মদীনার জামায়াত

মদীনার জামায়াত

Share

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আক্বীদাভিত্তিক ইসলামী জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে এবং রসূলে পাক (সঃ) এর হক্ক সুন্নতকে পুনঃজীবিত করতে আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

Photos from মদীনার জামায়াত's post 25/04/2022

প্রিয় নবীজির ব্যবহৃত পোশাক দেখতে ইস্তানবুলের মসজিদে মানুষের ঢল

আল্লাহর রসূলের (সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যবহৃত জুব্বা মুবারক দেখতে তুরস্কের ইস্তানবুলে হিরকা-ই শেরিফ মসজিদে হাজারও মানুষের ঢল নেমেছে।

হিরকা-ই শেরিফ মসজিদে যে পোশাকটি রাখা হয়েছে সেটি হযরত ওয়াইস আল-কারনিকে (রদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু) নবীজী (সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। তার বংশধররা এটি দীর্ঘ ১৪শ’ বছর ধরে যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করে আসছেন।

প্রিয় নবীজীর (সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুব্বা মুবারক দেখতে ওই মসজিদে হাজারও মানুষের ঢল নামে। গত শুক্রবার জুমার নামাজের আগে কিছু মানুষকে মসজিদের ভেতরে কাচে মোড়ানো বাক্সে বরকতময় এ পোশাকটি দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। বাইরে আলাদা আলাদা সারিতে হাজারো নারী ও পুরুষ মসজিদের ভেতরে প্রবেশের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন।দর্শনার্থীরা প্রিয় নবীজীর (সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পবিত্র এ পোশাক মুবারক দেখে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে।

করোনা মহামারিতে দীর্ঘ দুই বছর বন্ধ থাকার পর গত শুক্রবার (২২ এপ্রিল ২০২২) থেকে প্রদর্শনী আবারও শুরু হয়েছে। প্রদর্শনী চলবে ২৯ এপ্রিল ২০২২ পর্যন্ত।

সূত্র: ডেইলি সাবাহ

30/10/2020

সবচেয়ে প্রাচীন ও নির্ভরযোগ্য উৎস এবং অধিকাংশের মতে, ৫৭০ খৃষ্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল আল্লাহুতা’লার সেরা ও সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টি মহানবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্মগ্রহণ করেন এবং অনেকের মতে, এদিনে তিনি ইন্তেকালও করেন।
হাদীছ শরীফের আলোকে, মানব জাতির জনক হযরত আদম সফীউল্লাহ’র (’আলাইহিস সালাম) পবিত্র বেলাদত ও বেসাল দিবস জুমাবার যেমনি মুসলিম জাতির জন্যে ঈদ, তেমনি হুজুরে পুরনূরের (সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পবিত্র বেলাদত ও বেসাল দিবসও মুসলিম উম্মাহ’র জন্যে আরো বড় এবং আকলি দলিলের ভিত্তিতে সবচেয়ে বড় ঈদ। কেননা, দুনিয়ায় রহমাতুল্লিল আলামীনের আগমন বলে কথা!

পবিত্র শবে কদরের তারিখ নিয়ে মতভেদ সত্ত্বেও যেমনি এর যে কোনোটির বা সব তারিখের রাতে ইবাদত-বন্দেগীতে সমস্যা নেই - তেমনি মহানবীর (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) পবিত্র বেলাদত ও বেসালের তারিখ নিয়ে মতভেদ থাকলেও যে কোনো একটি তারিখে বা সকল তারিখে অথবা সারা রবিউল আউয়াল মাসে, এমনকি প্রতি সোমবারে ঈদ উদযাপনেও কোনো বাধা নেই। নবীজী প্রতি সোমবার রোজা রেখেছেন; যদিও উম্মতকে তা রাখতে বলেননি। তেমনি, তাঁর বেলাদত শরীফের যে কোনো তারিখে (সপ্তাহে বা মাসে বা বছরে) রোজা রেখে বা না রেখেও ঈদ উদযাপন করা যাবে। এ ব্যাপারে শরীয়তে কোনোই নিষেধাজ্ঞা নেই। যারা তা নিষেধ করেন বা বিদয়াত বলেন, তারা এ ব্যাপারে অজ্ঞ ও গোমরাহ এবং বিদয়াতের সংজ্ঞাই জানেন না।

আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফরমান: কোনো সম্প্রদায় বিদয়াত উদ্ভাবন না করা পর্যন্ত সুন্নত উঠিয়ে নেয়া হবে না। সুতরাং বিদয়াত উদ্ভাবন না করে সুন্নত আঁকড়ে থাকা উত্তম (মিশকাত: ১৭৮, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, মুসনাদে আহমাদ ও মুসনাদে বাঝঝার)। তিনি আরো ফরমান: কোনো সম্প্রদায় তাদের ধর্মে বিদয়াত উদ্ভাবন না করা পর্যন্ত আল্লাহ্ তাদের কাছ থেকে ঐ পরিমাণ সুন্নত উঠিয়ে নেবেন না। এরপরে রোজ কিয়ামত পর্যন্ত তা আর তাদের ফিরিয়ে দেবেন না (মিশকাত: ১৭৯ ও সুনানে দারিমী)। তিনি আরো ইরশাদ করেন: যদি কোনো উম্মত তাদের নবীর ওফাতের পরে তাদের ধর্মে কোন বিদয়াত উদ্ভাবন করে - তাহলে, তারা ঐ পরিমাণ সুন্নতেরই সর্বনাশ করে (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব ও তিবরানী)। সুতরাং বিদয়াতের সংজ্ঞা হচ্ছে, যা সুন্নতকে বিলুপ্ত করে, তা-ই বিদয়াত। কিছু আলেম নিজেদের মতো করে বিদয়াতের সংজ্ঞা দিয়েছেন। সেসব কেউ মানতে বাধ্য নয়। আর অন্য মাযহাবী আলেম হলে তো কথাই নেই।

আল্লাহুতা’লা ফরমান: আল্লাহর ফজল ও রহমতের ব্যাপারে তাদের আনন্দ-উৎসব করা উচিত। আর এটা তাদের কাছে যা কিছু রয়েছে - তা থেকেও উত্তম (১০:৫৮)। এ আয়াতে কারীমায় ফজল ও রহমত বলতে কী বোঝানো হয়েছে, সে মর্মে নবীজী (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) থেকে কোনো হাদীছ শরীফ বর্ণিত নেই। ফলে, আন্দাজে বা অনুমান করে মুসাফসিরদের একদল বলেছেন - তা আল-কুরআন; আরেক দল বলেছেন - তা ইসলাম; অন্য দল বলেছেন - তা নূরনবী। কাজেই, যে কোনোটি বা সবই (কুরআন, ইসলাম ও নবীজী) হতে পারে। যারা আলোচ্য আয়াতের ফজল ও রহমত বলতে নবীজীকে নিসবতের অর্থ বর্ণনা বা গ্রহণ করেছেন, তারা এর ভিত্তিতে নফল বা মুস্তাহাব হিসেবে মীলাদুন্নবীকে ঈদ হিসেবে উযাপন করেন। আমি এ দলভুক্ত।

ইতিহাস বলে, শিয়া ইসমাইলী প্রশাখার উবায়দী বংশের শাসক আল-মুয়িজ্জু লি-দীনিল্লাহ ৩৫৮ হিজরীর দিকে মিসর দখল করেন এবং সেখানে তিনিই সরকারীভাবে প্রথম ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন শুরু করেন - যা প্রায় ১০০ ধরে চালু ছিলো। এরপর তা বন্ধ হয়ে যায়।

সুন্নীদের মাঝে গাজী মুজাফফরুদ্দীন আবু সাঈদ কুকুবুরী আনুমানিক ৬০০ হিজরী থেকে ইর্বিল বা আর্বিলে (বর্তমানে ইরাকের স্বায়ত্বশাসিত রাজ্য কুর্দিস্তানের একটি শহর) সরকারীভাবে প্রথম ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন চালু করেন।

এ পর্যায়ে সরকারীভাবে মীলাদুন্নবী উদযাপনের প্রবর্তক শিয়ারা হলেও, তা সুন্নীদের পালনে কোনোই সমস্যা নেই। কেননা, পবিত্র আশুরায় ইহুদিরা রোজা রাখে এবং এর কারণ জেনে যেমনি নবীজী (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) বলেছিলেন: তোমাদের চেয়ে মুসার প্রতি আমাদের অধিকার ও নৈকট্য বেশি। এরপর সেদিন তিনি রোজা রাখলেন এবং রাখার হুকুম দিলেন (দারিমী, বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও ইবনে মাজা) - তেমনি শিয়ারা ঈদে মীলাদুন্নবী সরকারীভাবে প্রথম উদযাপন শুরু করলেও এ ব্যাপারে ওদের চেয়ে নবীজীর প্রতি আমাদের তথা সুন্নীদের অধিকার ও নৈকট্য বেশি। তাই, এটি উদযাপন করা নফল ইবাদত বা সওয়াবের কাজ।

যারা বলেন: সাহাবীদের (রাদ্বিআল্লাহুতা’লা ’আনহু) যুগে সরকারীভাবে ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন কখনো হয়নি বলে, তা জায়েজ নেই। এরা আসলে শরীয়ত সম্পর্কে অজ্ঞ ও গোমরাহ। কেননা, আল্লাহর রাসুল (সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফরমান: আমার উম্মতের ভেতরে আমাকে সেসব লোকই বেশি ভালোবাসবে - যারা আমার (ওফাতের) পরে আসবে! তাঁদের কেউ এমনও প্রত্যাশা করবে যে, যদি সে আমাকে দেখতো - তাহলে, আমার জন্যে সে তার পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদও কুরবান করে দিতো {সহীহ মুসলিম: ‘জান্নাত, জান্নাতের গুণাবলী ও নেয়ামতরাজি এবং জান্নাতিদের বিবরণ’ অধ্যায়; ‘যারা নবীজীকে (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের পরিবার-পরিজন ও সম্পদের বিনিময়ে দেখতে ভালোবাসবে’ পরিচ্ছেদ}। এ জাতীয় আরো হাদীছ শরীফ মিশকাতের ‘এ উম্মতের সওয়াব’ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে। কাজেই, সাহাবায়ে কেরাম নবীজীর সোহবতের কারণে আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বটেন। কিন্তু তাঁদের চেয়ে পরবর্তীদের নবীজীকে বেশি মহব্বত করার কথা খোদ নবীজীই বলে গেছেন। পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন তেমনই একটি নিদর্শন।

সম্প্রতি ফ্রান্স, বৃটেন, ভারত ও ইসরাইলসহ নানা জায়গায় অমুসলিমরা মহানবী (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম), ইসলাম ও মুসলিমদেরকে নানাভাবে অবমাননা করছে। আল্লাহুতা’লা এ ইস্যুতে পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন উপলক্ষে মুসলিম মিল্লাতকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেসব সফলভাবে মোকাবেলার তওফিক দান করুক। আমিন।

30/10/2020

প্রশ্নঃ প্রচলিত মীলাদুন্নবীর অনুষ্ঠান যে রীতিতে আয়োজন ও পালন করা হয়, তা তো হুবহু মহানবী ﷺ কিংবা সাহাবা, তাবেঈন ও তাবেউ তাবেঈনের যুগে ছিলো না। কাজেই, তা শরীয়তসম্মত হয় কিকরে?

উত্তরঃ প্রথম তিন যুগে বা খায়রুল কুরুনে কোনো রীতি না থাকলে, তা পরবর্তীকালের মুসলিমরা পালন করতে পারবেন না, এমন কোনো কথা বা শর্ত শরীয়তের মূলনীতি নয়। বরং, শরীয়তের মূল নীতিমালা হলো কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস, ইসতিহসান (জনকল্যাণকর), ইসতিদলাল (যুক্তিযুক্ত), উরফ (প্রচলন), আদত (অভ্যাস)। এগুলোর যেকোনো এক বা একাধিক মূলনীতি অনুসারে কোনো রীতি পালন করলেই, তা শরীয়তসম্মত হবে।

আর এই বৈধতা শুধু রীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং যেকোনো বস্তু ব্যবহার এবং লেন-দেনের ক্ষেত্রেও হতে পারে। কেননা, শরীয়ত শুধু রীতি সিদ্ধ কি সিদ্ধ হবে না, এমন ফয়সালা দেয় না। বরং কোনো বস্তু গ্রহণ বা বর্জন কোনো ভিত্তিতে করতে হবে, তারও ফয়সালা দেয়। আর এ ফয়সালার ভিত্তিই হচ্ছে, উপরে উল্লিখিত ৮টি মূলনীতি।

আমাদের সমাজে সিহাহ সিত্তাহ নামে প্রচলিত হাদীছের ছয়টি সংকলন কিতাব মূলত খায়রুল কুরুনের পরেই বা ফিতনার যুগেই সংকলিত হয়েছিলো। এগুলোর কোনোটিরই এমন প্রাচীন হস্তলিখিত পান্ডুলিপি পাওয়া যায় না, যা কিতাবগুলোর লেখকের যুগের কাছাকাছি সময়ে সংকলিত। তারপরও কিন্তু মুসলিমরা এ কিতাবগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়া কিংবা এগুলো থেকে হাদীছ বর্ণনা করা বন্ধ করেনি। বরং এগুলোর প্রতি আস্থা রেখেছে। কেননা, এগুলোর পান্ডুলিপি ও বর্ণনা কিয়াস, উরফ ও ইসতিদলাল অনুসারে সিদ্ধ। একইভাবে, খায়রুল কুরুনের পর রচিত ও প্রকাশিত বহু আলেমের বহু কিতাবের বর্ণনা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করা হয়েছে।

একইভাবে, বহু রীতি, অনুশীলন ও ব্যবহার বর্তমানে যেভাবে করা হয়, খায়রুল কুরুনে হুবহু সেভাবে ছিলো না এবং অনেক ক্ষেত্রে, সেগুলোর অস্তিত্বই ছিলো না। যেমন,

১) প্রচলিত ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন, মাইকিং, চাঁদা নেয়া এবং ওয়াজকারীকে মোটা অংকের টাকা দেয়া। বিভিন্ন সাজে, বিচিত্র ব্যানারে, সামিয়ানা টানিয়ে, আলোকসজ্জা করে ওয়াজ মাহফিলের যে আয়োজন বর্তমানে প্রচলিত আছে, তা খায়রুল কুরুনে মোটেও ছিলো না।

২) ওয়াজকে পেশা হিসেবে নেয়া এবং এ কাজের জন্য ওয়াজকারী কর্তৃক অর্থ দাবি করার প্রচলন খায়রুল কুরুনে ছিলো না।

৩) জুমআ ও ঈদের নামাজে বহুল প্রচলিত সিরিয়ার আলেপ্পোর তৎকালীন খতীব ইবনে নাবাতার (৩৩৫-৩৭৪ হিঃ) খুতবা, যা রচিত হয়েছে খায়রুল কুরুনের অনেক পরে! এছাড়াও পড়া হয় দেওবন্দের আশরাফ আলী থানভীসহ খায়রুল কুরুন-পরবর্তী বিভিন্ন আলেম লিখিত খুতবা।

৪) প্রচলিত বিয়ের রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন পদ্ধতি অনুসরণ না হলে, বিয়ে খারিজের প্রচলিত সিস্টেম। রেজিস্ট্রেশনের কয়েকদিন আগে শরীয়ত মোতাবেক বিয়ে পড়ানো হলেও, রেজিস্ট্রেশন না থাকায়, বিয়ে বাতিল হয়ে যায়। এই নিবন্ধনের সিস্টেম খায়রুল কুরুন কিংবা উপনিবেশের আগেও ছিলো না।

৫) বিয়ের ঘটকালি কিংবা কাযী কর্তৃক বিয়ে পড়ানোকে পেশা হিসেবে নেয়ার ব্যাপারটি খায়রুল কুরুনে ছিলো না।

৬) মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোতে খতমে বুখারী শরীফের প্রচলন রয়েছে। অথচ, খায়রুল কুরুনে বুখারী শরীফই ছিলো না!

৭) ইমামতি ও আযান দেয়াকে পেশা হিসেবে নেয়া। অথচ, খায়রুল কুরুনে কেউ এ দুটো পেশা হিসেবে নিয়েছে, এমন নজির নেই।

৮) কয়েকজনের কাফেলা নিয়ে মুসলিমদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কিংবা রাস্তা-ঘাটে মুসলিমদের দাঁড় করিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে, ইসলামের বাণী শোনানোর পদ্ধতি কোনোভাবেই খায়রুল কুরুনে ছিলো না।

৯) মসজিদ্গুলোতে নামাজ ও খুতবার সময় মাইক ব্যবহারের প্রচলন হয়েছে এই গত শতাব্দীতে।

১০) মসজিদ-মাদ্রাসায় তো খায়রুল কুরুনে বৈদ্যুতিক বাতি-ফ্যান বা যান্ত্রিক সুব্যবস্থাও ছিলো না! অথচ, তা এখন প্রায় সব মসজিদ-মাদ্রাসায়ই আছে।

১১) বহুতল মসজিদের ভবন নির্মাণের বহুল প্রচলন শুরু হয়েছে গত শতাব্দীতে। অথচ, খায়রুল কুরুনে দ্বিতল কোনো মসজিদ বা নামাজ পড়ার জায়গা ছিলো না।

১২) গ্রাম্য সালিশ বা পঞ্চায়েতের মাধ্যমে কোনো অপরাধের রায় দেয়া এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি করার পদ্ধতি একটি খায়রুল কুরুন-পরবর্তী বিচার পদ্ধতি। খায়রুল কুরুনে এবং এর পরেও রাজ্য নির্ধারিত বিচারক বা কাযী কর্তৃক বিচার প্রক্রিয়া সম্পাদিত হতো।

১২ই রবিউল আউয়ালের সাথে সঙ্গতি রেখে ১২টি পয়েন্ট উল্লেখ করলাম। আশে-পাশে তাকালে এবং একটু চিন্তা করলে, আপনারাও এমন বহু ব্যাপার, রীতি ও বস্তুর ব্যবহার পাবেন, যা খায়রুল কুরুনে ছিলো না। যেমন, বর্তমান ট্রাফিক আইন, বিচার প্রক্রিয়া, জাতীয়তা ও নাগরিকত্ব নিবন্ধনের পদ্ধতি, সামরিক যুদ্ধের পদ্ধতি ইত্যাদি। কিন্তু পরবর্তীকালে ফকীহগণ শরীয়তের এই ৮টি মূলনীতির কোনো এক বা একাধিক নীতিতে ফেলে, সেসব মুসলিমদের জন্য শরীয়তসিদ্ধ বলে রায় দিয়েছেন।

আবার, খায়রুল কুরুনের সবকিছুই যে আমাদের জন্য শরীয়তসিদ্ধ হয়ে যাবে, তা নয়। যেমন, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈকেরামের অংশগ্রহণে যেসব যুদ্ধ হয়েছে এবং সেগুলোতে স্বজাতি মুসলিমদের নিহত ও আহত হওয়ার যেসব ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, হাদীছ ও ইতিহাসের কিতাবগুলোতে বর্নিত থাকলেও, আমাদের জন্য অনুসরণীয় বা শরীয়তসিদ্ধ হয়ে যায়নি।

অথচ, মীলাদুন্নবী ﷺ পালন ও প্রচলিত মীলাদুন্নবীর ﷺ অনুষ্ঠানও শরীয়তের এই ৮টি মূলনীতির যেকোনোটি অনুসারে সিদ্ধ। যেমন,

সুরা ইউনুসের ৫৮ নং আয়াত ও সূরা আম্বিয়ার ১০৭ নং আয়াত অনুসারে, মীলাদুন্নবী ﷺ উপলক্ষে উৎসব করা কুরআন সিদ্ধ। বিভিন্ন হাদীছ থেকে জানা যায়, নবীজীর জন্মসংক্রান্ত আলোচনা করা আল্লাহর রসূলের ﷺ নিজের এবং সাহাবায়ে কেরামের সুন্নত। হিজরী ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে রাজ্য ও সাম্রাজ্যগুলোতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা, সেসব রাজ্য ও সাম্রাজ্যের আলেমগণের ইজমার দলীল। একইভাবে, অসংখ্য ন্যায়পন্থী ও বিশ্ববিখ্যাত আলেমের বরাতে আমরা জেনেছি, উৎসব ও আয়োজন করে শরীয়তের বিধিনিষেধের মতে, মীলাদুন্নবী ﷺ পালন করা জনকল্যাণকর এবং উত্তম আমল, যা ইসতিহসানের দলীল। একইভাবে, এই রীতি যুক্তিযুক্তও বটে, কেননা আমাদের নবীই আমাদের জন্য অনুগ্রহ এবং তাঁর আগমন ও তাঁর উম্মতের মধ্যে আমাদের অন্তর্ভুক্তি আমাদের জন্য সৌভাগ্যের দলীল। ফলে এটি ইসতিদলাল-এর মূলনীতি অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য। একইভাবে, উরফ (প্রচলন) মূলনীতি অনুযায়ী, প্রচলিত মীলাদুন্নবীর ﷺ নিয়ম যে শরীয়তসিদ্ধ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। একইভাবে প্রচলনের কারণে, মীলাদুন্নবী ﷺ বিশ্বের ৩৬টি মুসলিম দেশে সরকারী ছুটি ছাড়াও বাৎসারিক আনন্দের দিনে পরিণত হয়েছে, যা মুসলিমদের মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক ইতিবাচক অভ্যাস তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। যেমন, হালুয়া-রুটি বানিয়ে প্রতিবেশী ও গরীবদের মাঝে বন্টন করা, মীলাদুন্নবী উপলক্ষে পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানানো, নতুন জামা-কাপড় পরিধান করা এবং আলোকসজ্জা করা। এগুলো আদত বা অভ্যাসেরই দলীল।

কাজেই, মীলাদুন্নবীর ﷺ প্রচলিত অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি করলে, বর্তমানে প্রচলিত অসংখ্য অনুশীলন-অনুষ্ঠান-রীতির ব্যাপারেও আপত্তি উঠবে, যা খায়রুল কুরুনে ছিলো না; অথচ, আপত্তিকারীরা নিঃসঙ্কোচে করে যাচ্ছে! তাই সংখ্যালঘুদের মীলাদুন্নবীর ﷺ প্রতি বিরোধিতা অনর্থক বিরোধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

04/06/2020

⏰ গত কুইজের উত্তরঃ
==================
গত কুইজে প্রশ্ন যা ছিলোঃ https://bit.ly/36VQqq4

ছবিতে নির্দেশিত ১ নং স্থাপনাটি ছিলো মূলত একটি গ্রন্থাগার, যেখান থেকে মুসল্লীগণ আল-কুরআন ও অন্যান্য বই নিয়ে হারামে বসে, পড়তে পারতেন। এর অপর নাম, আল-আব্বাসের গম্বুজ।

আর ২ নং স্থাপনাটি ছিলো সূর্যঘড়ি ও সময় সম্বলিত জ্ঞান সাধনার স্থান। এখানে চার মাযহাবের মুফতীগণ বসতেন, যাদের প্রধান দায়িত্ব ছিলো ওয়াক্ত অনুযায়ী আযান ও নামাজের (চার মাযহাবের জন্য আলাদা জামাআতের) সময় নির্ধারণ করে দেয়া। তারা সূর্যঘড়ি দেখে দেখে প্রতি ওয়াক্তের সঠিক সময় নির্ধারণ করতেন এবং চার মাযহাবের ইমাম ও জনগণকে তা অবহিত করতেন। কেউ নামাজের ওয়াক্ত না জানলে, এখানে গিয়ে জেনে নিতে পারতো। অন্য একটি সূত্র মতে, এ স্থাপনাটি একসময় মসজিদুল হারামের কোষাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

এ দু'টো গম্বুজ-বিশিষ্ট স্থাপনাই ১৮৮৩ সালের (১৩০০ হিজরীর) পূর্বে উছমানীয় খলীফাগণের নির্দেশে কোনো কারণে সরিয়ে নেয়া হয়।

তথ্যসূত্রঃ
-----------
(১) আল-হাজ্ব হুসাইন ভেদাত লিখিত তুর্কী ভাষার বই 'আসর-ই সেদাত', প্রকাশকালঃ ২০১৪ ইং।
(২) নিউইয়র্ক গণগ্রন্থাগারে ১৯০৪ সালে সংগৃহীত ও সংরক্ষিত ১৮৪০ সালের মসজিদুল হারামের একটি দুর্লভ ছবি।
(৩) নেটে প্রাপ্ত অন্যান্য ঐতিহাসিক ছবি।

------------------------------
মুহাম্মাদ যাহিদ হাসান আল-মাতুরীদী

02/06/2020

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও ইমাম, আবেদ শাহ মুজাদ্দেদী 'আলাইহির রহমাহ'র অন্যতম খলীফা, বহু আলেমের উস্তাদ, ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা, আল্লামা কাযী মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম হাশেমী আজ মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিঊন।

ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স হয়েছিলো ৯৫ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। তাঁর নামাজে জানাজা আজ রাত ৯টায় নগরের জালালাবাদ (অক্সিজেন মোড়ের উত্তরে) দরবারে হাশেমীয়া আলিয়া শরীফে অনুষ্ঠিত হবে।

গত কয়েক মাসে বিশ্বব্যাপী বহু প্রখ্যাত ও প্রবীণ আলেম আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায়, এবার বাংলাদেশ থেকে আল্লামা হাশেমীকে হারিয়ে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মাঝে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। মহান আল্লাহ এ দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে সবাইকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফীক দান করুক এবং আল্লামা হাশেমীকে ইল্লিয়ীন ও জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুক।

29/05/2020

⏰ কুইজ ⁉️
===========
বলতে হবে, ১৮৮০ সালের মসজিদুল হারামের এ ছবিটিতে ১ ও ২ নং নির্দেশিত গম্বুজবিশিষ্ট দালানগুলো তৎকালীন সময়ে কী কাজে ব্যবহৃত হতো?

04/05/2020

এ বছর ফিতরার পরিমাণ কতো?
==========================
জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২,২০০ টাকা ও সর্বনিম্ন ৭০ টাকা।

✅ #আটা দ্বারা আদায় করলে ১ কেজি ৬শ ৫০ গ্রাম বা এর সর্বোচ্চ বাজার মূল্য - ৭০ টাকা।
✅ #যব দ্বারা আদায় করলে ৩ কেজি ৩শ গ্রাম বা এর সর্বোচ্চ বাজার মূল্য - ২৭০ টাকা।
✅ #গম দ্বারা আদায় করলে ১ কেজি ৬শ ৫০ গ্রাম বা এর সর্বোচ্চ বাজার মূল্য - ৭০ টাকা।
✅ #কিসমিস দ্বারা আদায় করলে ৩ কেজি ৩ গ্রাম বা এর সর্বোচ্চ বাজার মূল্য - ১,৫০০ টাকা।
✅ #খেজুর দ্বারা আদায় করলে ৩ কেজি ৩ গ্রাম বা এর সর্বোচ্চ বাজার মূল্য - ১,৬৫০ টাকা।
✅ #পনির দ্বারা আদায় করলে ৩ কেজি ৩ গ্রাম বা এর সর্বোচ্চ বাজার মূল্য - ২,২০০ টাকা।

সূত্রঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ (৪ঠা মে, ২০২০ইং)

03/05/2020

মালয়েশীয় শায়্যিখ শামসুল মোহাম্মদ নূর এক বিশাল কাফেলা নিয়ে উজবেকিস্তান সফর করেন ২০১৪ সালের ১০-১৭ ডিসেম্বর। সফরের ৫ম দিনে তথা ১৪ ডিসেম্বর তারিখে সফর করেন সামারক্বান্দে অবস্থিত ইমাম মাতুরীদীর মাজার শরীফ। ভিডিওচিত্রে সেই সফরেরই উল্লেখযোগ্য অংশ ধারণ করা হয়েছে। এ ভিডিওতে ইমাম মাতুরীদীর মাজার শরীফ ছাড়াও সামারক্বান্দের ঐতিহ্যবাহী গাঁধা-টানা গাড়ি এবং পাহাড়ী এলাকার বিভিন্ন মসজিদ, কবরস্থান এবং অন্যান্য স্থাপনাও চোখে পড়বে।

01/05/2020

ইসলামী আক্বীদার প্রধানতম ইমাম এবং মুতাকাল্লিমগণের ইমাম, আবু মানসুর আল-মাতুরীদীর (- ৯৪৪ খ্রিঃ) অন্যতম কীর্তি হচ্ছে, আল-কুরআনের এক অবিস্মরণীয় ব্যাখ্যাগ্রন্থ। এর মূল নাম, "তা'ওয়ীলাতু আহলিস সুন্নাহ" (تأويلات أهل السنة), যা "তা'ওয়ীলাতু আল-কুরআন" এবং "তাফসীরে মাতুরীদী" (تفسير الماتريدي) নামেও পরিচিত।

এ কিতাব সম্পর্কে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আবি আল-কুরাশী (- ১৩৭২ খ্রিঃ) তাঁর "তবাক্বাতুল হানাফীয়্যাহ" নামক হানাফী ইমামগণের জীবনী সংক্রান্ত গ্রন্থে বলেছেন, "এটি একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ, যার সাথে এই বিষয়ের উপর (লিখিত) পূর্বেকার কোনো লেখকেরই কোনো গ্রন্থের তুলনা চলে না।" ইমাম তক্বীউদ্দীন আল-তামীমী (- ১৫৯৬ খ্রিঃ) একই মত ব্যক্ত করেছেন।

এই তাফসীর গ্রন্থের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছেঃ
প্রথমত, এটাই প্রথম এমন কোনো তাফসীর গ্রন্থ, যাতে বর্ণনার ক্ষেত্রে সনদের পরিবর্তে মতনের উপর নির্ভর করা হয়েছে। এমন নীতি তাঁর যুগে ছিলো বিরল।

দ্বিতীয়ত, এতে তিনি নাক্‌ল (কুরআন ও হাদীছ)-এর সাথে আক্‌ল (যুক্তি)-এরও সন্নিবেশ করেন এই শর্তে যে, গৃহীত আক্‌ল শরীয়তের অনুকূলে হবে এবং কোনোভাবেই শরীয়তের পরিপন্থী হবে না। এজন্য অনেকে বলেন, এই তাফসীরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি তাফসীর বিল-মা'ছুর (ঐতিহ্যগত তাফসীর) এবং তাফসীর বিল-রা'য় (যুক্তিসঙ্গত তাফসীর) এর এক অপূর্ব সন্নিবেশমূলক গ্রন্থ।

তৃতীয়ত, এতে তিনি মুতাশাবিহ (রূপক বা অস্পষ্ট) আয়াতসমূহের বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা মুহকাম (স্পষ্ট) দলীলের আলোকে করেন এবং এ নীতি অবলম্বন করেন যে, মুতাশাবিহাতের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মুহাকামাতের দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

চতুর্থত, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তিনি ইসরাঈলী বা ইহুদী রিওয়ায়েত (বর্ণনা) সমূহ পরিহার করেন এবং সেসবের উপর নির্ভর করা থেকে বিরত থাকেন।

এছাড়া এ দীর্ঘ তাফসীর গ্রন্থের আরও অনেক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অন্য কোনো লেখায় উল্লেখ করবো ইন্শা‌আল্লাহ।

বাংলাদেশে এ গ্রন্থের উপর পিএইচডি থিসিস করেছেন ডঃ মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান। তাঁর ঐ অভিসন্দর্ভ ইংরেজি ভাষায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ (ইফাবা) থেকে ১৯৮১ সালে "An Introduction to Al-Maturidi’s Ta’wilat Ahl As-Sunnah" (আল-মাতুরীদীর তা'ওয়ীলাত আহল্‌ আস-সুন্নাহর একটি ভূমিকা) নামে প্রকাশিত হয়। এই থিসিসটি এখন দুষ্প্রাপ্য। মহান আল্লাহ চাইলে ভবিষ্যতে তা আপনাদের সামনে পিডিএফ আকারে প্রকাশ করার ইচ্ছা আছে।

দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এ গ্রন্থের বাংলা বা ইংরেজী পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ কোনোটাই এখনও প্রকাশিত হয়ে উঠেনি। তবে ১৯৭০ সালে লন্ডন প্রকাশনী থেকে ডঃ মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান এর ১ম দুই পারার ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশ করেন, যেটাও দুষ্প্রাপ্য।

এ পোস্টের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাফসীরে মাতুরীদী সম্পর্কে বাংলা ভাষাভাষী জনসাধারণকে সংক্ষিপ্ত ধারণা দেয়া এবং আরবী পড়তে আগ্রহীদের জন্য এর আরবী পিডিএফ-এর লিংক শেয়ার করা। লেবাননের বায়রুতে অবস্থিত দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ প্রকাশনী থেকে গ্রন্থটি ১০টি খন্ডে প্রকাশ করা হয় ২০০৫ সালে। এর তাহক্বীক বা সম্পাদনা করেছেন শায়্যিখ ডঃ মাজদী বাসাল্লুম। এর কয়েকটি পান্ডুলিপি তুরস্ক, মিশর, সিরিয়া, ইংল্যান্ড এবং জার্মানীর গ্রন্থাগারগুলোতে সংরক্ষিত রয়েছে।

১ম খন্ডঃ http://bit.ly/Kitab-Tawilat-Ahl-al-Sunnah-Jilid_1

২য় খন্ডঃ http://bit.ly/Kitab-Tawilat-Ahl-al-Sunnah-Jilid_2

৩য় খন্ডঃ http://bit.ly/Kitab-Tawilat-Ahl-al-Sunnah-Jilid_3

৪র্থ খন্ডঃ http://bit.ly/Kitab-Tawilat-Ahl-al-Sunnah-Jilid_4

৫ম খন্ডঃ http://bit.ly/Kitab-Tawilat-Ahl-al-Sunnah-Jilid_5

৬ষ্ঠ খন্ডঃ http://bit.ly/Kitab-Tawilat-Ahl-al-Sunnah-Jilid_6

৭ম খন্ডঃ http://bit.ly/Kitab-Tawilat-Ahl-al-Sunnah-Jilid_7

৮ম খন্ডঃ http://bit.ly/Kitab-Tawilat-Ahl-al-Sunnah-Jilid_8

৯ম খন্ডঃ http://bit.ly/Kitab-Tawilat-Ahl-al-Sunnah-Jilid_9

১০ম খন্ডঃ http://bit.ly/Kitab-Tawilat-Ahl-al-Sunnah-Jilid_10

08/04/2020
16/04/2018

ইসলামী দর্শন ও বিজ্ঞানের আলোকে লাইলাতুল মি’রাজের ঘটনাবলী সংক্রান্ত কিছু প্রশ্নের জবাব

১ম প্রশ্নঃ মেরাজের রজনীতে রসূল সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন কোথায়? আমার (প্রশ্নকারীর) দৃষ্টিতে এমন প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, "সাক্ষাৎ করেছেন আরশে আযীমে"। আরশে আযীম তো আল্লাহপাকের একটি নির্দিষ্ট স্থান। এই স্থানটি সাত আসমান, সিদরাতুল মোনতাহারও উপরে। এই স্থানটি উপরের দিকেই ইংগিত করে। এই জন্য উপরের দিকে হাত তোলে মোনাজাত করা হয়।

আমার উত্তরঃ এ প্রসঙ্গে "এরপর আল্লাহ পাক আরশে সমাসীন হলেন" অর্থবোধক আয়াতসমূহ স্মর্তব্য (সূরা আ’রাফঃ ৫৪, সূরা ইউনূসঃ ৩, সূরা রা’দঃ ২ ইত্যাদি)। এ সকল আয়াত সম্পর্কে ইমাম আ'লা হযরত (রদ্বিআল্লাহু তা’লা ’আনহু) বলেন, “এর অর্থ হচ্ছে, সৃষ্টির সমাপ্তি আরশের উপর গিয়ে ঠেকেছে” (খাজায়েনুল ইরফান)

অর্থাৎ, আরশের সীমার শেষ প্রান্তে গিয়ে স্থান-কাল-মাধ্যম সহ সমগ্র সৃষ্টিজগত সমাপ্তি লাভ করেছে। অর্থাৎ, এর (আরশের) শেষ সীমার উপরে (বা বাইরে) সৃষ্টিজগতের কোনো অস্তিত্ব নেই। সেখানে অন্য কিছুর অস্তিত্ব ব্যতিরেকে একমাত্র আল্লাহ পাকই তাঁর স্বত্তা ও গুণাবলী নিয়ে ভিন্ন ভিন্নভাবে বিরাজমান। তেমনি এর নিচে (বা ভেতরের দিকে) তথা সমগ্র সৃষ্টিজগতেও তিনি সৃষ্টিকুলসহ একইভাবে বিরাজমান। মোটকথা, তিনি সর্বত্র বিরাজমান।

যা হোক, স্থানের ধারণা বা অস্তিত্ব না থাকার দরুন, আরশের গন্ডির বাইরে যেখানে কেবল আল্লাহ পাকই আছেন, তাঁকে 'লা-মকান' বা 'স্থানবিহীন' বলে অভিহিত করা হয়। এ কারণেই নবীজী ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) মি'রাজের রাতে সমগ্র সৃষ্টিজগত পরিভ্রমণ ও পরিদর্শন শেষে আরশের সীমার উপর (বা বাইরে) গিয়ে এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছিলেন, যা ছিল মূলত “লা-মকান” (বা স্থান-মাধ্যম ইত্যাদির ধারণার বাইরের অবস্থা বা প্রকৃতি) - যেখানে স্রষ্টা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মধ্যে অন্য কোনো অন্তরায় (যেমন, স্থান-কাল ইত্যাদি) ছিল না।

এর প্রেক্ষিতে অনুধাবন করা যায়, নবীজীর (সল্লাল্লাহু তা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উর্ধ্বগমনের পেছনে বহুবিধ কারণ ছিল, যার কয়েকটি এখানে আলোকপাত করছি।

প্রথমত, মহান আল্লাহর সাথে এমনভাবে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করা, যেখানে অন্য কোনো অন্তরায় নেই; অন্য কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। আর এমন একটি অবস্থা হচ্ছে লা-মাকান, যা আরশের গন্ডির বাইরে। তাই সেখানে না গিয়ে (সৃষ্টিজগতের ভেতরে অবস্থান করে) অন্তরায়বিহীন বা সৃষ্টির অস্তিত্ববিহীন আল্লাহু তা’লাকে দেখা সম্ভব নয়।

আর মহাবিশ্ব তথা ১ম আসমান নিচ পর্যন্ত, ১ম থেকে ৭ম আসমান, এরপর সিদরাতুল মুনতাহা, কুরসী, আরশের নিচে নূরের সমুদ্র, ৭০ হাজার নূরের পর্দা এবং পরিশেষে আরশের গন্ডি পেরিয়ে গেলেই কেবল আল্লাহুতা'লাকে সেই অবস্থায় পাওয়া সম্ভব, যা উপরে উল্লেখ করেছি।

দ্বিতীয়ত, ১ম থেকে ৭ম এই আসমানগুলোর মাঝে যেসকল বাসিন্দা এবং আল্লাহ পাকের দৃশ্যমান (যেমন, সৌরজগত, ছায়াপথ ইত্যাদি) ও অদৃশ্য নিদর্শন রয়েছে, সেগুলোর সাথে সাক্ষাৎ ও পরিচয় লাভ করতে হলে এর মধ্য দিয়ে গমন না করে উপায় নেই।

তদুপরি, নবীজী ছিলেন সকল দৃশ্য ও অদৃশ্য সৃষ্টির নবী ও রাসূল। তাই আল্লাহ পাকের সাথে একান্ত সাক্ষাৎ লাভের আগে তাঁর অভূতপূর্ব, অনিন্দ্যসুন্দর ও অত্যাশ্চর্য সৃষ্টিসমূহের সাথে দেখা করা তাঁর জন্য জরুরী ছিল, যেনোঃ

(ক) এসব বিষয়ে নবীজীর আর কোনো কৌতুহল না থাকে; (খ) তিনি এসব কিছু সম্পর্কে অবহিত হয়ে যান; (গ) তিনিই যে সৃষ্ট সব কিছুর নবী ও রাসূল, তা তিনি স্বয়ং অবলোকন করে পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন; (ঘ) আসমানসমূহের বাসিন্দাগণ বিশেষ করে নবীগণের সাথে তাঁর পরিচয় হয়ে যায়, যেনো পরবর্তীতে আল্লাহ পাকের সাথে একান্ত সাক্ষাতের পর অবস্থাভেদে তাঁদের সাথে নবীজী যোগাযোগ করতে পারেন। যেমন, উম্মতের জন্য নামাজের ওয়াক্ত-সংখ্যা নিয়ে আল্লাহু তা’লার সাথে বিতর্ক করার সময়, নবীজী (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) নবী মূসার ('আলাইহিস সালাম) কাছে ৬ষ্ঠ আসমানে অন্তত ৯ বার আসা-যাওয়া করেছিলেন।

লক্ষ্য করুন, এই যে ৯ বার তিনি আরশের গন্ডির বাইরে (লা-মাকান) থেকে ৬ষ্ঠ আসমানে ফিরে এসে আবার আরশের গন্ডির বাইরে গেলেন, এর প্রেক্ষিতে কিছু বিষয় আমাদের কাছে উন্মোচিত হয়ে যায়, যথাঃ

(ক) বারবার যাওয়া-আসার ক্ষেত্রে তাঁর (নবীজী) আর কোনো মাধ্যম কিংবা বাহনের (বোরাক কিংবা রফরফ) দরকার পড়লো না। কেননা, তিনি তাঁর সত্ত্বাগত বৈশিষ্ট্য বা নূরে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন। আর বিবেক এটাই বলে যে, যেখানে নূরের তৈরি ফেরেশতাদের জন্য এক আসমান থেকে অন্য আসমান পেরিয়ে যেতে কোনো মাধ্যম প্রয়োজন হয় না, সেখানে সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ নূরের (নবীজীর) জন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন না হওয়াটাই অতি স্বাভাবিক। (এ প্রসঙ্গে ৩য় প্রশ্নের উত্তরে বিশদাকারে লিখেছি।)

(খ) তিনি যতোবারই ৬ষ্ঠ আসমানে আসলেন ও আরশের গন্ডির বাইরে ফিরে গেলেন, ততোবারই এর মধ্যে থাকা সব সৃষ্টিকে দেখে নিলেন এবং সহজ কথায় ৬ষ্ঠ আসমান থেকে লা-মাকানে যাওয়ার পথটি তাঁর জন্য চেনা (বা আপন) ও পরিষ্কার হয়ে গেলো।

(গ) মূসা ('আলাইহিস সালাম) উম্মতে মুহাম্মদীর পক্ষে ওকালতি করে তাঁর নিজের ও নিজ উম্মতের জান্নাত লাভের জন্য উছিলা তৈরি করে নিলেন।

(ঘ) এই ৯ বারই তিনি মহান আল্লাহকে দেখেছেন এবং তাঁর সাথে কথা বলেছেন। সুবহান আল্লাহ। সুবহান আল্লাহ!

তৃতীয়ত, পৃথিবী কমলা লেবুর মতো কিছুটা গোলাকার বলে অভিকর্ষ বল ছাড়িয়ে কোথাও যেতে হলে, উপরের দিকেই যেতে হবে, মাটি ভেদ করে নিচের দিকে নয়, তাই নয় কি? আর নূরানী শক্তি ও ক্ষমতার কাছে এই উপরের দিকে গমন করা কোনো ব্যাপারই না। উল্লেখ্য, মধ্যাকর্ষণ বা অভিকর্ষ বল হচ্ছে সেই শক্তি যা দিয়ে পৃথিবীর কেন্দ্র তার গন্ডির মধ্যে থাকা সবাইকে নিজের দিকে টানতে চায় বা টানে, যে কারণে আমরা পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে ছিটকে পড়ে যাচ্ছি না।

এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, মি'রাজের রাতে নবীজীর উর্ধ্বগমনের রহস্য কি ছিল এবং কতটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল! তাই এই উর্ধ্বগমনের বিষয়টি উপরের দিকে হাত তুলে দোয়া করার সাথে সম্পৃক্ত নয়। কেননা, আল্লাহ পাক তো সর্বত্রই আছেন। হাত তুলে দোয়া করার কি দরকার? বরং হাত তুলে দোয়া করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, (ক) দোয়ার আদব রক্ষা করা বা বজায় রাখা, (খ) হাতে নূর কামনা করা (বা বর্ষিত হওয়া) এবং তা দিয়ে মুখ মাসেহ করা, (গ) হাত তুলে আল্লাহুতা'লার কাছে আত্মসমর্পন করা, নতিস্বীকার করা।

এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে আমার এই নোটটি (http://bit.ly/2pRt27a) দ্রষ্টব্য।

২য় প্রশ্নঃ মি’রাজ রজনীতে অনেক ঘটনাই ঘটেছে। অথচ নবীজী যখন উম্মে হানীর ঘরে ফিরে আসলেন, তখনও তাঁর ইসরা ও মি’রাজে যাওয়ার আগের ওযুর পানি গড়িয়ে পড়ছিলো বা প্রবাহিত হচ্ছিলো। অনেকে এ ঘটনা থেকে বলেন যে, মি’রাজ রজনীতে পৃথিবী স্থির হয়ে ছিলো। বিজ্ঞান ও দর্শনের দৃষ্টিতে বিষয়টিকে কীভাবে দেখা উচিত?

আমার উত্তরঃ জ্বী, এটা ঠিক যে অনেকে ব্যক্তি বলে থাকেন, ইসরা ও মি'রাজের রাতে দুনিয়া বা পৃথিবী নাকি স্থির হয়ে ছিলো ! মূলত (আমার মতে), দুনিয়া বা পৃথিবী স্থির হয়ে যায় নি। বরং, মি'রাজের প্রতিটি ঘটনায় যে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, তার গতি পৃথিবীর (আহ্নিক) গতির চেয়ে অসীমগুণ বা অচিন্তনীয়ভাবে দ্রুত ছিলো। আর তাই, মি'রাজ থেকে ফিরে এসে, ওযুর ঐ একই পানি প্রবাহিত হতে থাকায়, পৃথিবী স্থির মনে হয়েছে। লক্ষ্যণীয়, নবীজীর ('আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) ভাষ্যানুযায়ী, "বোরাক তাঁর দৃষ্টিসীমায় পা ফেলতো” (খাসাইসুল ক্বুবরা)। অর্থাৎ, যতোদূর দেখা যায়, সেখানে এক কদম বা পদক্ষেপ ফেলেই আবার যতোদূর দেখা যায়, সেখানে পরবর্তী পদক্ষেপ ফেলতো। এটা মূলত একটা উপমা, যা আমাদের বোঝানোর জন্য বলা হয়েছে। কেননা, মানুষ তখনও, এমনকি এখনও ঐ গতিবিজ্ঞানে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করতে পারেনি।

[বিঃদ্রঃ আহ্নিক গতি হচ্ছে পৃথিবী একবার পশ্চিম থেকে পুর্বে, নিজ অক্ষের চতুর্দিকে ঘুরে আসতে যে সময় নেয়। এখানে সূর্যের চারিদিকে একবার ঘুরে আসার কথা কিংবা বার্ষিক গতি বোঝানো হয়নি।]

বর্তমান বিজ্ঞান, গতির বিচারে সাধারণ দৃশ্যমান আলোর গতি কিংবা বিভিন্ন অদৃশ্য তড়িত-চৌম্বকীয় তরঙ্গের গতিকেই (সেকেন্ডে ১,৮৬,০০০ মাইল) আদর্শ ধরে। মূলত, হুযুর রহমাতুল্লিল আ'লামীন (দুই জগতের অনুগ্রহ) ও তাঁর সফর সঙ্গীর গতি ছিলো এর থেকেও অভাবনীয়ভাবে বেশি। ইসলামী বিজ্ঞান ও দর্শন মতে এটা স্পষ্ট যে, রূহ ও নূরের গতি সাধারণ আলোর গতির তুলনায় কয়েকগুণ নয়, বরং অসীমগুণ বেশি (হিসাবের বাইরে)। এ কারণেই, নূরের তৈরি ফেরেশতারা মুহূর্তের মধ্যেই আসমান থেকে যমীনে কিংবা যমীন থেকে আসমানে যাতায়াত করতে পারে। একইভাবে অযু আদায়কারী রূহসমূহও ঘুমন্ত অবস্থায় মুহূর্তের মধ্যে আরশে গিয়ে সিজদা দিতে পারে। আর যার (নবীজীর) সত্ত্বা যে কোনো সৃষ্ট নূরের সত্ত্বা থেকে শ্রেষ্ঠ, তার গতি সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া আমাদের পক্ষে কীভাবে সম্ভব?

এবার আসি আসল কথায়। পদার্থবিজ্ঞান ও মহাজাগতিক বিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাকাশে এমন অসংখ্য 'ওয়ার্মহোল' ছড়িয়ে আছে, যার ভেতর দিয়ে মহাকাশের এক অংশ থেকে অন্য অংশে কিংবা এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে অত্যন্ত কম সময় লাগে, যা স্বাভাবিকভাবে (বা ওয়ার্মহোলের মাধ্যম ছাড়া) গেলে, অসংখ্য আলোকবর্ষ লেগে যেতে পারে - এই তত্ত্বটি গত প্রায় শতাব্দীকাল যাবৎ প্রণীত, প্রতিষ্ঠিত ও বিভিন্নভাবে পরীক্ষিত হয়ে আসছে। মহাজাগতিক পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র ধরে কিছুটা হলেও ধারণা করা যায়, সাইয়্যিদিল মুরসালীন ও তাঁর সফর সঙ্গীর গতি ও চলার মাধ্যম কেমন ছিল এবং তারা যতোক্ষণই ভিন্ন জগতে বা মাত্রায় অতিবাহিত করে থাকেন না কেনো, এতে আমাদের স্বাভাবিক সময়ের স্থিরতার প্রয়োজন হয়নি। বরং তাঁদের দ্রুততা বা আসা-যাওয়ার গতি পৃথিবীর সময়ের গতিকে অতিক্রম করে গিয়েছে। আর এটা খুবই সম্ভব, কেননা সময় আপেক্ষিক।

এর সমর্থনে আমি মি’রাজের রাতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। সাহাবী আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত আছে যে, মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস যাওয়ার পথে নবীজী কিছু কাফেলা দেখতে পেলেন। যখন তিনি একটি কাফেলার মুখোমুখি হলেন, তখন কাফেলাটির একটি উট উত্তেজিত হয়ে পালাতে গেলে উটটি হোচট খেয়ে পা ভেঙ্গে খোঁড়া হয়ে যায় এবং এই ঘটনা পরে একটি কাফেলা মক্কায় ফিরে এসে সত্য্য়ন করে। ঐ কাফেলাগুলোকে নবীজী যখন প্রত্যক্ষ করছিলেন, তখন কাফেলাগুলো স্বাভাবিক মনুষ্য গতিতেই চলছিলো। উল্লেখ্য যে, নবীজী যখন কাফেলাগুলোর সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন উট নবীজীকে দেখলেও, কাফেলার লোকেরা তাঁকে দেখেনি। কেননা, দেখলে তারা মক্কায় ফিরে এসে তা স্বীকার করতো। বরং যা হয়েছে তা হলো, কাফেলাগুলোর অবস্থান তিন মাত্রায় (Three Dimensional Space) এবং গতি মনুষ্যগতির (Human Speed) থাকলেও, নবীজীর অবস্থান ভিন্ন মাত্রায় ছিলো এবং গতিও অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিলো। এ কারণেই উট তাঁকে দেখলেও, লোকেরা তাঁকে দেখতে পায়নি। কেননা, সাধারণ মানুষের দৃষ্টিশক্তির চেয়ে পশু-পাখির দৃষ্টিশক্তি অনেক প্রবল হয়, যেকারণে তারা ভিন্ন মাত্রার (আমাদের দৃষ্টিতে অদৃশ্য) সত্ত্বাসমূহও অবলোকন করতে পারে।

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, নবীজী, জিবরাঈল ও বুরাক্ব অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে চলতে থাকলে, উট তাদের দেখলো কীভাবে? আমার উত্তর হচ্ছে, বিজ্ঞানের আলোকে, ভিন্ন মাত্রায় সময় অত্যন্ত আপেক্ষিক; তথা অনেক স্বল্প সময়ে অনেক দূরত্ব অতিক্রম করা যায়। তাই নবীজী এবং তাঁর সঙ্গী ও বাহন যখন ঐ কাফেলার মুখোমুখি হলেন, তখন তারা তাঁদের আপেক্ষিক গতি তুলনামূলক হ্রাস করেছিলেন, যে কারণে উটটি তাঁদের দেখতে পেয়েছিলো। কিন্তু এই হ্রাসকৃত গতিও ছিলো পৃথিবীর আহ্নিক গতির তুলনায় বেশি।

বিজ্ঞানের হিসাবে, পৃথিবীর আহ্নিক গতি ঘন্টায় যেখানে ১০০০ মাইল (অর্থাৎ, এক ঘন্টায় পৃথিবী ১০০০ মাইল পথ নিজ অক্ষে ঘুরে কিংবা ২৪ ঘন্টায় ২৪,০০০ মাইল পথ ঘুরে), সেখানে একটি সাধারণ রকেট পৃথিবীর অভিকর্ষ বল ছাড়িয়ে যেতে সেকেন্ডে ৪.৯ মাইল কিংবা ঘন্টায় ১৭,৬৪০ মাইল পথ অতিক্রম করে। অত্যাধুনিক স্পেইসক্র্যাফটগুলো ঘন্টায় ৩২,৪০০ মাইল থেকে ৩৬,০০০ মাইল পর্যন্ত অতিক্রম করতে সক্ষম। রকেট এতো গতিসম্পন্ন হওয়ার পরও কিন্তু উড্ডয়নের সময় তথা আমাদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকা পর্যন্ত আমরা রকেট দেখতে পাই। একইভাবে, উটটিও নবীজীকে দেখেছিলো (দৃষ্টিশক্তির কারণে), কিন্তু ভিন্ন মাত্রায় থাকার দরুন লোকেরা প্রত্যক্ষ করেনি।

আবার প্রশ্ন আসতে পারে, নবীজী ইসরাকালীন তাইয়্যেবা (মদীনা) এবং বায়তুল মুকাদ্দাসেও নামাজ পড়েছেন। তাহলে এই নামাজ আদায়কালীন সময়েও কি পৃথিবীর কিছু সময় গড়িয়ে যায়নি কিংবা পৃথিবী স্থির হয়ে যায়নি? আমার উত্তর হচ্ছে, না। কেননা, ঐ নামাজ ছিলো অতীন্দ্রিয় জগতে তথা ভিন্ন মাত্রায়। তাই ভিন্ন মাত্রার সময় আমাদের পৃথিবীর সময়ের অনেক উর্ধ্বে তথা ভিন্ন মাত্রায় কোনো কাজের গতিও ৩য় মাত্রায় কৃত কাজের থেকে অনেক বেশি হবে, যে কারণে ভিন্ন মাত্রা কিংবা অতীন্দ্রিয় অবস্থায় গতি পৃথিবীর স্বাভাবিক (আহ্নিক) গতিকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। আর তাই পৃথিবীকে স্থির মনে হয়েছে।

৩য় প্রশ্নঃ মি’রাজের রজনীতে নবীজীর জন্য বুরাক্ব লেগেছিল কিনা? বিবেকের দাবি হলো, যিনি সৃষ্টিজগতে হাজির বা বিদ্যমান, তিনি তো একই মুহূর্তে আকাশেও হাজির। তো হাজিরের জন্য বুরাক্ব লাগবে কেন?

উত্তর: এর কয়েকটি উত্তর হতে পারে।

প্রথমত, তাহলে মহান আল্লাহ তো মুহীত বা সর্বত্র বিরাজমান এবং ওয়াসি’ বা সর্বত্র পরিব্যাপ্ত। কাজেই, শুধু বুরাক্ব নয়, মি’রাজেরইবা দরকার কী?

দ্বিতীয়ত, পবিত্র মি’রাজ একটি মুজিজা বা অতীন্দ্রিয় বিষয়। যেসব পর্দার কারণে ঈমানদারগণ এখন মহান আল্লাহ দেখছেন না, বরং রোজ হাশরে সেসব অপসারিত হলে দেখবেন - পবিত্র মিরাজ ছিলো আসলে, সেসব পর্দা বা স্থান-কাল-ইন্দ্রিয় সীমাবন্ধতার গন্ডি পেরিয়ে এক অতীন্দ্রিয়, অভূতপূর্ব ও অভিনব সাময়িক যাত্রা, বুরাক্ব ছিলো এর বাহন এবং “ক্বা’বা ক্বাওসাঈন আও আদনা” ছিলো এর গন্তব্যস্থল।

বিজ্ঞান বলে, শব্দের গতি সেকেন্ডে ৩৩২ মিটার এবং আলোর গতি সেকেন্ডে ১,৮৬,০০০ মাইল। পবিত্র মি’রাজের ঘটনা এর চেয়েও বহু দ্রুত গতিতে সংঘটিত হয়েছিলো - যা চিন্তা করাও সম্ভব নয় (যা উপরে বর্ণিত হয়েছে)! কিন্তু উম্মতের বোঝার সুবিধার জন্যে নবীজী (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) মি’রাজের ঘটনাবলী ধাপে ধাপে বর্ণনা করেছেন।

তৃতীয়ত, বুরাক্ব ছাড়াও মি’রাজ হতে পারে। নইলে, নবীজী (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) কেনো বললেন যে, নামাজ ঈমানদারদের মিরাজ? অর্থাৎ, আত্মিকভাবে বুরাক্ব ছাড়াই মু'মিনদের জন্য মি'রাজ সম্ভব।

কাজেই, মি’রাজ নবীজীর হাজির-নাযির হওয়ার কিংবা আল্লাহুতা’লার মুহীত বা ওয়াসি’ হওয়ার বিপরীত দলিল নয়, বরং এটি একটি অতীন্দ্রিয় প্রক্রিয়া। একইভাবে, বুরাক্বও ছিলো একটি অতীন্দ্রিয় বাহন।

আমি ১ম প্রশ্নের উত্তরে উল্লেখ করেছি, নবীজী যখন ক্বা’বা ক্বাওসাঈন থেকে ৬ষ্ঠ আসমানে মূসার (’আলাইহিস সালাম) সাথে সাক্ষাতের জন্য যে ৯ বার আসা-যাওয়া করেছিলেন, তখন তিনি যাতায়াতে কোনো কিছু মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেননি। আর এই ৯ বারের কোনোবারেই কোনো কিছুকে বাহন হিসেবে ব্যবহারের কথা হাদীছেও আসেনি, কেনো? তদুপরি, আরেকটা ব্যাপার ভেবে দেখুন, উম্মে হানীর (রদ্বি আল্লাহু তা’লা ’আনহা) ঘর থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস (ইসরা) এবং এরপর উর্ধ্বগমন (মি’রাজ) পর্যন্ত বুরাক্ব ও রফরফ নামক বাহন দু’টির কথা হাদীছে থাকলেও ক্বা’বা ক্বাওসাঈন থেকে উম্মে হানীর ঘরে ফিরে আসার সময় কোনো বাহনের কথা হাদীছে উঠে আসেনি, কেনো? এর উত্তর কয়েকরকম হতে পারে।

(ক) শ্রোতাবৃন্দ (সাহাবীগণ) ভেবেছিলেন, নবীজী যেহেতু বুরাক্ব দিয়েই গিয়েছেন, তাহলে বুরাক্ব দিয়েই ফিরে এসেছেন। ফিরে আসার সময় কোনো বাহন ব্যবহার করেছেন কিনা, এই ব্যাপারটি আলাদাভাবে জানার কী-ই বা প্রয়োজন আছে?

(খ) হাদীছে এসেছে যে, সিদরাতুল মুনতাহা থেকে নবীজীর নতুন বাহন হলো রফরফ। কিন্তু কোনো হাদীছেই উক্ত হয়নি, রফরফ দিয়ে নবীজী কতোটুক দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন? অর্থাৎ, সেটা কি কুরসী, কিংবা আরশ কিংবা ক্বা’বা ক্বাওসাঈন পর্যন্ত, তা স্পষ্ট করে উদ্ধৃত হয়নি কিংবা নবীজী এ ব্যাপারে কিছুই উল্লেখ করেননি। এর কারণ কী? আরও ভেবে দেখুন, রফরফ যদি ক্বা’বা ক্বাওসাঈন পর্যন্ত নবীজীর বাহন হয়েই থাকে, তাহলে তো মহান আল্লাহকে মাধ্যম কিংবা অন্তরায় ছাড়া শুধু নবীজী নন, রফরফও দেখতে পেয়েছে কিংবা সাক্ষাৎ লাভ করেছে, তাই না? অথচ, তা অযৌক্তিক। কেননা, আরশই হচ্ছে সৃষ্টির শেষ সীমা। আর সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র নবীজীকেই মহান আল্লাহ আরশের গন্ডি অতিক্রম করার সৌভাগ্য ও সক্ষমতা দান করেছেন। খোদ আরশও তার গন্ডি বা সীমা ছেড়ে এর বাইরে প্রসারিত হয় না। আরশের বহনকারী ফেরেশতারাও আরশের গন্ডি অতিক্রম করতে পারে না। আর ফেরেশতাদের সর্দার জিবরাঈল সিদরাতুল মুনতাহার গন্ডিই অতিক্রম করতে পারে না। কাজেই, রফরফ দ্বারা আরশের গন্ডি অতিক্রম করা অস্বাভাবিক এবং অযৌক্তিক ব্যাপার। আর তাই, নবীজী একাই ক্বা’বা ক্বাওসাঈনে গিয়েছিলেন, রফরফ সাথে নিয়ে নয়।

মূলত, নূরের সমুদ্র, ৭০ হাজার নূরের পর্দা ইত্যাদি অতিক্রম করার সময় নবীজীর (সৃষ্ট) নূরানী সত্ত্বার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিলো, যা মহান আল্লাহর (অসৃষ্ট) নূরানী সত্ত্বার সাক্ষাৎ লাভে উপযুক্ত হয়ে গিয়েছিলো। আর তাই রফরফের প্রয়োজন আরশের গন্ডি অতিক্রম করার আগেই শেষ হয়েছিলো এবং নবীজী রফরফ ছাড়াই ক্বা’বা ক্বাওসাঈনে পৌঁছেছিলেন। সেই নূরানী সত্ত্বা ৯ বার নবী মূসার সাথে সাক্ষাতের সময়ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল ছিলো এবং এমনকি উম্মে হানীর ঘরে ফিরে আসা পর্যন্তও নূর হিসেবেই ছিলেন। তাই তাঁর গতি ছিলো যেমন অস্বাভাবিক দ্রুত, তেমনি ফেরেশতাদের মতো সৃষ্টিজগতের অন্তরায়সমূহ অতিক্রম করতেও তাঁর কোনো অসুবিধা হয়নি। আর একই কারণে, তিনি আলাদাভাবে কোনো বাহনের কথা মি’রাজের ঘটনা বর্ণনার সময় ফিরে আসার ক্ষেত্রে উল্লেখ করেননি।

৪র্থ প্রশ্নঃ নবীজী (সল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বীয় জুতা মুবারক নিয়ে আরশে ’আযীমে গিয়েছেন মর্মে অনেকে বর্ণনা করে থাকেন। এগুলোর ভিত্তি কী?

আমার উত্তরঃ নবীজী ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) আরশে জুতা মুবারক সহ গিয়েছিলেন কিনা, এ নিয়ে মতভেদ আছে। যারা এর পক্ষে বলেছেন, তাদের দু’জনের বক্তব্য এখানে পেশ করছি। ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী তাঁর “ই’জাযুল কুরআন শরীফ” কিতাবে উল্লেখ করেছেন,
وَمَوْلَانَا مُـحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَـمَّا زُجَّ بِهٖ فِىْ عَالَـمِ الْعِزَّةِ اَرَادَ اَنْ يـَّخْلَعَ نَعْلَيْهِ فَاِذَا النّـِدَاءُ يَا مـُحَمَّدُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا تَخْلَعْ نَعْلَيْكَ. فَقَالَ يَا رَبِّ سَــمِعْتُكَ تَقُوْلُ لِـمُوْسٰى عَلَيْهِ السَّلَامُ فَاخْلَعْ نَعْلَيْكَ .فَقَالَ يَا مُحَمَّدُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَئِنْ اَمَرْتُ حَضْرَتْ مُوْسٰى عَلَيْهِ السَّلَامُ بِنَزْعِ نَعْلَيْهِ عَلٰى جَبَلِ الطُّوْرِ فَقَدْ اَبَحْنَا لَكَ اَنْ تَطَأَ بِنَعْلَيْكَ عَلٰى بَسَاطِ النُّوْرِ لِاَنَّكَ الْمُكَرَّمُ عِنْدَنَا وَالْعَزِيْزُ لَدَيْنَا.
অর্থঃ "আর আমাদের মাওলা মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মহিমান্বিত আরশে আযীমের নিকটবর্তী হলেন, তখন তিনি তাঁর জুতা মুবারকদ্বয় খুলে ফেলার ইচ্ছা পোষণ করলেন। এরপর ডাক আসল, "হে মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আপনার জুতা মুবারক খুলবেন না।" এরপর তিনি বললেন, "হে আমার রব, আমি শুনেছি আপনি মুসা 'আলাইহিস সাল্লামকে বলেছিলেন, আপনি আপনার জুতাদ্বয় খুলে ফেলুন।" এরপর আল্লাহ বললেন, "হে মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম, নিঃসন্দেহে আমি মুসা 'আলাইহিস সাল্লামকে আদেশ করেছিলাম তূর পাহাড়ে তাঁর জুতাদ্বয় খুলে ফেলার জন্য, কিন্তু অবশ্যই আমি আপনার জন্য পছন্দ করি যে, আপনি এই প্রশস্ত নূরের মাকামে জুতা মুবারকসহ প্রবেশ করুন। কেননা, আপনি আমার নিকট অধিক সম্মানিত এবং আপনার মর্যাদা সুমহান।" (ই'জাযুল কুরআন শরীফ, ৩য় খন্ড, ৬৩ পৃষ্ঠা)

দেওবন্দী আলেম আব্দুল হাই আল-লখনৌভী তার "আল-আছার আল-মারফূ'আ ফী আল-আখবার আল-মাওদ্বু'আ" কিতাবে লিখেছেন,
فنودى من العلى الاعلى يا رسول الله صلى الله عليه وسلم لا تخلع نعليك فان العرش يتشرف بقدومك متنعلا-
অর্থঃ অতঃপর মহান মহীয়ানের পক্ষ থেকে আহ্বান করা হল, "হে আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আপনার জুতা মুবারাক খুলবেন না। কেননা, আরশ আপনার জুতা পরিহিত পা মুবারক দ্বারা সম্মানিত হবে।"

এছাড়া, ফতোয়াতে শামীতে রয়েছে, "সব ইমামগণের ইজমা হয়েছে যে, হুযুরে পাক সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের শরীর মুবারককে যে মাটি মুবারক স্পর্শ করেছে তার মর্যাদা এবং তাঁর না’লাইন (জুতা) শরীফে স্পর্শ করা ধুলাবালি মুবারকের মর্যাদা আরশে আযীমের মর্যাদার চেয়ে লক্ষ কোটি গুণে বেশি মর্যাদাবান।"

অপরদিকে, আলা হযরতকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে, মেরাজের রাতে আল্লাহর আরশের উপরে নবীজীর ('আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম) জুতা মুবারকসহ যাওয়ার কথাটি সঠিক কিনা? তিনি উত্তর দেন: "এটা মূলে মিথ্যা ও জাল কথা।" (মালফূযাত-ই আলা হযরত) অবশ্য তিনি উত্তরটি এর বেশি দীর্ঘ করেননি। মোল্লা আলী ক্বারীও তাঁর “শরহে শিফা” কিতাবেও এ সংক্রান্ত বর্ণনা জাল হাদীছ বলে সাব্যস্ত করেছেন।

তবে আমার মনে হয়, মি’রাজের রাতের এই ঘটনাটির সনদ না থাকলেও, ফতোয়ায়ে শামীতে উল্লিখিত না'লাইন শরীফের গুরুত্ব বিবেচনা করে অনেকে এই ঘটনাটি গ্রহণ বা সমর্থন করেছেন, যদিও এর গ্রহণযোগ্য কোনো সনদ সম্পর্কে জানা যায়নি।

যেহেতু বিষয়টি নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে, এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় চিন্তা ও পর্যালোচনার অবকাশ রাখে।

প্রথমত, নবীজী ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) কি জুতা ছাড়াই মিরাজ শরীফে গিয়েছিলেন, এমন কোনো দলীল আছে? আর জুতাসহ গিয়ে থাকলে, আরশে যাওয়ার আগে কিংবা অন্য কোথাও জুতা খুলেছিলেন মর্মে কোনো দলীল আছে কী?

দ্বিতীয়ত, নবীজীর ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) জুতা মুবারক তাঁর পোশাক মুবারকের মতোই সম্মানিত। অধিকন্তু, আমাদের জুতা ও এতে লেগে থাকা ধূলার সাথে নবীজীর ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) জুতা মুবারক ও এতে লেগে থাকার ধূলার যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কাজেই, আল্লাহ পাক নবীজীকে ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) জুতাসহ আরশে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করে থাকলে, তা আশ্চর্য্যের বিষয় নয়।

তৃতীয়ত, ফতোয়ায়ে শামীর ঐ ফতোয়ার ভিত্তি কী, তা কি এই সনদবিহীন হাদীছ না অন্য কোনো বর্ণনা? তা জানা গেলে হয়তো এ ব্যাপারে আরও পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে।

চতুর্থত, ইমাম সুয়ূতী ঐ কথা কি ইলহামের ভিত্তিতে, নাকি অন্য কোনো ভিত্তিতে বলছেন, তা জানা যায়নি। যেহেতু সনদ ছাড়াই তিনি এর উপর নির্ভর করেছেন এবং এর সনদ কিংবা মতনের সমালোচনা করেননি, বর্ণনাটি তার কাছে গ্রহণযোগ্য।

পঞ্চমত, আমরা না'লাইন শরীফ ও এর নকশাকে অত্যন্ত সম্মান ও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করি। কিন্তু কেন? এটা কি কেবল, নবীজীর ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) জুতা মুবারক বলেই, নাকি তা আরশের চাইতেও আল্লাহর নিকট বেশি সম্মানিত বলে (যেমনটি ফতোয়ায়ে শামীতে আছে)?

ষষ্ঠত, মহান আল্লাহ যেহেতু সর্বত্র বিরাজমান, তিনি তো দুনিয়াতেও লা-মাকানের মতোই বিরাজমান। এখানেও আমরা জুতা সহকারেই চলাচল ও অবস্থান করছি এবং এতে মহান আল্লাহর শান কিংবা মর্যাদার কোনোরূপ বিচ্যুতি ঘটছে না। তদুপরি, নবীজীর জুতা মুবারক আল্লাহর কাছে আরশ অপেক্ষা অধিক সম্মানিত হলে, তা নিয়ে আরশে পৌছাতে কিংবা আরশ অতিক্রম করলে, মহান আল্লাহর শানের কোনোরূপ বিচ্যুতি ঘটবে কি?

তবে হ্যাঁ, এখানে এই দাবি উত্থাপিত হতে পারে যে, (আমি যেহেতু আগেই উল্লেখ করেছি) আরশ তো সৃষ্টির শেষ সীমা। এই যুক্তিতে রফরফ আরশের গন্ডি অতিক্রম করতে না পারলে, নবীজীর জুতা মুবারক পারবে কেনো?

আর তাই এসকল পরস্পর বিপরীতমুখী প্রশ্ন ও সন্দেহের সমাধানকল্পে আমি মনে করি, লাইলাতুল মি’রাজে নবীজী ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) নিজ হাকীকী সুরতে অথবা সম্পূর্ণ নূরে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন (যা আগেও উল্লেখ করেছি), যে অবস্থায় তাঁর বাহ্যিক জুতা কিংবা পোশাক-আশাকের প্রয়োজন পড়েনি কিংবা সেসব নূরে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো। আবার দুনিয়ায় ফিরে এসে যখন তিনি মানবীয় সুরত ধারণ করেছেন, তখন জুতা-পোশাক ইত্যাদি অলৌকিকভাবেই কিংবা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাঁর মানবীয় সুরতে বাহ্যিকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ফেরেশতা-সর্দার জীবরাঈল ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) যখন দেহইয়াহ ক্বালবী নামক লোকের সুরতে ধরতেন, তখন একই ঘটনা ঘটতো।

আরও সহজ কথায়, আরশে মোয়াল্লা কিংবা এরও পরে নবীজী ('আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) জুতা নিয়ে গেলেও, তা নূরানী সুরতের কারণে লোপ পেয়েছিলো কিংবা অনস্তিত্বে চলে গিয়েছিলো। আবার তিনি ফিরে এসে মানবীয় সুরত ধরলে, তাঁর জুতা-পোশাক অস্তিত্বে চলে আসে। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাঁর জুতা মুবারক আমাদের কাছে তাঁর ব্যবহৃত বস্তুগুলোর মতোই অতি সম্মান বা তাজীমের বস্তু, কেননা তাতে লেগে থাকা ধূলা-বালি আল্লাহর কাছেও আরশ অপেক্ষা অধিক সম্মানিত।

মহান আল্লাহু ও তাঁর রসূলই এর অধিক ভালো জানেন। ধন্যবাদ।
#লেখাঃ মুহাম্মাদ যাহিদ হাসান আল-মাতুরীদী

Want your school to be the top-listed School/college in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Website

Address


Shahid Syed Nazrul Islam Sharani Dhaka
Dhaka
1000