হানাফি উসুলের সঠিক প্রয়োগের একটি নমুনা
একটি মাসআলাকে আমরা উদাহরণ হিসেবে নেই। সেটি হল, আসরের উত্তম সময় সংক্রান্ত মাসআলা।
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী আসরের নামাজ বিলম্বে আদায় করা উত্তম আর অন্যান্য মাজহাবে তাড়াতাড়ি আদায় করা উত্তম।
দলিলের দিকে তাকালে সচরাচরের মতোই বুখারি-মুসলিমসহ সিহাহসিত্তার সকল কিতাবে আসরকে তাড়াতাড়ি পড়ার হাদিস এসেছে। আসরকে বিলম্বিত করার হাদিস বুখারি-মুসলিমে নেই। আবু দাউদ শরিফে আছে, তবে তার সনদ নিয়ে অনেকে কালাম করেছেন।
ফলে হানাফি মাজহাবের দিকে সম্পৃক্তদের মধ্যে যারা মুহাদ্দিসীনের মানহাজ দ্বারা প্রভাবিত, তারা এখানে অন্য মাজহাবের প্রতি ঝুঁকেছেন। যেমন, আব্দুল হাই লকনবি রহ.। সাহেবে হেদায়া হানাফিদের পক্ষে একটি আকলি দলিল উল্লেখ করেছেন যে, এতে নফল পড়ার সুযোগ বেশি পাওয়া যায়। লকনবি রহ. তাকে রদ করে লিখেছেন,
إنه تعليل في مقابلة النصوص الصحيحة الصريحة الدالة على أفضلية التعجيل وهي كثيرة مروية في الصحاح الستة وغيرها
অর্থাৎ, এটি হাদিসের বিপরীতে যুক্তিপ্রদান। আর হাদিসগুলো অনেক এবং সিহাহ সিত্তায় বর্ণিত। (التعليق الممجد)
হানাফিরা সেসকল হাদিসের বিভিন্নভাবে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অথচ নিজেদের পক্ষে যেসকল হাদিস তারা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো প্রচলিত অর্থ ওই মানের সহিহ নয়। অনেকের মতে তো একেবারেই জয়িফ। কোনোটি আবার বিলম্বের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নয়। কোনোটি মারফু’ নয়, বরং সাহাবির কাজ হিসেবে বর্ণিত।
এগুলো দেখলে একজন হানাফি তালেবে ইলম দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। কেন আমরা বিশুদ্ধতম হাদিসগুলো রেখে অন্যগুলো নিয়ে টানাটানি করছি! সোজা দলিল রেখে কেন বিভিন্ন ‘অজুহাত’ সাজাচ্ছি।
কিন্তু আসল রহস্যটা সাধারণত তাদের অজানা থেকে যায়। সে রহস্য বোঝার আগে বুঝতে হবে হানাফিদের উসুল।
ইমাম আবু হানিফার রহ.-এর নিকট বর্ণিত হাদিসের চেয়ে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িদের আমলের মূল্য বেশি। কারণ, তারা পরবর্তীদের তুলনায় হাদিসের মর্ম বোঝায় অধিক নির্ভরযোগ্য। হাদিস বর্ণনায় বর্ণনাকারীর ভুল হতে পারে, কিন্তু পরম্পরার মাধ্যমে চর্চিত আমলে ভুলের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাই বর্ণনার বিপরীতে সাহাবা-তাবেয়ির আমল পেলে তারা সেটাই গ্রহণ করেন। এবং এক্ষেত্রে তাদের নিকটবর্তী সালাফ তথা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. ও তার ছাত্ররাই প্রাধান্য পেয়ে থাকেন। বলাবাহুল্য, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকিহ ছিলেন।
উল্লিখিত উসুলটি পাওয়া যায়, হানাফি মাজহাবের ফিকরি প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম বিখ্যাত তাবেয়ি হযরত ইবরাহিম নাখায়ি রহ.-এর কথায়। তিনি বলেন,
لو رأيت الصحابة يتوضؤون إلى الكوعين لتوضأت كذلك وأنا أقرأها إلى المرافق، وذلك لأنهم لا يتهمون في ترك السنن وهم أرباب العلم وأحرص خلق الله على اتباع رسول الله صلى الله عليه وسلم (الجامع في السنن والآداب والمغازي والتاريخ لعبد الله بن أبي زيد القيرواني ص 118)
অর্থাৎ, আমি যদি দেখতাম, সাহাবিরা ওজুতে কব্জি পর্যন্ত হাত ধৌত করেন, তবে কুরআনে ‘কনুই পর্যন্ত’ থাকা সত্ত্বেও আমি কব্জি পর্যন্ত হাত ধৌত করেই ওজু করতাম। কারণ, সাহাবিদের ব্যাপারে সুন্নাহ বর্জনের সন্দেহ করা যায় না। তারা আহলে ইলম এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। (অর্থাৎ, ধরে নিতাম যে, আয়াতের এমন কোনও ব্যাখ্যা তারা জানেন, যা আমরা জানি না।) (الجامع في السنن والآداب والمغازي والتاريخ لعبد الله بن أبي زيد القيرواني)
জাসসাস রহ. বলেন,
فمن العلل التي يردها أخبار الآحاد عند أصحابنا ... أن يكون شاذا قد رواه الناس، وعملوا بخلافه
অর্থাৎ, যেসকল কারণে আমাদের ইমামদের নিকট খবরে ওয়াহেদ পরিত্যাক্ত হয়, তার মধ্যে একটি হল মানুষের উক্ত হাদিসের বিপরীত আমল। (الفصول في الأصول)
উক্ত মাসআলায় তেমনটিই হয়েছে। ইমাম মুহাম্মাদ রহ. লিখেছেন,
قد جَاءَت فِي هَذَا آثَار واما مَا عَلَيْهِ اصحاب عبد الله بن مَسْعُود فالتأخير
অর্থাৎ, এ ব্যাপারে (তাড়াতাড়ি করার ব্যাপারে) কিছু হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তবে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি.-এর ছাত্রগণ যে মতের ওপর ছিলেন, তা হল বিলম্ব করা। (الحجة على أهل المدينة)
দেখুন, ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এখানে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হাদিসগুলো গ্রহণ না করার কারণ বলার পরও আমরা সেটি ভুলে গেছি। ফলে তৈরি হয়েছে নানান সংকট।
মোটকথা-
• উক্ত মাসআলায় হানাফি মাজহাবের মূল দলিল হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাযি.-এর ছাত্রদের আমল।
• হানাফিরা তাদের মতের সপক্ষে যেসকল হাদিস বর্ণনা করেছেন, সেগুলো মূলত উক্ত তাবেয়িদের আমলকে শক্তিশালী করে।
• উক্ত আমলের সপক্ষের হাদিসগুলোই এক্ষেত্রে أصح তথা আমলযোগ্য। (ফকিহগণের নিকট صحت মানে আমলযোগ্য হওয়া)
• সাহেবে হেদায়া যে আকলি দলিল উল্লেখ করেছেন, তা মূলত مؤيد বা সমর্থক স্বরূপ।
সুতরাং উল্লিখিত মাসআলায় হানাফিরা সাহাবা-তাবেয়িগণের আমলকে গ্রহণ করেছেন, যারা উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম। তাদের আমলের বিপরীতে হাদিস বুখারি-মুসলিম বা বিশুদ্ধতম সনদের হাদিসও তারা গ্রহণ করেননি। কারণ, বর্ণনার চেয়ে আমল শক্তিশালী। হানাফি মাজহাবের এই দূরদর্শিতা সত্যিই অতুলনীয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের ইমামদেরকে জাযায়ে খায়ের দান করুন।
©
মারকাজুল উলূম আল-ইসলামিয়া ঢাকা
উচ্চতর তাফসীরুল কুরআনের গবেষণামূলক একটি দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান Islamic Education is the backbone of the Nation. just not education.
23/05/2026
আলহামদুলিল্লাহ। মারকাজুল উলূম আল-ইসলামিয়া ঢাকা -এর ১৪৪৭-৪৮ হি. মোতাবেক ২০২৫-২৬ খ্রি. শিক্ষাবর্ষের মাসিক পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আগামীকাল থেকে পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে মাদরাসার সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। ঈদ পরবর্তী ০৮-০৬-২৬ রোজ সোমবার থেকে পুনরায় কার্যক্রম শুরু হবে। ইনশাআল্লাহ।
20/05/2026
18/05/2026
১৪৪৭-৪৮ হি. মোতাবেক ২০২৬-২৭ খ্রি. শিক্ষাবর্ষের মাসিক পরীক্ষা আগামী ২১ ও ২৩ মে রোজ বৃহস্পতিবার ও শনিবার অনুষ্ঠিত হবে।
17/01/2026
বহুগ্রন্থ প্রণেতা,মারকাজুল উলূম আল ইসলামিয়া ঢাকা-এর সম্মানিত শাইখুল হাদিস মাওলানা জুবায়ের আহমদ আশরাফ সাহেব ইন্তেকাল করিয়াছেন ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
05/01/2026
এবছর শিক্ষাসফরে উস্তাদবৃন্দ যাচ্ছেন প্রিয় মাতৃভূমির অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা বান্দরবান জেলায়।
সবার কাছে দুআর আরজি, আল্লাহ তাআলা যেনো এই সফরকে নিরাপদ ও আনন্দময় করেন।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Contact the school
Telephone
Website
Address
দক্ষিণ মান্ডা (কদমআলী রোড), মুগদা, ঢাকা/১২১৪
Dhaka
1214