16/04/2018
ইসলামী দর্শন ও বিজ্ঞানের আলোকে লাইলাতুল মি’রাজের ঘটনাবলী সংক্রান্ত কিছু প্রশ্নের জবাব
১ম প্রশ্নঃ মেরাজের রজনীতে রসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন কোথায়? আমার (প্রশ্নকারীর) দৃষ্টিতে এমন প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, "সাক্ষাৎ করেছেন আরশে আযীমে"। আরশে আযীম তো আল্লাহপাকের একটি নির্দিষ্ট স্থান। এই স্থানটি সাত আসমান, সিদরাতুল মোনতাহারও উপরে। এই স্থানটি উপরের দিকেই ইংগিত করে। এই জন্য উপরের দিকে হাত তোলে মোনাজাত করা হয়।
আমার উত্তরঃ এ প্রসঙ্গে "এরপর আল্লাহ পাক আরশে সমাসীন হলেন" অর্থবোধক আয়াতসমূহ স্মর্তব্য (সূরা আ’রাফঃ ৫৪, সূরা ইউনূসঃ ৩, সূরা রা’দঃ ২ ইত্যাদি)। এ সকল আয়াত সম্পর্কে ইমাম আ'লা হযরত (রদ্বিআল্লাহু তা’লা ’আনহু) বলেন, “এর অর্থ হচ্ছে, সৃষ্টির সমাপ্তি আরশের উপর গিয়ে ঠেকেছে” (খাজায়েনুল ইরফান)
অর্থাৎ, আরশের সীমার শেষ প্রান্তে গিয়ে স্থান-কাল-মাধ্যম সহ সমগ্র সৃষ্টিজগত সমাপ্তি লাভ করেছে। অর্থাৎ, এর (আরশের) শেষ সীমার উপরে (বা বাইরে) সৃষ্টিজগতের কোনো অস্তিত্ব নেই। সেখানে অন্য কিছুর অস্তিত্ব ব্যতিরেকে একমাত্র আল্লাহ পাকই তাঁর স্বত্তা ও গুণাবলী নিয়ে ভিন্ন ভিন্নভাবে বিরাজমান। তেমনি এর নিচে (বা ভেতরের দিকে) তথা সমগ্র সৃষ্টিজগতেও তিনি সৃষ্টিকুলসহ একইভাবে বিরাজমান। মোটকথা, তিনি সর্বত্র বিরাজমান।
যা হোক, স্থানের ধারণা বা অস্তিত্ব না থাকার দরুন, আরশের গন্ডির বাইরে যেখানে কেবল আল্লাহ পাকই আছেন, তাঁকে 'লা-মকান' বা 'স্থানবিহীন' বলে অভিহিত করা হয়। এ কারণেই নবীজী ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) মি'রাজের রাতে সমগ্র সৃষ্টিজগত পরিভ্রমণ ও পরিদর্শন শেষে আরশের সীমার উপর (বা বাইরে) গিয়ে এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছিলেন, যা ছিল মূলত “লা-মকান” (বা স্থান-মাধ্যম ইত্যাদির ধারণার বাইরের অবস্থা বা প্রকৃতি) - যেখানে স্রষ্টা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মধ্যে অন্য কোনো অন্তরায় (যেমন, স্থান-কাল ইত্যাদি) ছিল না।
এর প্রেক্ষিতে অনুধাবন করা যায়, নবীজীর (সল্লাল্লাহু তা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উর্ধ্বগমনের পেছনে বহুবিধ কারণ ছিল, যার কয়েকটি এখানে আলোকপাত করছি।
প্রথমত, মহান আল্লাহর সাথে এমনভাবে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করা, যেখানে অন্য কোনো অন্তরায় নেই; অন্য কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। আর এমন একটি অবস্থা হচ্ছে লা-মাকান, যা আরশের গন্ডির বাইরে। তাই সেখানে না গিয়ে (সৃষ্টিজগতের ভেতরে অবস্থান করে) অন্তরায়বিহীন বা সৃষ্টির অস্তিত্ববিহীন আল্লাহু তা’লাকে দেখা সম্ভব নয়।
আর মহাবিশ্ব তথা ১ম আসমান নিচ পর্যন্ত, ১ম থেকে ৭ম আসমান, এরপর সিদরাতুল মুনতাহা, কুরসী, আরশের নিচে নূরের সমুদ্র, ৭০ হাজার নূরের পর্দা এবং পরিশেষে আরশের গন্ডি পেরিয়ে গেলেই কেবল আল্লাহুতা'লাকে সেই অবস্থায় পাওয়া সম্ভব, যা উপরে উল্লেখ করেছি।
দ্বিতীয়ত, ১ম থেকে ৭ম এই আসমানগুলোর মাঝে যেসকল বাসিন্দা এবং আল্লাহ পাকের দৃশ্যমান (যেমন, সৌরজগত, ছায়াপথ ইত্যাদি) ও অদৃশ্য নিদর্শন রয়েছে, সেগুলোর সাথে সাক্ষাৎ ও পরিচয় লাভ করতে হলে এর মধ্য দিয়ে গমন না করে উপায় নেই।
তদুপরি, নবীজী ছিলেন সকল দৃশ্য ও অদৃশ্য সৃষ্টির নবী ও রাসূল। তাই আল্লাহ পাকের সাথে একান্ত সাক্ষাৎ লাভের আগে তাঁর অভূতপূর্ব, অনিন্দ্যসুন্দর ও অত্যাশ্চর্য সৃষ্টিসমূহের সাথে দেখা করা তাঁর জন্য জরুরী ছিল, যেনোঃ
(ক) এসব বিষয়ে নবীজীর আর কোনো কৌতুহল না থাকে; (খ) তিনি এসব কিছু সম্পর্কে অবহিত হয়ে যান; (গ) তিনিই যে সৃষ্ট সব কিছুর নবী ও রাসূল, তা তিনি স্বয়ং অবলোকন করে পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন; (ঘ) আসমানসমূহের বাসিন্দাগণ বিশেষ করে নবীগণের সাথে তাঁর পরিচয় হয়ে যায়, যেনো পরবর্তীতে আল্লাহ পাকের সাথে একান্ত সাক্ষাতের পর অবস্থাভেদে তাঁদের সাথে নবীজী যোগাযোগ করতে পারেন। যেমন, উম্মতের জন্য নামাজের ওয়াক্ত-সংখ্যা নিয়ে আল্লাহু তা’লার সাথে বিতর্ক করার সময়, নবীজী (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) নবী মূসার ('আলাইহিস সালাম) কাছে ৬ষ্ঠ আসমানে অন্তত ৯ বার আসা-যাওয়া করেছিলেন।
লক্ষ্য করুন, এই যে ৯ বার তিনি আরশের গন্ডির বাইরে (লা-মাকান) থেকে ৬ষ্ঠ আসমানে ফিরে এসে আবার আরশের গন্ডির বাইরে গেলেন, এর প্রেক্ষিতে কিছু বিষয় আমাদের কাছে উন্মোচিত হয়ে যায়, যথাঃ
(ক) বারবার যাওয়া-আসার ক্ষেত্রে তাঁর (নবীজী) আর কোনো মাধ্যম কিংবা বাহনের (বোরাক কিংবা রফরফ) দরকার পড়লো না। কেননা, তিনি তাঁর সত্ত্বাগত বৈশিষ্ট্য বা নূরে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন। আর বিবেক এটাই বলে যে, যেখানে নূরের তৈরি ফেরেশতাদের জন্য এক আসমান থেকে অন্য আসমান পেরিয়ে যেতে কোনো মাধ্যম প্রয়োজন হয় না, সেখানে সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ নূরের (নবীজীর) জন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন না হওয়াটাই অতি স্বাভাবিক। (এ প্রসঙ্গে ৩য় প্রশ্নের উত্তরে বিশদাকারে লিখেছি।)
(খ) তিনি যতোবারই ৬ষ্ঠ আসমানে আসলেন ও আরশের গন্ডির বাইরে ফিরে গেলেন, ততোবারই এর মধ্যে থাকা সব সৃষ্টিকে দেখে নিলেন এবং সহজ কথায় ৬ষ্ঠ আসমান থেকে লা-মাকানে যাওয়ার পথটি তাঁর জন্য চেনা (বা আপন) ও পরিষ্কার হয়ে গেলো।
(গ) মূসা ('আলাইহিস সালাম) উম্মতে মুহাম্মদীর পক্ষে ওকালতি করে তাঁর নিজের ও নিজ উম্মতের জান্নাত লাভের জন্য উছিলা তৈরি করে নিলেন।
(ঘ) এই ৯ বারই তিনি মহান আল্লাহকে দেখেছেন এবং তাঁর সাথে কথা বলেছেন। সুবহান আল্লাহ। সুবহান আল্লাহ!
তৃতীয়ত, পৃথিবী কমলা লেবুর মতো কিছুটা গোলাকার বলে অভিকর্ষ বল ছাড়িয়ে কোথাও যেতে হলে, উপরের দিকেই যেতে হবে, মাটি ভেদ করে নিচের দিকে নয়, তাই নয় কি? আর নূরানী শক্তি ও ক্ষমতার কাছে এই উপরের দিকে গমন করা কোনো ব্যাপারই না। উল্লেখ্য, মধ্যাকর্ষণ বা অভিকর্ষ বল হচ্ছে সেই শক্তি যা দিয়ে পৃথিবীর কেন্দ্র তার গন্ডির মধ্যে থাকা সবাইকে নিজের দিকে টানতে চায় বা টানে, যে কারণে আমরা পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে ছিটকে পড়ে যাচ্ছি না।
এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, মি'রাজের রাতে নবীজীর উর্ধ্বগমনের রহস্য কি ছিল এবং কতটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল! তাই এই উর্ধ্বগমনের বিষয়টি উপরের দিকে হাত তুলে দোয়া করার সাথে সম্পৃক্ত নয়। কেননা, আল্লাহ পাক তো সর্বত্রই আছেন। হাত তুলে দোয়া করার কি দরকার? বরং হাত তুলে দোয়া করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, (ক) দোয়ার আদব রক্ষা করা বা বজায় রাখা, (খ) হাতে নূর কামনা করা (বা বর্ষিত হওয়া) এবং তা দিয়ে মুখ মাসেহ করা, (গ) হাত তুলে আল্লাহুতা'লার কাছে আত্মসমর্পন করা, নতিস্বীকার করা।
এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে আমার এই নোটটি (http://bit.ly/2pRt27a) দ্রষ্টব্য।
২য় প্রশ্নঃ মি’রাজ রজনীতে অনেক ঘটনাই ঘটেছে। অথচ নবীজী যখন উম্মে হানীর ঘরে ফিরে আসলেন, তখনও তাঁর ইসরা ও মি’রাজে যাওয়ার আগের ওযুর পানি গড়িয়ে পড়ছিলো বা প্রবাহিত হচ্ছিলো। অনেকে এ ঘটনা থেকে বলেন যে, মি’রাজ রজনীতে পৃথিবী স্থির হয়ে ছিলো। বিজ্ঞান ও দর্শনের দৃষ্টিতে বিষয়টিকে কীভাবে দেখা উচিত?
আমার উত্তরঃ জ্বী, এটা ঠিক যে অনেকে ব্যক্তি বলে থাকেন, ইসরা ও মি'রাজের রাতে দুনিয়া বা পৃথিবী নাকি স্থির হয়ে ছিলো ! মূলত (আমার মতে), দুনিয়া বা পৃথিবী স্থির হয়ে যায় নি। বরং, মি'রাজের প্রতিটি ঘটনায় যে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, তার গতি পৃথিবীর (আহ্নিক) গতির চেয়ে অসীমগুণ বা অচিন্তনীয়ভাবে দ্রুত ছিলো। আর তাই, মি'রাজ থেকে ফিরে এসে, ওযুর ঐ একই পানি প্রবাহিত হতে থাকায়, পৃথিবী স্থির মনে হয়েছে। লক্ষ্যণীয়, নবীজীর ('আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) ভাষ্যানুযায়ী, "বোরাক তাঁর দৃষ্টিসীমায় পা ফেলতো” (খাসাইসুল ক্বুবরা)। অর্থাৎ, যতোদূর দেখা যায়, সেখানে এক কদম বা পদক্ষেপ ফেলেই আবার যতোদূর দেখা যায়, সেখানে পরবর্তী পদক্ষেপ ফেলতো। এটা মূলত একটা উপমা, যা আমাদের বোঝানোর জন্য বলা হয়েছে। কেননা, মানুষ তখনও, এমনকি এখনও ঐ গতিবিজ্ঞানে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করতে পারেনি।
[বিঃদ্রঃ আহ্নিক গতি হচ্ছে পৃথিবী একবার পশ্চিম থেকে পুর্বে, নিজ অক্ষের চতুর্দিকে ঘুরে আসতে যে সময় নেয়। এখানে সূর্যের চারিদিকে একবার ঘুরে আসার কথা কিংবা বার্ষিক গতি বোঝানো হয়নি।]
বর্তমান বিজ্ঞান, গতির বিচারে সাধারণ দৃশ্যমান আলোর গতি কিংবা বিভিন্ন অদৃশ্য তড়িত-চৌম্বকীয় তরঙ্গের গতিকেই (সেকেন্ডে ১,৮৬,০০০ মাইল) আদর্শ ধরে। মূলত, হুযুর রহমাতুল্লিল আ'লামীন (দুই জগতের অনুগ্রহ) ও তাঁর সফর সঙ্গীর গতি ছিলো এর থেকেও অভাবনীয়ভাবে বেশি। ইসলামী বিজ্ঞান ও দর্শন মতে এটা স্পষ্ট যে, রূহ ও নূরের গতি সাধারণ আলোর গতির তুলনায় কয়েকগুণ নয়, বরং অসীমগুণ বেশি (হিসাবের বাইরে)। এ কারণেই, নূরের তৈরি ফেরেশতারা মুহূর্তের মধ্যেই আসমান থেকে যমীনে কিংবা যমীন থেকে আসমানে যাতায়াত করতে পারে। একইভাবে অযু আদায়কারী রূহসমূহও ঘুমন্ত অবস্থায় মুহূর্তের মধ্যে আরশে গিয়ে সিজদা দিতে পারে। আর যার (নবীজীর) সত্ত্বা যে কোনো সৃষ্ট নূরের সত্ত্বা থেকে শ্রেষ্ঠ, তার গতি সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া আমাদের পক্ষে কীভাবে সম্ভব?
এবার আসি আসল কথায়। পদার্থবিজ্ঞান ও মহাজাগতিক বিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাকাশে এমন অসংখ্য 'ওয়ার্মহোল' ছড়িয়ে আছে, যার ভেতর দিয়ে মহাকাশের এক অংশ থেকে অন্য অংশে কিংবা এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে অত্যন্ত কম সময় লাগে, যা স্বাভাবিকভাবে (বা ওয়ার্মহোলের মাধ্যম ছাড়া) গেলে, অসংখ্য আলোকবর্ষ লেগে যেতে পারে - এই তত্ত্বটি গত প্রায় শতাব্দীকাল যাবৎ প্রণীত, প্রতিষ্ঠিত ও বিভিন্নভাবে পরীক্ষিত হয়ে আসছে। মহাজাগতিক পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র ধরে কিছুটা হলেও ধারণা করা যায়, সাইয়্যিদিল মুরসালীন ও তাঁর সফর সঙ্গীর গতি ও চলার মাধ্যম কেমন ছিল এবং তারা যতোক্ষণই ভিন্ন জগতে বা মাত্রায় অতিবাহিত করে থাকেন না কেনো, এতে আমাদের স্বাভাবিক সময়ের স্থিরতার প্রয়োজন হয়নি। বরং তাঁদের দ্রুততা বা আসা-যাওয়ার গতি পৃথিবীর সময়ের গতিকে অতিক্রম করে গিয়েছে। আর এটা খুবই সম্ভব, কেননা সময় আপেক্ষিক।
এর সমর্থনে আমি মি’রাজের রাতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। সাহাবী আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত আছে যে, মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস যাওয়ার পথে নবীজী কিছু কাফেলা দেখতে পেলেন। যখন তিনি একটি কাফেলার মুখোমুখি হলেন, তখন কাফেলাটির একটি উট উত্তেজিত হয়ে পালাতে গেলে উটটি হোচট খেয়ে পা ভেঙ্গে খোঁড়া হয়ে যায় এবং এই ঘটনা পরে একটি কাফেলা মক্কায় ফিরে এসে সত্য্য়ন করে। ঐ কাফেলাগুলোকে নবীজী যখন প্রত্যক্ষ করছিলেন, তখন কাফেলাগুলো স্বাভাবিক মনুষ্য গতিতেই চলছিলো। উল্লেখ্য যে, নবীজী যখন কাফেলাগুলোর সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন উট নবীজীকে দেখলেও, কাফেলার লোকেরা তাঁকে দেখেনি। কেননা, দেখলে তারা মক্কায় ফিরে এসে তা স্বীকার করতো। বরং যা হয়েছে তা হলো, কাফেলাগুলোর অবস্থান তিন মাত্রায় (Three Dimensional Space) এবং গতি মনুষ্যগতির (Human Speed) থাকলেও, নবীজীর অবস্থান ভিন্ন মাত্রায় ছিলো এবং গতিও অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিলো। এ কারণেই উট তাঁকে দেখলেও, লোকেরা তাঁকে দেখতে পায়নি। কেননা, সাধারণ মানুষের দৃষ্টিশক্তির চেয়ে পশু-পাখির দৃষ্টিশক্তি অনেক প্রবল হয়, যেকারণে তারা ভিন্ন মাত্রার (আমাদের দৃষ্টিতে অদৃশ্য) সত্ত্বাসমূহও অবলোকন করতে পারে।
এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, নবীজী, জিবরাঈল ও বুরাক্ব অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে চলতে থাকলে, উট তাদের দেখলো কীভাবে? আমার উত্তর হচ্ছে, বিজ্ঞানের আলোকে, ভিন্ন মাত্রায় সময় অত্যন্ত আপেক্ষিক; তথা অনেক স্বল্প সময়ে অনেক দূরত্ব অতিক্রম করা যায়। তাই নবীজী এবং তাঁর সঙ্গী ও বাহন যখন ঐ কাফেলার মুখোমুখি হলেন, তখন তারা তাঁদের আপেক্ষিক গতি তুলনামূলক হ্রাস করেছিলেন, যে কারণে উটটি তাঁদের দেখতে পেয়েছিলো। কিন্তু এই হ্রাসকৃত গতিও ছিলো পৃথিবীর আহ্নিক গতির তুলনায় বেশি।
বিজ্ঞানের হিসাবে, পৃথিবীর আহ্নিক গতি ঘন্টায় যেখানে ১০০০ মাইল (অর্থাৎ, এক ঘন্টায় পৃথিবী ১০০০ মাইল পথ নিজ অক্ষে ঘুরে কিংবা ২৪ ঘন্টায় ২৪,০০০ মাইল পথ ঘুরে), সেখানে একটি সাধারণ রকেট পৃথিবীর অভিকর্ষ বল ছাড়িয়ে যেতে সেকেন্ডে ৪.৯ মাইল কিংবা ঘন্টায় ১৭,৬৪০ মাইল পথ অতিক্রম করে। অত্যাধুনিক স্পেইসক্র্যাফটগুলো ঘন্টায় ৩২,৪০০ মাইল থেকে ৩৬,০০০ মাইল পর্যন্ত অতিক্রম করতে সক্ষম। রকেট এতো গতিসম্পন্ন হওয়ার পরও কিন্তু উড্ডয়নের সময় তথা আমাদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকা পর্যন্ত আমরা রকেট দেখতে পাই। একইভাবে, উটটিও নবীজীকে দেখেছিলো (দৃষ্টিশক্তির কারণে), কিন্তু ভিন্ন মাত্রায় থাকার দরুন লোকেরা প্রত্যক্ষ করেনি।
আবার প্রশ্ন আসতে পারে, নবীজী ইসরাকালীন তাইয়্যেবা (মদীনা) এবং বায়তুল মুকাদ্দাসেও নামাজ পড়েছেন। তাহলে এই নামাজ আদায়কালীন সময়েও কি পৃথিবীর কিছু সময় গড়িয়ে যায়নি কিংবা পৃথিবী স্থির হয়ে যায়নি? আমার উত্তর হচ্ছে, না। কেননা, ঐ নামাজ ছিলো অতীন্দ্রিয় জগতে তথা ভিন্ন মাত্রায়। তাই ভিন্ন মাত্রার সময় আমাদের পৃথিবীর সময়ের অনেক উর্ধ্বে তথা ভিন্ন মাত্রায় কোনো কাজের গতিও ৩য় মাত্রায় কৃত কাজের থেকে অনেক বেশি হবে, যে কারণে ভিন্ন মাত্রা কিংবা অতীন্দ্রিয় অবস্থায় গতি পৃথিবীর স্বাভাবিক (আহ্নিক) গতিকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। আর তাই পৃথিবীকে স্থির মনে হয়েছে।
৩য় প্রশ্নঃ মি’রাজের রজনীতে নবীজীর জন্য বুরাক্ব লেগেছিল কিনা? বিবেকের দাবি হলো, যিনি সৃষ্টিজগতে হাজির বা বিদ্যমান, তিনি তো একই মুহূর্তে আকাশেও হাজির। তো হাজিরের জন্য বুরাক্ব লাগবে কেন?
উত্তর: এর কয়েকটি উত্তর হতে পারে।
প্রথমত, তাহলে মহান আল্লাহ তো মুহীত বা সর্বত্র বিরাজমান এবং ওয়াসি’ বা সর্বত্র পরিব্যাপ্ত। কাজেই, শুধু বুরাক্ব নয়, মি’রাজেরইবা দরকার কী?
দ্বিতীয়ত, পবিত্র মি’রাজ একটি মুজিজা বা অতীন্দ্রিয় বিষয়। যেসব পর্দার কারণে ঈমানদারগণ এখন মহান আল্লাহ দেখছেন না, বরং রোজ হাশরে সেসব অপসারিত হলে দেখবেন - পবিত্র মিরাজ ছিলো আসলে, সেসব পর্দা বা স্থান-কাল-ইন্দ্রিয় সীমাবন্ধতার গন্ডি পেরিয়ে এক অতীন্দ্রিয়, অভূতপূর্ব ও অভিনব সাময়িক যাত্রা, বুরাক্ব ছিলো এর বাহন এবং “ক্বা’বা ক্বাওসাঈন আও আদনা” ছিলো এর গন্তব্যস্থল।
বিজ্ঞান বলে, শব্দের গতি সেকেন্ডে ৩৩২ মিটার এবং আলোর গতি সেকেন্ডে ১,৮৬,০০০ মাইল। পবিত্র মি’রাজের ঘটনা এর চেয়েও বহু দ্রুত গতিতে সংঘটিত হয়েছিলো - যা চিন্তা করাও সম্ভব নয় (যা উপরে বর্ণিত হয়েছে)! কিন্তু উম্মতের বোঝার সুবিধার জন্যে নবীজী (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) মি’রাজের ঘটনাবলী ধাপে ধাপে বর্ণনা করেছেন।
তৃতীয়ত, বুরাক্ব ছাড়াও মি’রাজ হতে পারে। নইলে, নবীজী (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) কেনো বললেন যে, নামাজ ঈমানদারদের মিরাজ? অর্থাৎ, আত্মিকভাবে বুরাক্ব ছাড়াই মু'মিনদের জন্য মি'রাজ সম্ভব।
কাজেই, মি’রাজ নবীজীর হাজির-নাযির হওয়ার কিংবা আল্লাহুতা’লার মুহীত বা ওয়াসি’ হওয়ার বিপরীত দলিল নয়, বরং এটি একটি অতীন্দ্রিয় প্রক্রিয়া। একইভাবে, বুরাক্বও ছিলো একটি অতীন্দ্রিয় বাহন।
আমি ১ম প্রশ্নের উত্তরে উল্লেখ করেছি, নবীজী যখন ক্বা’বা ক্বাওসাঈন থেকে ৬ষ্ঠ আসমানে মূসার (’আলাইহিস সালাম) সাথে সাক্ষাতের জন্য যে ৯ বার আসা-যাওয়া করেছিলেন, তখন তিনি যাতায়াতে কোনো কিছু মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেননি। আর এই ৯ বারের কোনোবারেই কোনো কিছুকে বাহন হিসেবে ব্যবহারের কথা হাদীছেও আসেনি, কেনো? তদুপরি, আরেকটা ব্যাপার ভেবে দেখুন, উম্মে হানীর (রদ্বি আল্লাহু তা’লা ’আনহা) ঘর থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস (ইসরা) এবং এরপর উর্ধ্বগমন (মি’রাজ) পর্যন্ত বুরাক্ব ও রফরফ নামক বাহন দু’টির কথা হাদীছে থাকলেও ক্বা’বা ক্বাওসাঈন থেকে উম্মে হানীর ঘরে ফিরে আসার সময় কোনো বাহনের কথা হাদীছে উঠে আসেনি, কেনো? এর উত্তর কয়েকরকম হতে পারে।
(ক) শ্রোতাবৃন্দ (সাহাবীগণ) ভেবেছিলেন, নবীজী যেহেতু বুরাক্ব দিয়েই গিয়েছেন, তাহলে বুরাক্ব দিয়েই ফিরে এসেছেন। ফিরে আসার সময় কোনো বাহন ব্যবহার করেছেন কিনা, এই ব্যাপারটি আলাদাভাবে জানার কী-ই বা প্রয়োজন আছে?
(খ) হাদীছে এসেছে যে, সিদরাতুল মুনতাহা থেকে নবীজীর নতুন বাহন হলো রফরফ। কিন্তু কোনো হাদীছেই উক্ত হয়নি, রফরফ দিয়ে নবীজী কতোটুক দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন? অর্থাৎ, সেটা কি কুরসী, কিংবা আরশ কিংবা ক্বা’বা ক্বাওসাঈন পর্যন্ত, তা স্পষ্ট করে উদ্ধৃত হয়নি কিংবা নবীজী এ ব্যাপারে কিছুই উল্লেখ করেননি। এর কারণ কী? আরও ভেবে দেখুন, রফরফ যদি ক্বা’বা ক্বাওসাঈন পর্যন্ত নবীজীর বাহন হয়েই থাকে, তাহলে তো মহান আল্লাহকে মাধ্যম কিংবা অন্তরায় ছাড়া শুধু নবীজী নন, রফরফও দেখতে পেয়েছে কিংবা সাক্ষাৎ লাভ করেছে, তাই না? অথচ, তা অযৌক্তিক। কেননা, আরশই হচ্ছে সৃষ্টির শেষ সীমা। আর সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র নবীজীকেই মহান আল্লাহ আরশের গন্ডি অতিক্রম করার সৌভাগ্য ও সক্ষমতা দান করেছেন। খোদ আরশও তার গন্ডি বা সীমা ছেড়ে এর বাইরে প্রসারিত হয় না। আরশের বহনকারী ফেরেশতারাও আরশের গন্ডি অতিক্রম করতে পারে না। আর ফেরেশতাদের সর্দার জিবরাঈল সিদরাতুল মুনতাহার গন্ডিই অতিক্রম করতে পারে না। কাজেই, রফরফ দ্বারা আরশের গন্ডি অতিক্রম করা অস্বাভাবিক এবং অযৌক্তিক ব্যাপার। আর তাই, নবীজী একাই ক্বা’বা ক্বাওসাঈনে গিয়েছিলেন, রফরফ সাথে নিয়ে নয়।
মূলত, নূরের সমুদ্র, ৭০ হাজার নূরের পর্দা ইত্যাদি অতিক্রম করার সময় নবীজীর (সৃষ্ট) নূরানী সত্ত্বার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিলো, যা মহান আল্লাহর (অসৃষ্ট) নূরানী সত্ত্বার সাক্ষাৎ লাভে উপযুক্ত হয়ে গিয়েছিলো। আর তাই রফরফের প্রয়োজন আরশের গন্ডি অতিক্রম করার আগেই শেষ হয়েছিলো এবং নবীজী রফরফ ছাড়াই ক্বা’বা ক্বাওসাঈনে পৌঁছেছিলেন। সেই নূরানী সত্ত্বা ৯ বার নবী মূসার সাথে সাক্ষাতের সময়ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল ছিলো এবং এমনকি উম্মে হানীর ঘরে ফিরে আসা পর্যন্তও নূর হিসেবেই ছিলেন। তাই তাঁর গতি ছিলো যেমন অস্বাভাবিক দ্রুত, তেমনি ফেরেশতাদের মতো সৃষ্টিজগতের অন্তরায়সমূহ অতিক্রম করতেও তাঁর কোনো অসুবিধা হয়নি। আর একই কারণে, তিনি আলাদাভাবে কোনো বাহনের কথা মি’রাজের ঘটনা বর্ণনার সময় ফিরে আসার ক্ষেত্রে উল্লেখ করেননি।
৪র্থ প্রশ্নঃ নবীজী (সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বীয় জুতা মুবারক নিয়ে আরশে ’আযীমে গিয়েছেন মর্মে অনেকে বর্ণনা করে থাকেন। এগুলোর ভিত্তি কী?
আমার উত্তরঃ নবীজী ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) আরশে জুতা মুবারক সহ গিয়েছিলেন কিনা, এ নিয়ে মতভেদ আছে। যারা এর পক্ষে বলেছেন, তাদের দু’জনের বক্তব্য এখানে পেশ করছি। ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী তাঁর “ই’জাযুল কুরআন শরীফ” কিতাবে উল্লেখ করেছেন,
وَمَوْلَانَا مُـحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَـمَّا زُجَّ بِهٖ فِىْ عَالَـمِ الْعِزَّةِ اَرَادَ اَنْ يـَّخْلَعَ نَعْلَيْهِ فَاِذَا النّـِدَاءُ يَا مـُحَمَّدُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا تَخْلَعْ نَعْلَيْكَ. فَقَالَ يَا رَبِّ سَــمِعْتُكَ تَقُوْلُ لِـمُوْسٰى عَلَيْهِ السَّلَامُ فَاخْلَعْ نَعْلَيْكَ .فَقَالَ يَا مُحَمَّدُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَئِنْ اَمَرْتُ حَضْرَتْ مُوْسٰى عَلَيْهِ السَّلَامُ بِنَزْعِ نَعْلَيْهِ عَلٰى جَبَلِ الطُّوْرِ فَقَدْ اَبَحْنَا لَكَ اَنْ تَطَأَ بِنَعْلَيْكَ عَلٰى بَسَاطِ النُّوْرِ لِاَنَّكَ الْمُكَرَّمُ عِنْدَنَا وَالْعَزِيْزُ لَدَيْنَا.
অর্থঃ "আর আমাদের মাওলা মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মহিমান্বিত আরশে আযীমের নিকটবর্তী হলেন, তখন তিনি তাঁর জুতা মুবারকদ্বয় খুলে ফেলার ইচ্ছা পোষণ করলেন। এরপর ডাক আসল, "হে মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আপনার জুতা মুবারক খুলবেন না।" এরপর তিনি বললেন, "হে আমার রব, আমি শুনেছি আপনি মুসা 'আলাইহিস সাল্লামকে বলেছিলেন, আপনি আপনার জুতাদ্বয় খুলে ফেলুন।" এরপর আল্লাহ বললেন, "হে মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম, নিঃসন্দেহে আমি মুসা 'আলাইহিস সাল্লামকে আদেশ করেছিলাম তূর পাহাড়ে তাঁর জুতাদ্বয় খুলে ফেলার জন্য, কিন্তু অবশ্যই আমি আপনার জন্য পছন্দ করি যে, আপনি এই প্রশস্ত নূরের মাকামে জুতা মুবারকসহ প্রবেশ করুন। কেননা, আপনি আমার নিকট অধিক সম্মানিত এবং আপনার মর্যাদা সুমহান।" (ই'জাযুল কুরআন শরীফ, ৩য় খন্ড, ৬৩ পৃষ্ঠা)
দেওবন্দী আলেম আব্দুল হাই আল-লখনৌভী তার "আল-আছার আল-মারফূ'আ ফী আল-আখবার আল-মাওদ্বু'আ" কিতাবে লিখেছেন,
فنودى من العلى الاعلى يا رسول الله صلى الله عليه وسلم لا تخلع نعليك فان العرش يتشرف بقدومك متنعلا-
অর্থঃ অতঃপর মহান মহীয়ানের পক্ষ থেকে আহ্বান করা হল, "হে আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আপনার জুতা মুবারাক খুলবেন না। কেননা, আরশ আপনার জুতা পরিহিত পা মুবারক দ্বারা সম্মানিত হবে।"
এছাড়া, ফতোয়াতে শামীতে রয়েছে, "সব ইমামগণের ইজমা হয়েছে যে, হুযুরে পাক সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের শরীর মুবারককে যে মাটি মুবারক স্পর্শ করেছে তার মর্যাদা এবং তাঁর না’লাইন (জুতা) শরীফে স্পর্শ করা ধুলাবালি মুবারকের মর্যাদা আরশে আযীমের মর্যাদার চেয়ে লক্ষ কোটি গুণে বেশি মর্যাদাবান।"
অপরদিকে, আলা হযরতকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে, মেরাজের রাতে আল্লাহর আরশের উপরে নবীজীর ('আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) জুতা মুবারকসহ যাওয়ার কথাটি সঠিক কিনা? তিনি উত্তর দেন: "এটা মূলে মিথ্যা ও জাল কথা।" (মালফূযাত-ই আলা হযরত) অবশ্য তিনি উত্তরটি এর বেশি দীর্ঘ করেননি। মোল্লা আলী ক্বারীও তাঁর “শরহে শিফা” কিতাবেও এ সংক্রান্ত বর্ণনা জাল হাদীছ বলে সাব্যস্ত করেছেন।
তবে আমার মনে হয়, মি’রাজের রাতের এই ঘটনাটির সনদ না থাকলেও, ফতোয়ায়ে শামীতে উল্লিখিত না'লাইন শরীফের গুরুত্ব বিবেচনা করে অনেকে এই ঘটনাটি গ্রহণ বা সমর্থন করেছেন, যদিও এর গ্রহণযোগ্য কোনো সনদ সম্পর্কে জানা যায়নি।
যেহেতু বিষয়টি নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে, এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় চিন্তা ও পর্যালোচনার অবকাশ রাখে।
প্রথমত, নবীজী ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) কি জুতা ছাড়াই মিরাজ শরীফে গিয়েছিলেন, এমন কোনো দলীল আছে? আর জুতাসহ গিয়ে থাকলে, আরশে যাওয়ার আগে কিংবা অন্য কোথাও জুতা খুলেছিলেন মর্মে কোনো দলীল আছে কী?
দ্বিতীয়ত, নবীজীর ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) জুতা মুবারক তাঁর পোশাক মুবারকের মতোই সম্মানিত। অধিকন্তু, আমাদের জুতা ও এতে লেগে থাকা ধূলার সাথে নবীজীর ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) জুতা মুবারক ও এতে লেগে থাকার ধূলার যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কাজেই, আল্লাহ পাক নবীজীকে ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) জুতাসহ আরশে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করে থাকলে, তা আশ্চর্য্যের বিষয় নয়।
তৃতীয়ত, ফতোয়ায়ে শামীর ঐ ফতোয়ার ভিত্তি কী, তা কি এই সনদবিহীন হাদীছ না অন্য কোনো বর্ণনা? তা জানা গেলে হয়তো এ ব্যাপারে আরও পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে।
চতুর্থত, ইমাম সুয়ূতী ঐ কথা কি ইলহামের ভিত্তিতে, নাকি অন্য কোনো ভিত্তিতে বলছেন, তা জানা যায়নি। যেহেতু সনদ ছাড়াই তিনি এর উপর নির্ভর করেছেন এবং এর সনদ কিংবা মতনের সমালোচনা করেননি, বর্ণনাটি তার কাছে গ্রহণযোগ্য।
পঞ্চমত, আমরা না'লাইন শরীফ ও এর নকশাকে অত্যন্ত সম্মান ও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করি। কিন্তু কেন? এটা কি কেবল, নবীজীর ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) জুতা মুবারক বলেই, নাকি তা আরশের চাইতেও আল্লাহর নিকট বেশি সম্মানিত বলে (যেমনটি ফতোয়ায়ে শামীতে আছে)?
ষষ্ঠত, মহান আল্লাহ যেহেতু সর্বত্র বিরাজমান, তিনি তো দুনিয়াতেও লা-মাকানের মতোই বিরাজমান। এখানেও আমরা জুতা সহকারেই চলাচল ও অবস্থান করছি এবং এতে মহান আল্লাহর শান কিংবা মর্যাদার কোনোরূপ বিচ্যুতি ঘটছে না। তদুপরি, নবীজীর জুতা মুবারক আল্লাহর কাছে আরশ অপেক্ষা অধিক সম্মানিত হলে, তা নিয়ে আরশে পৌছাতে কিংবা আরশ অতিক্রম করলে, মহান আল্লাহর শানের কোনোরূপ বিচ্যুতি ঘটবে কি?
তবে হ্যাঁ, এখানে এই দাবি উত্থাপিত হতে পারে যে, (আমি যেহেতু আগেই উল্লেখ করেছি) আরশ তো সৃষ্টির শেষ সীমা। এই যুক্তিতে রফরফ আরশের গন্ডি অতিক্রম করতে না পারলে, নবীজীর জুতা মুবারক পারবে কেনো?
আর তাই এসকল পরস্পর বিপরীতমুখী প্রশ্ন ও সন্দেহের সমাধানকল্পে আমি মনে করি, লাইলাতুল মি’রাজে নবীজী ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) নিজ হাকীকী সুরতে অথবা সম্পূর্ণ নূরে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন (যা আগেও উল্লেখ করেছি), যে অবস্থায় তাঁর বাহ্যিক জুতা কিংবা পোশাক-আশাকের প্রয়োজন পড়েনি কিংবা সেসব নূরে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো। আবার দুনিয়ায় ফিরে এসে যখন তিনি মানবীয় সুরত ধারণ করেছেন, তখন জুতা-পোশাক ইত্যাদি অলৌকিকভাবেই কিংবা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাঁর মানবীয় সুরতে বাহ্যিকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ফেরেশতা-সর্দার জীবরাঈল ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) যখন দেহইয়াহ ক্বালবী নামক লোকের সুরতে ধরতেন, তখন একই ঘটনা ঘটতো।
আরও সহজ কথায়, আরশে মোয়াল্লা কিংবা এরও পরে নবীজী ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) জুতা নিয়ে গেলেও, তা নূরানী সুরতের কারণে লোপ পেয়েছিলো কিংবা অনস্তিত্বে চলে গিয়েছিলো। আবার তিনি ফিরে এসে মানবীয় সুরত ধরলে, তাঁর জুতা-পোশাক অস্তিত্বে চলে আসে। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাঁর জুতা মুবারক আমাদের কাছে তাঁর ব্যবহৃত বস্তুগুলোর মতোই অতি সম্মান বা তাজীমের বস্তু, কেননা তাতে লেগে থাকা ধূলা-বালি আল্লাহর কাছেও আরশ অপেক্ষা অধিক সম্মানিত।
মহান আল্লাহু ও তাঁর রসূলই এর অধিক ভালো জানেন। ধন্যবাদ।
#লেখাঃ মুহাম্মাদ যাহিদ হাসান আল-মাতুরীদী