14/11/2025
যারা সম্প্রতি শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হলেন:
শিক্ষা ক্যাডারের বৈধ কিছু সুযোগ সুবিধা নিয়ে কিছু আলোচনা করার।
🟦প্রথমেই আসি যোগদানের পর আপনার স্যালারি ফিক্সেশন নিয়ে:
যোগদানের পর ১-২ মাস সময় লাগবে স্যালারি ফিক্সেশন হতে। জটিলতা থাকলে কারও কারও ক্ষেত্রে সময়টা ৩ মাসে গিয়েও ঠেকতে পারে। তবে যেই মাসে যোগদান করবেন ফিক্সেশন হলে ঐ মাস থেকেই স্যালারি পাবেন। বকেয়া থাকলেও ফিক্সেশনের পর সব একসাথে পাবেন। ধরুন যোগদান করলেন ১০ জানুয়ারি, ২০২৬, আর স্যালারি ফিক্সেশন হলো ১ মার্চ, ২০২৬। তাহলে আপনি জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি মাসের স্যালারি মার্চ মাসে একসাথে পেয়ে যাবেন।
৯ম গ্রেড হিসেবে আপনি ২২,০০০/- টাকা মূল বেতনে যোগদান করলেও একটি গেজেটেড পোস্ট হিসেবে আপনি শুরু থেকেই একটি অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট পাবেন। সেক্ষেত্রে আপনার মূল বেতন হবে ২২০০০ + (২২০০০ × ৫%) = ২৩১০০/-
এর সাথে উপজেলায় পোস্টিং হওয়ায় মূল বেতনের ৪০% বাড়ি ভাড়া পাবেন: ২৩১০০ × ৪০% = ৯২৪০/-
বিশেষ প্রণোদনা মূল বেতনের ১০% = ২৩১০০ × ১০% = ২৩১০/-
চিকিৎসা ভাতা= ১৫০০/-
শিক্ষা ভাতা (১ সন্তান পর্যন্ত) = ৫০০/- {২ সন্তান হলে ১০০০/-)
সর্বমোট গ্ৰস স্যালারি= ২৩১০০+৯২৪০+২৩১০+১৫০০+৫০০ = ৩৬,৬৫০/-
এই গ্ৰস স্যালারি থেকে কর্তন হবে = যৌথ বীমা ও কল্যাণ তহবিলের জন্য ২৫০ টাকা, আয়কর ২৫০ টাকা এবং স্ট্যাম্প ১০ টাকা, মোট= ৫১০/-
সুতরাং জিপিএফ না কাটালে আপনি উত্তোলন করতে পারবেন = ৩৬,১৪০/-
(২ বছর পর জিপিএফ কাটানো বাধ্যতামূলক)
পহেলা বৈশাখে পাবেন মূল বেতনের ২০% এবং দুই ঈদে মূল বেতনের সমপরিমাণ দুইটা বোনাস পাবেন।
🔹এছাড়াও যাদের অনার্স বা মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণী (সিজিপিএ ৩) আছে তারা আরও একটা অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট পাবেন। এটা পেতে স্যালারি ফিক্সেশনের পর কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। তবে যখনই পান সেটা প্রথম মাসের স্যালারি থেকে কাউন্ট হবে এবং বকেয়া আকারে প্রথম মাসের স্যালারি থেকেই দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে মূল বেতন হবে ২৩১০০ + (২৩১০০ × ৫%)
= ২৪২৫৫/-
এটা টেকনিক্যাল বা পেশাগত ক্যাডারেই দেওয়া হয়, জেনারেল ক্যাডারে দেওয়া হয় না।
এই হলো আপনার বেতন-ভাতা।
🟪 বেতন ভাতার বাইরে বৈধ ইনকাম:
আপনার কলেজে যদি শুধু উচ্চমাধ্যমিক থাকে (বা অনার্স মাস্টার্স না থাকে) তাহলে বেতন ভাতার বাইরে বৈধ আয় খুব একটা থাকবেনা। এছাড়াও উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও ঢাকার কলেজগুলোর মধ্যেও বেতনের বাইরে বৈধ আয়ের আকাশ-পাতাল পার্থক্য ঘটে। এক্ষেত্রে আয়ের উৎস নিম্নরূপ:
(ক) কলেজের অভ্যন্তরীণ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা:
১ম বর্ষের হাফ ইয়ারলি এবং ইয়ারলি পরীক্ষা এবং ২য় বর্ষের প্রি-টেস্ট ও টেস্ট পরীক্ষা। এই পরীক্ষাগুলোতে ডিউটি দিলে পার ডিউটিতে আপনি কলেজ ভেদে গড়ে ৫০০-৬০০ টাকা পাবেন। চারটি পরীক্ষায় ৫ টি করে ডিউটি দিলে এক্ষেত্রে আপনার আয় ২০ × ৫০০ = ১০,০০০/-
এরসাথে প্রশ্ন করা (প্রতি প্রশ্ন ২০০-৩০০/-) ও খাতা দেখা বাবদ (প্রতি খাতা ৭-১০ টাকা) আরও ৮-১০ হাজার পাবেন, যদিও প্রশ্ন সবসময় আপনিই করবেন তা নয়। এছাড়াও খাতাও যে সব আপনি একাই দেখবেন তাও নয়। সুতরাং প্রশ্ন করা ও খাতা দেখার টাকার অর্ধেক ধরলে এক্ষেত্রে আপনার প্রাপ্তি ৪-৫ হাজারের ঘরে। আর যদি ডিপার্টমেন্টে আপনি একাই থাকেন (অন্য কোন শিক্ষক না থাকলে) তাহলে পুরোটাই আপনার। উপজেলার কলেজে সিঙ্গেল ম্যান হিসেবে আপনি পরে যেতেও পারেন।
(খ) এছাড়াও কলেজে ডিগ্রি থাকলে ডিগ্রির প্রশ্ন করা, ডিউটি দেওয়া এবং খাতা দেখা বাবদ আরও ৪-৫ হাজার পাবেন।
(গ) এর বাইরেও কলেজের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা কমিটির সদস্য হলে আপনি একটি পরীক্ষা পরিচালনা বাবদ ১৫-২০ হাজার টাকা পেতে পারেন। সাধারণত বছরে ন্যূনতম একটি কমিটি আপনি পেতে পারেন। তবে যোগদানের পর এক দেড় বছর অতিবাহিত না হলে অনেক কলেজে কমিটি দিতে চায় না।
(ঘ) আপনার কলেজ উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষার সেন্টার থাকলে এবং আপনি বোর্ড পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সদস্য হলে আরও ১৫-২০ হাজারের মতো পাবেন।
(ঙ) উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষার ডিউটি দিলে তিন ঘণ্টার একটি ডিউটি বাবদ ২০০-৩০০ টাকা পাবেন। (জাতি গড়ার কারিগরদের রাষ্ট্রের সম্মান এটুকুই; তিন ঘণ্টায় ২০০ টাকা!)
(চ) এছাড়াও পরীক্ষা ছাড়াও কলেজে আরও বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম থাকে। যেমন: রেড ক্রিসেন্ট, রোবার, বিএনসিসি, বিভিন্ন ক্লাব, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, অভ্যন্তরীণ ক্রয় কার্যক্রম, ইত্যাদি। এসকল ক্ষেত্রে আপনি যদি সংশ্লিষ্ট কমিটিতে থাকেন বা দায়িত্বে থাকেন তাহলে বছরে হয়তো আরও ৮-১০ হাজার টাকা পেতে পারেন।
সব মিলিয়ে উপজেলা পর্যায়ের উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে পদায়ন হলে বছরে (প্রতি মাসে নয়) বেতন ভাতার বাইরে আপনার গড়ে ৩০-৪০ হাজার টাকা থাকবে। বড় কোন কমিটি পেয়ে গেলে হয়তো এই অঙ্ক ৫০+ হতে পারে বছরে (প্রতি মাসে নয়) (যোগদান পরবর্তীতে ১-২ বছর না গেলে বড় কমিটি হয়তো মিলবে না)
🟥জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স মাস্টার্স ভুক্ত কলেজ হলে:
আপনার পদায়ন যদি উপজেলা পর্যায়ের এমন কলেজে হয় যেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্স মাস্টার্স আছে তাহলে আপনার ইনকাম আরও বাড়বে। এক্ষেত্রে কলেজগুলো নিম্নরূপ হয়ে থাকে-
(ক) আপনি যে বিষয়ে যোগদান করেছেন ঐ বিষয়ে অনার্স সহ আরও ৭/৮ টা সাবজেক্টে অনার্স আছে। এক্ষেত্রে প্রতি মাসে গড়ে ৩-৪ হাজার টাকা থাকবে।
(খ) আপনার নিজ বিষয়ে অনার্স নেই তবে অন্যান্য ৭/৮ বিষয়ে অনার্স আছে। এক্ষেত্রে প্রতি মাসে গড়ে ৫-৬ হাজার টাকা থাকবে।
(গ) আপনার নিজ বিষয় সহ ১০-১৫ টি বিষয়ে অনার্স আছে। (সাধারণত উপজেলা পর্যায়ের খুব কম কলেজেই এটা থাকে): এক্ষেত্রে মোটামুটি ভালো আয় থাকে, প্রতি মাসে গড়ে ৮-১০ হাজার টাকা থাকবে।
(ঘ) এছাড়াও আপনার কলেজ যদি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা কেন্দ্র হয় তাহলে প্রতি পরীক্ষার ডিউটি বাবদ ৫০০-৬০০ টাকা পাবেন। এক্ষেত্রে প্রচুর ডিউটি থাকে,, কেননা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সারাবছর লেগেই থাকে। অনার্স, মাস্টার্স, প্রিলি টু মাস্টার্স, ডিগ্রী - এই পরীক্ষাগুলোর ডিউটি দিয়েও বছরে ভালো ইনকাম থাকে। যেমন অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় গড়ে ৬-৭ টা ডিউটি দেওয়া যায়। এভাবে ২য়, ৩য়, ৪র্থ, মাস্টার্স, প্রিলি টু মাস্টার্স, ডিগ্রি - প্রতিটিতেই গড়ে ৫/৬ টা করে ডিউটি থাকে। সেই হিসেবে -
চার বছরের অনার্সে - ৪×৬ = ২৪ টা ডিউটি (প্রতি বছর ৬ টা করে ধরে)
মাস্টার্সে- ৬ টা
প্রিলি টু মাস্টার্সে - ৫ টা
ডিগ্রিতে- ৬ টা
মোট: ৪০+ ডিউটি থাকে। প্রতি ডিউটি ৬০০ করে ধরলেও ৪০×৬০০ = ২৪০০০ টাকা থাকে বছরে।
(ঙ) এর বাইরে আপনার কলেজ যদি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স মাস্টার্স পরীক্ষার কেন্দ্র হয় তাহলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে একটি কমিটি পরিচালনা বাবদ আপনার গড়ে ৪০-৫০ হাজার টাকা সম্মানী থাকবে (ন্যূনতম ৩০০০ হাজার পরীক্ষার্থী ধরে)। পরীক্ষার্থী আরও বেশি হলে সম্মানী আরও বৃদ্ধি পায়। চাকরির ১ বছর অতিবাহিত হলে সাধারণত বছরে এধরনের একটি কমিটি পেতে পারেন (যদি আপনার কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স পরীক্ষা কেন্দ্র হয়)
(চ) পরীক্ষক হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স, মাস্টার্স ও ডিগ্রি পরীক্ষার খাতা দেখেও আপনি বছরে ৫০,০০০+ ইনকাম করতে পারেন। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় একজন পরীক্ষককে প্রতি খাতার জন্য ৫০/- টাকা সম্মানী দেয় এবং প্রতি ইয়ারের ন্যূনতম ২৫০ টি খাতা দিয়ে থাকে। এই হিসেবে আপনি যদি অনার্স ১ম-৪র্থ বর্ষের ২৫০×৪ = ১০০০ খাতা দেখেন, এতেই আপনার সম্মানী ৫০,০০০/- টাকা থাকবে।
তবে এটার জন্য আপনাকে প্রথম থেকেই বেশ দৌড়ঝাঁপ করতে হতে পারে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতা দেখার জন্য পরীক্ষক হতে আপনাকে প্রথমেই TMIS আইডি খুলতে হবে। উপজেলার কলেজগুলোতে এই কাজে খুব একটা সহযোগিতা নাও পেতে পারেন। এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে কিংবা সিনিয়র স্যারদের পরামর্শে কাজ করতে হবে। এই আইডি খোলার নিয়ম ইউটিউবে সার্চ করলেই পাবেন। তবে এক্ষেত্রে একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন: আইডি খোলার পরেই যে আপনি খাতা পাবেন তেমনটা নাও হতে পারে। এরজন্য আপনাকে ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক অফিসে সশরীরে যেতেও হতে পারে। কষ্ট করে একবার যে-কোনভাবে এই যাত্রায় সফল হলে বছরে লাখ টাকার কাছাকাছি খাতা দেখার সম্মানী পেতে পারেন। উপজেলার কলেজ হলে এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক অফিস থেকে বেশি দূরে হলে সাধারণত খাতা দিতে চায় না। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দৌড় ঝাপ করেই কাজ করতে হবে। সিনিয়র স্যারদের পরামর্শও নিতে পারেন। তবে যাইহোক, TMIS এবং TTIS আইডি অবশ্যই খুলে রাখবেন।
(ছ) একইভাবে উচ্চমাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষার খাতা দেখেও ভালো ইনকাম করা যায়। এক্ষেত্রেও একটি আইডি খোলার প্রয়োজন হয়, যোগদানের পর এটাও খুলে রাখবেন এবং একইভাবে খাতা পাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ যাই লাগে করবেন।
উল্লেখ্য, স্যালারি আপনি যেকোন ব্যাংক একাউন্টে নিতে পারবেন, তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-কোন সম্মানী (খাতা দেখা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি) পেতে সোনালী ব্যাংকের একাউন্ট থাকা বাধ্যতামূলক। সুতরাং সোনালী ব্যাংকে একাউন্ট না থাকলে আগামীকাল আপনার প্রথম কাজ হচ্ছে সোনালী ব্যাংকে নিজ নামে একটি সেভিংস একাউন্ট ওপেন করা।
এর বাইরেও আইন-বিধির অধীনে থেকে লেখালেখি করা, গবেষণা, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, টিউশন, অনলাইন/অফলাইনে বিভিন্ন প্যাসিভ ইনকাম সহ বিভিন্ন বৈধ আয়ের সুযোগ তো রয়েছেই।
এছাড়াও, আরও বিভিন্ন ধরনের বৈধ ইনকাম শিক্ষা ক্যাডারে রয়েছে। যোগদানের পর ধীরে ধীরে এসব বুঝতে পারবেন।
আজ এ পর্যন্তই। পরবর্তী লেখায় চেষ্টা করবো শিক্ষা ক্যাডারের কিছু সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করার।