04/09/2023
আমরা যখন কাউকে রিপ্রেজেন্ট করার সুযোগ পাই, বিষয়টি কি আমাদের জন্য সম্মানের? যদি উচ্চ অবস্থানে থাকা কোনো ব্যক্তি আমাদেরকে তার প্রতিনিধিত্ব করতে বলে তাহলে আমাদের অনুভূতি আসলে কেমন হবে? তখন আমাদের প্রতিক্রিয়াই বা কেমন হবে? এই বিষয়টি নিয়েই সুরা বনী ঈসরাইল থেকে পর্যালোচনা করেছেন ডঃ ইউসুফ মাহবুবুল ইসলাম।
ধরুন আপনি যে কোম্পানিতে চাকরি করেন সেই কোম্পানির মালিক আপনাকে খুবই বিশ্বাস করেন এবং তিনি চান যাতে আপনি তার ডেপুটি হিসেবে তাকে রিপ্রেজেন্ট করেন। এই বিষয়টি কি আপনাকে সম্মান আর মর্যাদা প্রদান করবে না? এমন বিশেষ সম্মান পেয়ে আপনার প্রতিক্রিয়াই বা কেমন হওয়া উচিত?
এখন যদি বলা হয়, একজন সত্ত্বা যিনি আপনার কোম্পানির মালিকের থেকেও বিশাল বড় এবং যিনি সকল মালিকেরও মালিক অর্থাৎ আল্লাহ; তিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন তার ডেপুটি হিসেবে, তখন আপনার মনের অনুভূতি আসলে কেমন হবে? এটা কি আরো বড় সম্মানের নয়? আপনি কি আপনার প্রাপ্ত সম্মানের জন্য ন্যায়বিচার করতে আগ্রহী হবেন? আসলেই কি আল্লাহ আমাদেরকে তার প্রতিনিধি হিসেবে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন? আমরা কিভাবে নিশ্চিত হবো? পবিত্র গ্রন্থে কি এই ব্যাপারে কিছু বলা হয়েছে? সুরা বাকারার ৩০ নাম্বার আয়াতে উল্লেখ আছে,
“(হে নবী, স্মরণ করো,) যখন তোমার মালিক (তাঁর) ফেরেশতাদের (সম্বোধন করে) বললেন, আমি পৃথিবীতে (আমার) খলীফা বানাতে চাই; তারা বললো, তুমি কি এমন কাউকে (খলীফা) বানাতে চাও যে (তোমার) ) যমীনে (বিশৃংখলা ও) বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং (স্বার্থের জন্যে) তারা রক্তপাত করবে, আমরাই তো তোমার প্রশংসা সহকারে তোমার তাসবীহ পড়ছি এবং (প্রতিনিয়ত) তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি; আল্লাহ তায়ালা বললেন, আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।“
একজন মানুষ যদি এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতো যে কেন তাকে এই রকম সম্মান মহান আল্লাহতায়ালা দিলেন এবং এখন তাহলে তার দায়িত্বই বা কি হবে?
এই প্রসঙ্গে সুরা আল-আনামে উল্লেখ আছে,
“১৬৫. তিনিই সেই (মহান) সত্তা, যিনি তোমাদের এ যমীনে তাঁর খলিফা বানিয়েছেন এবং (এ কারণে তিনি তোমাদের একজনকে অন্য জনের ওপর (কিছু বেশী) মর্যাদা দান করেছেন, এর উদ্দেশ্যে হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের সবাইকে যা কিছু দিয়েছেন তা দিয়েই তিনি তোমাদের কাছ থেকে (কৃতজ্ঞতার) পরীক্ষা নিতে চান; (জেনে রেখো,) তোমার মালিক শাস্তি দানের ব্যাপারে অত্যন্ত (কঠোর ও) তৎপর, (আবার) তিনিই বড়ো ক্ষমাশীল ও পরম দয়াময় |”
যে সম্মান ও মর্যাদা আমরা পেলাম সেটা আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার সরুপ। তবে মর্যাদার সাথে সাথে দায়িত্ব ও চলে আসে। আল্লাহ বলেন,
“হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা আল্লাহর জন্যে (সত্য ও) ন্যায়ের ওপর সাক্ষী হয়ে অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে থাকো, (মনে রাখবে, বিশেষ) কোনো সম্প্রদায়ের দুশমনী যেন তোমাদের এমনভাবে প্ররোচিত না করে যে, (এর ফলে) তোমরা (তাদের সাথে) ন্যায় ও ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, কারণ এ (কাজ)-টি (আল্লাহ তায়ালাকে) ভয় করে চলার অধিক নিকটতর; তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো; অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে পূর্ণাংগ ওয়াকেফহাল রয়েছেন।“ (সুরা আল-ইমরানঃ ৮)
একজন মুমীনের জন্য ন্যায়বিচার প্রয়োগ করা এবং সত্যকে সমর্থন করা খুবই গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব। আমাদের প্রত্যেকের এই দায়িত্বের প্রতি কিভাবে সাড়া দেয়া উচিত? সুরা বনী ইসরাইলে আল্লাহ আমাদের মনে করিয়ে দেন,
“৭০. আমি অবশ্যই আদম সন্তানদের মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে আমি ওদের চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদের পবিত্র (জিনিসসমুহ দিয়ে) আমি রেযেক দান করেছি, অতপর আমি অন্য যতো কিছু সৃষ্টি করেছি তার অধিকাংশের ওপরই আমি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।”
এই সৃষ্টিজগতে মানুষই হচ্ছে একমাত্র সৃষ্টি যারা প্রশ্ন করতে জানে এবং বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে মহান আল্লাহর অস্তিত্বের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে পারে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দেয়ার পাশাপাশি গাইডও করেছেন এবং সর্তক করেছেন। তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে, শয়তান আমাদের ইমোশনকে কাজে লাগিয়ে সহজেই আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে পারে। ইমোশনের ফাদে আমরা যাতে না পরি সেই ব্যাপারে আল্লাহ আমাদের সতর্ক করেছেন।
সুরা আল-আরাফে আল্লাহ বলেন,
“২৭. হে আদমের সন্তানরা, শয়তান যেভাবে তোমাদের পিতা মাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে, তেমনি করে তোমাদেরও সে যেন প্রতারিত করতে না পারে, শয়তান তাদের উভয়ের দেহ থেকে তাদের পোশাক খুলে ফেলেছিলো, যাতে করে তাদের উভয়ের গোপন স্থানসমুহ উভয়ের কাছে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে, (মুলত) সে নিজে এবং তার সংগী-সাথীরা তোমাদের এমন সব স্থান থেকে দেখতে পায়, যেখান থেকে তোমরা তাদের দেখতে পাও না, যারা (আমাকে) বিশ্বাস করে না তাদের জন্যে শয়তানকে আমি অভিভাবক বানিয়ে দিয়েছি।”
শয়তান যে ধরনের ইমোশনাল লজিক দেয়, সেগুলো বোঝা কি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ? উদাহরনসরুপ বলা যায়, শয়তান এমন কোন প্ররোচনা দিয়েছিলো আদম এবং হাওয়াকে, যে, তারা উভয়েই নিষিদ্ধ গাছ থেকে ফল খেলো?
এই ঘটনাও আমরা সুরা আল-আ’রাফ থেকে জানতে পারি,
“২০. অতঃপর শয়তান তাদের দু'জনকেই কুমন্ত্রণা দিলো যেন সে তাদের নিজেদের লজ্জাস্থানসমুহ, যা তাদের পরস্পরের কাছ থেকে গোপন করে রাখা হয়েছিলো প্রকাশ করে দিতে পারে, সে (তাদের আরো) বললো, তোমাদের মালিক তোমাদের এ গাছটির (কাছে যাওয়া) থেকে তোমাদের যে বারণ করেছেন, তার উদ্দেশ্যে এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, (সেখানে গেলে) তোমরা উভয়েই ফেরেশতা হয়ে যাবে, অথবা (এর ফলে) তোমরা (জান্নাতে) চিরস্থায়ী হয়ে যাবে |
২১. সে তাদের কাছে কসম করে বললো, আমি অবশ্যই তোমাদের উভয়ের জন্যে (তোমাদের) হিতাকাংখীদের একজন ।
২২. এভাবে সে এদের দুজনকেই প্রতারণার জালে আটকে ফেললো, অতঃপর (এক সময়) যখন তারা উভয়েই সে গাছ (ও তার ফল) আস্বাদন করলো, তখন তাদের লজ্জাস্থানসমুহ তাদের উভয়ের সামনে খুলে গেলো, (সাথে সাথে) তারা জান্নাতের কিছু লতা পাতা নিজেদের ওপর জড়িয়ে (নিজেদের গোপন স্থানসমুহ) ঢাকতে শুরু করলো, তাদের মালিক (তখন) তাদের ডাক দিয়ে বললেন, আমি কি তোমাদের উভয়কে এ গাছটির ( কাছে যাওয়া) থেকে নিষেধ করিনি এবং আমি কি তোমাদের একথা বলে দেইনি যে, শয়তান হচ্ছে তোমাদের উভয়ের প্রকাশ্য দুশমন?”
শয়তানের এইসব প্ররোচনা যা সে উভয়ের মাথার ভিতর ঢুকিয়ে দিয়েছিলো, এর প্রতিক্রিয়ায় আদম ও হাওয়া কি করতে পারতেন? তারা যদি এই চিন্তার উপর লজিকাল কিছু প্রশ্ন করতেন তাহলে কি তারা শয়তানের ফিসফিসানিটা ক্রস এক্সামিন করতে পারতেন? লজিকাল প্রশ্নগুলো কেমন হতে পারতো? উদাহরনসরুপ, আল্লাহ কি আমাদেরকে (আদম ও হাওয়া) কোনো ক্ষেত্রে বঞ্চিত করতে পারেন? – যিনি কিনা আমাদের চাওয়ার আগেই অজস্র নেয়ামত দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন? কে সৃষ্টি করে এবং জীবন দেয় - ফল কি আমাদের অনন্ত জীবন দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? কোনটা হওয়া বেশি উত্তম, বুদ্ধি বিবেক জ্ঞান সম্পন্ন মানুষ নাকি জ্ঞান বুদ্ধিহীন ফেরেশতা? কে বেশি জানেন, আল্লাহ-যিনি আমাদের সবাইকে সৃষ্টি করেছেন নাকি শয়তান-যে কিনা নিজেই একটা সৃষ্টি? আমরা যদি কনফিউজড হয়ে যাই, তাহলে আমরা কার কাছে গাইডেন্স চাই-আল্লাহর কাছে নাকি শয়তানের কাছে?
এই প্রশ্নগুলো কি আদম ও হাওয়াকে শয়তানের ফাদ বুঝতে সাহায্য করতে পারতো?
আসুন আমরা একটু নিজেদের দিকেই তাকাই, শয়তান আমাদের চিন্তাভাবনাকে আল্লাহ এবং তার আদেশ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কি কি ধরনের প্ররোচনা দিয়ে থাকে? উদাহরনসরুপ, নামাযের সময় সে কি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কোনও কাজের কথা মনে করিয়ে দেয়? অথবা সে কি আমাদেরকে খেলার শেষ অংশটুকু দেখার জন্য উৎসাহ দেয়? শয়তানের এইসব ফিসফিসানি যা সে আমাদের চিন্তার মধ্যে দিয়ে থাকে তাকে মোকাবেলা করাটা কি গুরুত্বপূর্ন নয়? আল্লাহ আমাদেরকে সুরা আল-আ’রাফে গাইড করছেন এভাবে যে,
“৩৫. হে আদম সন্তানরা (শুরুতেই আমি তোমাদের বলেছিলাম), যখনি তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকে রসুলরা আসবে, যারা তোমাদের কাছে আমার আয়াত পড়ে শোনাবে, তখন যারা (সে অনুযায়ী) আমাকে ভয় করবে এবং (নিজেদের) সংশোধন করে নেবে, তাদের কোনোই ভয় থাকবে না, তারা কখনো দুশ্চিন্তাগ্রস্থও হবেনা ৷
৩৬. আর যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে এবং বড়াই করে এ (সত্য) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তারাই হবে জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরদিন অবস্থান করবে |
৩৭. যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে মিথ্যা আরোপ করে কিংবা তাঁর আয়াতকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে, তার চাইতে বড়ো যালেম আর কে? এরা হচ্ছে সেসব ব্যক্তি, যারা কেতাবে (বর্ণিত দুর্ভাগ্য থেকে) তাদের নিজেদের অংশ পেতে থাকবে, এমনিভাবে (তাদের মৃত্যুর সময়) তাদের কাছে আমার ফেরেশতারা যখন এসে হাযির হবে তখন তারা বলবে (বলো), তারা (এখন) কোথায় যাদের তোমরা আল্লাহ তায়ালার বদলে ডাকতে, তারা বলবে আজ সবাই (আমাদের ছেড়ে) সরে গেছে, তারা (সেদিন) সবাই নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে, তারা সত্যিই কাফের ছিলো.”
আমদেরকে মহান আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং শয়তান ও তার দোসরদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা আল্লাহর কাছে নামাযের সময়/প্রার্থনার সময় নিম্মলিখিতভাবে দোয়া করতে পারি যেমনটা তিনি আমাদের শিখিয়েছেন,
“৮০. তুমি বলো, হে আমার মালিক (যেখানেই আমাকে নিয়ে যাও না কেন), তুমি আমাকে সত্যের সাথে নিয়ে যেও এবং (যেখান থেকেই আমাকে বের করো না কেন) সত্যের সাথেই বের করো এবং তোমার কাছ থেকে আমার জন্যে একটি সাহায্যকারী (রাষ্ট্র) শক্তি প্রদান করো |”
যখন আমরা আল্লাহর কাছে সত্য চাই এবং তিনি আমাদের যে সম্মান দিয়েছেন তার যোগ্য হতে চাই, তখন তিনি সাহায্য করেন এবং শয়তান অদৃশ্য হয়ে যায় এবং তখন আল্লাহ আমাদের জ্ঞান দেখতে/উপলব্ধি করতে সহায়ত করেন। আর আমাদের সামনে তখন বাস্তবতা প্রকাশিত হয়ে যায়, আল্লাহ বলেন,
“৮১. তুমি বলো সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা (চিরতরে) বিলুপ্ত হয়ে গেছে; অবশ্যই মিথ্যাকে বিলুপ্ত হতে হবে |
৮২. আমি কোরআনে যা কিছু নাযিল করি তা হচ্ছে ঈমানদারদের জন্যে (তাদের রোগের) উপশমকারী ও রহমত, কিন্তু এ সত্ত্বেও তা যালেমদের জন্যে ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না |
বিশ্বাসীরা আল-কোরানকে তেমনভাবেই মেনে চলে, যেমনভাবে কেউ একটি জটিল প্রোডাক্টের ম্যানুয়াল মেনে চলে। মহা গ্রন্থ আল-কোরআনের উদ্দেশ্য কি?
সুরা সাদ এর ২৯ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলেন,
“আমি এই মোবারক গ্রন্থটি তোমাদের উপর নাযিল করেছি, যাতে করে মানুষ এর আয়াত সমূহের ব্যাপারে চিন্তা গবেষণা করতে এবং জ্ঞানবান লোকেরা তা থেকে উপদেশ গ্রহন করতে পারে”