11/08/2026
ঘুমানোর পূর্বে যে সকল আমল কখনো ছাড়বেন না।
রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী রাতের আমল ও তার ফজিলত।
দিনের শেষে একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি হলো ঘুমানোর পূর্ব মুহূর্ত। ইসলাম ঘুমকে শুধু বিশ্রাম হিসেবে নয়, বরং একটি ইবাদতপূর্ণ আমলে পরিণত করার শিক্ষা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুমানোর আগে এমন কিছু আমল করতেন এবং সাহাবিদেরও তা শিক্ষা দিতেন, যা একজন মুসলিমকে আল্লাহর হেফাজত, রহমত ও বরকতের মধ্যে রাখে। তাই আমাদের উচিত এই সুন্নাহগুলোকে জীবনের স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত করা।
১. ঘুমানোর আগে ওজু করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
"তুমি যখন ঘুমাতে যাবে, তখন নামাজের ওজুর মতো ওজু করে নাও।"
—সহিহ আল-বুখারি: ২৪৭, সহিহ মুসলিম: ২৭১০
ওজু অবস্থায় ঘুমালে ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করেন। অনেক আলেম বলেছেন, ওজু অবস্থায় মৃত্যু হলে সে শহীদের সওয়াবের আশা করতে পারে।
২. ডান কাতে শোয়া
রাসূল ﷺ ডান কাতে শুয়ে ঘুমাতেন।
হাদিসে এসেছে—
"অতঃপর ডান পার্শ্বে শুয়ে পড়বে।"
—সহিহ আল-বুখারি: ২৪৭
এটি সুন্নাহ হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও উপকারী বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
৩. ঘুমানোর দোয়া পড়া
রাসূল ﷺ ঘুমানোর সময় পড়তেন—
بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتُ وَأَحْيَا
উচ্চারণ: বিসমিকা আল্লাহুম্মা আমুতু ওয়া আহইয়া।
অর্থ: "হে আল্লাহ! আপনার নামেই আমি মৃত্যুবরণ করি এবং জীবিত হই।"
—সহিহ আল-বুখারি: ৬৩২৪
এই দোয়া মানুষকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা শেখায়।
৪. আয়াতুল কুরসি পাঠ করা
ঘুমানোর আগে সূরা আল-বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত (আয়াতুল কুরসি) পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
যে ব্যক্তি রাতে আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমাবে, আল্লাহ তার জন্য একজন রক্ষক নিযুক্ত করবেন এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে আসতে পারবে না।
—সহিহ আল-বুখারি: ২৩১১
এটি ঘুমানোর পূর্বের সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ আমলগুলোর একটি।
৫. সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস তিনবার পড়া
রাসূল ﷺ প্রতি রাতে এই তিনটি সূরা তিনবার পড়তেন, এরপর দুই হাতে ফুঁ দিয়ে মাথা ও শরীর মুছে নিতেন।
—সহিহ আল-বুখারি: ৫০১৭
এই আমল জাদু, বদনজর, শয়তানের কুমন্ত্রণা ও বিভিন্ন অকল্যাণ থেকে আল্লাহর হেফাজতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
৬. শেষ দুই আয়াত (সূরা আল-বাকারা)
রাসূল ﷺ বলেছেন—
"যে ব্যক্তি রাতে সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করবে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।"
—সহিহ আল-বুখারি: ৫০০৯, সহিহ মুসলিম: ৮০৮
আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, "যথেষ্ট" বলতে রাতের নিরাপত্তা, ইবাদতের সওয়াব এবং অকল্যাণ থেকে সুরক্ষা বোঝানো হয়েছে।
৭. ৩৩, ৩৩ ও ৩৪ বার তাসবিহ
হজরত আলী (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল ﷺ ফাতিমা
(রা.)-কে বলেছিলেন—
▪️৩৩ বার সুবহানাল্লাহ
▪️৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ
▪️৩৪ বার আল্লাহু আকবার
এগুলো ঘুমানোর আগে পড়তে।
তিনি বলেন—
"এটি তোমাদের জন্য খাদেমের চেয়েও উত্তম।"
—সহিহ আল-বুখারি: ৫৩৬২, সহিহ মুসলিম: ২৭২৭
৮. সূরা আল-মুলক পাঠ করা
রাসূল ﷺ বলেছেন—
কুরআনে ৩০ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা আছে, যা একজন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করবে, যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করা হয়। সেটি হলো ‘তাবারাকাল্লাযি বিইয়াদিহিল মুলক’।
—সুনান আবু দাউদ: ১৪০০, জামে তিরমিজি: ২৮৯১ (হাসান)
এ কারণে অনেক সালাফ ঘুমানোর আগে সূরা আল-মুলক পড়ার অভ্যাস করতেন।
৯. নিজের আমলের হিসাব নেওয়া
হজরত উমর (রা.) বলেছেন—
"তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগে নিজেরাই নিজেদের হিসাব নাও।"
এই বক্তব্য সাহাবিদের আত্মসমালোচনার শিক্ষা দেয়। ঘুমানোর আগে সারাদিনের ভুলের জন্য তাওবা করা
এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১০. ইস্তিগফার করে ঘুমানো
আল্লাহ তাআলা বলেন—
"তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।"
—সূরা নূহ: ১০
রাসূল ﷺ প্রতিদিন বহুবার ইস্তিগফার করতেন। (সহিহ মুসলিম: ২৭০২)
ঘুমানোর আগে অন্তর থেকে "আস্তাগফিরুল্লাহ" পড়া হৃদয়কে প্রশান্ত করে এবং আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশা জাগায়।
১১. তাওবা করে ঘুমানো
কেউ জানে না, সে আরেকটি সকাল পাবে কি না। তাই ঘুমানোর আগে সব গুনাহের জন্য আন্তরিকভাবে তাওবা করা একজন মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল।
আল্লাহ বলেন—
"হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পার।"
—সূরা আন-নূর: ৩১
১২. কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা চাওয়া ও সবাইকে ক্ষমা করা
রাসূল ﷺ মানুষের অন্তর পরিষ্কার রাখার শিক্ষা দিয়েছেন। বিদ্বেষ, হিংসা ও প্রতিশোধের মনোভাব নিয়ে ঘুমানো উচিত নয়। নিজের জন্য এবং অন্যদের জন্য দোয়া করা একজন মুমিনের সুন্দর চরিত্রের পরিচয়।
🌿 ঘুমানোর আগে একটি সুন্দর রুটিন
প্রতিদিন রাতে চেষ্টা করুন—
▪️ওজু করুন।
▪️বিছানা ঝেড়ে নিন (এটিও সুন্নাহ; সহিহ ▪️আল-বুখারি: ৬৩২০, সহিহ মুসলিম: ২৭১৪)।
▪️ডান কাতে শুয়ে পড়ুন।
▪️ঘুমানোর দোয়া পড়ুন।
▪️আয়াতুল কুরসি পড়ুন।
▪️সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস তিনবার পড়ে শরীরে ফুঁ দিন।
▪️সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ুন।
▪️৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়ুন।
▪️সম্ভব হলে সূরা আল-মুলক তিলাওয়াত করুন।
▪️ইস্তিগফার ও তাওবা করে আল্লাহর কাছে নিজের, পরিবার ও সমগ্র উম্মাহর জন্য দোয়া করুন।
উপসংহার
ঘুম একটি দৈনন্দিন অভ্যাস, কিন্তু একজন মুমিনের জন্য এটি ইবাদতেরও একটি সুযোগ। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো এই আমলগুলো খুব সহজ হলেও এর প্রতিদান অত্যন্ত মহান। এগুলোর মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর হেফাজত লাভ করে, শয়তানের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে, অন্তরে প্রশান্তি অনুভব করে এবং প্রতিটি রাতকে ইবাদতে পরিণত করতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—সমাজে ঘুমানোর আগে নির্দিষ্ট সংখ্যা বা নির্দিষ্ট সূরা পড়লে নিশ্চিতভাবে ধন-সম্পদ বৃদ্ধি, সব সমস্যা দূর হওয়া বা অবশ্যম্ভাবীভাবে সব দোয়া কবুল হওয়ার মতো যেসব দাবি প্রচলিত আছে, সেগুলোর অনেকগুলোরই সহিহ হাদিসে প্রমাণ নেই। তাই আমাদের উচিত কেবল কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত আমলগুলো নিয়মিত করা এবং আল্লাহর কাছে আন্তরিকতার সঙ্গে কল্যাণ প্রার্থনা করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমীন।