23/09/2025
আলহামদুলিল্লাহ, সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি তাঁর অসীম অনুগ্রহে ও অগণিত রহমতে আমাদের প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইমদাদিয়া মুসলিমনগর-কে ধাপে ধাপে আজকের এ গৌরবময় অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁরই অশেষ দয়া ও বরকতে হাঁটি হাঁটি পা করে আমাদের এই প্রিয়তম প্রতিষ্ঠান আজ অষ্টাদশ বর্ষে পদার্পণ করেছে। এটি শুধু একটি তারিখের সংযোজন নয়; এটি আমাদের অতীত পরিশ্রম, অক্লান্ত সাধনা, অগণিত ত্যাগ আর সোনালী স্মৃতির জীবন্ত দলিল।
আঠারো বছরের দীর্ঘ পথচলায় আমরা কত সাফল্যের সাক্ষী হয়েছি, কত চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছি, কত অশ্রু, কত রক্ত, কত দোয়ার ফল এই জামিয়ার প্রতিটি ইট-পাথরের মাঝে লুকিয়ে আছে—তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমাদের যাত্রার শুরুটা ছিল শূন্য থেকে, একেবারেই সামান্য আকারে; স্বপ্ন ছিল বড়, সম্পদ ছিল সীমিত, কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসা, দ্বীনের খিদমতের আকাঙ্ক্ষা এবং আমাদের সম্মানিত উস্তাদদের মেহনত—এই তিনের সমন্বয়েই আজ আমরা যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছি, তা নিঃসন্দেহে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক।
আজ আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের জামিয়ার বুকে থেকে ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী দীনের বিভিন্ন খাতে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের অভিজাত এলাকাসমূহে, তারা দ্বীনের খিদমত আঞ্জাম দিচ্ছেন—কেউ মসজিদের মিম্বারে খুতবা দিচ্ছেন, কেউ মাদরাসার ক্লাসরুমে কোরআনের নূর ছড়িয়ে দিচ্ছেন, কেউ সমাজের নানান স্তরে দ্বীনি সেবায় যুক্ত হয়ে আল্লাহর বান্দাদের পথ দেখাচ্ছেন। প্রতিটি শিক্ষার্থীর এই সাফল্য আমাদের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক বিশেষ নেয়ামত।
শুধু শিক্ষার্থী তৈরিই নয়, শিক্ষার মানের দিক থেকেও আলহামদুলিল্লাহ আমাদের জামিয়া সারা বাংলাদেশে আলাদা একটি মর্যাদা অর্জন করেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ ও ইত্তেফাকুল মাদারিস—উভয় বোর্ডেই আমরা নিয়মিতভাবে শীর্ষ স্থান, স্টার মার্ক ও সুনাম অর্জন করছি। এটি কোনো একদিনের ফসল নয়; এটি আমাদের সকলের প্রিয়, সম্মানিত মুহতামিম সাহেব মুফতী নেয়ামতুল্লাহ সাহেব (হাফিজাহুল্লাহ), মুসাল্লাম বুযুর্গ সম্মানিত নাযেমে তা‘লিমাত মুফতী ইলিয়াস কাসেমী সাহেব (হাফিজাহুল্লাহ) এবং অতিত-বর্তমান সকল আসাতিযায়ে কেরামের চোখের পানি, রাত জাগা পরিশ্রম ও ত্যাগের বাস্তব প্রতিফলন। তাঁদের ধৈর্য, নিষ্ঠা, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিরলস পরিশ্রমের ফলেই আজ আমাদের জামিয়া আলোকোজ্জ্বল মর্যাদা লাভ করেছে।
তবে আমরা মনে করি, উন্নতির পথের কোনো শেষ নেই। অতীতের সাফল্য কেবল অনুপ্রেরণা, গন্তব্য নয়। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের শিখিয়েছেন যে, মুমিন সর্বদা অগ্রসরমান—আজকের দিনটি যেন গতকালের চেয়ে উত্তম হয়। তাই আমরা চাই, আমাদের জামিয়ার লেখাপড়ার মান আরও উন্নত হোক, শিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত হোক, ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পাক, এবং দ্বীনের খিদমতের এই ধারা আরও বহুদূর ছড়িয়ে যাক।
প্রিয় প্রাক্তন শিক্ষার্থীবৃন্দ! আপনারাই আমাদের জামিয়ার সেই অমূল্য রত্ন, যারা এখানে এক বছর বা চার-পাঁচ বছর, কেউবা দশ বছর কাটিয়েছেন। আপনারা এই জামিয়ার প্রতিটি ইটের সাথে পরিচিত, প্রতিটি ক্লাসরুমের সাথে আপনাদের অগণিত স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আপনার মূল্যবান মতামত, আপনার অভিজ্ঞতা, আপনার সমালোচনা এবং আপনার পরামর্শ আমাদের জানাবেন। কারণ আপনারাই এই প্রতিষ্ঠানের জীবন্ত ইতিহাস, আপনারাই এই জামিয়ার সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। আপনাদের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ আমাদের আগামী দিনের জন্য দিকনির্দেশনা হবে।
আমরা বিশ্বাস করি, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি শুধু এর বর্তমান ছাত্র বা উস্তাদদের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে থাকে এর আলমনি—প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তাঁদের চোখে দেখা ত্রুটি, তাঁদের অনুভূত সঙ্কট এবং তাঁদের অন্তরের দোয়া—এই তিনটি একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রকৃতপক্ষে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়।
এ কারণেই আমরা উদ্যোগ নিয়েছি আবনা সম্মেলন–২০২৫ আয়োজনের। ইনশাআল্লাহ আগামি ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, বৃহস্পতি বার, আমাদের এই সম্মেলন হবে এক মিলনমেলা—যেখানে পুরোনো স্মৃতি রোমন্থনের পাশাপাশি থাকবে ভবিষ্যতের রূপরেখা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা। এখানে আমরা শুধু একে অপরকে দেখার জন্য একত্র হব না; আমরা একত্র হব জামিয়ার ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি দৃঢ় ও আদর্শ শিক্ষার পরিবেশ নির্মাণের অঙ্গীকার নিয়ে।
আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট ও সুসংগঠিত—
১. শিক্ষার মানোন্নয়ন : লেখাপড়ার মান ক্রমাগত উন্নত করে জামিয়াকে দেশসেরা মাদরাসার কাতারে পৌঁছে দেওয়া।
২. শিক্ষা ও আবাসন পরিবেশের উৎকর্ষ : লেখাপড়ার উপযোগী সার্বিক পরিবেশ, ছাত্রদের থাকার ও খাওয়ার মান উন্নয়নের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া, যাতে তারা নিশ্চিন্ত মনে অধ্যয়ন করতে পারে।
৩. সৌহার্দ্যময় সম্পর্ক গড়ে তোলা : উস্তাদ ও ছাত্রদের মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের একটি আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করা।
৪. প্রচার–প্রসার বৃদ্ধি : দেশব্যাপী মাদরাসার পরিচিতি ও সুনাম বিস্তৃত করা, যাতে জামিয়ার ইতিবাচক ভাবমূর্তি আরও সুদৃঢ় হয়।
৫. দাওয়াহ, গবেষণা ও প্রকাশনা শক্তিশালীকরণ : যুগের চাহিদা অনুযায়ী দাওয়াহ, গবেষণা এবং প্রকাশনা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করা।
এই লক্ষ্যগুলো অর্জনে আপনার মতামত, আপনার পরামর্শ আমাদের জন্য অমূল্য পাথেয়।
আসুন আমরা সবাই মিলে আমাদের এই প্রাণের প্রতিষ্ঠানটিকে আগামী দিনের জন্য আরও আলোকিত ও সমৃদ্ধ করে তুলি। যেন আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা এই জামিয়ার সুশৃঙ্খল, মানসম্মত ও দ্বীনি পরিবেশে আরও সুন্দরভাবে দীনের খিদমতে নিজেদেরকে প্রস্তুত করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের এই প্রচেষ্টা কবুল করুন, জামিয়াকে দিন দিন উন্নতি দান করুন, এবং আমাদের সকলকে এই দ্বীনি খিদমতের কাজে আন্তরিকভাবে যুক্ত রাখুন—আমিন।