25/09/2026
"ময়মনসিংহ শহরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা ছিল জন্মের চেয়েও বেশি কিছু। এখানেই ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর জন্মেছিলেন এমন এক শিশু, যিনি পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে নিজের আলাদা জায়গা করে নেবেন। পৃথিবী তাঁকে চিনবে আচার্য স্যার জগদীশচন্দ্র বসু নামে। পদার্থবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের সীমানা পেরিয়ে তাঁর গবেষণা একসময় বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্ন হাজির করবে, উদ্ভিদেরও কি অনুভূতি আছে, তারা কি বাইরের উদ্দীপনায় সাড়া দেয়?
জগদীশচন্দ্রের পরিবারের আদি নিবাস অবশ্য ময়মনসিংহে ছিল না। তাঁদের পৈতৃক বাড়ি ছিল বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল গ্রামে, বর্তমান মুন্সিগঞ্জে। তাঁর বাবা ভগবানচন্দ্র বসু ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তারও আগে তিনি ১৮৫৩ থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন এবং স্কুলটির প্রথম প্রধান শিক্ষক হিসেবেও তাঁর নাম পাওয়া যায়। বাবার কর্মসূত্রেই সেই সময় বসু পরিবার ময়মনসিংহে ছিল। জগদীশচন্দ্রের জন্মও হয় এই শহরেই।
তবে ময়মনসিংহের সঙ্গে জগদীশচন্দ্রের সম্পর্ক শুধু জন্মের স্মৃতিতে আটকে থাকেনি। তাঁর শৈশবের শিক্ষার সঙ্গে এই শহরের নামও জড়িয়ে আছে। তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু হয় ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে। তখনকার সামাজিক বাস্তবতায় উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো অনেকের কাছে মর্যাদার বিষয় ছিল। কিন্তু ভগবানচন্দ্র ছেলেকে শুরুতেই ইংরেজি স্কুলে পাঠাননি। মাতৃভাষা ও নিজের সমাজের মানুষের সঙ্গে পরিচয় থেকেই শিশুর শিক্ষা শুরু হওয়া উচিত, এমন বিশ্বাস তাঁর ছিল।
পরবর্তীকালে জগদীশচন্দ্র নিজেও তাঁর শৈশবের সেই শিক্ষার গুরুত্বের কথা বলেছেন। বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনার কারণে ছোটবেলা থেকেই তিনি সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কাছ থেকে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। একজন মুসলিম কর্মচারীর ছেলে তাঁর পাশে বসত, অন্য পাশে বসত একজন জেলের ছেলে। শৈশবের এই অভিজ্ঞতা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল বলে তাঁর জীবনীসংক্রান্ত বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে।
ময়মনসিংহের সেই শৈশব পেরিয়ে জগদীশচন্দ্র কলকাতায় যান। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময় তাঁর বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ আরও গভীর হয়। পরে তিনি কেমব্রিজ ও লন্ডনে পড়াশোনা করেন। দেশে ফিরে প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। তখন ভারতীয় বিজ্ঞানীদের জন্য গবেষণার সুযোগ ছিল সীমিত, বৈষম্যও ছিল। কিন্তু সেসবের মধ্যেই তিনি পরীক্ষাগারে নিজের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।
প্রথম দিকে তাঁর গবেষণার বড় ক্ষেত্র ছিল তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। মিলিমিটার তরঙ্গ নিয়ে তাঁর পরীক্ষাগুলো তাঁকে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করে। বেতার তরঙ্গ শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও তাঁর তৈরি যন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে তাঁর গবেষণার পথ ঘুরে যায় উদ্ভিদের দিকে।
সেখানেই তৈরি হয় তাঁর সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক অধ্যায়।
যে উদ্ভিদকে মানুষ সাধারণত স্থির, নিশ্চুপ ও অনুভূতিহীন বলে মনে করত, জগদীশচন্দ্র তার ভেতরের প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করার চেষ্টা করলেন। তিনি দেখাতে চাইলেন, আলো, তাপ, রাসায়নিক পদার্থ কিংবা অন্য উদ্দীপনায় উদ্ভিদও শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া দেখায়। সেই প্রতিক্রিয়াকে দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য করার জন্য তিনি তৈরি করেন ক্রেসকোগ্রাফ। অত্যন্ত ক্ষুদ্র বৃদ্ধিও এই যন্ত্রের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছিল।
এখানে জগদীশচন্দ্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর পরীক্ষাধর্মী মন। শুধু কোনো ধারণা বিশ্বাস করার বদলে তিনি সেটিকে যন্ত্রের মাধ্যমে মাপতে চেয়েছেন। উদ্ভিদের ক্ষুদ্রতম প্রতিক্রিয়াকেও তিনি বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভাষায় ধরতে চেয়েছেন। তাঁর গবেষণা পরবর্তী সময়ে উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা ও জীবপদার্থবিদ্যার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
জগদীশচন্দ্র ছিলেন শুধু গবেষক নন, বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও চেষ্টা করেছেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’কে বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৯১৭ সালে কলকাতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বসু বিজ্ঞান মন্দির, বর্তমান Bose Institute। প্রতিষ্ঠানটি আন্তঃবিষয়ক গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৯২০ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটির Fellow নির্বাচিত হন। বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এটিও ছিল একটি বড় অধ্যায়।
কিন্তু তাঁর গল্পে ময়মনসিংহের জায়গাটা আলাদা।
কারণ পৃথিবীখ্যাত সেই বিজ্ঞানীর জীবনের প্রথম ঠিকানাগুলোর একটি ছিল এই শহর। তাঁর বাবা ছিলেন ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক। তাঁর নিজের শিক্ষাজীবনের সূচনাও এই শহরের সেই বিদ্যালয়ে। অর্থাৎ পরবর্তী সময়ে যিনি বিজ্ঞানের প্রচলিত সীমানা ভেঙে পদার্থবিজ্ঞান থেকে উদ্ভিদের জগতে প্রবেশ করবেন, তাঁর শৈশবের শিক্ষার ভিত তৈরি হয়েছিল ময়মনসিংহেই।
আজ ময়মনসিংহের রাস্তায় হাঁটলে হয়তো ১৮৫৮ সালের সেই শহরকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বদলে গেছে শহর, বদলে গেছে শিক্ষার ধরন, বদলে গেছে বিজ্ঞানের ভাষাও। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় একটি যোগসূত্র রয়ে গেছে।
ময়মনসিংহে জন্ম নেওয়া সেই শিশুটি একদিন পৃথিবীকে দেখিয়েছিলেন, প্রকৃতির নীরবতার মধ্যেও সংকেত থাকে। মানুষের চোখে যে গাছ স্থির, তার শরীরেও ঘটে চলেছে নানা পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনকে অনুভূতির গল্প না বানিয়ে তিনি নিয়ে এসেছিলেন পরীক্ষাগারের টেবিলে, যন্ত্রের সূক্ষ্ম রেখায়।
৩০ নভেম্বর ১৮৫৮-তে ময়মনসিংহে যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল, প্রায় আট দশক পরে তাঁর জীবন থেমে যায়। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন থামেনি। প্রকৃতিকে বোঝার সেই কৌতূহল আজও বিজ্ঞানচর্চার অংশ।
আর ময়মনসিংহের জন্য তাঁর পরিচয়টি আরও সহজ।
এই শহরের মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন সেই জগদীশচন্দ্র বসু, যিনি একদিন গাছের নীরবতাকেও বিজ্ঞানের ভাষায় কথা বলিয়েছিলেন"
©️Publician©️