26/09/2020
মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করা প্রত্যেক মানুষের জন্মগত অধিকার। শিক্ষার মাধ্যম যে মাতৃভাষাই হওয়া উচিত এ ব্যাপারে আজ আর দ্বিমত নেই। কারণ মনের ভাব মাতৃভাষার মাধ্যমে যে রূপ স্বাচ্ছন্দ্য ও অবলীলায় প্রকাশ করা সম্ভব অন্য ভাষায় তা সম্ভব নয়। প্রত্যেক মানুষের কাছে তার মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান রয়েছে। সুতরাং অপর সব ভাষা অপেক্ষা মাতৃভাষা সকলের নিকট সুমধুর। শৈশবে মাতৃক্রোড়ে থেকে যে ভাষায় সর্বপ্রথম শিশু কথা বলতে শিখে, সে ভাষার বর্ণের সাথে সবার আগে পরিচিত হওয়া উচিত। অতঃপর সে ভাষার মাধ্যমেই উচ্চতর শিক্ষায় অগ্রসর হতে হবে। মাতৃভাষা সম্পূর্ণ আয়ত্ত না করতে পারলে তার সম্যক জ্ঞানার্জন সম্ভব হবেনা। মায়ের ভাষায় কথা বলে কিংবা মনের ভাব প্রকাশ করে যে আনন্দ পাওয়া যায় অন্য কোন ভাষায় সেই আনন্দ পাওয়া যায় না। আমরা বাঙালি জাতি। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। বাংলাভাষার মাধ্যমেই আমরা প্রথমে ‘মা’ নামক ছোট্ট শব্দটি শিখেছি। এ ভাষাতেই আমরা কথা বলি ও লিখন লিখি। এ ভাষাতেই অতি আপনজনের কাছে পত্র লিখে মনের ভাব প্রকাশ করি। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে আমরা যে কল্পনার ছবি আঁকি তা এই বাংলা ভাষাতেই। তাই এই ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের মজাই আলাদা।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ইউরোপীয় বিদ্যা ইংরেজি ভাষার জাহাজে করে এদেশের শহরে বন্দরে আসতে পারে, কিন্তু পল্লীর আনাচে-কানাচে তাকে পৌঁছে দিতে হলে দেশি ভাষার ডিঙ্গি নৌকার প্রয়োজন। এ জন্যই বলা হয়Ñমাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষালাভ ও চিন্তার উৎকর্ষতা আদান-প্রদানে কতগুলো সাধারণ সুবিধা রয়েছে। স্বাধীন দেশে মাতৃভাষা চালু থাকবে এবং শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষা গুরুত্ব পাবে এটাই স্বাভাবিক। বলার চেয়ে লেখ্য ভাষার গুরুত্ব বেশি। তাই যদি মাতৃভাষায় সব কিছু লেখা যায় তাহলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যার্জনে আর কোন বাধা থাকবেনা। তাহলে বিদ্যা অর্জন করা দুর্বোধ্য বলে কেউ বই পুস্তক তালাচাবি দিয়ে পালিয়ে বেড়াবেনা। আমাদের দেশে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল কেন? মাতৃভাষার জন্য কেন তাজা প্রাণ ঝরে পড়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর একটাই মাতৃভাষাকে অস্বীকার করা বা অবমাননা করা মানে নিজেকে অবমাননা করা, নিজের মাকে অবমাননা করা। এসব দাবি প্রতিষ্ঠার জন্যই ভাষার জন্যে আন্দোলন করতে হয়েছিল। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা যখন জাপানে-জার্মানিতে উচ্চ শিক্ষার জন্য যায় তখন সেখানে তাদের প্রথমে সেসব দেশের ভাষা শিখতে হয়। তাহলে সে দেশের ভাষায় কি তারা সমৃদ্ধ নয়? তারা কি বিজ্ঞানে পিছিয়ে রয়েছে মোটেওনা। তাই মাতৃভাষার গুরুত্ব অবশ্যই দেওয়া উচিত।
মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হলে তা সহজেই মানুষের হৃদয় জুড়ে থাকতে পারে। শিক্ষার্থীরা ও শিক্ষণীয় বিষয়ে আনন্দ খুঁজে পায়। মাতৃভাষার মাধ্যমে গাঁথুনিটা খুব মজবুত করে দিতে পারলে যে কোন ভাষায় শিক্ষার্থীরা অতি সহজে পারদর্শিতা অর্জন করতে পারে। দেশ জোড়া শিক্ষাহীনতার গাঢ় অন্ধকার বিদূরিত করার একমাত্র উপায় শিক্ষাকে সহজ লভ্য করা। সাধারণের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হলে শিক্ষার মাধ্যম অবশ্যই মাতৃভাষা হতে হবে। দেশের মনীষীবৃন্দ তাদের চিন্তার ফসল যদি মাতৃভাষার মাধ্যমে গ্রন্থাগারে সঞ্চয় করেন তবে তা সহজেও স্বাভাবিকভাবে দেশের বিদ্যার্থীদের অন্তর স্পর্শ করতে পারে।
মাতৃভাষা হচ্ছে সহজাত ভাষা। এ ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করে যে আনন্দ তা অন্য ভাষায় নেই। তাছাড়া বিদেশী ভাষা শেখা ও আয়ত্ব করা কষ্টসাধ্যও বটে। তাইতো মাতৃভাষায় জ্ঞানানুশীলন ব্যতীত বিশ্বে কোন জাতিই উন্নতি লাভ করতে পারেনি। ইউরোপে যতদিন ল্যাটিন ভাষা প্রচলিত ছিল, ততদিন সেখানে জাতীয় সংস্কৃতির ¯্রােতছিল প্রায় রুদ্ধ। ইউরোপের অধিবাসীরা যখন ল্যাটিন ভাষা ছেড়ে মাতৃভাষা গ্রহণ করে তখন থেকেই সেখানে সর্বাঙ্গীন জাতীয় উন্নতি দেখা দেয়।
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ছাড়াও অনেক নাম না জানা ছাত্ররা ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বর্তমানে মাতৃভাষার মাধ্যমে যে শিক্ষাদান পদ্ধতি আমাদের দেশে চালু হয়েছে এর পেছনে রয়েছে ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা লাভ করে। এরপর থেকে সর্বস্তরে শিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলাভাষা ক্রমেই বিস্তার লাভ করে চলছে।
মাতৃভাষা মানবজীবনের অমৃত রসায়ম। আজ পৃথিবীর সকল সভ্য দেশে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা-দীক্ষা, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। শিল্প, বাণিজ্য, জ্ঞান, বিজ্ঞানের উন্নতির মূলেও রয়েছে মাতৃভাষা। মাতৃভাষার মাধ্যমে বহুদেশের বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে এবং সে সব দেশ সর্বক্ষেত্রে উন্নতি প্রদর্শন করে শ্রদ্ধা অর্জন করেছে। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ সম্পর্কে আজ পৃথিবীর মনীষীবৃন্দ একমত। যাদের মনে দেশাত্মবোধ রয়েছে তারা সকলেই মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। অন্যথায় আমাদের জাতীয় জীবনে বিপর্যয় নেমে আসবে।