ধরে জ্ঞান বিজ্ঞানে ইউরোপীয়ান ডোমিনেশন চলছে।
বিজ্ঞানে মুসলিম অবদানের যে কমন ন্যারেটিভ তার ভেতর বিস্তর মতলববাজি আছে। এই কমন ন্যারেটিভ নিয়ে অন্য আরেক দিন লেখা যাবে। বর্তমান বিশ্বে, বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ, কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জর্জ স্যালিবা, Islamic Science and the Making of European Renaissance নামে চমৎকার একটি বই লেখেন। সেখানে তিনি প্রচলিত বর্ণনায় ইউরোপীয় ইতিহাসবিদরা কিভাবে মুসলিম অবদানকে বিভিন্ন কৌশলে খাটো করতে চেষ্টা করেছেন তা তুলে ধরেছেন। দুঃখের কথা হচ্ছে এই প্রচলিত বর্ণনাকে বস্তুনিষ্ঠ চ্যালেঞ্জ জানানোর মত মুসলিম স্কলারশিপ আজও তৈরি হয় নি।
বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান বিজ্ঞানে মুসলিম বিশ্ব সবচেয়ে পশ্চাদপদ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবস্থার বেশ উন্নতি হচ্ছে। তবুও সব মিলিয়ে অনেক পেছনে। এই অবস্থার জন্য দায়ী কি? একটি প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, আমাদের ধর্মতেই সমস্যা। এই ধারণা অনেকে সুযোগ পেলেই প্রচার করতে থাকে। এই ধারণা একেবারেই ঠিক নয়। দুটি কারণে এই ধারণা দেওয়া হয়। প্রথমটি হচ্ছে স্রেফ অজ্ঞতা। দ্বিতীয়টি অন্ধ ইসলামবিদ্বেষ এবং সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ভণ্ডামি।
একটু ব্যাখ্যা করি। এই ২০২০ সালে গবেষণার দিক থেকে প্রথম পাঁচটি মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র হচ্ছে – ইরান, টার্কি, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, ইজিপ্ট এবং পাকিস্তান। সারা বিশ্বে এই দেশগুলোর অবস্থান, ১৬, ১৮, ২১, ২৪, ২৫, ৩০, ৩২। খুব ভালো নয়, কিন্তু প্রতি বছরই এরা আগের থেকে ভালো করছে। খেয়াল করার বিষয় প্রত্যেকটি দেশেই রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক জীবনে ইসলামের ব্যাপক প্রভাব আছে। কোন কোনটি ধর্ম-রাষ্ট্র (যেই মানেরই হোক না কেন)। কাজেই ধর্ম বিশ্বাস বিজ্ঞান চর্চা দমিয়ে রাখে তা মোটাদাগে ঠিক নয়।
মুসলিম বিশ্ব জ্ঞান বিজ্ঞানে কেন পিছিয়ে আছে? আমার কাছে মনে হয় এর প্রধান কারণ হচ্ছে মুসলিম সমাজে জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে গেছে। যেখানে এই শ্রদ্ধাবোধ নেই, সেখানে জ্ঞান চর্চাও নেই। জ্ঞানের প্রতি এই শ্রদ্ধাবোধ কি করে হারিয়ে গেল? এর উত্তর জটিল এবং গবেষণার বিষয়। তবে কোন ভাবেই ধর্মকে দায়ী করা চলে না। কুরআনে যেভাবে, যতবার, মানুষকে চিন্তা করতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে, তেমনি আর কোন ধর্মগ্রন্থে বলা আছে কি না জানি না।
বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের সংঘাত মূলত একটি ইউরোপীয় প্রবণতা। ইসলামের ইতিহাসে এর খুব একটা নজির নেই। এই সত্যটাও জর্জ স্যালিবা তাঁর বইয়ে খুব সুন্দর করে তুলে ধরেছেন।
শামস্ আল-দিন আল-খাফরি একজন মস্ত বড় ধর্মতত্ত্ববিদ ছিলেন। তাঁর জীবনী লেখক এই পরিচয়টিকেই সামনে তুলে ধরেছেন। শামস্ আল-দিন আল-খাফরির আর একটি পরিচয় আছে। তিনি ষোড়শ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ। এমন অজস্র উদাহরণ দেওয়া যাবে। দু চারটি বিপরীত উদাহরণে কিছুই আসে যায় না।
বর্তমান সময়ে, অন্তত আমাদের দেশে, এক শ্রেণির আলেম কিছু বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন যেটা জ্ঞান অর্জনের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা। 'ইহুদি-নাসারারা সব বিজ্ঞান কুরআনের থেকে শিখেছে', অথবা 'তাবত বিজ্ঞান কুরআনে আছে', এর দু'টো উদাহরণ। এ'ধরনের বক্তব্যের যে ওজন তা ধারণ করার জ্ঞান এই সমস্ত আলেমদের নেই। এরা ইসলামকে হাসির খোরাক বানায়। সমালোচকদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয় এবং চিন্তা ও জ্ঞানচর্চার রাস্তাটা বুঝে না বুঝে বন্ধ করে দেয়।
একটি সময় মুসলিমরা জ্ঞান বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠ ছিল। ধর্ম মেনে জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় তাঁদের কোন অসুবিধা হয় নি। এখনো কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। একবার তারা পেরেছে, আবার কেন পারবে না? কারণটি খুঁজে বের করা দরকার। কারণটি ইসলাম নয়। মতলববাজদের ফালতু বয়ানে কান দেওয়ার তাই কোন যৌক্তিক কারণ নেই।
© Saleh Hasan Naqib