03/07/2019
হযরত মাওলানা মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (১৯৪৮-২০০৮)
ভাইস প্রিন্সিপাল, খালাশ পীর ফাজিল মাদরাসা।
-------------------------------------------------------------------
১. জন্ম : মাওলানা নুরুল ইসলাম (রহ.) ১৯৪৮সালে ২০শে জানুয়ারি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানাধীন চিলাখাল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ইয়াসিন আলী খন্দকার (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ, সুশিক্ষিত ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। মাতা রাহেলা খাতুন ছিলেন একজন দীনদার পর্দাশীন মহিলা ।
২. শিক্ষা জীবন : তিনি ছোটবেলা থেকেই প্রখর মেধাবী ও তীক্ষ্ম বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। উর্দূ, ফার্সি ও আরবী ভাষার প্রাথমিক শিক্ষা তার দাদা ইউসুফ আলী (রহ.)-এর নিকট অর্জন করেন। অত:পর ১৯৬০ সালে মিঠাপুকুর থানাধীন বুর্জক-সন্তোষপুর ফাজিল মাদরাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হোন। তিনি সেখান থেকে ১৯৬৩ সালে দাখিল এবং ১৯৬৭ সালে আলিম সমাপ্ত করেন। অত:পর পীরগঞ্জ থানাধীন খালাশপীর ফাজিল মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ১৯৬৯ সালে ফাজিল সমাপন করেন। অত:পর উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বগুড়া সরকারি মুস্তফাবিয়া আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ১৯৭১ সালে কামিল সমাপ্ত করেন। মাওলানা নুরুল ইসলাম (রহ.) ছাত্রজীবনে বরাবরই প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তার প্রখর মেধা ও বুদ্ধিমত্তার কারণে তিনি সকল ওস্তাদগণের নিকটে প্রিয়পাত্র হয়েছিলেন।
৩. কর্ম জীবন : ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর তিনি রংপুর পুলিশ লাইনে A.S.I পদে যোগদান করেন। ছয় মাস চাকুরী করার পর পিতার পরামর্শে তিনি এ পদ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যহতি গ্রহণ করেন। অত:পর ১লা জুন ১৯৭২ সালে দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ থানাধীন বোয়ালমারি কাচদহ দ্বিমুখী ফাজিল মাদরাসায় প্রভাষক পদে যোগদান করেন। সেখানে এক বছর শিক্ষকতার পর ১৬ই মে ১৯৭৩ সালে তার ওস্তাদের নির্দেশে পীরগঞ্জ থানাধীন খালাশপীর ফাজিল মাদরাসায় ভাইস প্রিন্সিপাল পদে যোগদান করেন। তিনি দক্ষতা ও একনিষ্ঠতার সাথে আমৃত্যু এ দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে প্রিন্সিপাল পদ শূন্য হলে একমাত্র আখেরাতের জবাবদিহিতার ভয়ে তিনি এ পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তীতে অপারগ হয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল হিসেবে তিনি এ দায়িত্ব পালন করেছেন; তবে এ পদ গ্রহণ করেন নি।
৪. পাঠদানে দক্ষতা : মাওলানা নুরুল ইসলাম (রহ.) ছিলেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী, বিদগ্ধ আলেম ও গবেষক। ইলমে দীনের প্রতিটি শাখায় তার অবাধ বিচরণ ছিল। মিশকাত শরীফের অধিকাংশ হাদিস ও অনেক কিতাবের মতন(মূলপাঠ) তার মুখস্ত ছিল।তিনি দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সাথে তাফসীরে জালালাইন , মিশকাত শরীফ ও হিদায়া কিতাবের দরস দিতেন। তার দরস ও বয়ানে ছাত্ররা মুগ্ধ হয়ে যেতো। আরবী, উর্দূ, ফারসী ও ইংরেজী ভাষায় তার যথেষ্ট দখল ছিল। তিনি অত্র এলাকার আলেম-ওলামার কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে দীনি সমস্যার সমাধান দিতেন। ইলমে ফারায়িয ও গাণিতিক বিদ্যায়ও তার দক্ষতা ছিল অসাধারণ। সেটেলমেন্ট সার্ভ ও কোর্ট বিষয়ক তিনি ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শদাতা।
৫. চারিত্রিক গুণাবলি : তিনি প্রশাসনিক বিষয়ে জালালী তবিয়তের লোক ছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একেবারে সাধা-সিধে মানুষ। মাওলানা নুরুল ইসলাম (রহ.) ছিলেন দুনিয়াবিমুখ একজন আল্লাহওয়ালা বুযুর্গ ব্যক্তি। তিনি ছিলেন নববী চেতনায় উজ্জীবিত একজন প্রকৃত আশেকে রাসূল। আমানতদারিতা ও তাকওয়া-পরহেযগারীতে তিনি ছিলেন অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। আকাবির-আসলাফ ও উস্তাদগণের প্রতি তার ভক্তি- শ্রদ্ধা ছিল বর্ণনাতীত। আখেরাতের জবাবদিহিতার বিষয়ে তিনি সর্বদা চিন্তিত থাকতেন। সব সময়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র অবস্থায় থাকা ছিল তার স্বভাবজাত গুণ। লেনদেনের সচ্ছতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বিরল ব্যক্তিত্ব। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় তিনি সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। অভাবী ও অনাথের প্রতি তিনি ছিলেন উদার ও মহানুভব। অনেক সময় তিনি সৃষ্টির মাঝে মহান স্রষ্টার হিকমত ও কুদরতের অন্বেষণে থাকতেন বিভোর। প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন আলেমে হক্কানী ও রব্বানী।
৬. বিশিষ্ট ওস্তাদবৃন্দ : তিনি অর্ধশতাধিক ওলামায়ে কেরামের নিকট শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন। তন্মধ্যে অন্যতম হলেন -
১. হযরত মাও. মোবাশশের হুসাইন (রহ.), প্রিন্সিপাল, বর্জক সন্তোষপুর ফাজিল মাদরাসা।
২. হযরত মাও. আবদুর রহমান বাবনপুরী (রহ.), প্রিন্সিপাল, খালাশপীর ফাজিল মাদরাসা।
৩. হযরত মাও. আবু তাহের মুহাম্মদ সালেহ উদ্দীন, প্রিন্সিপাল, খালাশপীর ফাজিল মাদরাসা।
৪. হযরত মাও. আবু নসর মুহাম্মদ নজীবুল্লাহ (রহ.), প্রিন্সিপাল, বগুড়া সরকারি মুস্তফাবিয়া আলিয়া মাদরাসা।
৫.হযরত মাও. মাহবুবুর রহমান (রহ.), ভাইস প্রিন্সিপাল, প্রতাপনগর আবু বকর সিদ্দিক ফাজিল মাদরাসা, সাতক্ষীরা। তিনি তার রুহানি শায়েখ ছিলেন।
৭. উল্লেখযোগ্য ছাত্রবৃন্দ : শিক্ষকতার ৩৫ বছরে তার নিকট হাজার হাজার ছাত্র শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন -
১. মাও. আনিসুর রহমান, প্রিন্সিপাল, বোয়ালমারি কাচদহ ফাযিল মাদরাসা, নবাবগঞ্জ, দিনাজপুর।
২. মাও. নেসার আহমদ, ভাইস প্রিন্সিপাল, পীরগঞ্জ ফাজিল মাদরাসা।
৩. মাও. আব্দুল মুমিন, ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল, সরলিয়া ফাজিল মাদরাসা, পীরগঞ্জ।
৪. মাও. গোলাম সাকালাইন,
সহকারী অধ্যাপক, জাফরপাড়া কামিল মাদরাসা, পীরগঞ্জ, রংপুর।
৫. মাও. শাহাদাতুল ইসলাম, প্রভাষক, ধাপসাত গড়া কামিল মাদরাসা, রংপুর।
৬. মাও. রুহুল আমীন, প্রভাষক, মির্জাপুর কাদিরিয়া ফাজিল মাদরাসা, মিঠাপুকুর, রংপুর।
৮. বৈবাহিক জীবন : তিনি ১৯৭৪ সালে খালাশপীর মধ্যপাড়া নিবাসী মুন্সী কাউসার আলী (রহ.)-এর বড় মেয়ে নুরুন্নাহার বেগমের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হোন। পরর্বতীতে তিনি অত্র এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। পারিবারিক জীবনে তিনি এক স্ত্রী, তিন ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে যান। ছেলেদের প্রত্যেকে কওমি ও সরকারি উভয় শিক্ষাধারায় শিক্ষিত আলেম ও গবেষক। বড়ছেলে মাওলানা মুহাম্মদ আনওয়ারুস সালাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে এসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত আছেন। মেঝো ছেলে মুফতি আলতাফুর রহমান মাহমূদ ঢাকা’র স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান মারকাজুল উলূম আল ইসলামিয়ায় মুহাদ্দিস পদে কর্মরত আছেন। আর ছোটছেলে হাফেজ ওবায়দুল্লাহ আহমাদ ফারুক এখনও শিক্ষানবিস। আর মেয়েদের সকলে সুশিক্ষিত ও বিবাহিত।
৯. রচনাবলি : হযরত মাওলানা নূরুল ইসলাম (রহ.) কর্মব্যস্ততার মধ্যেও বিভিন্ন বিষয়ে বইপত্র লিখেছেন। তবে, সেগুলো পান্ডুলিপি আকারে রয়েছে। তন্মধ্যে ১.কুরআন ও হাদীসের আলোকে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা, ২. মিলাদ-কিয়ামের শেষ কথা, ৩.শ্রেষ্ঠ রাসূল মুহাম্মদ(সা.), ৪.ঈমানের সাতাত্তর শাখা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১০. ইন্তেকাল : বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এ মনীষী হাজার হাজার ছাত্র ও ভক্তবৃন্দকে শোকাতুর করে ২০০৮ সালে ১২ সেপ্টেম্বর ১১ই রমযান বৃহ:বার দিবাগত রাত আড়াইটায় মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে ইহজগত ত্যাগ করেন। চন্দ্রবর্ষ মোতাবেক তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।পরে দিন ১২ই রমযান বাদ জুমা পারিবারিক কবরস্থানে স্বীয় পিতার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হোন। ইন্নালিল্লাহি ও ইন্নাইলাহি রাজিঊন। আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করুন এবং তার দীনি খেদমতসমূহকে কবুল করুন এবং তাকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন। আমীন।