23/10/2017
গ্রামের নাম তালতলা। এই গ্রামের তালপুকুরের কাদার নিচে পাওয়া গেল এক তালের আঁটি। একে তো দশ বছরের পুরোনো, তায় আবার ছিল কাদার তলে। ব্যাপার বোঝেন! এই জিনিস যে তালের আঁটি, বোঝার কোনো উপায় নাই। পাথরের মতো; কিন্তু পাথর না।
উদ্ধারকর্তার হাত থেকে এর কাছে, তার কাছে যাচ্ছে। কেউ বলতে পারছে না জিনিসটা কী। ঘণ্টা দুয়েক গবেষণা হলো। পাতি বুদ্ধিজীবীদের ঝগড়া হলো। হাতাহাতি-মারামারি হলো। ফয়সালা হলো না। ঠিক হলো, গ্রামের ৯৫ বছর বয়সী আবু তালেব তালুকদার সাহেবের কাছে যাওয়া হবে। তিনি এই এলাকার একমাত্র জীবিত বুদ্ধিজীবী। গুগল, উইকিপিডিয়া ও এনসাইক্লোপিডিয়া—এই তিন জিনিস আঁটি বাঁধলে যে থিংকট্যাংক হয়, সেই ট্যাংকির নাম আবু তালেব তালুকদার।
তালুকদার কোনো কিছুর সমাধান দিতে পারেন না; কিন্তু সমস্যার কথা গভীর মনযোগে শোনেন। পরে একটা কিছু বলে দেন। সমাধান না পেলেও তাঁর ধানাইপানাই ফয়সালাতেই গ্রামবাসী বিনোদন পায়। সমাধান না মিলুক, সমস্যার কথা উজাড় করে বলতে তো পারা যায়! এই-বা কম কী?
যা হোক, সেই তালুকদার সাহেব গ্রামবাসীর আনা তালের আঁটি হাতে মিনিট বিশেক ঝিম মেরে থাকলেন। উৎসুক চোখগুলো তাঁর সামনে কাতলা মাছের মতো হাঁ করা। তারা চায় সমাধান। তারা চায় ফয়সালা। তারা জানতে চায়, এই আশ্চর্য জিনিসটা আসলে কী?
তালুকদারের মুখে রা নেই। তিনি চেয়ে আছেন তালের আঁটির দিকে। লোকজন উসখুস শুরু করে।
হাতের ওপর মেলে ধরা জিনিসটার দিকে চেয়ে থাকা তালুকদার সাহেবের মুখে আচমকা হাসির রেখা ফোটে। হাসি বড় হতে থাকে। আরও বড় হয়। আস্তে আস্তে খিক্ খিক্ শব্দ ওঠে। শব্দ বাড়তে থাকে। এরপর হা হা হা। তারপর হো হো হো।
এই দৃশ্য দেখে ‘সমগ্র জনতা নিম্নাভিমুখী আলোড়িত জলরাশির কল্লোলের মতো কৌতুকে উচ্ছ্বসিত হইয়া ধ্বনি দিয়া উঠিল’, ‘পাইছে...দাদাজান...পাইছে!’
দাদাজান আবার মিনিট দশেকের ঝিমে চলে গেলেন। কোনো কথা নেই। এরপর তাঁর মুখ থেকে আস্তে আস্তে খুত খুত করে কান্নার শব্দ বেরোতে লাগল। এরপর হু হু। তারপর হাউ হাউ...মাউ মাউ...। তালুকদারের কান্না আর থামে না। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারালেন।
‘কী হলো! কী হলো!’ বলে সবাই আর্তনাদ করে উঠল। তাদের ফয়সালার দরকার নেই। তালুকদার সাহেব বাঁচলেই হলো।
অনেক পাখার বাতাস, অনেক জলের ছিটে, ফুঁ-ফাঁ দেওয়ার পর জ্যান্ত গুগল চোখ মেললেন।
একজন মুরুব্বি গোছের লোক বললেন, ‘দাদাজান, সারা জীবন শেষ ফয়সালা আপনি দিছেন। আইজও আপনার কাছেই আসছি। কিন্তু আপনার যে অবস্থা দেখতেছি, তাতে ফয়সালার দরকার নাই। আপনে আগে সুস্থ হন।’
তালেব তালুকদার তাঁর দিকে চাইলেন। মুরব্বি বললেন, ‘খালি এইটুক বলেন, আপনে হাসলেন; হাসার পরে কানলেন। এইডার মাজেজা কী, দাদাজান?’
তালুদার তালের আঁটি টেবিলের ওপর রেখে বললেন, ‘দ্যাখ, আমি হাসলাম এই জন্য যে জিনিসটা যে কী, তা আমিও ধরতে পারি নাই।’
—আর কানলেন ক্যান?
—আমার কান্নায় বুক ফাইট্যা যাইতেছে এই ভাইবা যে আমি মইরা গেলে তোরা ফয়সালার লাইগ্যা যাবি কার কাছে? তগো ফয়সালা দিবো কেডা?
তালতলা গ্রামের বাসিন্দারা তালের আঁটি নিয়ে যে সমস্যায় পড়েছিল, তার চেয়ে বড় সমস্যা এখন আমাদের সামনে। এই আকাশ-পাতাল সমস্যার নাম প্রশ্নপত্র ফাঁস। টুক করে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে তা টুকুস করে পরীক্ষার্থীর হাতে চলে যাচ্ছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র আর পরীক্ষার হলে সরবরাহ করা প্রশ্নপত্রে হুবহু মিল থাকার প্রমাণ জাতির সামনে তুলে ধরার পরও ফল বাতিল করা হচ্ছে না। এই ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলছে, সব গুজব। গুজবে কান দেবেন না।
সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নের ইংরেজি অংশটি ফাঁস হয়। গত শুক্রবার সকালে এই পরীক্ষা হয়। তার আগের দিন বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে কয়েকজনের ই-মেইলে এই পরীক্ষার ইংরেজি অংশের ২৪টি প্রশ্ন পাঠানো হয়। পরীক্ষা শুরুর অন্তত আধা ঘণ্টা আগে কয়েকজনের মোবাইলে ওই সব প্রশ্নের উত্তরের একটি লিখিত কপি খুদে বার্তা হিসেবে পাঠানো হয়। রাতে পাওয়া প্রশ্নের কপি ও পরীক্ষার আগে পাঠানো খুদে বার্তার কপি প্রথম আলোর কাছে আসে। পরীক্ষা শেষে আগের দিনের প্রশ্নগুলোর সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের অবিকল মিল পাওয়া যায়। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর এম আমজাদ আলী বলেছেন, ‘প্রশ্ন ফাঁসের প্রশ্নই ওঠে না। তবে বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতির কারণে ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান শুক্রবার রাতে বলেন, ‘এটা একটা গুজব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে একটা অশুভ মহলের ষড়যন্ত্র।’ তাই এ বিষয়ে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন বা পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের কোনো ধরনের সম্ভাবনাকে নাকচ করেন তিনি। যথারীতি ফলও ঘোষিত হয়েছে।
যেকোনো সমস্যা সমাধান করতে গেলে আগে সমস্যাকে স্বীকার করে নিতে হবে। এরপরে সমাধানের প্রশ্ন আসবে। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন যে ফাঁস হচ্ছে, সেটাই তো স্বীকার করা হচ্ছে না। এ অবস্থায় আমরা করব কী?
শিক্ষাঙ্গন এখন তালুকদারবিহীন তালতলা। পরীক্ষা এলেই প্রশ্ন ফাঁস হয়। প্রতিকার চাইতে চাইতে এখন শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত। তাঁরা এখন প্রতিকারও জোরালোভাবে চান না। কারণ, কর্তৃপক্ষ মনে করে, সব হলো ‘গুজব’। তাই এটিকে সমস্যা হিসেবে মেনে নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলার কোনো মানে হয় না।
এই কারণে শিক্ষার্থীরা এখন একজন তালেব তালুকদার খুঁজছেন, যিনি সমাধান দিতে পারুন আর না পারুন অন্তত তাঁদের সমস্যার কথা শুনবেন। এতে অন্তত কিছুটা হালকা হওয়া যাবে।
কপাল খারাপ। তালুকদার এখন আর জীবিত নাই। ভক্ত দাস বাউলের গানের, ‘বিশ্বাস বাবু গেছেন মারা/ সত্যবাবুর খবর নাই’-এর মতো তালুকদারও ‘নাই’ হয়ে গেছেন।
সারফুদ্দিন আহমেদ: কবি ও সাংবাদিক।