05/08/2026
একসময় আমার মনে হতো, শাইখুল ইসলাম আল্লামা মুহাম্মদ যাহিদ আল-কাওসারী রহ.-এর ّ اللامذهبية قنطرة اللادينية" অথ্যাৎ, লা-মাযহাবিয়্যাহ (মাযহাববিমুখতা) হলো লা-দীনিয়্যাহ (ধর্মবিমুখতার) সেতু" এই প্রবন্ধের শিরোনামে হয়তো কিছুটা অতিশয়োক্তি রয়েছে। কিন্তু আজ, যখন আমরা সেই ধারার বাস্তব রূপ প্রত্যক্ষ করছি, যারা নিজেদেরকে কেবল ‘নসের অনুসারী’ বলে পরিচয় দেয় এবং ‘মানুষের তাকলীদ করি না’—এই দাবিতে মুখর থাকে, তখন স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তাঁর সেই মূল্যায়ন কতটা সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবসম্মত ছিল।
আজ আমরা দেখছি, তারা ফিকহ, আকিদা, হাদিস এবং শরিয়তের মূলনীতি ও সঠিক অনুধাবনের ভিত্তিগুলো নিয়ে কী ভয়াবহ ছেলেখেলা করছে। তারা দ্বীনের ইমামদের বিদআতির তকমা দিচ্ছে, ইজতিহাদ ও ইস্তিনবাতে চরম অগভীরতার পরিচয় দিচ্ছে, সহিহ হাদিস পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করছে, এমনকি সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের মতো উম্মাহর সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থগুলোর প্রতিও দুঃসাহসিক সমালোচনায় লিপ্ত হচ্ছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে তারা আহলুল বাইতের প্রতি যে প্রকাশ্য বিদ্বেষ ও শত্রুতা প্রদর্শন করেছে, সেই সঙ্গে যে অসংলগ্নতা, অদ্ভুত দাবিদাওয়া ও আত্মবিরোধিতার আশ্রয় নিয়েছে—এসবই নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, মাযহাববিমুখতার পথে প্রবেশ আসলে সব ধরনের অনিষ্টেরই একটি প্রবেশদ্বার এবং দ্বীন থেকে বিচ্যুতির এক বিপজ্জনক সেতু।
তারা মনে করেছিল, সুপ্রতিষ্ঠিত ও অনুসৃত ফিকহি মাযহাবগুলোর সীমানা অতিক্রম করে যাওয়া এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত ইমামগণ যে সুদৃঢ় উসুলি নীতিমালা নির্মাণ করেছেন, সেগুলোকে অগ্রাহ্য করাই নাকি প্রকৃত তাহকিক এবং বিশুদ্ধ উৎসে প্রত্যাবর্তন। কিন্তু বাস্তবে তারা এমন এক সীমাহীন জ্ঞানগত বিশৃঙ্খলার মধ্যে পতিত হয়েছে, যার কোনো কূলকিনারা নেই। তারা উম্মাহর সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত মহান ইমামদের অনুসরণ পরিত্যাগ করে নিজেদের সীমাবদ্ধ বোধ-বুদ্ধি, পরিবর্তনশীল প্রবৃত্তি এবং অপরিণত আক্ষরিকতাবাদের অনুসারী হয়ে পড়েছে।
আজ যে কেউ এই চিন্তাধারার পরিণতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বিস্মিত না হয়ে পারবে না। ‘স্বাধীনভাবে কুরআন-সুন্নাহ বোঝার’ দাবিই শেষ পর্যন্ত তাদের এমন অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে যে, তারা শরিয়তের পবিত্র সীমারেখা লঙ্ঘন করতে দ্বিধা করছে না। তারা উম্মাহর সনদ ও হাদিসের মূল পাঠসমূহ নিয়ে অবিবেচক মন্তব্য করছে, আলেমদের মর্যাদাকে খাটো করছে; এমনকি বাড়াবাড়ির এক পর্যায়ে গিয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর পবিত্র আহলুল বাইতের বিরুদ্ধেও প্রকাশ্যে কটূক্তি করছে। এটি এমন এক নজির, যা এই পদ্ধতির অন্তর্নিহিত গভীর ত্রুটি এবং তার ভয়াবহ পরিণতির দিকেই স্পষ্ট ইঙ্গিত করে।
ফিকহের প্রাচীন ও বিশুদ্ধ শিক্ষাধারার সঙ্গে জ্ঞানগত ও আত্মিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়া মানে শরিয়তের সুরক্ষাব্যূহ ভেঙে ফেলা। এর ফলে শরিয়তের নসসমূহ হয়ে পড়ে যে-কারও ইচ্ছামতো ব্যাখ্যার শিকার, আর দ্বীনের অঙ্গন পরিণত হয় অযোগ্য ও দুঃসাহসীদের বিচরণভূমিতে। যে ব্যক্তি সালাফে সালেহিনের অক্লান্ত সাধনা এবং তাঁদের প্রতিষ্ঠিত মাযহাবসমূহকে তুচ্ছজ্ঞান করে, তার জন্য পরে নিজের প্রবৃত্তির বিরোধী হলে শরিয়তের নসকেও তুচ্ছজ্ঞান করা কঠিন থাকে না।
আল্লাহ আমাদের সেই মহান ইমামগণের প্রতি অসীম রহমত বর্ষণ করুন, যাঁরা দ্বীনকে শুধু তার কাঠামোতেই নয়, বরং তার প্রকৃত তাৎপর্য ও মর্মার্থসহ সংরক্ষণ করেছেন এবং এমন সব সুদৃঢ় নীতিমালা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, যা মানববুদ্ধিকে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করে। আজ সত্যের সন্ধানীর জন্য মুক্তির একমাত্র পথ হলো—এই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সুপ্রতিষ্ঠিত ইলমি ধারার সঙ্গে অবিচলভাবে সম্পৃক্ত থাকা। কেননা, এ পথই মানুষকে ভ্রান্ত চিন্তার উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে রক্ষা করে এবং বিভ্রান্তিকর কল্পনা ও ভ্রান্ত ধারণার বিপজ্জনক খাদ থেকে নিরাপদ রাখে।
আর তারা যা বলে, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট সহায়।
--ড. সাইফ আলী আল-আসরী হাফি.