24/04/2021
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা : প্রফেসর বিধান চন্দ্র দাস ও তাঁর ‘আইজ্যাক নিউটন’
এক.
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা নিয়ে তরজা বহুদিনের। এর বাস্তবতা, অবাস্তবতা নিয়ে নিয়ে কথাবার্তা শুনে শুনে কান অভ্যস্ত হয়ে গেছে। রীতিমতো। কিন্তু সামান্য মাথা খাটালেই পাই, ভাষাগত অক্ষমতাটা আসে ব্যক্তির অক্ষমতার জায়গা থেকেই। আর, সেই জায়গাটা ঢাকতেই দোষ চাপানো হয় ভাষা, পরিভাষার ওপরে। অর্থাৎ, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা। অন্তত, জগদীশ বসু, সত্যেন বসুর হাতে বিজ্ঞান নিয়ে যে উঁচু-দরের বাংলা পেয়েছি, তাতে একথা স্বীকার করতে পিছু হটার মানে নেই। কথাগুলো পাড়া একারণে যে, প্রফেসর বিধান চন্দ্র দাসের সঙ্গে পরিচয় এই বাংলা ভাষার বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমেই। আমরা কাগজ করি। একদিন স্যার (‘চিহ্ন’ সম্পাদক শহীদ ইকবাল) পরিকল্পনা করলেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা নিয়ে একটা বিভাগ কাগজে যোগ করা যাক। তিনি বেশ একটা নামও বেছে নিলেন : ‘বিজ্ঞানের সহজপাঠ’। এই বিভাগের শুরু থেকেই বিধান স্যার এখানকার নিয়মিত লেখক। স্যার তাঁকে লেখার ব্যাপারে নিয়মিত ফোন করতেন, মাঝেমধ্যে ফোন বন্ধ পেয়ে বলতেন : ‘হয়তো লেখা বা গবেষণার কাজে ব্যস্ত। নইলে ফোন বন্ধ থাকতো না’। এই যে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে লেখা, গবেষণা; যেসব ব্যাপার থেকে নিষ্ঠা প্রায় উঠেই গেছে, সেই কাজের জন্য ফোন বন্ধ করে নিবিষ্ট থাকা; এমন নজির খুব বেশি পাই না। এমন প্রুতিশ্রুতির ছবি দেখি না। সেখান থেকেই বিধান স্যারের প্রতি, তাঁর কাজের প্রতি একটা শ্রদ্ধারেখা দাঁড়িয়ে যায়। তাঁর প্রতি আস্থা পাই।
দুই.
পরে তাঁকে নিয়ে জানাশোনাটা বাড়ে। এটিও জানতে পারি যে, তিনি এক ডজনেরও বেশি নতুন প্রাণী-প্রজাতির আবিষ্কর্তা। দেশ-বিদেশের জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা প্রায় আশি। এছাড়া দৈনিকে প্রাণ-প্রতিবেশ-পরিবেশ নিয়ে নিয়মিত তাঁর লেখা পাই, পড়ি। ‘চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা’য় তিনি বক্তৃতা করেছিলেন । ‘সাহিত্য ও বিজ্ঞান : দোঁহে অভেদ’ নামে। এই পর্বটা উপস্থাপনের কারণে, তাঁকে কাছ থেকে দেখারও সুযোগ হয়েছিলো। সে বক্তৃতাও আমরা ‘বিজ্ঞানের সহজপাঠে’ ছাপলাম। একদিন, কাশেম স্যার (প্রফেসর আবুল কাশেম) ও মুহিত হাসানের সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে জানলাম যে, বিধান স্যার ‘কথাপ্রকাশে’র জীবনী সিরিজে আইজ্যাক নিউটনের জীবনী লিখছেন। এবং, আরেকটি ব্যাপার হলো, এটাই তাঁর প্রথম বই। রীতিমতো তাজ্জব হলাম। একজন প্রবীণ অধ্যাপক, যিনি লেখালেখির সঙ্গেও যুক্ত দীর্ঘদিন; তাঁর প্রথম বই কিনা কেবল বেরুচ্ছে! বুঝতে পারি, হয়তো বই প্রকাশের প্রতি তাঁর কোন মনোযোগ নেই; লালন করেন ঔদাস্য। সেটির প্রমাণও পাই, এই যে ‘আইজ্যাক নিউটন’ বইটি প্রকাশ পেলো, সেটি কিন্তু কাশেম স্যার ও মুহিত হাসানের নিরন্তর লেগে থাকবার ফলেই। তাঁদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে, বিদ্যাসাগরে যখনই সাক্ষাৎ হয়েছে; এই বইটির প্রসঙ্গও উঠেছে। সেকারণে, এই জীবনীটি নিয়ে গোড়া থেকেই একটা আগ্রহ ছিল। সঙ্গে, বাল্যের নিউটন সম্পর্কিত আগ্রহ। দুয়ে মিলে চার হয়ে পাঠের তাগাদা বাড়ালো।
তিন.
এই যে বই প্রকাশের প্রতি মনোযোগ না থাকা, ঔদাস্য; তার বিপরীত পরিচয় পাই বিধান স্যারের লেখা হাতে নিলে। যেখানে পাতার পর পাতা বিস্তর পাঠ, পরিশ্রম ও নিষ্ঠার পরিচয় মুঠো মুঠো ছড়ানো থাকে। এইতো, ‘চিহ্ন’ ৪০ সংখ্যায় বেরুলো বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা নিয়ে তাঁর লেখা। শুরুতেই তিনি নাড়ির খবর দিয়ে দিয়েছেন : ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার বয়স অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বয়সের তুলনায় তার সমৃদ্ধি ঘটেনি’। লেখার কাল সীমাটা থেমেছে সাতচল্লিশে। এর পরেও টুকুও তিনি জানাবেন বলে আশাকরি। ‘আইজ্যাক নিউটন’ বইটিরও পাতায় পাতায় তাঁর পরিশ্রমের ছাপ পাই। এই ছোট্ট কলেবরের একটি বই লিখতেও তিনি কত জনের কাছে গেছেন! ঘেঁটেছেন কত বই-পুস্তক। এমনকি এই কাজের জন্য, নিউটন সম্পর্কিত তথ্য নিঃসন্দেহ হতে যোগাযোগ করেছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির আর্কাইভ ও পাণ্ডুলিপি শাখাতেও। পেয়েছেনও। এমন নিষ্ঠা এই সিরিজের জীবনী লিখতে কেউ দেখিয়েছেন কিনা, আমার জানা নেই। আইজ্যাক নিউটনের চুরাশি বছরের জীবনটা ছিল বহুরৈখিক। দেখি, বিধান স্যারের লক্ষ্যটাও সেদিকে। তথ্যের ইমারতে, বয়ানের পলেস্তারা যুগিয়ে। তবে, কেবল সোজাসুজি একটা মূর্তি গড়ে তোলা নয়। গড়নের বাঁকগুলোও চোখে হারায় না, বরং স্পর্শ পাই। জন্ম থেকে রাখাল বালক নিউটনের ট্রিনটি কলেজ যাওয়া পর্ব অব্দি, তিনি একটি খাড়া ভিত গড়ে তোলেন। তারপর আবিষ্কার পর্ব থেকে সেটিকে একবারে ডালপালা মেলে দেন। মৃত্যু অব্দি। তারপরের চ্যাপ্টার তিনটি যেন পর্দা গুটানোর পালা। তিনি গড়ে তোলা মানুষটাকে ঘঁষামাজা করেন।
চার.
যে নিউটনকে পেতে চাই তাঁকে নিয়ে, তাঁর আবিষ্কার নিয়ে বিস্তর আলাপ করেছেন বিধান স্যার। নিপাট বিজ্ঞানরহিত ছাত্র হলেও, সেটি মাথায় খেলে। আবার, নিউটনকে তো কেবল নাম ও কিংবদন্তি হিসেবেই জানতাম; তিনি সেই কিংবদন্তিগুলোকে তথ্যের পরম্পরায়, যুক্তির দাহ্যে ফেলে সারটাকে বের করে এনেছেন । যার সঙ্গে আপেল গাছের নীচে বসে থাকা, পোষা কুকুর কাগজের আগুন, দুটি বেড়ালের দুটি দরজা, দার্শনিকের পাথর, নিউটনের ম্যাট্রিক পাস; এই জনশ্রুতিগুলো বাতিল হয়ে যায়। আবার, বিজ্ঞানী নিউটনের সঙ্গে অন্য এক নিউটনের ছবিও মেলে ধরেন তিনি। ফলে, গা ঝাড়া দিয়ে বসতে হয় সেই নিউটনকে জানতে। যে কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান রক্ষার জন্য রাজনীতে নামে, সদস্য নির্বচিত হয় পার্লামেন্টের। আবার, তিরিশ বছর আসীন থাকে টাঁকশালের প্রধান পদে। এমনকি, পয়সা জালকারীদের ধরতে লন্ডনে যাকে পালন করতে হয় আদি শার্লক হোমসের ভূমিকা। বিধান স্যার নিউটনকে পূজার ছলে দেখেছেন। সেটি মোটেও বলা যাবে না। দেখতে পারি, অনেকে নিউটনকে ছোট করার চেষ্টা করেছিলেন, তিনি সেগুলো খণ্ডন করেছেন। বিস্তর তথ্যের আলোকে। তুলেছেন, সেকালের আরেক তিন প্রতাপশালী ব্যক্তিত্ব গটফ্রিড লাইবনিজ, রবার্ট হুক, জন ফ্লামস্টিডের সঙ্গে তার বিতণ্ডাগুলো। যুক্তির নিরিখে সেগুলো ব্যাখ্যা করেছেন। ক্ষুদ্র কলেবরের এই গ্রন্থে গবেষকের নিষ্ঠাও চোখে ধরা দেয়। বিশেষত তাঁর তথ্য সন্নিবেশ দেখলে। যা বিজ্ঞানের ছাত্রদের স্বাভাবিক উৎসাহের কারণ হতে পারে। আবার, এই গবেষণা-নিষ্ঠা যেহেতু উদ্ধৃতি সর্বস্ব নয়, একারণে সেটি সমানভাবে সাধারণ পাঠকেরও উৎসাহের কারণ হয়। ফলে, বইটি দুই ধরনের কেজো গুরুত্ব পায়। সঙ্গে ছোট বাক্যের যে গদ্য তিনি ব্যবহার করেছেন, সেটিও বেশ পেলব। পাঠে ক্লান্তি আনে না। এমনকি, কোথাও কোথাও যেন কাব্য করে। যেমন নিউটনের জন্মস্থান নিয়ে : ‘বাড়ির পূর্বদিকে পাহাড় আর বয়ে যাওয়া উইথম নদী, উন্মুক্ত প্রান্তর, তৃণভূমি- সবকিছু মিলে উলস্থর্প বাড়িটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল সত্যিই মনোরম’। শেষে, প্রসন্নতা নিয়েই এটি বলতে পারি যে, আমাদের দেশে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চায়, বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিধান স্যারের ‘আইজ্যাক নিউটন’ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
নাজমুল হাসান পলক