27/02/2026
সুবহানাল্লাহ্
নারীদের মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায়ের বিধিবিধান
মনে প্রশ্ন জাগাটা খুবই স্বাভাবিক, পুরুষরা তাগিদ নিয়ে গুরুত্বের, সাথে মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করলেও মেয়েদের বেলায় সঠিক হুকুম কি ? জুমার নামাজ অথবা ঈদের নামাজের জামাতে মহিলাদের শরিক হওয়ার ব্যপারে কি হুকুম ?
মহিলাদের জামাতে নামাজ আদায়ের বিধান সম্পর্কে ইসলামের ফিকহে বিভিন্ন মাযহাবে কিছু পার্থক্য রয়েছে। ফিকহে আহনাফ বা হানাফি মাযহাবের দলিল ও কিতাবের নামসহ বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরছি।
আলোচনার শুরুতেই আমরা জেনে নিই কোরআনুল কারিমে আল্লাহ্ এ ব্যাপারে কি বলেছেন। সূরা আল আহযাবের ৩৩ঃ৩৩ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’লা বলেন,
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
(الأحزاب: ٣٣)
অর্থঃ “তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান কর। মূর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না”। -সূরা আহযাব ৩৩।
হানাফী ফুকাহাগণ বলেন, এ আয়াত নারীগণের ঘরে অবস্থানের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে, যা ইবাদতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এর পর আমরা জেনে নিবো প্রিয় নবী রাসূলে আরাবি নূর নবী মা-বোনগণের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার ব্যাপারে কি বলেছেন, সুনান আবু দাউদ শরীফের ৫৬৭ নং হাদীসের বর্ণনায় জানা যায়, রাসূল ﷺ মহিলাদেরকে মসজিদ সমূহে যাতায়াতে বাধা দিতে নিষেধ করলেও ঘরে নামাজ পড়াকেই উত্তম বলেছেন। রাসূল ﷺ বলেন,
لَا تَمْنَعُوا نِسَاءَكُمُ الْمَسَاجِدَ وَبُيُوتُهُنَّ خَيْرٌ لَهُنَّ
(سنن أبي داود، رقم: ٥٦٧)
অর্থাৎঃ “তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের মসজিদ সমূহে যাতায়াতের বাধা দিও না। কিন্তু তাদের ঘরসমূহই তাদের (নামাযের জন্য)-উত্তম স্থান।”
সুনানে আবু দাউদ, আহকামুল কোরআন, থানভি সহ বাজলুল মাজহুদ এর মতো প্রশিদ্ধ হাদীস গ্রন্থের বরাতে জানা যায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর যুগে নারীদের মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজের অনুমতি থাকলেও তা ছিল কিছু শর্ত সাপেক্ষে। যেমনঃ
ক) সম্পূর্ণ আবৃত ও পূর্ণ শরীর ঢেকে বের হবে।
খ) সেজেগুজে খুশবু লাগিয়ে বের হবে না।
গ) বাজনাদার অলংকার, চুড়ি ইত্যাদি পরে আসতে পারবে না।
ঘ) অঙ্গভঙ্গি করে চলতে পারবে না।
ঙ) পুরুষদের ভিড় এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে চলবে।
চ) অপ্রয়োজনে কোনো বেগানা পুরুষের সঙ্গে কথা বলবে না।
ছ) সর্বোপরি তাদের বাহিরে বের হওয়াটা ফেতনার কারণ হবে না।
-সুনানে আবু দাউদ: ৫৬৫, আহকামুল কোরআন, থানভি: ৩/৪৭১, বাজলুল মাজহুদ: ৪/১৬১।
মনে প্রশ্ন জাগাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক শর্ত সাপেক্ষে মহিলাদের মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের অনুমতি থাকার পরও কেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর ইন্তিকালের পর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু কেন নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন!! সেই আমলে উম্মত জননী মা আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা সহ অসংখ্য জলিলকদর সাহাবিগণ জীবিত ছিলেন। তাঁরা কেউ কোনো প্রতিবাদ করেননি বরংচ কেনো উনারা বিরোধিতা না করে নারীদের মসজিদে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাকেই যুক্তি যুক্ত মনে করছেন !!! এর উত্তর সহজ!! রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর ইন্তিকালের পর সাহাবিগনের পক্ষ হতে নারীদের মসজিদে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণ হচ্ছে উপরোক্ত শর্তগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া। এ প্রসঙ্গে হজরত মা আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, 'নারীরা যে অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তা যদি রাসূল ﷺ জানতেন, তবে বনি ইসরাইলের নারীদের যেমন নিষেধ করা হয়েছিল, তেমনি তাদেরও মসজিদে আসা নিষেধ করে দিতেন।' -বুখারী শরীফ ৮৬৯।
হানাফী বিশেষজ্ঞ ইমামগণ দশ হাজার হাদীসের বর্ণনাকারী উম্মত জননী হজরত মা আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার এ বক্তব্যকে শক্ত দলিল হিসেবে গ্রহণ করেন যে সামাজিক পরিবর্তনের কারণে বিধান পরিবর্তনযোগ্য।
উপরের হাদীসের ব্যাখ্যায় বুখারী শরীফের বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) লিখেছেন, 'হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহা -এঁর এই মন্তব্য তো রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর দুনিয়া থেকে ইন্তিকালের কিছুদিন পরের নারীদের সম্পর্কে। অথচ আজকের যুগের নারীদের উগ্রতা আর পর্দাহীনতা হাজার ভাগের এক ভাগও সে যুগে ছিল না। তাহলে এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ কী মন্তব্য করতেন ?' -উমদাতুল কারি ৬/১৫৮।
বর্তমান সময়ে কিছু মুসলিম ভাইয়ের ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর সুন্নতকে ডিঙিয়ে কারো কথা মানা উচিত হবে না। নাউজুবিল্লাহ্। এ চিন্তা শুধুমাত্র তাঁদের অজ্ঞতারই প্রতিফলন। সাহাবিগণের সুন্নত কখনো হাদীসের বিরুদ্ধে যায় না, বরং আল্লাহ্ ও রাসূল ﷺ এঁর হক আদায়ে তাঁরাই অগ্রগামী এবং সর্ব শ্রেষ্ঠ।
আমরা অনেকে হয়তো জানিই না বা জানলেও গুরুত্ব দেইনা হাদীস শরীফের পাশাপাশি সাহাবিগণের আমলও দলিলরূপে গণ্য। কেননা তাঁরা ছিলেন সত্যের মাপকাঠি। রাসূল ﷺ সুস্পষ্ট বলেছেন, 'তোমরা আমার পরে খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে, যেমন মাড়ির দাঁত দিয়ে কোনো জিনিস মজবুতভাবে ধরা হয়।' -আবু দাউদ শরীফ ৪৬০৭।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পর হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজ খেলাফত আমলে যখন মহিলাদের পরিবর্তিত অবস্থা দেখেন এবং ফেতনার আশঙ্কা দিন দিন বাড়তে থাকে, তখন উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.), ইবনে মাসউদ ও ইবনুজ জুবায়ের (রা.) সহ বড় বড় সাহাবায়ে কিরামগণ নারীদের মসজিদে না আসার আদেশ জারি করলেন। অন্য সাহাবায়ে কিরামগণও এ ঘোষণাকে স্বাগত জানালেন। কেননা তাঁরা জানতেন-মহিলাদের মসজিদে আসতে নিষেধ করার মধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর নির্দেশের বিরোধিতা করা হয়নি; বরং তাঁর ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে।
বর্তমানে গোটা বিশ্ব জুড়ে অশ্লীলতা আর বেপর্দার ছড়াছড়ি। ফিতনায় যখন পুরো সমাজ জর্জরিত সে মুহূর্তে অবলা মা- বোনদের ছাওয়াবের স্বপ্ন দেখিয়ে মসজিদে আর ঈদগাহে টেনে আনার চেষ্টা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। বর্তমান যুগের নারীগণ কখনোই রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর যুগের নারীগণের সমকক্ষ নন খুব সহজেই বুঝা যায়। তথাপি সে যুগের নারীগণকেই মসজিদে আসতে নিষেধ করেছেন খোদ আমিরুল মো'মিনিন হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু। সুতরাং আমরা বর্তমান এই ফিতনার যুগে মহিলাগণকে মসজিদে ও ঈদগাহে গিয়ে নামাজের জন্য উৎসাহ দিতে পারি না।
মূলত নারীদের মসজিদে যাওয়ার হাদীসগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা না জানার কারণেই মূলত বিপত্তিটা বেড়েছে। তাই আসুন এ সম্পর্কিত একটি হাদীস ও তার ব্যাখ্যা জেনে নেই। তাহলে সকল সংশয় দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ্।
মুসলিম ও আবু দাউদ শরীফে হজরত ইবনে ওমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেন, 'আল্লাহর বান্দিদের আল্লাহর মসজিদ থেকে নিষেধ করো না।' -মুসলিম শরীফ ৪৪২; আবু দাউদ শরীফ ৫৬৬।
উল্লেখিত হাদীসের ব্যাখ্যা হলো, ইসলামের প্রথম যুগে নারীগণ মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তাদের নিষেধ করা হতো না। ওই নির্দেশ সাময়িক ও শর্তসাপেক্ষ ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের কারণে ও মসজিদে নারীরা যাওয়ার শর্ত বিদ্যমান না থাকার কারণে এখন নিষেধ করাটাই সুন্নত। কারণ রাসূল ﷺ এঁর যুগ অহী নাজিলের যুগ ছিল। তাই নারীগণ যাতে বিভিন্ন সময় অবতীর্ণ আয়াত ও শরিয়তের বিভিন্ন বিধান সরাসরি রাসূল ﷺ এঁর কাছ থেকে ভালোভাবে শিখে নিতে পারেন, সেজন্য নারীদের মসজিদে আসতে নিষেধ করা হয়নি। কিন্তু পরে এই প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়ায় সাহাবায়ে কিরামগণ নিষেধ করে দেন।
আল্লামা ইবনে নুজাইম মিসরি ও আল্লামা হাসকাফি (রহ.) বলেন, বর্তমান যুগে ফেতনার ব্যাপক প্রচলন হওয়ায় ফতোয়া হলো সব নারীর জন্যই সব নামাজ মসজিদে গিয়ে জামাতে আদায় করা মাকরুহে তাহরিমি। -আল বাহরুর রায়েক ১/৬২৭-৬২৮, আদ্দুররুল মুখতার ১/৩৮০।
আমাদের মধ্যে অনেক ভাই বলে থাকেন যে, মক্কা-মদিনার হারামাইন শরিফে নারীরা মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণ করে থাকেন। এখানে কেন নিষেধ হবে? এর উত্তর হলো, আসলে হারামাইনে কিছু বিশেষ প্রয়োজনের কারণে নারীগণের জামাতে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তা হলো, নারীদের যেহেতু মক্কা শরীফের মসজিদে হারামে তাওয়াফের জন্য আসতে হয় এবং মদীনার মসজিদে নববিতে জিয়ারতের জন্য তাঁরা এসে থাকেন। এ অবস্থায় নামাজের আজান হয়ে গেলে আর বের না হয়ে তাঁরা মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণ করে থাকেন। ওলামায়ে কিরামগণ এর অনুমতি দিয়েছেন। তবে শুধু কেবল জামাতে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে নারীদের হারামাইন শারীফাইনে যাওয়ার অনুমতি নেই। বর্তমানে না জেনে অনেক মহিলা শুধু নামাজের জন্যই হারামাইনে উপস্থিত হয়ে থাকেন, তা ঠিক নয়। -ইলাউস সুনান:৪/২৩১।
নারীদের নামাজ সংক্রান্ত অসংখ্য হাদীস আছে, যেগুলোতে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঘরে নামাজ পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের মসজিদে আসতে নিরুৎসাহী করা হয়েছে।
আবু দাউদ শরীফের ৫৭০ নং সহিহ হাদীসে হজরত আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
صَلَاةُ الْمَرْأَةِ فِي بَيْتِهَا خَيْرٌ مِنْ صَلَاتِهَا فِي حُجْرَتِهَا، وَصَلَاتُهَا فِي حُجْرَتِهَا خَيْرٌ مِنْ صَلَاتِهَا فِي دَارِهَا
অর্থাৎঃ "নারীর নিজ ঘরে (সাধারণ স্থান) সালাত আদায় করা তার উঠান বা কামরায় সালাত আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর নারীর ঘরে (সাধারণ স্থান) সালাত আদায় করার চেয়ে তার ঘরের ভেতরের নির্জন প্রকোষ্ঠে/বেডরুম) সালাত আদায় করা আরও উত্তম"।
অন্য বর্ণনায় হজরত উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, 'নারীদের ঘরে নামাজ পড়া ঘরের বাইরে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম' -আল মু'জামুল আওসাতঃ ৯১০১।
মুসনাদে আহমদ ২৬৫৪২ নং হাদীসে উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, 'নারীদের নামাজের উত্তম জায়গা হলো তাদের ঘরের নির্জন কোণ।' (হাদীসটি হাসান)
আবু হুমাইদ আল সাঈদি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার উম্মে হুমাইদ নামক একজন মহিলা সাহাবি রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর কাছে গিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে আগ্রহী।' রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'আমি জানি তুমি আমার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পছন্দ করো। কিন্তু তোমার জন্য বড় কামরার তুলনায় ঘরের অন্দরমহলে নামাজ পড়া উত্তম। আবার বড় কামরায় নামাজ পড়া উত্তম বারান্দায় নামাজ পড়ার চেয়ে। তোমার মহল্লার মসজিদের চেয়ে বারান্দায় নামাজ আদায় করা উত্তম। মহল্লার মসজিদ উত্তম, আমার মসজিদের (মসজিদে নববির) চেয়ে।' এ কথা শোনার পর উম্মে হুমাইদ রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর ঘরের নির্জন স্থানে একটি নামাজের স্থান বানাতে নির্দেশ দিলেন। সেখানেই আজীবন নামাজ আদায় করেছেন। এ অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। -মুসনাদে আহমদ ২৭০৯০; ইবনে খুজাইমা ১৬৮৯, হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.)-এঁর মতে হাদীসটি হাসান। ফাতহুল বারি: ২/২৯০)
আবু মুসা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেন, 'জামাতে জুমার নামাজ পড়া প্রত্যেক মুসলমানের ওপর অকাট্য ওয়াজিব, তবে ক্রীতদাস, নারী, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব নয়।' (আবু দাউদ: ১০৬৭ (হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রহ.)-এঁর শর্ত অনুযায়ী সহিহ; আল মুস্তাদরাক: ১/২৮৮)
উল্লিখিত হাদীসগুলো থেকে এ বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পুরুষদের দায়িত্ব পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে পড়া, আর মহিলাগণের দায়িত্ব হলো ঘরে নামাজ পড়া। এছাড়াও রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর যুগে মহিলাগণের জন্য জামাতে শরিক হওয়া ওয়াজিব, সুন্নত বা অত্যাবশ্যকীয়ও ছিল না; বরং শুধু অনুমতি ছিল। তবে সেটিও ছিল অপছন্দের সঙ্গে এবং শর্তসাপেক্ষে।
ফতোয়ায়ে আহনাফ বা হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফতোয়ার কিতাবগুলোতে কি মত প্রকাশ করা হয়েছে আসুন তাও আমরা জেনে নিই।
হানাফী আইনশাস্ত্রের অন্যতম প্রভাবশালী কিতাব (ফিকহ্) হিসাবে বিবেচিত আল-হিদায়ার লেখক হানাফী মাজহাবের একজন ইসলামী পণ্ডিত ইমাম মারঘীনানী রহমতুল্লাহ আলাইহি’র আল-হিদায়া নামক গ্রন্থে লিখেছেনঃ
وَيُكْرَهُ خُرُوجُ الشَّوَابِّ إِلَى الْمَسْجِدِ لِلصَّلَاةِ لِمَا فِيهِ مِنْ خَوْفِ الْفِتْنَةِ
(الهداية، كتاب الصلاة)
যুবতী নারীর মসজিদে যাওয়া মাকরূহ; কারণ এতে ফিতনার আশঙ্কা আছে।
হিজরীর ৬ষ্ঠ শতকের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ 'আলা' আল-দীন আল-কাসানী সামারকান্দি রহমতুল্লাহ আলাইহি’র তুহফাত আল-ফুকাহা'র ব্যাখ্যা হিসাবে লিখিত ‘বাদাই আল-সানাই' তারতিব আশ-শরা'ই' (ধর্মীয় -আইনি বিধিবিধানের বিন্যাসে বিস্ময়কর শৈল্পিকতা) গ্রন্থে আল-দীন আল-কাসানী সামারকান্দি রহমতুল্লাহ আলাইহি বলেনঃ
وَأَمَّا فِي زَمَانِنَا فَيُكْرَهُ خُرُوجُهُنَّ إِلَى الْجَمَاعَةِ لِظُهُورِ الْفَسَادِ وَكَثْرَةِ الْفِتْنَةِ
(بدائع الصنائع، كتاب الصلاة)
বর্তমান সময়ে মহিলাদের জামাতে উপস্থিতি মাকরূহ্; কারণ এতে ফিতনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ের আশঙ্কা থাকে।
খুব প্রসিদ্ধ একটি ফতোয়ার কিতাব ফতোয়ায়ে আল হিন্দিয়ায় বলা হয়েছেঃ
وَيُكْرَهُ لِلشَّابَّةِ خُرُوجُهَا إِلَى الْمَسْجِدِ لِلصَّلَاةِ
(الفتاوى الهندية، كتاب الصلاة)
যুবতীদের মসজিদে যাওয়া মাকরূহে তাহরীমী।
হানাফী মাযহাবের সবচাইতে প্রসিদ্ধ ফতোয়ার কিতাব ‘রদ্দুল মুহতার আলা দুররুল মুখতার’ (ফাতাওয়ায়ে শামী)। লেখক: ইবনে আবেদীন রহমতুল্লাহ আলাইহি তাঁর ‘রদ্দুল মুহতার আলা দুররুল মুখতার’ ফাতাওয়ায়ে শামীতে উল্লেখ করেছেন,
وَفِي زَمَانِنَا يُمْنَعْنَ لِفَسَادِ الزَّمَانِ
(رد المحتار على الدر المختار)
“আমাদের সময়ে মহিলাদের মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ হওয়ার নিকটবর্তী; কারণ ব্যাপক ফিতনা।”
হানাফী মাযহাবের মত অনুযায়ী মহিলাদের মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে মূল হুকুমঃ
▪️মহিলাদের জন্য ঘরে নামাজ আদায় করা উত্তম ও অধিক ছাওয়াবের।
▪️তরুণী ও যুবতী মহিলাদের জন্য মসজিদে জামাতে যাওয়া মাকরূহে তাহরীমী (যা নিষিদ্ধের কাছাকাছি)।
▪️বয়স্ক (বৃদ্ধা) মহিলাদের জন্য ফিতনার আশঙ্কা না থাকলে তবেই কিছু ক্ষেত্রে অনুমতি আছে।
▪️বর্তমানে ফিতনার আশঙ্কা অধিক হওয়ায় সাধারণভাবে মসজিদে জামাতে না যাওয়াই উত্তম ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত।
আল ইসলাম জহুরীয়া
ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র
উত্তর বাহেরচর, তারানগর
কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা, বাংলাদেশ।