23/01/2016
●|● ঈমানের সংরক্ষণ ।। ১ম পর্ব ●|●
ইনশাআল্লাহ আজকের খুতবায় আমি আপনাদের সাথে কুরআনের ৪৯ তম সুরা হুজুরাত এর একটি নির্দিষ্ট আয়াত আলোচনা করতে চাই যেটাতে আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল খুব ইন্টারেস্টিং একটি বিষয় আলোচনা করেছেন। তিনি ‘আরাব’ নামক একদল লোকের আলোচনা করেছেন। ‘আরাব’রা বেদুইন ছিল, এবং এই আয়াতের প্রেক্ষাপট, আলোচনার মূলভাবটা বলার পূর্বে আমাদেরকে এই লোকেদের সম্পর্কে কিছু জানতে হবে, যেটা আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেছেন। আপনারা জানেন যে রাসুলুল্লাহ (সঃ) মক্কা নগরীতে উনার দাওয়াত কাজ পরিচালনা করতেন, যেটা ওই অঞ্চলের অন্যান্য এলাকা থেকে ঘনবসতিপূর্ন ছিল। এরপর উনি মদীনা শহরে গেলেন, সেটাও আরেকটি ঘনবসতিপূর্ন এলাকা ছিল। অর্থাৎ এটি ছিল এমন একটি শহর যেখানে অনেক মানুষ কাছাকাছি বসবাস করতো। কিন্তু আরব জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তখন ছিল, “আরাব”।
“আরাব” এমন লোক যারা শহরে বাস করতো না। তারা ঘুরে বেড়াতো। তারা তাদের পশুর পাল নিয়ে মরুভূমির বুকে চড়ে বেড়াতো। অধিকাংশ সময়, বছরের অধিকাংশ সময় তারা বাইরেই থাকত বিরাণ ভূমির মাঝে। তারা শহরে যারা সবসময় বাস করে এমন লোকেদের মত ছিল না। এবং ওইসময় অধিকাংশ আরবদের জীবনযাপনই এরকম বেদুইনদের মত ছিল, যারা তাদের তাঁবু নিয়ে ঘুরে বেড়াতো, তাদের মালপত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। এবং এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা এরকম করে ঘুরে বেড়াতো। তাদের কেউ হয়তো ব্যবসা করতো, আবার কেউবা তাদের পশুদের দুধ বিক্রি করে, এভাবে বিভিন্ন ভাবে তারা জীবিকা নির্বাহ করতো। অর্থাৎ এরা হচ্ছে এমন লোক যারা ঘনবসতিপূর্ন এলাকার অংশ নয়। তো তাদের মাঝে কেউ কেউ তখন মুসলিম হওয়া শুরু করেছে। এই লোকেরা শুধু সাধারণ লোকজনের সংস্পর্শবিহীন ছিল তাই নয়, তাদের সাথে মুসলিমদেরও কোন নিয়মিত যোগাযোগ ছিল না। তারা একদম একা ছিল। যদিও তারা মুসলিম ছিল, ইসলাম সম্পর্কে তারা খুব কমই জানতো। তাই যে জিনিসটা আমরা প্রথমেই এই সুরা থেকে জানতে পারি, তাহলো যেহেতু অন্য লোকজনের সাথে তাদের মেলামেশা কম ছিল তাই তারা ‘আদব’ ‘শিষ্টাচার’ এগুলো বুঝতো না। \
আপনারা জানেন যে এরকম হয়, যারা হয়তো শহরে বা লোকালয়ে বাস করে না, তারা জানে না কিভাবে অন্যদের সাথে চলাফেরা করা উচিত। তাই এই লোকেরা যখন রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর কাছে এসে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলো, আল্লাহ সুরার শুরুতেই তাদের বর্ণনা দিয়েছেন, “ان الذين ينادونك من وراء الحجرات اكثرهم لا يعقلون’ এই বেদুইনদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, তারা রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর বাড়ির কাছে এসেছে এবং তারা বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উনার নাম ধরে ডাকছিল। এবং তারা ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ’ বলে ডাকেনি। এখানে আমাদেরকে বুঝতে হবে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে উনার পরিবারের সদস্যরা পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলে ডাকতেন। উনারা রাসুলুল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে উনার নাম ধরে ডাকতেন না। উনার চাচা উনার নাম ধরে ডাকতেন না, উনার সবচেয়ে ভাল বন্ধু উনার নাম ধরে ডাকতেন না, আশেপাশের সবাই উনাকে উনার উপাধি ‘রাসুলুল্লাহ’ বলে ডাকতেন, এটা রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর প্রতি সম্মানেরই অংশ ছিল। কিন্তু এই বেদুইনরা আসলো এবং বলল ‘...ইয়া মুহাম্মদ..’। “মুহাম্মদ বের হও, তোমার সাথে আমাদের কথা আছে”। এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে এটা খুবই অশোভনীয় ছিল। তাই যদিও এটা ভুল ছিল, আল্লাহ প্রথমে তাদেরকে একটি অযুহাত দিলেন, “তাদের অনেকেই এটা বুঝবে না” এবং তাদের পূর্বাপর চিন্তা করলে আপনি বুঝতে পারবেন কেন তারা বুঝতে পারবে না, কেননা তারা রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর সাহচর্যে খুব একটা ছিল না। তারা সাহাবাদের সাহচর্যেও খুব একটা ছিল না। তারা প্রশিক্ষিত ছিল না, শিক্ষিত ছিল না যেভাবে অন্য মুসলিমরা শিক্ষিত ছিল। তাই আবু বকর সিদ্দিকের (রাঃ) কাছে যে ব্যবহার আশা করা যায়, ওদের কাছ থেকে তা আশা করা যায় না। উসমান (রাঃ) এর কাছ থেকে বা উনাদের মত মানুষদের কাছ থেকে যা আশা করা যায়, ওদের কাছ থেকে তা যায় না। এখন আল্লাহ আবার ওদেরকে শিখানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। ولو انهم صبروا حتى تخرج اليهم لكان خيرا لهم والله غفور رحيم ‘তারা যদি আপনি বের হয়ে এসে তাদের সাথে কথা বলা পর্যন্ত ধৈর্যশীল হত, (৪৯;৫) তাহলে ওটা তাদের জন্য ভাল হত’। (৪৯;৫) তাদের এত অধৈর্যশীল হয়ে এভাবে চিৎকার করে রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর ঘরের বাইরে ডাকাডাকি করা উচিত হয়নি।
আমি আপনাদেরকে এই ঘটনার একটু অল্পবিস্তর ভূমিকা দিতে চাই আপনাদের জানার জন্য। রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর সময়েও ঐখানে নানান ধরনের মুসলিম ছিল। আর এটার সাথে তাদের অন্তরে কতটুকু ঈমান ছিল তার কোন সম্পর্ক নেই। কিংবা তারা কতটুকু বেশি ভাল বা কম ভাল ছিল তারও কোন সম্পর্ক নেই। এটা আসলে বলছে তারা কতটুকু ইসলামের সম্পর্কে জানে তার উপর। এই বেদুইনদের রাসুলুল্লাহ (সঃ) বা উনার সাহাবীদের সাথে বেশি সময় কাটানোর সুযোগ হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা মুসলিম। আসল ব্যাপার হচ্ছে যেহেতু তারা খুব কম জানতো এবং তারা খুব কমই ইসলাম কে চিনেছে, তাই তারা ওই মুসলিম সমাজের অংশ হতে পারেনি যারা প্রতিনিয়ত উন্নতি করছে, বেড়ে উঠছে, ইসলাম সম্পর্কে আরো জানছে, তাদের ইসলামের সাথে সম্পর্কটা আরো শক্ত হচ্ছে, তারা উম্মাহ হিসেবেও আরো শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু বেদুইনরা এসবের কিছু সম্পর্কেই ওয়াকিবহাল নয়। তাই সময়ের সাথে যেটা হল সেটা হচ্ছে তারা যেই অল্পটুকু জানতো তাতেই তারা খুব খুশী ছিল। এবং এটাই ভয়ংকর। যখন আপনি অল্প জানেন এবং তাতেই খুশী থাকেন। এই সমস্যাটাই আমি আজকে যেই আয়াতটা আলোচনা করতে চাই তাতে আলোকপাত করা হয়েছে। “قالت الاعراب امن”, বেদুইনরা আসলো আর বলল আমাদের ঈমান আছে, আমরা বিশ্বাস করি। তারা শুধু এটা বলেনি যে তারা মুসলিম, তারা বলল আমাদের ঈমান আছে। এখন যেই মুসলিমরা রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর সাহচর্যে ছিলেন, তারা বুঝে যে প্রকৃত পক্ষে এটা বলা যে ‘আমরা বিশ্বাস করি’ এর সাথে আরো অনেক দায়িত্ব জড়িত।
যখন কেউ বলে ‘আমি ঈমান এনেছি’, ‘আমি বিশ্বাস করেছি’, এটার অর্থ আসলে আমি আমার পুরা জীবন ধারাটিই পরিবর্তন করে ফেলেছি। কিভাবে আমি ঘুমাই, কিভাবে জেগে উঠি, কিভবে খাই, কিভাবে পান করি, কিভাবে চিন্তা করি, আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন জিনিসটা কি? আমার জীবনের লক্ষ্য কি? আমার জীবনের সব জিনিস পরিবর্তিত হবে, একটি কারণে, কারণটি হল ‘আমি বিশ্বাস করি’। এটা কোন সাধারণ ব্যাপার নয়। কিন্তু ওই বেদুইনদের মতে এটা খুব সাধারণ,’ ঠিক আছে এখানে একজন ঈশ্বর আছে, এবং এই ব্যক্তি তাঁর বার্তাবাহক, আর আমরা তাঁর কথা বিশ্বাস করি, যেটা তাঁর কাছে এসেছে, যেটাকে কুরআন বলে, ঠিক আছে, ভাল, আমি গ্রহণ করলাম। এটা তাদের জন্য একটা অতি সাধারণ ব্যাপার ছিল, এটা জটিল কোন বিষয় ছিল না, এটার জন্য তাদের নিজেদেরকেও একেবারে রূপান্তর করার প্রয়োজন ছিল না। কিছুই ছিল না। তাই তারা বলল, ‘আমান্না’, আমরা ঈমান আনলাম, ভাল। কিন্তু আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল তাদেরকে শুধরে দিলেন আর বললেন, ‘কুল লাম তু’মিনু’, ‘তাদেরকে বল’, রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে উনার নিজস্ব ব্যবহারের ধরন থেকে বের হয়ে তাদেরকে বলতে হল ‘লাম তু’মিনু’, তোমরা বিশ্বাস আননি। ‘ওয়ালা কিন কুলু আসলামনা’ বরং এটা বল যে ‘আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি’।
প্রসংগক্রমে- আমরা ইসলাম গ্রহন করেছি, আমরা সমর্পন করেছি এটার মানে হল আমরা শুধু প্রথম পদক্ষেপটাই নিয়েছি। ঈমান অনেক পরিপক্ক একটি বিষয়। ইসলাম শুধু তোমার প্রথম পদক্ষেপ। এবং আপনারা কুরআনে লক্ষ্য করবেন, ‘আমান্না’। ‘আমান্না’ ব্যাপারটি কুরআনে প্রশংসিত হয়েছে। সাধারণত যখন লোকেরা বলে আমরা বিশ্বাস করতে এসেছি, এটা অবশ্যই একটি ভাল ব্যাপার। কিন্তু এই লোকদের ক্ষেত্রে, আপনাকে বুঝতে হবে যে তারা কোথা থেকে এসেছে, ওরা ছিল, নিজেদের উপর অতিমাত্রায় আস্থাশীল, যে তারা ইসলাম ধরে রাখতে পারবে, তাদের ঈমান একদম নিখুঁত এবং যা যা জানা দরকার তারা সবকিছুই জানে, আমার আর কিছু বুঝার দরকার নেই, আর বেশি জানার চেষ্টা করারও দরকার নেই, আমার নিজের ভিতরে কিছু পরিবর্তন করারও দরকার নেই। এই ‘অতিমাত্রায় আস্থা’ হচ্ছে সমস্যা। এই বেদুইনরা যাদের সাথে বাকি সমাজের যোগযোগ ছিল না, যারা অতি আস্থাশীল ছিল যে তাদের মাঝে ইতোমধ্যেই ঈমান রয়েছে এবং ভাবছে যে এটা কোন ব্যাপারই না। তাদেরকে এটা বলতে হবে যে, তারা শুধু প্রথম পদক্ষেপটাই নিয়েছে, ‘কুল লাম তু’মিনু, ওয়ালা কিন কুলু আসলামনা’ । এখন যখন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে এটা বলছেন, তারা এটা বুঝতে পারছিল না কেন আল্লাহ মহানবী (সঃ) কে দিয়ে বলাচ্ছেন ‘তোমার শুধু ইসলাম আছে কিন্তু ঈমান নেই’, ‘আমরা আল্লাহ উপর বিশ্বাস করি, আমরা তাঁর রাসূলে বিশ্বাস করি, আমরা আখিরাতে বিশ্বাস করি, আর কি দরকার? সমস্যা কি? কেন আপনি বলছেন যে আমাদের শুধু ইসলাম আছে, ঈমান নেই? আমাদের সেই উঁচু স্তরে যাই নি।’ আল্লাহ নিজে এই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। ولما يدخل الايمان في قلوبكم ঈমান, বিশ্বাসের উপহারটা, স্বীকারোক্তি, এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি, এখনো তোমাদের অন্তরে পৌছায়নি। এর মধ্য দিয়ে আমরা খুব কঠিন একটা বাস্তবতার দেখা পাচ্ছি। ঈমান এমন কোন ব্যাপার নয় যেটা এমনি এমনি হয়ে যায় এটা আপনি নিজে নিজে এমনি এমনি পেয়ে যাবেন না। এবং আপনি এটাও ভাবতে পারেন না যে আপনার এটা আছেই। আর এমন কিছুও নয় যেটা আপনি নিজে নিজেই রাখতে পারবেন। আপনাকে এটা রক্ষা করতে হবে। কুরআনের অন্য আরেকটি জায়গায় আল্লাহ আসলে পাথরের সাথে তুলনার বর্ননা করেছেন, যার একেবারে গভীরে রয়েছে পানি, এবং আল্লাহ এই পানিটাকেই ঈমানের সাথে তুলনা করেছেন। এখন আল্লাহ এই আয়াতে আমাদেরকে বলছেন, যে এই বেদুইনদের জানতে হবে যে তারা এমনি এমনি তাদের ঈমান ধরে রাখতে পারবে না শুধু মাত্র এই কারনে যে তারা সহজেই ইসলামের ছায়াতলে এসেছে। তারা এর কিছু বক্তব্যের সাথে একমত হয়েছে এবং তারা ভাবছে এটাই তাদের জন্য যথেষ্ঠ।
কেন আমি এটা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি? কারন পুরো বিশ্বজুড়ে, আমেরিকাব্যাপি, ইউরোপব্যাপি, অস্ট্রেলিয়াব্যাপি, বিশ্বের অনেক জায়গাতেই, বিশেষত যেখানে মুসলিমরা সংখ্যালঘু, অনেক মুসলিম সমাজই খুব অল্প সংখ্যক লোকের সমষ্টি। এবং তাদের জন্য জানার, বেড়ে উঠার সুযোগ খুব সীমিত। তাই উদাহরণ স্বরুপ যেমন বলা যায় কোন জনগোষ্ঠীর বাবা-মাদের ইসলামিক জ্ঞান অত্যন্ত কম। এটা তাদের দোষ না, তারা ইসলাম সম্পর্কে খুবই অল্প জানে, এরূপ তাদের সন্তান হয়, তাদের সন্তানরা স্কুলে যায়, তারা সেখানে ৮ ঘণ্টা, ৭ ঘণ্টা সময় কাটায় বাসার বাইরে, বাবারা থাকে কাজে, এই বাচ্চারা বাসায় ফিরে তারা ৩-৪ ঘণ্টা ব্যস্ত থাকে তাদের স্কুলের বাড়ীর কাজ করতে অথবা অন্য কোন কাজে, এরপর তাদের কিছু ভিডিও গেমস খেলতে হয় অথবা টিভি দেখতে হয়, এবং যতক্ষণে দিন শেষ হয়ে যায় আপনি আসলে ইসলাম সম্পর্কিত কিছুই করেন নি। নূন্যতম যেটা হয়তো বা আপনি করেছেন তা হল তাদেরকে বলেছেন ‘এই চলো, নামাজ পড়বো’, অথবা ‘ চল মাগরিব পড়ি’, ‘ওহ, না, আমাকে এখন আবার নামাজ পড়তে হবে? (বাচ্চার অভিব্যক্তি)’। এবং তারপর, এই বাচ্চাটি আসলে ইসলাম সম্পর্কে অত্যন্ত অল্প জানতে পারে। অত্যন্ত অল্প জানতে পারে। কারন তারা যতক্ষণ জাগ্রত থাকে তাদের পুরা সময়টাই যায় মুসলিম বাদে আর অন্য যতভাবে সম্ভব, সেভাবে। আসলে নির্দিষ্ট ভাবে ইসলামিক তেমন কিছু্রই তারা প্রতিনিয়ত সম্মুখীন হয় না, যাতে তারা ভাবতে পারে যে এটাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার। প্রকৃতপক্ষে এরকম সংখ্যালঘু সমাজে, বাচ্চারা যখন স্কুলে যায় তাদেরকে অন্যদের থেকে একদমই আলাদা দেখায়। তারা অন্যদের থেকে একদমই আলাদা ব্যবহার করে। এবং এটা তাদেরকে একদমই একা বোধ করায়। এবং যখন তারা এরকম একাকী বোধ করে তারা ভাবে যে তারা মুসলিম একারনেই। তাই অনেক সময়ই এরকম হয় যে তারা অন্য বাচ্চাদের সামনে নিজেদের কে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতেও সংকোচ করে, তাদের মনে হয় আমাকে এখানে ঠিক মানাচ্ছে না, অন্য বাচ্চাদের সামনে, এবং তারা সংকোচ বোধ করে, নামাজ পড়তে বা এই ধরনের কিছু করতে, অথবা এমন হয়তো যে তাদের বন্ধুরা বাড়ীতে এসেছে, আর তাদের মা নামাজ পড়ছে, তারা মাকে বলছে, ‘মা তুমি কি অন্য ঘরে নামাজ পড়বা, আমার বন্ধুদের কাছে এটা অদ্ভুত লাগছে’? তারা আসলে ইসলামকে নিয়ে আত্মবিশ্বাসী নয়। এবং আসলে, এমনকি বাবা-মা রাও, যদিও আমি এতক্ষণ বাচ্চাদেরকে নিয়েই কথা বলছিলাম, আসলে আমার খুতবা কিন্তু বাবা-মাদেরকে নিয়েই। যেসব বাবা-মারা অল্পবিস্তর ইসলাম জানে,তারা সেটা নিয়েই সন্তুষ্ট, ভাবে যথেষ্ট, আমরা মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ, আমরা জানি যা যা জানা দরকার, সবকিছুই ঠিকঠাক। সবকিছু ততক্ষণ পর্যন্তই ঠিকঠাক, যতক্ষন না আপনার সন্তানরা ১৫-১৬ বছরে পা দেয়। যখন সেই বাচ্চাই, ২০ বছরে পা দেয়, যখন সেই সন্তানই বলে আমি নামাজ পড়ার কোন কারণই দেখতে পাচ্ছি না। আমি দেখি না। তোমরা মুসলিম, ভাল, কিন্তু এটা আমার জন্য নয়।
আমাদেরকে বুঝতে হবে, এই দ্বীন আপনাআপনি বাচ্চাদের কাছে চলে যাবে না, এটা কোন অটোম্যাটিক ব্যাপার না। শুধুমাত্র আপনি মুসলিম, আপনি নামাজ পড়েন, আপনি কুরআন পড়েন এবং আপনি আপনার সন্তানকে নামাজ পড়তে বলেন, এটার নিশ্চয়তা দেই না যে ঈমান তাদের অন্তরে প্রবেশ করবে। আসল ব্যাপার হল, এটা তখুনি তাদের অন্তরে প্রবেশ করবে যখন আপনি আপনার নিজের অন্তরে প্রবেশ করানোর জন্য যথেষ্ঠ চেষ্টা করবেন, ইসলাম যদি আপনার জন্য কোন সাধারণ ব্যাপার হয়ে যায়, ঠিক আছে, আলহামদুলিল্লাহ যে আপনি সময় বের করে জুমা পড়তে এসেছেন, খুবই ভালো। আল্লাহ আমাদের সকল ইবাদত কবুল করুন, এবং আমদের সকল প্রচেষ্টা কবুল করুন, আমরা এসেছি আর জুমা পড়ছি। এর বাইরে, ঘরের ভেতর, সেখানে ইসলামের কিছুই নেই, সত্যি, সত্যিই সেখানে কিছুই নেই, ওখানে কোন কথা বার্তা নেই, আমাদের বাচ্চারা এটাও জানেন না যে, আমাদের রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে ছিলেন, তারা কুরআন কি সেটা জানে না, শুধুমাত্র ছোট কিছু সুরা ছাড়া যেগুলো আপনারা ওদেরকে শিখিয়েছেন, এবং এতটুকুই। এটাই ধর্ম। সেক্ষেত্রে আমাদের সাথে ওই বেদুইনদের তেমন একটা পার্থক্য নেই। যাদের সাথে ইসলামের যোগাযোগ ছিল খুব কম অথচ তারা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী যে তাদের এটি আছে, আর আল্লাহ তাদেরকে বলছেন ‘ এটা এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি’ ولما يدخل الايمان في قلوبكم কেননা যদি এটা একবার প্রবেশ করেই থাকে কারো অন্তরে, তাহলে কিছু একটা হবে তাঁর ভিতরে, কিছু একটা হবে যেটা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, সবাই তার পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। আপনি হয়তো বলতে পারেন, আমি সর্বক্ষণ ননমুসলিমদের আশেপাশে থাকি, তাই আমার ঈমান দুর্বল হচ্ছে। আমি এমন জায়গায় থাকি যেখানে শিখার কোন জায়গা নেই, শেয়ার করার কোন জায়গা নেই, আমার মুল্যবোধগুলো শক্ত করার কোন জায়গা নেই, হ্যাঁ এটা সত্যি।
কিন্তু জানেন? যখন ঈমান একবার অন্তরে প্রবেশ করে, তখন আপনি একদম নিজে নিজে একা থাকতে পারেন আর তখনও আপনি আপনার ঈমান ধরে রাখতে পারবেন। আপনি হয়তো গুহাবাসীর মত গুহার মাঝে থাকতে পারেন এবং তা স্বত্তেও আপনার ঈমান বজায় থাকবে। আপনি হয়তো ইব্রাহিম (আঃ) এর মত, যিনি ছিলেন, ‘কানা উম্মাতান, একদম নিজে নিজেই উনি একটা উম্মাহ ছিলেন। উনার আশে পাশে উনার কোন সাথী ছিল না। অর্থাৎ আমরা আমাদের পরিবেশকে অযুহাত হিসাবে দাঁড়া করাতে পারি না। বেদুইনদের এই অজুহাত দেয়া হয়নি যে , ‘তোমরা তো শহরে বাস কর না, তোমাদের জন্য এটা ঠিক আছে’। না। ولما يدخل الايمان في قلوبكم ‘وان تطيعوا الله ورسوله لا يلتكم من اعمالكم شيئا’ ‘যদি তুমি আল্লাহর এবং তাঁর রাসুলের আনুগত্য কর, এখানে রাসুল (স) এর উল্লেখ করাটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। ‘وان تطيعوا الله ورسوله কেন ? কারণ, মদিনার বাইরে মরুভূমিতে থেকে রাসুল (সাঃ) এর আনুগত্য করাটা সম্ভব নয়। আমাদের জন্য রাসুল (সাঃ) এর আনুগত্য করা এক রকম আর বেদুইনদের জন্য রাসুল (সাঃ) এর আনুগত্য করা আরেক রকম, আপনাদেরকে তাদের প্রেক্ষাপটটা বুঝতে হবে। রাসুল (সাঃ) কি করতে বলছেন সেটা তাদের পক্ষে জানা সম্ভব না যতক্ষণ না তারা উনার সাহচর্যে থাকবেন, যতক্ষণ না ওনাদের সাথে এমন কেউ থাকবে যে বলতে পারবে রাসুল (সাঃ) কি বলেছেন। তাই তাদের বিকাশের জন্য, আসলে তাদেরকে এমন জায়গায় থাকতে হবে যেখানে এই বিষয়ে পড়াশোনা চলছে, যেখানে এই বিষয়ের বিকাশ হচ্ছে, আলোচনা চলছে। “وان تطيعوا الله ورسوله আরবীতে 'ইতাআ' এর অর্থ শুধু আনুগত্যই নয়, এটা মনোযোগ দেওয়া অর্থেও ব্যবহৃত হয়। ‘ইতাআ’এসেছে ‘তাও’ থেকে যার অর্থ শুধু আনুগত্য বা ঐচ্ছিকই বুঝায় না, এটা মনোযোগ দেয়াও বুঝায়। যদি আপনি মনোযোগ দেন আর তারপর শোনেন এবং আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের (সাঃ) আনুগত্য করেন, আপনার কোন কাজ বৃথা যাবে না।
একদিকে তাদেরকে বলা হচ্ছে, তোমাদের প্রকৃত অর্থে ঈমান নেই, তোমাদেরকে সেই ঈমান অর্জন করতে হবে। অন্যদিকে তাদেরকে বলা হচ্ছে, শোন, এর অর্থ এটা নয় যে যা ভাল কাজ তুমি করেছ তা বৃথা গেছে, যদি তুমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের (সাঃ) এর আনুগত্যে অটল থাক, তোমার কোন কাজই বৃথা যাবে না। এটা অত্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার। কুরআনের অন্য এক জায়গায় সূরা হাদিদে আল্লাহ তাদের পরিনতি সম্পর্কে বর্ননা করেছেন, যেসব লোকেরা তাদের ঈমানকে সহজভাবে নিয়েছে তারা ভাবে ঠিক আছে আমরা মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ, এর অর্থ সবকিছু ঠিক আছে, না সব ঠিক নেই। না না সব ঠিক নেই। এরকম সম্ভাবনা কি আছে যে কেউ মুসলিম হল, এবং সময়ের সাথে তাদের ঈমান দুর্বল থকে দুর্বলতর হল এমন পর্যায়ে যে তারা এমনকি ইসলাম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা শুরু করলো? এটা কি সম্ভব? অবশ্যই। প্রকৃতপক্ষে, হাদীদের আয়াতটিতে যাবার আগে, এমনকি এই সুরাতেও إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا ‘প্রকৃত মু’মিন তারাই যারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলে বিশ্বাস করে এবং এরপর কখনো সন্দেহ পোষন করে না’। কেন আল্লাহ বলছেন যে তারা কখনো সন্দেহ পোষন করে না। কারন সেই সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সম্ভাবনা যদি না থাকতো, তাহলে সেটা উল্লেখ করার কোন দরকারই ছিল না। আসলে আমরা আমাদের ঈমান এমনি এমনি ধরে রাখতে পারবো না, এর জন্য আসলেই প্রচেষ্টা দরকার। অনেক অনেক প্রচেষ্টার দরকার।