Nazrul's Educatum - পড়াশোনা
বিশেষ কিছুই নয়। জানা বিষয়গুলো আবার জেনে নেয়া।
07/03/2025
গরু আমাদের দুধ দেয় না, আমরা কেড়ে নিই! গাধাও মোট বয় না, ধোপারা এককালে জোর করে কাজটি করাতো! হিসেব মত সিংহীও দুধ দেয়, সিংহও ওজন বইতে সক্ষম! কিন্তু সিংহকে দিয়ে ওসব করানো মানুষের ক্ষমতার বাইরে !!!
এই জন্য একটু বোকা আর ভালো মানুষদের গরু কিংবা গাধার সাথে তুলনা করা হয়! এই দু'টো প্রাণীর নামে কোনো মানুষকে ডাকা মানে তাকে অপমান করা! কিন্তু কাউকে সিংহ বললে সে উল্টো গর্ববোধ করবে!
সেই সিংহ- যে আজ অবধি মানুষের উপকার করল না, যার সামনে মানুষ গেলে মুহূর্তের মধ্যে পরপারে চলে যাবে, সেই সিংহ হচ্ছে মানুষের চোখে রাজা!
উপকারী গাধা হচ্ছে হাসির বস্তু !!!
অতিরিক্ত ভালো হওয়ার সমস্যা এটাই! অতিরিক্ত ভালো মানুষরা কারো কাছে গুরুত্ব পায় না !!!
তুমি নিঃস্বার্থভাবে ত্যাগ করতে থাকো, ভালো মনে কারো ক্রমাগত উপকার করতে থাকো, আঘাতের পর আঘাত সহ্য করেও হাসিমুখে কাউকে ভালোবাসতে থাকো, তুমি তার চোখে 'গাধা' ছাড়া আর কিছুই হবে না !!!
যদি মনে করো সে একদিন এগুলোর মূল্য বুঝবে, তাহলে তুমি সত্যিই গাধা!
কারো কাছে নিজের দাম পেতে গেলে একবার অন্তত সিংহের মত হতেই হয় !!!
সফলতার গল্প।
একাকীত্ব আবিষ্কার হয় ১৯২০ সালে। তার ঠিক কিছুদিন আগে আবিষ্কার হয় হাবল টেলিস্কোপ। রাতের ঝকঝকে আকাশে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল টেলিস্কোপে চোখ রাখেন। সেই প্রথম কোন মানবের চোখ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি অতিক্রম করে অকল্পনীয় দূরে পৌঁছে যায়। বোঝা যায় এই অসীমে বিস্তৃত মহাবিশ্বের ভেতর কি ভয়াবহ একা আমরা।
কিছু মানুষ এই আকাশ দেখাটেখা পছন্দ করতো না। তারা ভাবতো খুঁজতে খুঁজতে আকাশে স্বর্গের সন্ধান মিলে যাবে। রীতিমত স্বর্গের প্রায়ভেসি লঙ্ঘন! যা হোক, এই মহাবৈশ্বিক একাকীত্ব ঘোচাতে মানুষ মরিয়া হয়ে একে অন্যের কাছে আসতে চাইলো। ডাক উন্নত হলো। টেলিগ্রাম আসলো। রেল আসলো। তারপর বিমান, মোবাইল, ইন্টারনেট কতো কি! তবু মানুষের একাকীত্ব যেন আর ঘোচে না।
তুমি আমার সাথে কথা বলছো, যথেষ্ট নয়
আমি বহু দূর থেকে তোমাকে দেখতে পাচ্ছি যথেষ্ট নয়
আমি হাওয়ার বেগে তোমার কাছে এলাম, তবু যথেষ্ট নয়
আমি তোমাকে ছুঁয়ে দেখছি তবু হচ্ছে না
এমনকি তোমাকে জড়িয়ে ধরার পরও কি যেন নেই।
দুটো ক্ষুদ্রতম কণা যেহেতু একে অপরকে স্পর্শ করতে পারে না। আমরাও কেউ কাউকে স্পর্শ করতে পারছি না। একটা অতি আণবিক ব্যবধান রয়েই যাচ্ছে আমাদের মাঝে। তারপরো মানুষের সে কি চেষ্টা, প্রেমে, কামে, বন্ধুত্বে, আত্মীয়তায়। কোনকিছু চিরস্থায়ী নয় জেনেও…
Painting: The Lovers II, 1928 by Rene Magritte.
- দ্বিগ্বিজয় আজাদ
@ কমলাকান্তের দপ্তর।
01/12/2024
"ইয়ে মানে আপনি নোবেল পাচ্ছেন বটে, কিন্তু প্রাইজটা নিতে আসবেন না প্লিজ। এমন চরিত্রহীনা নারী পুরস্কার নিতে এলে খুব বদনাম হবে আমাদের! আমরা.... আমরা আপনাকে বাড়িতে পৌঁছে দেব প্রাইজ।"
১৯১১ সাল। সারা দুনিয়াকে চমকে দিয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য নোবেল প্রাইজ ঘোষণা হল বিজ্ঞানী মাদাম মেরি কুরির নামে। তার আগে দ্বিতীয়বার নোবেল কেউ পাননি। তাও আবার দুটো আলাদা বিভাগে!
অথচ কী আশ্চর্য, নাম ঘোষণা করেই স্টকহোমের নোবেল কমিটি তড়িঘড়ি মেরি কুরিকে চিঠি লিখল,“দয়া করে আপনি কিন্তু পুরস্কার নিতে আসবেন না। আমরা আমাদের বদনাম চাইছি না। প্লিজ মাদাম! আমরা আপনাকে পুরস্কারটি পাঠিয়ে দেব যথাসময়ে।"
মেরি কুরি বিস্মিত। আহতও। আটবছর আগে স্বামী পিয়েরের সঙ্গে যৌথভাবে যখন প্রথম নোবেল প্রাইজটি পেয়েছিলেন, অসুস্থতায় দুজনের কেউই যেতে পারেননি, এবার কেন যাবেন না? তিনি তো কোন অন্যায় করেননি! দৃঢ়ভাবে তিনি জানিয়ে দিলেন,“আমি পুরস্কার নিতে যাব। যাবই। ধন্যবাদ।”
নোবেল কমিটি পড়ল মহা ফ্যাসাদে। মেরি কুরির নাম যখন ইন্টারনাল কমিটিতে চূড়ান্ত হয়েছে, তখনো অবধি যে তাঁদের হাতে এসে পড়েনি হাতে গরম ফরাসী সংবাদপত্রগুলো! কিন্তু সেগুলোয় যে এখন ছেয়ে যাচ্ছে কেচ্ছা। বিশ্বের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী মাদাম মেরি কুরি নাকি পরকীয়ায় লিপ্ত! তাও আবার মৃত স্বামীর ছাত্র পলের সঙ্গে।
নানারকম কাল্পনিক প্রতিবেদনে তখন ফরাসী মিডিয়া লাগাতার আক্রমণ করে চলেছে দেশের সবচেয়ে প্রতিভাবান নারীটিকে। দেশের নাগরিকরা জঘন্যতম বিশেষণে ছিছিক্কার করছে। সবার মনেরই চাপা অসন্তোষ ফেটে বেরোচ্ছে এখন উল্লাসে। আহা, গত কয়েকদশক ধরে যতই দেশের নাম উজ্জ্বল করুক, মেয়ে হয়ে এত বাড়বাড়ন্ত কি ভাল বাপু? মেয়ে হয়েছ, আর্ট পড়ো, তা নয় সায়েন্সে গেছে। দেশের পুরুষগুলো বসে আছে, আর যত রাজ্যের পুরস্কার থেকে বড় বড় বিজ্ঞান সংস্থার মাথায় কিনা একটা মেয়েমানুষ …!
বিখ্যাত প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে তাবড় তাবড় অধ্যাপকরা পড়ানোর সুযোগ পান না। সেখানে কিনা প্রথম মহিলা অধ্যাপক হিসেবে জয়েন করেছেন। না, এতটা মেনে নেওয়া যায় না। সুযোগ যখন একটা পাওয়া গেছে, সেটা কেউ ছাড়ে? তার ওপর মেরি ফ্রান্সের ভূমিকন্যা নন, পোল্যান্ডে জন্ম তাঁর। অন্য দেশ থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসায় জনসাধারণের আক্রোশ হয়ত আরো বেশি।
নিজের জগতে এমনিই বহু পুরুষ বিজ্ঞানী সহ্য করতে পারতেন না মেরিকে, তাঁরাও পরোক্ষ সমর্থনে তাতাতে লাগলেন জনতাকে। কেউ পল মেরির পরকিয়া নিয়ে আজগুবি সাক্ষাতকার দিয়ে লাইমলাইটে আসতে চাইছিলেন, কেউ অন্য কোনভাবে। বিংশ শতকের গোড়ার রক্ষণশীল ইউরোপীয় সমাজ ফুঁসছিল। এই মেয়েই কিনা আগে গর্বোদ্ধত সুরে বলেছিল, "মানুষ হওয়ার যাবতীয় অধিকার আমাদের সমাজে পুরুষরাই মনোপলি নিয়ে রেখেছে।"
উদ্ধত মেয়েটাকে এবার বাগে পাওয়া গেছে।
মেরির স্বামী পিয়ের শুধু তাঁর জীবনসঙ্গী ছিলেন না, ছিলেন গবেষণার সহকর্মী থেকে সবচেয়ে কাছের বন্ধু। সেই পিয়েরের হঠাৎ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে মেরি একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। কাজে হারিয়ে ফেলেছিলেন উৎসাহ।
সেই সাংঘাতিক মানসিক বিপর্যয়ে তিনি হয়ত মানসিক আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন পদার্থবিদ পল লজেভঁ-র কাছে। পল ছিলেন পিয়ের কুরিরই ছাত্র, মেরির চেয়ে বছরপাঁচেকের ছোট। পলের সঙ্গে মানসিক আদানপ্রদানে মেরি ক্রমশই জীবনের মূল স্রোতে ফিরে আসছিলেন। পল নিজেও বিবাহিত ছিলেন, যদিও স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়ে গেছে আগেই। আলাদা থাকেন বহুদিন।
দুই একাকীত্বে ভোগা বিজ্ঞানীর বন্ধুত্ব হয়ত দুজনকেই শান্তি দিচ্ছিল। কিন্তু পলের প্রাক্তন স্ত্রী জেনি কী করে যেন পেয়ে গেলেন দুজনের কিছু চিঠিপত্র! রাগে ক্ষোভে উন্মত্ত জেনি মেরিকে খুনের হুমকি তো দিলেনই, দেশের কাছে দেবীস্বরূপা মেরির ইমেজ একেবারে টুকরো টুকরো করে দিতে সেই চিঠিগুলো তুলে দিলেন মিডিয়ার হাতে।
© 𝗗𝗲𝗯𝗮𝗿𝗮𝘁𝗶 𝗠𝘂𝗸𝗵𝗼𝗽𝗮𝗱𝗵𝘆𝗮𝘆
ব্যাস, আর কি! মিডিয়া লুফে নিল। সাধারণ চিঠির ওপর ক্রমাগত রঙ চড়িয়ে পরিবেশিত হতে লাগল রগরগে কেচ্ছা। এমনকি কিছু কিছু কাগজে কিস্তিতে ছাপা হতে শুরু করল মেরি – পলের কাল্পনিক প্রেমকাহিনী। প্রকাশিত হতে লাগল পলের স্ত্রী ও শ্বাশুড়ির সাক্ষাৎকারও। পল যে আগে থেকেই বিবাহবিচ্ছিন্ন, সেই তথ্যটাকে ‘ফুটেজ’ এর লোভে ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হতে লাগল, বারবার বলা হতে লাগল, মেরি পলের সংসার ভাঙছেন।
সাংবাদিক গুস্তেভ টেরি আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে লিখলেন,“আসলে পিয়ের বেঁচে থাকতেই এই পরকীয়া শুরু। পিয়েরের মৃত্যু মোটেই অ্যাক্সিডেন্ট নয়, স্ত্রীর এই বিশ্বাসঘাতকতায় পিয়ের নিজেই ঘোড়ার গাড়ির তলায় ঝাঁপ দিয়ে সুইসাইড করেন।”
এমন জলজ্যান্ত মিথ্যাচারে মেরি হতবাক। স্বামী পিয়ের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন মেরির প্রিয়তম বন্ধু। তিনি জীবিত থাকার সময়ে পলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তো দূর, ভালভাবে পরিচয়ও ছিল না মেরির।
কিন্তু উত্তেজিত জনতা আর কবে যুক্তি দিয়ে কিছু বুঝতে চেয়েছে? যুক্তির চেয়ে গুজবের শক্তি বরাবরই বেশি। সাংবাদিক গুস্তেভ টেরির ওই প্রতিবেদনে আগুনে ঘি পড়ল যেন। জ্যান্ত মানুষের সম্মানের চেয়ে মরা পিয়েরকে ছদ্ম সমবেদনা জানানোর লোক কয়েকশো গুণ বেশি।
যে মানুষটা বিশ্বদরবারে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন, সেই মেরি কুরিরই বাড়ি ঘেরাও করে চলল উন্মত্ত জনতার বিক্ষোভ আর তাণ্ডব। সঙ্গে অশ্রাব্য গালিগালাজ আর হুমকি। সন্তানদের নিয়ে তখন ভয়ে কুঁকড়ে রয়েছেন নোবেলজয়ী কিংবদন্তী বিজ্ঞানী মেরি। মানসিকভাবে একেবারে তলানিতে তিনি।
ওদিকে বিজ্ঞানী পলের কাজ রিসার্চ সবই গেছে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি, বললেন,“সাংবাদিক গুস্তেভ টেরি সাংবাদিকতার লজ্জা। উনি সংবাদ নয়, মিথ্যে রগরগে কেচ্ছা পরিবেশনে সিদ্ধহস্ত। আমি ওঁকে আমার সঙ্গে ডুয়েল যুদ্ধে লড়ার জন্য আহ্বান করছি।”
মুখোমুখি দাঁড়ালেন সাংবাদিক ও বিজ্ঞানী। দুজনের হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র। কিন্তু শেষমেশ ডুয়েল লড়া হল না। সাংবাদিক টেরি অবজ্ঞাভরে লিখলেন,“চাইলেই আমি এক গুলিতে পলকে হারাতে পারতাম, কিন্তু আমি চাই না দেশ একজন বরেণ্য বিজ্ঞানীকে অকালে হারাক!”
তারই মাঝে এল মেরির দ্বিতীয়বারের নোবেল প্রাপ্তির সংবাদ। লোকজন গর্বিত হওয়ার বদলে আরো ক্ষেপে উঠল। বাইবেলে আছে, চরিত্রহীনা নারী হল ঘোর পাপিষ্ঠা, এমন একজন কিনা সুইডেনের রাজার হাত থেকে পুরস্কার নেবেন? তাতে বুঝি রাজার হাতের পবিত্রতা থাকবে? হতেই পারে না।
কাগজে ছেয়ে যেতে লাগল শ্লোগান। ‘মেরি কুরিকে কিছুতেই নোবেল প্রাইজ নিতে দেওয়া যাবে না। ব্যান করা হোক মেরি কুরিকে। এখুনি। আমাদের রাজার হাত অপবিত্র হতে দেওয়া যাবে না।'
এদিকে নোবেল সংগঠকরা মহা ফ্যাসাদে। ভেতরে ভেতরে পুরোপুরি ভেঙে গিয়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন মেরি। ছোট থেকে ভয়াবহ দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে উঠে এসেছেন তিনি। এত সহজে নিজেকে ফুরিয়ে যেতে দেবেন না। জ্যেষ্ঠা কন্যা আইরিন ও দিদি ব্রোনিয়াকে নিয়ে মাথা উঁচু করে স্টকহোম পৌঁছলেন তিনি। যাবতীয় বিক্ষোভকে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে সুইডেনের রাজার হাত থেকে বিশ্বের সর্বপ্রথম মানুষ হিসেবে নিলেন দ্বিতীয় নোবেল পুরষ্কার। নোবেল প্রাইজ বক্তৃতায় বারবার বললেন স্বামী পিয়েরের কথা।
ফরাসী মিডিয়া যদিও পাত্তাই দিল না এতবড় গৌরবটিকে। মেরির ওপর জঘন্য আক্রমণ চলতেই থাকত। নারী, তার ওপর সফল নারীকে চারিত্রিক দোষ দিয়ে টুকরো করে দেওয়ার মত বিজয়োল্লাস আর কিছুতেই নেই।
চরম মানসিক জোর থাকা মানুষগুলোর শরীর কখনো কখনো তাঁদের মানসিক দৃঢ়তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। মন লড়ে গেলেও শরীর বিদ্রোহ করে। প্রবল প্রতিবাদের মধ্যে দেশে ফিরে মেরিরও তাই হল। ফেরার সঙ্গে সঙ্গে এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন, ভর্তি হতে হল হাসপাতালে।
দিনরাত তেজস্ক্রিয় পদার্থের সংস্পর্শে থাকতে থাকতে মেরির শরীরের অনেক কোষ তখন ক্ষতিগ্রস্থ, লিভার সাংঘাতিকভাবে ড্যামেজড। মিডিয়াকে এড়াতে অন্য নামে কেবিন বুক করতে হল।
কিন্তু সাংবাদিকরা আর দেশের জনতা তাতেও তাঁকে রেহাই দিল না। রটিয়ে দেওয়া হল, মেরি আসলে পলের অবৈধ সন্তানের মা হতে যাচ্ছিলেন, তাই গর্ভপাত করাতে গোপনে ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে। ছি ছি কী লজ্জা!
এতকিছুর পরও ভগ্নদেহে বাড়ি ফিরলেন মেরি। ধীরে ধীরে ফিরলেন কাজেও। রেডিয়াম ইন্সটিটিউটের ভবন তৈরি করা শুরু করলেন। ধীরে ধীরে যেতে লাগলেন নানা দেশের কনফারেন্সে। চলতে লাগল তাঁকে নিয়ে আজকের ভাষায় ট্রোলও।
তারপর শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যে ফরাসী জনতা তাঁকে ছিঁড়ে খেয়েছে, সেই ফরাসী সেনাদেরই সেবাশুশ্রূষায় আঠেরোটি ভ্যানে এক্স রে মেশিন নিয়ে মেরি পড়ে রইলেন যুদ্ধক্ষেত্রে। এ মাথা থেকে ও মাথা ছুটোছুটি করে দ্রুত রেডিওঅ্যাক্টিভ এক্স রে মেশিনে নির্ণয় করতে লাগলেন অসুখ, বাঁচাতে লাগলেন তাঁদের। কিন্তু এই লাগাতার নোংরা আক্রমণে ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ডভাবে অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ছিলেন তিনি। একেই ভীষণ দরিদ্র পরিবারে জন্মেছিলেন, ছোট থেকে অকল্পনীয় সংগ্রাম করে উঠে এসেছিলেন। তারপর আর শরীর নিতে পারছিল না।
মেরির যুদ্ধক্ষেত্রে অত কর্মকাণ্ডে মিডিয়া একটু থমকাল বটে, কিন্তু থামল না। বলল, "লোকের কাছে ভাল সাজতে চাইছে এসব করে।"
এরপর যতদিন বেঁচেছিলেন, মনের দিক থেকে কোনদিনও স্বাভাবিক হতে পারেননি মেরি কুরি। মৃত্যুর আগে মেয়েদের বলে গিয়েছিলেন, তাঁকে যেন কবর দেওয়া হয় স্বামী পিয়েরের কবরের ওপরেই। তাই হয়েছিল। বিস্ময়ের ব্যাপার, পল ও মেরির প্রেম পূর্ণতা পায়নি, কিন্তু কয়েকদশক পরে পলের নাতি মাইকেল ও মেরি কুরির নাতনি হেলেন একে অন্যকে বিবাহ করে সুখী দম্পতি হয়েছিলেন।
এই নভেম্বরেই সেই বিশ্ববরেণ্য বৈজ্ঞানিক মাদাম মেরি কুরির জন্মদিন। ৭ই নভেম্বর। তাঁর যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের বিজ্ঞান। চারিত্রিক দোষে প্রত্যক্ষভাবে দুষ্ট কত পুরুষ তাঁর কর্মজগতে নন্দিতই হয়েছেন। হয়ে চলেন। ক্রেডিটও নেন কেউ কেউ। অথচ ভাবতেও আশ্চর্য লাগে, এত বড় বিজ্ঞানীও মহিলা হওয়ার 'অপরাধ' এ কতবড় যাতনা সহ্য করেছেন।
সব ধর্মগ্রন্থেই চরিত্রহীনা নারীর জন্য কড়া শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু চরিত্রহীন পুরুষের জন্য নেই যে!
শুভ জন্মদিন মাদাম মেরি কুরি। আপনি লড়াইয়ের দ্বিতীয় নাম। তখনকার পুরুষ শাসিত সমাজে এক মেধাবিনীর রাজত্ব করার দ্যোতক। আপনি যদি অতবছর আগে পেরে থাকেন, আমরা তার ১ শতাংশ হলেও পারব।
আরো একটা কথা। তাঁর কাজ, প্রথম মানুষ হিসেবে দুবার নোবেলজয়ের কৃতিত্বই রয়ে গেছে ইতিহাসে, সেইসব কুৎসা, আঘাত, গুজব মুছে গেছে, ঝরে গেছে আবর্জনাময় মেদের মত। এটাই হয়। আঘাত পেলেও থামবেন না, জানবেন, আপনার কাজগুলো ঠিক রয়ে যাবে। বাকি সব হারিয়ে যাবে।
তথ্যসূত্রঃ
১. Marie Curie: the woman who changed the course of science, Philip Steele.
২. Madame Curie: A Biography, Eve Courie.
৩. Marie Curie: A life, Susan Quinn.
৪. Obsessive Genius, inner life of Marie Curie, Barbara Goldsmith ইত্যাদি।
© Debarati Mukhopadhyay
09/09/2024
এটি সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি। কেন জানেন? কারণ এই ছবিটি তার ফটোগ্রাফারকে এনে দিয়েছিল নোবেল পুরস্কার!
হ্যাঁ কারণ এটি পৃথিবীর প্রথম এক্স-রে ছবি। ছবিটি তুলেছিলেন ১৮৯৫ সালে, উইলহেম রন্টজেন। যাঁকে তার এই অসাধারণ আবিষ্কারটির জন্যে ১৯০১ সালে বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে এই আবিষ্কারের মূল্য উপলব্ধি করতে পেরেই রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান এই বিজ্ঞানী।
মজার কথা হলো, এই প্রথম ছবিটিতে তিনি তুলেছিলেন তাঁর স্ত্রী বার্থার হাতের। দেখুন ছবিতে মহিলার হাতের আঙুলে বিয়ের আংটিটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রন্টজেন সাহেব নিজেও জানতেন না যে এই অদৃশ্য রস্মিটি আসলে কী, যা কিনা মানুষের শরীর ভেদ করে হাড়ের ছাপ এঁকে দিতে সক্ষম হয় পর্দায়। তাই তিনি এই অজানা রস্মির নাম দিয়েছিলেন - "X"। যা গাণিতে অজানা কিছুকে বোঝায়। সেই থেকেই আজকে আমাদের সকলের অতি পরিচিত নামটি এসেছে - X- Ray!
Bangla Tribune
হোমকলাম
“মা তোর বদনখানি মলিন হলে”
ফারজানা হুসাইন
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ২১:১৯
ফারজানা হুসাইন
ফারজানা হুসাইন
স্কুলের গন্ডির বাইরে বিশেষ দিনগুলো ছাড়া সচরাচর জোর গলায় জাতীয় সঙ্গীত গাইতে দেখা যায় খেলোয়াড়দের। যে কোনও আন্তর্জাতিক ম্যাচ শুরুর আগে আমরা দেখি আমাদের লাল-সবুজ জার্সি পরা বাঘ ও বাঘিনীরা আবেগ নিয়ে দলবদ্ধভাবে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত গাইছে। মাঠে উপস্থিত দর্শকের মাঝেও সেই আবেগ ছড়িয়ে যায় নিমেষেই।
২০১৮ সালে ইউরোপিয়ান জার্নাল অব স্পোর্টস সায়েন্সে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে একটি দারুণ তথ্য। গবেষণাটি বলছে, কোনও প্রতিযোগিতামূলক খেলায়, ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সঙ্গীতের সময় প্রদর্শিত দলের আবেগ ম্যাচে ওই দলের সাফল্যের সাথে জড়িত।
এই গবেষণাটি ইউরো ২০১৬ টুর্নামেন্টের ৫১টি খেলায় জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় দলের সদস্যদের মধ্যে যে আবেগ দেখা যায় এবং দলের কর্মক্ষমতা বা পারফরম্যান্সের মধ্যে কোনও সংযোগ আছে কিনা তা পরীক্ষা করে এবং পজেটিভ কানেকশন বা ইতিবাচক সংযোগ দেখতে পায়।
গবেষণায় বলা হয়, সামাজিক পরিচয় তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা এই গবেষণায় দেখা গেছে, যে দলগুলো ভীষণ আবেগের সাথে ম্যাচের শুরুতে জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছে ওই ম্যাচে তারা তূলনামুলক কম সংখ্যক গোল খেয়েছে।
এর পিছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গবেষণাপত্রটি বলছে, একসাথে একটি জাতীয় সঙ্গীত গাইবার কারণে দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে একটি সোশ্যাল আইডেন্টিটি কনসেপ্ট কাজ করে যা ম্যাচে তাদের পারফর্মেন্সকে প্রভাবিত করে। খেলোয়াড়রা ম্যাচটাকে কেবল একটা খেলা নয় বরং প্রতিপক্ষের দলকে দেখে আমরা বনাম ওরা হিসাবে।
এ তো গেলো আবেগ দিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার গল্প। জাতীয় সঙ্গীত না গেয়ে নিরব দাঁড়িয়ে থেকেও যে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করা যায় তার উদাহরণ ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে আছে।
২০২২ এর বিশ্বকাপ ফুটবলের ইরান আর ইংল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচের শুরুতে ইরানের পুরো দল জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া থেকে বিরত থাকে। ওই সময়ে ইরানের সিকিউরিটি ফোর্স কুর্দি অধ্যুষিত শহরগুলোতে গুলি চালাচ্ছিলো আন্দোলনকারীদের ওপর। এরই প্রতিবাদ ছিল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া পরিমন্ডলে ইরান ফুটবল দলের জাতীয় সঙ্গীত না গাওয়া যা বিশ্ব মিডিয়ার নজরে আসে সাথে সাথেই। পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে ইরানের সমর্থকরা ও বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে দলের সাথে এই প্রতিবাদে অংশ নেয়।
মোটামুটি বলা যায়, দেশ কিংবা বিদেশে জাতীয় সঙ্গীত আজ কেবল সরকারি বিশেষ দিনগুলোতে আর খেলাধুলার ইভেন্টগুলোতে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে অলিম্পিক গেমসে, যেখানে প্রতিটি ইভেন্টের বিজয়ীকে সে যে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে তার পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে অভিবাদন জানানো হয়। তবে গভীরভাবে চিন্তা করলে আমরা দেখবো জাতীয় সঙ্গীত হলো কোনও দেশের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের জানালা; যে জানালা দিয়ে তাকালে ওই দেশের সংস্কৃতি, দেশের মানুষ, তাদের আশা আত্মত্যাগকে জানা যায়।
জাতীয় সঙ্গীত সাধারণত দেশের সরকার দ্বারা স্বীকৃত হয়, অর্থাৎ তাৎপর্য বিবেচনায় কোনও সঙ্গীতকে দেশের সরকার জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দেয়। আবার বহুল জনপ্রিয় কোনও গান জনগণের বহুল ব্যবহারের মাধ্যমে ও জাতীয় সঙ্গীতে রূপান্তরিত হতে দেখা যায়। ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ অনেক পুরনো জাতীয় সঙ্গীত রচিত হয়েছিল জাতির ক্রান্তিকালে একটি জাতির সংকল্পকে শক্তিশালী করার জন্য জাতীয় সঙ্গীতের যে শক্তি তার প্রমাণ দেখতে পাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন মিত্রশক্তির জাতীয় সঙ্গীতের লন্ডন থেকে বিবিসি-এর সাপ্তাহিক সম্প্রচার ইউরোপ জুড়ে লক্ষ লক্ষ দর্শকদের আকর্ষণ করেছিল।
একই ভাবে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে আমার সোনার বাংলা সহ আরও অনেক দেশাত্মবোধক ও প্রতিবাদী গান সম্প্রচার করা হতো যা মুক্তিকামী বাংলার জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলো।
(১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চিরসবুজ সিনেমা ‘জীবন থেকে নেওয়া’-তে আমার সোনার বাংলা এই গান ব্যবহৃত হয়। এটি কোনো সিনেমায় এই গানের প্রথম ব্যবহার। জহির রায়হান নির্মিত এই সিনেমায় তৎকালীন বাঙালি স্বাধীনতা আন্দোলনকে রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।)
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের আগে গানটির পুনরুজ্জীবন ঘটে। মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার এই গানকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অথচ, সাম্প্রতিক সময়ের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ হলো, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতকে ‘স্বাধীনতার অস্তিত্বের পরিপন্থি’ আখ্যা দিয়ে তা পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের ছেলে আব্দুল্লাহিল আমান আযমী।
আমান আযমীর এই মন্তব্যের পর পুরো দেশজুড়ে বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কালক্ষেপন না করে গত মঙ্গলবার থেকেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে নিজেদের স্কুল জীবনের এসেম্লিতে গাওয়া আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি - নিয়ে ছেলেবেলার মধুর স্মৃতিকথন আর স্মৃতিকাতর হতে দেখা গেছে বুমার, মিলেনিয়াল সহ জেন-জি দেরও।
এখানে অবশ্যই উল্লেখ করা দরকার যে, এবার প্রতিবাদ যারা করছে তারা অনেকেই বলছে আমরা গত জুলাই- আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সে নতুন সাম্যের বাংলাদেশ চেয়েছি, সেই বাংলাদেশে সবার বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথাও বলেছি। সুতরাং, কারো কোনও চিন্তা বা কথা পছন্দ না হলে, প্রতিবাদ হবে অবশ্যই তবে তা কারো বাক স্বাধীনতা হরণ করে নয়।
এদিকে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে কেবল নয় সমষ্টিগত ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে অফলাইনেও। ব্যক্তি ও শিল্পীরা জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের এই দাবিকে দেখছেন বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত ষড়যন্ত্র হিসাবে।
গত শুক্রবার জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের “ষড়যন্ত্রের” বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও প্রতিবাদী গান গেয়ে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীরা।
একটা দারুণ তথ্য দেই এখানে।
২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের সময় ২০৫টা দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর জন্য প্রস্তুত রাখা হয়। ওই সময় সব দেশের জাতীয় সঙ্গীত ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনে আর বিশ্লেষণ করে ‘দ্য আর্ট ডেস্ক’ শীর্ষ তালিকা তৈরি করেছিল। ‘আর্ট ডেস্ক’ সঙ্গীত ও শিল্পকলাবিষয়ক প্রকাশনা, যাতে টেলিগ্রাফ, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, ইকোনমিস্টের লেখকেরা যুক্ত। আর্ট ডেস্কের প্রতিষ্ঠাতা ইসমেন ব্রাউনের নিজের নামেই পৃথিবীর সেরা জাতীয় সঙ্গীতগুলোর তালিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁদের মতে, সেরা ১০ স্বর্ণপদকজয়ী জাতীয় সঙ্গীত হলো রাশিয়া, ইতালি, জাপান, বাংলাদেশ, জ্যামাইকা, ইসরায়েল, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি, ক্যামেরুন ও বুলগেরিয়া।
তালিকার কথা যখন উঠলোই তখন বিশ্বের কয়েকটি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের দিকে একটু তাকানো যাক।
সবচেয়ে পুরনো জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে কথা বলতে গেলে ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস এবং জাপানের নাম উঠে আসে। জাতীয় সঙ্গীত বা ন্যাশনাল এন্থেমের ধারণার শুরু হয় আঠারো শতকে হলেও মূলত উনিশ শতকে এসে জাতীয়তাবাদের ধারণা ক্রমবিকাশের সাথে সাথে ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে জাতীয় সঙ্গীতের ধারণা প্রসার ঘটে। এর আগে বিভিন্ন দেশ, জনপদের মানুষ সম্মিলিতভাবে যা গাইতো তা মূলত রাজার বন্দনাগীত বা রয়াল এন্থেম।
ব্রিটেনের জাতীয় সংগীত হলো God save the king যার বাংলায় অর্থ দাঁড়ায় স্রষ্টা রাজাকে রক্ষা করুন।
ব্রিটিশ এই জাতীয় সঙ্গীতে দেশ, দেশের মানুষ, তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি বা ব্রিটিশদের আশা আত্মত্যাগ এসবের কিছুই নেই। এটা মূলত একটা প্রার্থনা সঙ্গীত। তারপর আবার এই সঙ্গীত রাজা বা রানীর পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলে যায়।
দুই বছর আগে রানীর মৃত্যুতে গত দুই বছরে এই সঙ্গীত এখন গড সেইভ দ্য কিং মানে স্রষ্টা রাজাকে রক্ষা করুন হয়ে গেছে। কারণ রানী এলিজাবেথের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেছেন তার ছেলে তৃতীয় চার্লস।
৭৩ বছরের প্রিন্স অবশেষে রাজ সিংহাসনে তো বসলো কিন্তু এখনও ব্রিটেনের জনগণ তাকে যখন তখন রাজা না বলে প্রিন্স চার্লস বলে বসে, এমনকি তার সামনেও। জনগণের আর কী দোষ! ৭৩ বছর একটা লম্বা সময় কোনও অভ্যাস গড়ে ওঠার জন্য। আর সেই অভ্যাসের কারণেই হরহামেশাই এখানের মানুষ এখনও ভুল করে রাজার বন্দনার বদলে গড সেইভ দ্য কুইন গেয়ে বসছে জাতীয় সঙ্গীতে।
লন্ডনের আর্ট ডেস্ক অবশ্য বহু প্রাচীন ব্রিটেনের এই জাতীয় সঙ্গীতকে রেখেছে খারাপের তালিকায়। এদিকে গাইতে গেলে বেগ পেতে হয় এমন কঠিন জাতীয় সঙ্গীতের তালিকা করলে একেবারে উপরের দিকে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত “The Star-Spangled Banner”। ব্রিটেনের মতো আমেরিকার এই জাতীয় সংগীত কোনও রাজা বা রানীর বন্দনা করে নয় বরং জাতীয় পতাকাকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা। আরেকটি মজার তথ্য হলো, ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা পাওয়া আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীতের সুর এসেছে বহু পুরনো ইংরেজ পানশালায় প্রচলিত একটি গান থেকে। একে তো মদের দোকানে গাওয়া গান, তার ওপর সে গান আবার ইংরেজ শাসকদের মনে করিয়ে দেয়!
“আমার সোনার বাংলা” কিন্তু এমনি এমনি আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে যায়নি। “আমার সোনার বাংলা” রবীন্দ্রনাথের এই গানকে যখন জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গ্রহণ করার চিন্তা করা হয় তখন একই সাথে আরও দুটো গানের কথা উঠে এসেছিলো আলোচনায়। তাদের একটি হলো দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ এবং কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’। পরবর্তীতে ‘চল চল চল’ গানটি আমাদের রণ সঙ্গীত হিসাবে গৃহীত হয় আর রবি ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’কে নির্ধারণ করা হয় আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে।
‘ধন ধান্য পুষ্পভরা’ গানটি কেন আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হতে পারে না এমন প্রশ্নও উঠেছে এ সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। ‘ধন ধান্য পুষ্পভরা’ গানটি খুবই শ্রুতিমধুর। বিশেষ করে গানের কয়েকটা লাইন যেমন ‘ভাইয়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ’, আবার ‘ও সে, স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে-দেশ, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা’; আমাদের বাংলাদেশের মানুষ আর তাদের ইতিহাসকে কী দারুণ করে ফুটিয়ে তোলে। তবে এই গানেরই একটি লাইন যা ঘুরে ফিরে বারবার গানটিতে এসেছে তা হলো - ‘সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি’। গানের এই কথাগুলো প্রকট জাতীয়তাবাদ আর উৎকট স্বাদেশীকতায় দুষ্ট!
প্রকট জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গে “Song of the Germans,” বা জার্মানির জাতীয় সঙ্গীতের কথা এসে যায়। জার্মান জাতীয় সঙ্গীতের প্রথম শ্লোক, "Deutschland, Deutschland über alles" (জার্মানি, জার্মানি সবার উপরে), দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে এবং বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়কালে জার্মান জাতীয়তাবাদ এবং সামরিকতাবাদের সাথে যুক্ত থাকার কারণে বিতর্কিত হয়েছে।
"জার্মানি সবার উপরে " গানটি যদিও মূলত উনিশ শতকে জার্মান ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল, ‘জার্মানি সবার উপরে’ এই অনুভূতিটি পরবর্তীতে নাৎসিদের হাতে জার্মান শ্রেষ্ঠত্ব এবং সম্প্রসারণবাদের চরম রূপ প্রচার করতে ব্যবহৃত হয়েছিল।
ফলস্বরূপ, এই সঙ্গীতের প্রথম স্তবকটি দেশের ফ্যাসিবাদ ও আগ্রাসনের অন্ধকার ইতিহাসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ হয়ে উঠেছে। তাই বর্তমান জার্মানির জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে প্রথম ও দ্বিতীয় স্তবক বাদ দিয়ে কেবল তৃতীয় স্তবক গাওয়া হয়।
এ পর্যায়ে এসে প্রশ্ন উঠতে পারে, জাতীয় সঙ্গীত কি কখনই পরিবর্তন করা যায় না?
হ্যাঁ যায়, জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের ইতিহাস পৃথিবীতে আছে। জার্মানির কথা তো মাত্র বললাম। কেবল জার্মানি নয়, বিশ্বের আরও কয়েকটা দেশ দিন বদলের সাথে নতুন নতুন ধারণা ও ত্বত্ত্বকে ধারণ করে নিজেদের জাতীয় সঙ্গীতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে কানাডা এবং অস্ট্রিয়ার কথা বলা যায় যেখানে লিঙ্গ সমতা ও লিঙ্গ নিরপেক্ষ ধারণা ও আইনের প্রচলন ও প্রসার ঘটায় মূল জাতীয় সঙ্গীতকে সামান্য পরিমার্জন করা হয়েছে।
লিঙ্গ সমতা আনার জন্য অস্ট্রিয়ার জাতীয় সঙ্গীতে ‘ছেলেরা’-এর জায়গায় ‘মেয়েরা এবং ছেলেরা’ লেখা হয়েছে। এটি করা হয় ২০১২ সালে।
কানাডা সম্প্রতি তাদের জাতীয় সঙ্গীতকে আরও লিঙ্গ নিরপেক্ষ করেছে। সঙ্গীতের দ্বিতীয় লাইনে ‘তোমার সব ছেলেরা’-এর জায়গায় লেখা হয়েছে ‘আমরা সবাই’।
প্রত্যেক দেশের জাতীয় সঙ্গীত তাদের নিজস্ব স্বকীয়তায় ইউনিক হলেও দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় সঙ্গীত এবং এর ইতিহাস দারুণ রোমাঞ্চকর। ১৯৯৪ সালে বর্ণবৈষম্যের অবসানের আগে, দক্ষিণ আফ্রিকায় দ্বৈত জাতীয় সঙ্গীত বা দুটো সঙ্গীত ছিল।
‘উঁচু’ শ্বেতাঙ্গের জন্য একটি আর ‘নিচু’ কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য আরেকটি। সরকারি রাষ্ট্রীয় গানটি ছিল "ডাই স্টেম", যা ইংরেজিতে "দ্য কল অব সাউথ আফ্রিকা" নামে পরিচিত, তবে দেশটির "আই আফ্রিকা" বা "গড ব্লেস আফ্রিকা" নামে একটি অনানুষ্ঠানিক জাতীয় সঙ্গীতও ছিল; কালোদের এই গান, তারা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের গান হিসাবে গাইতো।
প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই গান ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার অস্থির ইতিহাসের একটি সাক্ষাৎ প্রতীক হিসাবে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা ঘোষণা করেছিলেন যে "ডাই স্টেম" এবং "গড ব্লেস আফ্রিকা" জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে সম্মান ভাগ করে নেবে।
অবশেষে, ১৯৯৭সালে, দেশটি আগের দুটি জাতীয় সঙ্গীত থেকে কিছু অংশ নিয়ে নতুন একটি জাতীয় সঙ্গীত তৈরি করে। একটি অস্বাভাবিক মোড়ের মধ্যে, নতুন সঙ্গীতটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বাধিক কথ্য পাঁচটি ভাষার গানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে: জোসা, জুলু, সেসোথো, আফ্রিকান এবং ইংরেজি।
আমাদের জাতীয় সঙ্গীত আমার সোনার বাংলা কে পরিবর্তনের চেষ্টা কিন্তু নতুন নয়। আগেও বিভিন্ন সরকারের আমলে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।
জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের পক্ষের একটি যুক্তি হলো, ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত হয়েছিল। আসলে, গানটির মূল পাণ্ডুলিপি পাওয়া না যাওয়ায় এর সঠিক রচনাকাল জানা যায় না। তবে, সত্যেন রায়ের লেখা থেকে জানা যায়, ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতা টাউন হলে একটি প্রতিবাদসভায় এই গান প্রথম গাওয়া হয়। সেই বছর ৭ সেপ্টেম্বর (২২ ভাদ্র, ১৩১২ বঙ্গাব্দ) ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বাক্ষরে গানটি ছাপা হয়। গানের প্রথম দশ লাইনকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত করা হয়েছে, তবে পুরো গান থেকে এবিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় যে, ব্রিটিশ বিরোধী এবং স্বদেশি আন্দোলনের স্বপক্ষের গান এটি।
আরেকটি হাস্যকর বিষয় অনেকে তোলেন যে, রবীন্দ্রনাথ এই গানের সুর গগন হরকরার বাউল গান ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ থেকে চুরি করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন রচনা থেকে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় যে তিনি গগন হরকরা, লালন সহ বাউল গান এবং তাদের ভাটিয়ালী সুরে মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জাতীয় সঙ্গীতের সুরে প্রকাশ্য মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীতের সুর নেওয়া হয়েছে একটি ইংরেজ পানশালার পপুলার গানের সুর থেকে। এমনকি ব্রিটিশ জাতীয় সঙ্গীত God save the king এর সুর সবচেয়ে বেশি কপি করা জাতীয় সংগীত।
তাই, গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ গানের সুরে আমার সোনার বাংলা গাইতে আর আপত্তি থাকার কথা না। বরং, বাউল সুরের এই জাতীয় সংগীত আমাদের শান্তিকামী, ভাবুক জাতিসত্ত্বার প্রামান্য চিত্র হয়ে ওঠে যেনো।
আরও বলা হয়, আমার সোনার বাংলা গানে বাংলাদেশ শব্দটি কোথাও ব্যবহার করা হয়নি। তাই এই গান বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে না।
বাংলাদেশ শব্দটাকে ব্যবচ্ছেদ করলে আমরা দেখি, যে দেশের নাম বাংলা কিংবা বাংলা ভাষাভাষীর দেশ। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ও বাংলায় কথা বলে। তবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জাতীয়তা বাংলাদেশি নয়, বরং ভারতীয়। আর ভারতীয়দের অফিসিয়াল ভাষা হিন্দি ও ইংরেজি। ওরা জাতীয় সঙ্গীত গায় হিন্দিতে - ‘জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে’। উপরন্তু, ভারতের জাতীয় সঙ্গীতে পশ্চিমবঙ্গকে ‘বঙ্গ’ বলা হয়েছে, ‘বাংলা’ নয়। তাই ‘আমার সোনার বাংলা’ গানে যে বাংলার কথা বলা হয়েছে তার নির্যাস আজকের বাংলাদেশ ভীষণভাবে ধারণ করে।
আরেকটি প্রশ্ন ওঠে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতে মা শব্দটি নিয়ে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সাথে জড়িত বা সমর্থকদের এক কঠিন চিন্তা আমার সোনার বাংলা গানের এই মা কে? এই পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথের ধর্ম পরিচয়কে টেনে নিয়ে এসে সন্দেহ করা হয় এই মা কি তবে সনাতনীদের দেবী মা কিনা।
এই প্রশ্নের উত্তর জাতীয় সঙ্গীতেই আছে। “ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে”, কিংবা “মা তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মত” - এই মা দেশ, মাতৃভূমি। পূজনীয় বা উপাস্য দেবতার আসনে আসীন দূরের বা ভয়ের কেউ নয় বরং একান্তই আপন, আমাদের সবচেয়ে ভালোবাসার মা রূপক দেশ।
জার্মানি, ফ্রান্স সহ অনেক দেশের জাতীয় সঙ্গীতে দেশকে পিতৃভূমি বা ফাদারল্যান্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই জাতীয় সঙ্গীতগুলোতে ন্যাশনাল গ্লোরি বা জাতিগত গর্বের কথা বলা হয়েছে। অথচ আমাদের জাতীয় সংগীতে আমরা মাতৃভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা বলি, বিভিন্ন ঋতুর কথা বলি, বলি দেশের জন্য আমাদের ভালোবাসার কথা। এ গানে কোনও উগ্র জাতীয়তা বোধ নেই, নেই কোন লিঙ্গ অসাম্যতা।
যে জাতীয় সঙ্গীতে দেশকে মা সম্বোধন করা হয়, তুমি সম্বোধন থেকে আবেগে এক নিমেষে সেই দেশ মাতৃকাকে তুই বলা যায়; কোনও শঙ্কা, লজ্জা বা দ্বিধা ছাড়াই গলা ছেড়ে গাওয়া যায়, দেশকে বলা যায় -আমি তোমায় ভালোবাসি!
যে গানে বটের ছায়া আছে, আমের মৌ মৌ গন্ধ আছে, মায়ের আঁচল আছে, সোনার ধানের ছোঁয়া আছে; যে গানে আকাশে বাতাসে বাউলের হৃদয় থেকে উঠে আসা করুণ সুর শুনি দেশ-মায়ের মলিন বদন দেখে ;
যে গানের সাথে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মুক্তিকামী যোদ্ধাদের একাত্মতা আছে, আছে স্বৈরাচার বিরোধী সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতা অভ্যুথ্থানের সম্পৃক্ততা; এই জাতীয় সঙ্গীতকে আত্মায় ধারণ করা কেবল আমাদের মতো দৃঢ়চিত্তের আর কোমল হৃদয়ের জাতির পক্ষেই সম্ভব।
লেখক: ব্যারিস্টার-এট-ল,আইনজীবি এবং মানবাধিকার কর্মী।
© বাংলা ট্রিবিউন
27/08/2024
"আমি আমার জীবনে অনেক বই পড়েছি, কিন্তু সেগুলো থেকে অর্জিত বেশীরভাগ তথ্যই আমার এখন মনে নেই। তাহলে এত বই পড়ে আসলে আমার কি লাভ হচ্ছে?" একজন ছাত্র তার শিক্ষককে ঠিক এই প্রশ্নটি একদিন জিজ্ঞেস করেছিল।
শিক্ষক এই ব্যাপারে মৌন ছিলেন, তিনি প্রথম দিন কোন উত্তর দিলেন না।
কিছুদিন পর নদীর ধারে সেই ছাত্র এবং শিক্ষকের মধ্যে একদিন দেখা হয়, শিক্ষক ছাত্রকে একটি ছিদ্রযুক্ত পাত্র দেখিয়ে বললো - "যাও, নদীর ধার থেকে পাত্রটি নিয়ে আমার জন্যে এক পাত্র পানি নিয়ে আসো", পাত্রটি সেখানে ময়লার মধ্যে মাটিতে পড়েছিল।
ছাত্রটি কিছুটা বিভ্রান্তিবোধ করলো, এটা অযৌক্তিক উপদেশ, একটা ছিদ্রযুক্ত পাত্র দিয়ে পানি নিয়ে আসা সম্ভব নয়, কিন্তু শিক্ষকের উপদেশ অমান্য করা যাবে না, তাই সে মাটি থেকে পাত্রটি তুলে নিয়ে নদীর ধারে ছুটে গেল পানি নিয়ে আসার জন্যে।
পাত্র ভর্তি করে সে পানি নিয়ে উপরে উঠে এলো, কিন্তু বেশি দূর যেতে পারলো না, কয়েকটা কদম দেওয়ার সাথে সাথেই পানিগুলো সব ছিদ্র দিয়ে নিছে পড়ে গেল।
সে আরও কয়েকবার চেষ্টা করলো, কিন্তু সে ব্যার্থ হলো এবং হতাশাবোধ করলো।
এভাবে আরও কয়েকবার চেষ্টা করার পরেও সে পানি নিয়ে পৌঁছাতে পারলো না, সে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
তারপর সে শিক্ষকের নিকট ফিরে গিয়ে বললো - "আমি ব্যর্থ হয়েছি, আমি এই পাত্রটিতে পানি নিয়ে আসতে পারবো না, এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, আমাকে ক্ষমা করুন।"
ছাত্রের কথা শুনে শিক্ষক কোমল একটি হাসি দিলেন এবং ছাত্রকে উদ্দ্যেশ্য করে তিনি বললেন - "না, তুমি ব্যর্থ হওনি। পাত্রটির দিকে তাকিয়ে দেখ, এটি এখন পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে, একদম নতুন একটি পাত্রের মত দেখাচ্ছে। ছিদ্রগুলো দিয়ে যতবারই পানি পড়েছে ততবারই পাত্রটির মধ্যে থাকা ময়লাগুলো পরিষ্কার হয়ে বের হয়ে গিয়েছে। যখন তুমি কোন বই পড় তখন তোমার সাথে একই ব্যাপার ঘটে, তোমার ব্রেইন হচ্ছে একটি ছিদ্রযুক্ত পাত্রের মত, আর বইয়ের মধ্যে থাকা তথ্যগুলো হচ্ছে পানির মত। তাই যখন তুমি কোন বই পড় এর সব কিছু মনে রাখতে পারো না। কিন্তু তুমি একটা বই পড়ে এর সবগুলো তথ্য মনে রাখতে পারলে কিনা সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ন কোন বিষয় না। কারণ বই পড়ে তুমি যেসব ধারণা, জ্ঞান, আবেগ, অনুভূতি, উপলব্দি এবং সত্য খুঁজে পাও সেগুলো তোমার মনকে পরিষ্কার করে, যতবার তুমি একটি বই পড়ে শেষ কর ততবার তোমার আধ্যাত্মিক রূপান্তর ঘটে, প্রতিবার তোমার পুনর্জন্ম হয়, ফলে তুমি আরও বিশুদ্ধ একজন মানুষে পরিণত হও। এটাই হচ্ছে বই পড়ার মূল উদ্দেশ্য।"
হ্যাপি রিডিং...।
~সংগৃহিত
27/08/2024
গ্যালিলিওর বিচার
বিজ্ঞানী গ্যালিলিও তখন অন্ধ। যে চোখ দুটি দিয়ে তিনি দুরবিন দিয়ে মহাকাশ দেখেছিলেন, নতুন নতুন গ্রহ-উপগ্রহ দেখেছেন, সেই চোখ দুটিই এখন অন্ধকার। আট বছর ধরে বন্দি। বয়স আশির কোঠায়।
শরীর ভেঙে পড়েছে। জীবনের এই শেষ মুহূর্তগুলোতে যদি আপনজনদের পাশে পেতেন। তা হওয়ার জো নেই। যাজকরা তার কাছে কাউকে ভিড়তে দেবেন না।
এভাবে আর কদ্দিন? ধীরে ধীরে অবহেলায়, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করতে হলো মহাবিজ্ঞানীকে। একদিকে অবশ্য ভালোই হয়েছে, পেয়েছেন দীর্ঘ আট বছরের দুর্বিষহ বন্দিজীবন থেকে মুক্তি।
কী এমন দোষ করেছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই বিজ্ঞানী?
তিনি কোপার্নিকাসের মতবাদ প্রচার করেছিলেন। বলেছিলেন, ব্রুনোকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছেন মুর্খ যাজকরা।
এমনটি বলার জন্য তাকে একবার মাফ চাইতে হয়েছেলি। ওয়াদা করতে হয়েছিল, চার্চ ও বাইবেলবিরোধী কিছু বলবেন না। কিন্তু সে ওয়াদা রাখতে পারেননি গ্যালিলিও। জ্বলজ্বলে তারার মতো সত্যকে তিনি কিভাবে মিথ্যা বলবেন?
কিভাবে অসত্যের অন্ধকারকে আলো বলে চালিয়ে দেবেন। গ্যালিলিও সত্যের জয়গান গেয়েছিলেন আজীবন।
বলেছিলেন সূর্য নয়, পৃথিবীই সূর্যের চারপাশে ঘোরে। দীর্ঘ আট বছর কারাগারে ধুঁকে ধুঁকে অবশেষে মৃত্যুবরণ করেন গ্যালিলিও।
সূত্র : ব্রিটানিকা
27/08/2024
প্রাইমারি স্কুলের কবিতাগুলো মস্তিষ্কের বিশাল জায়গা দখল করে আছে। ইদানিং আমি হুটহাট ভুলে যাই বহুকিছু। মুখস্থ বিদ্যায় আমি মহা খারাপ। তারপর কবিতাগুলো মস্তিষ্ক থেকে মুছে না। আমার প্রাইমারি স্কুল বইয়ে সেই কবিতা।
মাঝে মাঝে আমি কবিতাগুলো জাবর কাটি। বিশেষ করে ভাত খাওয়ার পর। কবিতার প্রতি আমার বিশেষ প্রেম ভালবাসা নেই।
আমার এক বন্ধু অসাধারন কন্ঠে সুবোধ সরকার এর একটি কুকুরের বায়োডেটা পড়ে। পড়া পর শেষ লাইনে সে হু হু করে হেসে উঠে। পুুরো ঘর কাপিয়ে হাসি। এক কবিতা বার বার পড়ে মানুষ কি করে হাসতে পারে
তার কোন যৌক্তিক কারণ আমার জানা নেই। আমি কয়েক ডজন বার দেখেছি সেই হাসি। বিকট হাসি, ভনিতা ছাড়া হাসি।
আমরা এক সাথে হলেই তাকে বলি Play। সাথে সাথে সে পুরো শরীর শক্ত করে একের পর এক সুবোধ সরকার, প্রদীপ বালা,মহাদেব সাহা, পূর্ণেন্দু পত্রী, তসলিমা নাসরিন, ভবানীপ্রসাদ মজুমদার, আল মাহমুদ, শুরু করে। কিছুতেই ক্লান্তি নেই।
এত শত কবিতা কি করে একটা মানুষ মস্তিষ্কে রাখে? তার দাবী আমি কবিতা মস্তিষ্কে রাখি না। পেটে রাখি।
আমি চেষ্টা করে তার মত পেটে কবিতা রাখতে পারি না।
অনেক কষ্ট করে সুবোধ সরকারে “একজন টেররিস্টের চিঠি” মুখস্থ করে ফেলেছিলাম।
যেখানে সারা দুনিয়াব্যাপী টেররিস্ট বিরোধী আন্দোলন হচ্ছে। সেখানে আমি “একজন টেররিস্টের চিঠি” মস্তিষ্কে নিয়ে ঘুরছি। শব্দটা ভয়নাক।
কিন্তু বিশ্বাস করুন সুবোধ সরকারের “একজন টেররিস্টের চিঠি” পড়লে আপনার ভয়ানক মনে হবে না। বরং আপনার মনে হবে এই চিঠি তো ৪৭ কিংবা ৭১রে আপনার লেখা চিঠি।
পৃথিবীতে এখন সব আন্দোলনকে যদি টেররিস্টের এর মোড়কে মোড়ানো যায়। তবে মন্দ হবে না। শাসক আর শোষক গোষ্ঠী দুনিয়াব্যাপী তাদের পোষ্য প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে এটি প্রতিষ্ঠিত করেছে টেররিস্টের শব্দটা মানে ভয়ানক কিছু। শাসক গোষ্ঠীর মতের বাইরে, স্বার্থের আঘাতকারীরাই আজ টেররিষ্ট।
একে শেষ করে দেওয়া রাষ্ট্রের কাজ, দুনিয়ার কাজ। দুনিয়া আজ ঐক্যবদ্ধ টেররিস্টদের শেষ করতে।
কিন্তু পৃথিবীর নানা প্রান্তে যে মানুষগুলো লড়ছে অধিকার, স্বাধীনতা, শোষন, ক্ষুদা, আগ্রাসনের বিপক্ষে তাদের কি হবে। তারাও কি শাসকগোষ্ঠীর কথিত ”টেররিস্ট”?
এ প্রশ্নের উত্তরে শুধু বলি, টেররিস্ট শব্দটা ব্যবহার করে শাসকগুলো দুনিয়া যেকোন আন্দোলনকে থামিয়ে দেওয়ার শক্তি রাখে। যেমন দেখুন আফ্রিকা পুরো আফ্রিকা লুট করে নিচ্ছে সন্ত্রাস দমনের নামে। বার্মায় সরকার হাজার হাজার মানুষ মেরে চালিয়ে দিল সন্ত্রাস বলে। ইরাক, আফগান, সিরিয়া, ইয়েমেনে হাজার হাজার মানুষ মারল তারা টেররিস্ট শব্দটাকে পুঁজি করে।
প্রিয়
সুবোধ সরকার আপনার দীর্ঘ কবিতা মুখস্থ করতে গিয়ে আমি বার বার ভাবতাম। ফেইসবুক, মুভি, আড্ডা, অফিস, অভাব, অভিযোগ, ঘুরাঘুরিতে ঠাসা আমার মস্তিষ্ক। তাতে এই চিঠি দিয়ে আর একটু জায়গা ভরে লাভ কি?
কিন্তু যখনই পড়ি “একজন টেররিস্টের চিঠি” তখন বলি আমার মস্তিষ্কের সবচেয়ে উর্বর অংশ জুড়ে আছো সুবোধ সরকার।
সুযোগ পেলে আপনিও একবার পড়ে নিতে পারেন। “একজন টেররিস্টের চিঠি”। মিলিয়ে নিতে পারবেন দুনিয়াব্যাপি লক্ষ মানুষ মারা কি করে তার বৈধতা নিয়ে নিল টেররিস্ট বলে। তাদের পালিত টেররিস্ট কর্মকান্ড দুনিয়া অন্য সকল বৈধ আন্দোলনকে থামিয়ে দিতে পারে না।
“একজন টেররিস্টের চিঠি”
সুবোধ সরকার
প্রিয়তমাসু
আমি তিনদিন খাইনি। কেউ কোনও খাবার দিয়ে যায়নি।
কী করে দেবে? গুহার বাইরে প্রচন্ড বরফ পড়ছে।
যে কোনও দিন আমি গুলিতে মারা যাব। যে কোনও দিন
তুমি টিভির পর্দায় আমার মুখ দেখতে পাবে।আমি
গুহার ভেতর সারারাত কম্পিউটরের সামনে বসে। কতদিন
আমি বকুল ফুলের গন্ধ পাইনি। কতদিন আমি গরম রুটি
খাইনি। কতদিন আমি তোমার ঘাসে হাত দিইনি।
কালো ঘাস। আঃ! ভাবলেই চে গুয়েভারা ছুটে বেড়ায়
শরীরে। স্টালিনকে হাতের মুঠোয় ধরে বসে থাকি।
তার মুখ দিয়ে গরম বেরিয়ে আসে। আঃ, গরম।
আমার স্টালিন ভালো আছে। তোমার সাইবেরিয়া?
হা,হা,হা… এখানে কেউ আমার জন্মদিন কবে
জানে না।
আমি পড়াশুনায় ভাল ছিলাম। অধ্যাপক বাবার ছেলে।
কম্পিউটরে আমার চাইতে কেউ ভাল ছিলনা। আজ আমি
গুহায় বসে আছি।কিন্তু কেন? প্রিয়তমাসু,মাই লাভ,তুমি
এর উত্তর পাবে যদি অত্যাচারের ইতিহাস পড়ো। কত হাজার
কোটি ডলার খরচ করে ওরা গরিবকে আরও গরিব
করে চলেছে। ১১ বছরের একটি
বালককে একটি পাউরুটি কিনে দিয়ে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,
তোর কি হয়েছে রে? সে গোগ্রাসে পাউরুটি কামড়
দিয়ে বলেছিলঃ আমার বাবা-মাকে ওরা পুড়িয়ে
দিয়েছে,জ্যান্ত। ছেলেটা খেতে খেতে কর গুনছিল,
বাবা-মা, দুই ভাই, তিন বোন…এক,দুই,তিন,চার,পাঁচ…
হ্যাঁ, এগারো জন। ছেলেটার নাম বলব না। কে খোঁজো। আজীবন
খুঁজে যাও।
প্রিয়তমা, আমাকে আর বেশি দিন ওরা বাঁচিয়ে রাখবেনা।
তার আগেই আমি ওদের দু’দুটো ঘাঁটি উড়িয়ে দেব।
ওদেরতো পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায়না, ওরা
আবার জন্মায়, আবার গনতন্ত্র বানায়, আবার পার্লামেন্টে
যায়।আবার প্রেস মিট করে। একটা সত্যি কথা লিখি,
ওরা গনতন্ত্র দিয়ে যা করায়, আমরাও AK-47 কে,
দিয়ে তাই তাই করাই। ওদেরটা দোষ নয়, আমাদেরটা দোষ।
আমি মারা যাব। তার আগে একবার, যদি
একবার তোমাকে দেখতে পেতাম। তোমার হাত ধরতে
পারতাম।যদি একবার তোমার ভেতরে ঢুকতে পারতাম, যেভাবে
বরফ ঢোকে গুহায়,যেভাবে শিকড় ঢোকে পাথরে,যেভাবে
ভাইরাস ঢোকে কম্পিউটরে।
আজ আমি একজন টেররিস্ট। হয়তো এটাই আমার শেষ চিঠি।
বলতো,কেন আমার মত ছেলে টেররিস্ট হবে?
কেন আমি ঘর-বাড়ি ছেড়ে,মায়ের হাতের খাবার ছেড়ে,
ভাল চাকরী ছেড়ে;গুহার জীবন,জঙ্গলের জীবন,
বরফের জীবন বেছে নিলাম?
আমি মাতাল হতে পারতাম।লম্পট হতে পারতাম। একজন
মাতালকে মেনে নেয় সমাজ। একজন লম্পটকে মেনে নেয় রাষ্ট্র।
একজন মাফিয়া বিধায়ককে মেনে নেয় এসেম্বলি। কিন্তু
একজন টেররিস্টকে মেনে নেয়া যায়না।
কতদিন তোমার স্নান করা চুলের গন্ধ পাইনি।
চোখ ভরে আসে জলে। পাউরুটি খাওয়া শেষ করে
১১ বছরের ছেলেটি বলেছিল,আর আছে? আমি আর
একটা পাউরুটি কিনে দিয়ে বলেছিলাম; শোন্ তুই বড় হয়ে
কী করবি? সে বলেছিলঃ বদলা নেব।
ছেলেটার মুখ ভেসে ওঠে যেই মনে হয় আমার সামনে
অনেক অনেক কাজ। অনেকগুলো খারাপ কাজ। ভুল
বললাম,অনেক,অনেক,ভালো কাজ।
আমাকে ক্ষমা করো। মা’কে একবার দেখে এসো। বোকা মেয়েটা
আমার মা হয়ে কোনও অন্যায় করেনি।
ইতি-
কোন নাম নেই
পুনশ্চঃ আমি মরে গেলে, আমাকে তুমি ‘আকাশ’ বলে ডেকো।
#ক্রসফায়ার_বন্ধ_কর
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Contact the school
Telephone
Website
Address
Dohar
Dhaka
1330