27/04/2025
নাট্যকলাঃ ভাইবা অভিজ্ঞতা
জবি, পজিশন: ২৫ তম
পরীক্ষার্থী: মোঃ কামরুল হাসান
সেশন: ২৩-২৪
১.
রুমে ৪ জন পরিক্ষক ছিলেন। হাতের ডান পাশে দুজন নারী, বামপাশে দুজন পুরুষ শিক্ষক ছিলেন। ডান দিক থেকে প্রথমজন রাগান্বিত ভাবে ছিলেন, পরেরজনও কিছুটা এমন ছিলেন। বাম দিক থেকে প্রথমজন একদমই শান্ত ছিলেন, পরেরজন সবার সিনিয়র ছিলেন, খুবই হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন।
আমিঃ সালাম দিয়ে হাসি মুখে সবার সাথে আই কন্টাক্ট রেখে প্রবেশের অনুমতি চাইলাম।
বোর্ড সদস্যগণ: হাস্যোজ্জ্বল মুখে আসতে বললেন।
ঢুকে তাঁদের সামনে দাঁড়ালাম। আবারও সালাম দিলাম।
২য় স্যার: আপনার এডমিট কার্ডটা দিনতো।
(দিলাম। স্যার এডমিট কার্ড দেখে প্রশ্ন করলেন।)
“আপনার নাম মোঃ কামরুল হাসান?”
আমি: জি, স্যার।
স্যার: বাংলাদেশ আপনার নামে একজন বিখ্যাত লোক আছেন, যাকে পটুয়া বলা হয়, শুনেছেন?
আমি: জি স্যার। তাঁর নাম পটুয়া কামরুল হাসান। স্যার: তাঁর অবদান কি? কেন বিখ্যাত?
আমি: স্যার, তিনি আমাদের জাতীয় পতাকার রূপকার। এজন্য তিনি অমর হয়ে আছেন।
স্যার: বেশ। আচ্ছা, জাতীয় পতাকার প্রথম ডিজাইনার কে ছিলেন?
আমি: শিব নারায়ণ দাস।
স্যারঃ বাহ্, সাব্বাস, ভেরি গুড…! আচ্ছা, পটুয়া কামরুল হাসানের সর্বশেষ চিত্রকর্মের নাম কি, জানেন?
আমি: দুঃখিত স্যার। জানা নেই।
স্যার: একটু মনে করার চেষ্টা করুন, পারবেন। (উনি একটু হিঙ্স দিলেন, তবুও মনে পড়েনি)
আমি: (কিছুক্ষণ চিন্তা করে) সরি স্যার, মনে পড়ছেনা।
এরপর ১ম ম্যাম: কিছুটা বিরক্তের সাথে, আপনার মার্কসিটে পিতা ও মাতার নামে কলম দিয়ে কাটা কেন?
আমি: উত্তর দিয়েছি। কিছুটা উৎকন্ঠ হয়ে জিগ্যেস করেছেন, “সার্টিফিকেটেও কি ভুল?”
আমি: “না স্যার, সার্টিফিকেট, এনআইডি সংশোধন করেছি, সার্টিফিকেটের প্রেশ কফি নিয়েছি, মার্কসিটের প্রেশ কফির আবেদন করেছি। দ্রুত পেয়ে যাব।”
২য় ম্যাম: অভিজ্ঞতার কোন কিছু আছে?
আমি: জি, স্যার। আছে।
(স্কুল, কলেজ জীবনের সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সনদ, আমাদের নিজদের নির্মিত টেলিভিশন নাটকে অভিনয়, বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতার স্থীরচিত্র সংবলিত ফাইল দিলাম।)
১ম ম্যাম: তাহলে এখানে রাখুন। আর আপনি আরও একটু পেছনে গিয়ে দাঁড়ান।
(কেউ সনদ দেখছেন, কেউ নাটক, অনুষ্ঠানের স্থিরচিত্রগুলো দেখছেন।)
১ম ম্যাম: আপনি অনলাইনে আবৃত্তি করেছেন, অনুষ্ঠান করেছেন, টেলিভিশন নাটকও করেছেন, এগুলো প্রিন্ট করে নিয়ে এসেছেন। কে বলেছে এভাবে এগুলো আনতে?
আমি: স্যার, আমি নিয়ে এসেছি।
ম্যাম: নাট্যকলায় পড়ে এমন কারো সাথে কথা হয়েছে? পরিচয় আছে?
আমি: সেরকম পরিচয় নেই স্যার। পরীক্ষার কয়েকদিন আগে যোগাযোগ করেছি কয়েকজন সিনিয়র ভাইয়ের সাথে।
ম্যাম: কার সাথে যোগাযোগ করেছেন? নাম কি?
আমি: নাম মনে আসছিলো না। আমতা আমতা করে একজনের নাম বলেছি।
ম্যাম: বিরক্তের সাথে ওতো গ্রাজুয়েশন শেষই করেনি, থার্ড ইয়ার শেষ করে চলে গেছে। ওর থেকে কি বুদ্ধি নিয়েছেন? আর কারো সাথে কথা হয়েছে?
আমি: আমি যে ভাইয়ের সাথে বেশি কথা বলেছি এবার তার নাম মনে পড়েছে। বললাম।
ম্যাম: আচ্ছা। ও বলেছে এগুলো প্রিন্ট করে আনতে?
আমি: না, স্যার। আমিই এনেছি।
ম্যাম: দেখছিতো সব টেলিভিশন নাটক করেছেন! এসব করে কি সুপার স্টার হয়ে যাবেন? নায়ক হবেন, এত সহজ? (উনি শুরু থেকেই রাগ রাগ মেজাজে ছিলেন)
টেলিভিশন নাটক করেছি শুনামাত্র দ্বিতীয় ম্যাম বিস্ময়ের চোখে বললেন, “টেলিভিশন নাটক!” পরে ১ম ম্যাম আমার কাগজগুলো উনাকে দিলেন, এবার ঐ ম্যাম মনোযোগের সাথে দেখছিলেন। অন্য স্যারগণ সনদগুলো দেখছেন। ধাপে ধাপে সবাই খুব গুরুত্বের সাথে সবগুলো দেখেছেন)
২য় স্যার: সনদগুলো দেখছেন আর জিগ্যেস করেছেন, “ইসলামিক ফাউন্ডেশনে আপনার পরিচিত কেউ আছে?”
আমি: না, স্যার।
১ম ম্যামের মেজাজ দেখে ততোক্ষণে আমার হাঁটু কাঁপা শুরু করেছে। ভয় পাইছি রীতিমতো যদিও আমি শুরু থেকেই খুবই কনফিন্ট ছিলাম, অন্তত নার্ভাস হবোনা। আমি ভেবেছি উনি খুবই বিরক্ত হয়েছেন এগুলো দেখে! তবুও মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করেছি।
ম্যাম: সুবর্ণ নাট্যদল। এটা আপনাদের সংগঠন?
আমি: জি, স্যার। আমাদের সংগঠন। আমরা অবসর সময়ে শখের বশে নিজেরা নাটক নির্মাণ করি।
ম্যাম: টেলিভিশন নাটকি করেছেন শুধু? কোন মঞ্চ নাটক দেখেছেন সরাসরি বা নিজে অভিনয় করেছেন? করলে কোথায় করেছেন?
আমি: স্যার, ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে নিজেরা করি সংগঠনের আয়োজনে বিভিন্ন ভুমিহীন সমাবেশে অভিনয় করেছি। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দিবসে মঞ্চ নাটক করেছি। যখন যেটার সুযোগ পাই। স্যার, কিছুদিন আগে স্থানীয় সরকার দিবসে উপজেলা শিল্পকলা মঞ্চে আমার রচনা ও নির্দেশনায় “বিজয়ের পথে” নাটকটি মঞ্চায়ন করেছি। আমি মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার চরিত্র অভিনয় করেছি।
ম্যাম: আচ্ছা।
এবার দ্বিতীয় ম্যাম: গান গাইতে পারেন?
আমি: জি, স্যার।
ম্যাম: তাহলে শুনানতো একটা। কি গান শোনাবেন?
ম্যাম: ভাওয়াইগা গান। বন্দে মায়া লাগাইসে পিরিতি শিখাইসে– গাইতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ পর থামিয়ে বললেন, “এ গানটি কে লিখেছেন?
আমি: বাউল শাহ আব্দুল করিম।
বামদিক থেকে ২য় স্যার: একটা বইয়ের পৃষ্টা খুলে বললেন, “এটা পড়ুনতো।”
আমি: যথোচিতভাবে পড়লাম। উচ্চারণ, বাচনভঙ্গিতে বেশ সন্তোষ্ট হয়েছেন বুঝেছি। কিন্তু ভুল করেছি ‘ভগ্নী’ শব্দকে ভাগ্নি পড়েছি। পড়া শেষে স্যার আবার পড়তে বললেন, আবারও এ ভুল করেছি। এবার বললেন, “শব্দটা কি ভাগ্নি?”
আমি: লজ্জা পেলাম। দুঃখপ্রকাশ করেছি।
এবার বাম পাশ থেকে ১ম স্যার: আচ্ছা, আপনার বাড়িতো নোয়াখালী, মুনীর চৌধুরীর কয়েকটি নাটকের নাম বলুন।
আমি: বলতে পারছিলাম না। পরে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, “কপালকুণ্ডলা”
স্যার: এটা কি নাটক?
আমি: আমি নার্ভাস হয়ে যাই, “হ্যাঁ” বলেছি!
১ম ম্যাম: এটা উপন্যাস, নাটক না!
স্যার: নাট্যকলায় পড়তে চান। আচ্ছা, কয়েকজন নাট্যকারের নাম বলুন।
আমি: (চট করে মাথা থেকে চলে গেছে। অবাক হয়েছি একজনের নামও মনে পড়েনি!) ২০ সেকেন্ড পর সেলিম আল দীন স্যারের নাম বলেছি। পরে মুনীর চৌধুরীর নামও বলেছি।
(মুনীর চৌধুরীর নাম বলায় ম্যাম একজন হাসলেন, কারণ উনার নাম স্যার আগেই জিগ্যেস করেছেন)
স্যার: আচ্ছা, সেলিম আল দীনের কয়েকটি নাটকের নাম বলুন।
আমি: ‘চাকা’ নাটকের নাম বলেছি। আরগুলো মনে পড়েনি।
স্যার: আচ্ছা, ‘চাকা’ নাটকটি পড়েছেন?
আমি: দুঃখিত স্যার, পড়া হয়নি।
(এ মুহূর্তে খুবই নার্ভাস ছিলাম, কারণ, এ সহজ প্রশ্ন উত্তর না দিতে পেরে আত্মবিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে গেছে)
২য় ম্যাম: আচ্ছা, নাট্যকলায় কেন পড়তে চান?
আমি: স্যার আমার আবাল্য শখ অভিনয়। শৈশব থেকেই অভিনয় শিল্পকে গভীরভাবে অনুভব করি, হৃদয়ে ধারণ ও লালন করি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস এখানে আমি ভাল করবো ইনশাল্লাহ।
ম্যাম: (উনি শুরু থেকেই মেজাজি ছিলেন। উত্তর দিতে পারি বা না পারি প্রশ্ন সব রাগান্বিত কন্ঠে করেছেন।) আচ্ছা দেখি, করে দেখানতো অভিনয়। পারবেন এখন?
আমি: জি, স্যার। পারবো।
ম্যাম: তাহলে শুরু করেন, দাঁড়ায় আছেন কেন? দ্রুত শুরু করুন।
আমি অপ্রস্তুত ছিলাম। তবু হুট করে অভিনয় শুরু করলাম।
লায়ালগ দিচ্ছিলাম: সৃজিতা, আমি তোমাকে শেষবারের মতো অনুরোধ করছি। তোমার পিতার আত্ম অহমিকা, ভাব-গাম্ভীর্যের কাছে আমার সত্য, স্বতসিদ্ধ, বিশুদ্ধ ভালোবাসাতে কলঙ্ক লেপন করোনা। আমি তোমাকে ভালোবাসি। এটা সত্য। তুমি না চাইলে জোর করবোনা, কাপুরুষের মতো পালাতেও বলোবনা, কিন্তু তোমার বাবার ধন সম্পদ ঐশ্বর্যের কাছে আমার প্রেমের কবর রচনা করোনা প্লিজ, সৃজিতা, প্লিজ, প্লিজ। বিশ্বাসের সাথে আমার হাত ধরো, তোমার সাথে আমি আজীবন থাকতে চাই। (এভাবে হবহু এ ডায়ালগ দিতে দিতে শেষ করেছি)
উনারা সবাই একচু চুপসে গেলেন। একজন আরেকজনের সাথে চোখাচোখি করছেন।
পরে ২য় স্যার বললেন: আচ্ছা, আপনি যার সাথে সারাজীবন থাকতে চান, তার নামটা যেন কি বললেন?
আমি: স্যার, সৃজিতা।
উনি খাতায় কি যেন লিখলেন, সৃজিতা নাম লিখলেন না নম্বর দিলেন বুঝিনি।
১ম ম্যাম: বাম দিকের স্যারকে ঈশারা করে জিগ্যেস করলেন, “আপনি আর কিছু জিগ্যেস করবেন স্যার?” স্যার বললেন, “না, থাক”।
ম্যাম বললেন, “ আপনি আসতে পারেন” তাও রাগ মেজাজে।
ততোক্ষণে আমি চান্স পাবার আশা ছেড়ে দিয়েছি।
চলে আসছিলাম, দরজার কাছাকাছি এসে সবেমাত্র দরজা টান দেব এমন সময় ঐ রাগ রাগ মেজাজের ম্যাম জোরে হাঁকলেন, “১ মিনিট…”।
আমি স্বাভাবিক হাস্সোজ্জল কন্ঠে পেছন ফিরে, “জি, স্যার”।
ম্যাম: না, আপনাকে না। আপনি আসতে পারেন।