22/08/2026
বিসিএস লিখিত নজরকাড়া উত্তর (কয়েকজন এর অনুরোধের প্রেক্ষিতে সিরিজটি নিয়ে আরো লেখা দিচ্ছি)
৪৫ তম লিখিত বিসিএস প্রায় প্রতিটি সাব্জেক্ট ব্যতিক্রমী ও কঠিন প্রশ্ন এসেছিল। প্রশ্নের প্যাটার্নেও ছিল বিশদ পরিবর্তন, যা পরবর্তী বিসিএস গুলোতে ফলো করা হয়েছে।
বাংলাদেশ বিষয়াবলীতে ৪৫তম তে একটা প্রশ্ন এসেছিলো -"সামাজিক অস্থিরতা বলেত কী বোঝায়? বাংলােদেশর সামািজক অস্থিরতা বৃদ্ধির কারণ ও এর প্রতিকার আলোচনা করুন।"
এই প্রশ্নের সমস্যা হচ্ছে প্রশ্নটার স্কোপ বেশ কনফিউজিং। সামাজিক অস্থিরতা আসলে কোন প্রেক্ষাপটে বলা হচ্ছে এটা ঠিক বুঝা যাচ্ছিলো না। এখন যেমন মব ভায়োলেন্স হচ্ছে, অটোরিক্সা/হোকার নিয়ে টালমাটাল অবস্থা তখন কিন্তু সেরকম ছিলো না। তাই প্রশ্নের উত্তর কোন দৃষ্টিকোণ থেকে লিখতে হবে এটা নিয়ে অনেকের ই কনফিউশন ছিলো।
আমি প্রশ্নটা দেখে এটা অন্তত বুঝলাম যে এই কনফিউজিং প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোন প্রেক্ষাপট নেই। তাই প্রেক্ষাপট নিয়ে না ভেবে যেটা ভালো জানি সেই দৃষ্টিকোন থেকেই লিখা শুরু করি আমি। সংক্ষেপে আমার উত্তরটি ছিল এমন -
১। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তার ও ভার্চুয়াল জগত: বর্তমান সময়ে এসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলো একটা বৈশ্বিক প্যানডেমিক আকার ধারণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলো এমন ভাবে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং করে যেন ইউজাররা এতে আসক্ত হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় ব্যবহারকারীরা নিজেদের ব্যাপারে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সামাজিক মাধ্যমে উপস্থাপন করে। নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করার প্রবণতা থেকে তাই ব্যবহারকারীদের বিশাল একটা অংশ হতাশায় ভুগে। ভার্চুয়াল জগতের এই বাবল থেকে সহজে মুক্তি মিলছে না দেখে সকলের মনে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মনে একটা অস্থিরতা তৈরী করছে যা সামাজিক অস্থিরতায় রুপান্তরিত হচ্ছে।
২। ক্ষুদ্র এটেনশন স্প্যান ও স্ক্রিন টাইম: সাম্প্রতিক এক সার্ভে থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে জেন জি দের বৈশ্বিক এভারেজ স্ক্রিন টাইম ৫ ঘন্টা। এক্সট্রিম ক্ষেত্রে এই স্ক্রিন টাইম ১২-১৩ ঘন্টাও হয়ে থাকে কারো কারো ক্ষেত্রে। স্মার্টফোনের প্রতি আসক্তি পুরো একটা প্রজন্ম থেকে সৃজনশীলতা, চিন্তার গভীরতা, স্বাভাবিক জীবনাচরণ ইত্যাদি কেড়ে নিচ্ছে। কোন কোন বিশ্লেষকের মতে স্মার্টফোনের এই আসক্তি কোকেইন এর নেশার থেকেও তীব্র। তাছাড়া স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এটেনশন স্প্যান কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে জেন জি তরুণরা কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি বেশিক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারেনা। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, শিক্ষনীয় সিনেমা প্রভৃতি উপাদান যা এতদিন ধরে আমাদের ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্স তৈরীতে অসামান্য অবদান রাখতো সেসবে বিমুখ হয়ে তরুণ প্রজন্ম রিলস, মিম, ও মাইন্ডলেস শর্ট ভিডিওতে আসক্ত হচ্ছে যা তাদের মধ্যে একধরণের অস্থিরতা তৈরী করছে।
৩। পোস্ট ট্রুথ যুগ ও সাইবার বুলি: ইন্টারনেট এর কল্যাণে যেকোন তথ্য প্রচার এখন খুবই সহজ। তাই সঠিক ইনফরমেশন এর পাশাপাশি প্রচুর মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন অনলাইন জগতে ছড়িয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে আজকাল আর অনলাইনে প্রাপ্ত কোন টেক্সট, ছবি, এমনকি ভিডিও এর ও সত্যতা সম্পর্কে সহজে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। এসকল ভুয়া তথ্য ও নিউজ জনমনে খুব সহজেই বিরূপ পতিক্রিয়া তৈরী করতে পারে। এসবের পাশাপাশি আক্রমণাত্মক আচরণ এর কারণে সাইবার স্পেস এ বুলি এর শিকার হচ্ছেন অনেকেই। দুটোর সম্মিলিত প্রভাবে সামষ্টিকভাবে জনমনে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৪। এলগোরিদমে বন্দীত্ব এবং কনফার্মেশন বায়াস: বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া একজন ইউজার কী কন্টেন্ট দেখবে সেটা নির্ধারণ করে বিভিন্ন এলগোরিদম এর সাহায্যে। একজন ইউজার যা দেখতে পছন্দ করে এলগোরিদম সেটাই তাকে দেখায়। ফলে ব্যক্তি পর্যায়ে কনফার্মেশন বায়াস বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভিন্নমত সম্বলিত কোন ধারণা বা শিক্ষা না পাওয়ায় ব্যক্তি পর্যায়ে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে ও পরমত-সহিষ্ণুতা কমে যাচ্ছে। এর ফলে তরুণদের অনেকে এক্সট্রিম চিন্তাভাবনার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
৫। শব্দদূষণ ও বায়ু দূষণ: বিগত দশকে বাংলাদেশে শব্দদূষণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত ঢাকা নগরীতে শব্দ দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কিছু কিছু স্পটে ১০০ ডেসিবল মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে শব্দের তীব্রতা। গবেষণা মতে শব্দদূষণের ফলে মানুষের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় ও সহনশীলতার মাত্রা কমে যায়। এছাড়াও ঢাকা নগরীর বাতাসে কালো ধোঁয়া, ধূলাবালি প্রভৃতি "পাবলিক নুইস্যান্স" তৈরী করে। শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণের সম্মিলিত প্রভাবে নগরবাসীর মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে যা স্থায়ীভাবে তাদের মানসিকভাবে অস্থির করে তুলছে।
এরকম আরো কিছু পয়েন্ট ছিলো কারণ হিসাবে। আর প্রতিকার হিসাবে আমি ব্যক্তিপর্যায়ে ডিজিটাল ডিটক্স, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লাইব্রেরি ও খেলার মাঠ তৈরী, সৃজনশীলতার বিকাশ, মানসিক সমস্যাকে ট্যাবু হিসাবে না দেখা, ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং, ব্যক্তিগত পর্যায়ে ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে সংযম ও ধৈর্য বৃদ্ধি ইত্যাদি লিখেছিলাম।
আমি জানি বেশিরভাগ প্রার্থী রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যাপার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বেকারত্ব এসব পয়েন্ট লিখবে। কিন্তু প্রশ্নের কনফিউশন এর সুযোগ নিয়ে আমি এখানে ব্যক্তি পর্যায়ে অন্তর্গত বিষয়গুলো তুলে ধরেছি, এবং এমন একটা দিকে টেনে নিয়েছি যে বিষয়ে আমার দখল বেশি। অন্যভাবে বললে প্রশ্নের অস্পষ্টতাই আমাকে হেল্প করেছে গতানুগতিক উত্তর না লিখে নজরকাড়া উত্তর লিখতে। তাই প্রশ্ন যদি হয় কনফিউজিং মনে রাখবেন হয়তো এটাই সুযোগ আপনার স্কিল শো অফ করার।
[এই লেখা টা আমার পেজ এর একদম শুরুর দিকে পোস্ট করা হয়েছিল। কিন্তু তখন ফলোয়ার খুব কম থাকায় অনেকই মিস করে গিয়েছে। তাই আবার রিপোস্ট করা হলো।]
#বিসিএস
#বাংলাদেশ_বিষয়াবলী
#বিসিএস_লিখিত