19/05/2025
ভারতের মিনিস্ট্রি অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি কতৃক বাংলাদেশ থেকে মোট সাত ধরনের পণ্য আমদানি রেস্ট্রিক্টেড করা হয়েছে, যা আপনারা ইতিমধ্যেই জানেন। সাদা চোখে এটাকে জাস্ট বাংলাদেশের ইকোনমির বিরুদ্ধে ভারতের ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেলের একটি স্টেপ বলেই মনে হতে পারে, এবং বিষয়টা সত্যিই কিছুটা এরকম তবে পুরোটা নয়।
প্রথমত, আপনি যদি খেয়াল করেন তাহলে দেখতে পাবেন, ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের মাঝে যে কয়টি পণ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তার মাঝে ফুড আইটেম বেশি। যেমন: ফ্রুটস ফ্লেভার এন্ড কার্বনেটেড ড্রিংকস, প্রসেসড ফুড অর্থাৎ প্যাকেটজাত পণ্য। এছাড়াও প্লাস্টিক দ্রব্যাদি এবং রেডিমেড গার্মেন্টস পণ্যের উপরও তারা আমদানি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
যদি প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশের ঠিক কয়টা কম্পানি এই ধরনের কার্বনেটেড ড্রিংকস বা প্রসেসড ফুড, প্লাস্টিক প্রোডাক্ট বা গার্মেন্টস প্রোডাক্ট ভারতে এক্সপোর্ট করে.? আপনি হাজার খুঁজেও একটি কোম্পানি ব্যতীত অন্য কোনো কোম্পানির নাম পাবেন না। আমিও পাইনি। সেটা হলো: ‛প্রাণ আরএফএল’ কোম্পানি। অর্থাৎ ভারত নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না করলেও মূলত প্রাণ কোম্পানির প্রোডাক্টকেই লিমিট করেছে।
কিন্তু কেনো করেছে.?
পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, প্রাণ আরএফএল'ই একমাত্র বাংলাদেশি কোম্পানি যারা 1997 সাল থেকে ভারতে নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। ২০০৮ সালে প্রাণ ভারতের স্যাভেন সিস্টার্সের একটি রাজ্য ত্রিপুরায় তাদের প্রথম ফ্যাক্টরি স্থাপন করে। সেসময় প্রাণ আরএফএল কোম্পানির সিনিয়র ম্যানেজার পরমুদ্দিন হোসেইন (এক্সপোর্ট) বলেছিলেন “ত্রিপুরা বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে র ম্যাটেরিয়ালস ত্রিপুরায় পাঠানো সহজ হবে”। বর্তমানে ভারতের কলকাতা, গোহাটি, শিলং, আগরতলা এবং ত্রিপুরা― এই পাঁচটি স্ট্রং পজিশনে প্রাণের ফ্যাক্টরি রয়েছে। এছাড়া ভারতের স্যাভেন সিস্টার্সের মিজোরাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং আসামে রয়েছে প্রানের বেশ কয়েকটি অস্থায়ী ডিপো।
পশ্চিমবঙ্গ এবং স্যাভেন সিস্টার্সের রাজ্যগুলোতে প্রানের তৈরি বিভিন্ন প্রসেসড স্ন্যাক্স আইটেম যেমন: কেক, বিস্কিট, নুডলস, রামেন, প্রাণ স্পাইসি ঝাল চানাচুর এবং ড্রিংকসের মধ্যে প্রাণ লিচি সবচেয়ে জনপ্রিয়। পণ্যের গুনগত মান ভাল হওয়ায় ভারতজুড়েই প্রানের পণ্যের বেশ কদর। তবে ঝামেলার শুরু হয় 2019 সালের দিক থেকে।
2019 সালে কলকাতায় “ক্রাইম ইন্টিলিজেন্স ব্যুরো”―সিআইডি দুইজন ব্যক্তিকে এরেস্ট করে নর্থ ইস্টের রাজ্য গুলো নিয়ে গোয়েন্দা তৎপরতার অভিযোগে। ওই দুইজনের নাম: রাজেশ ঘোষ এবং বিধান কিরতানিয়া। সিআইডি জানায়, তারা দুজনেই প্রাণ কোম্পানির এমপ্লয়ী।
অফিসিয়ালি খুব একটা না হলেও আনঅফিসিয়ালি ভারত বেশ কয়েকবার প্রাণ কোম্পানির এমপ্লয়ীদের এরেস্ট করেছে এবং মিডিয়া উইংয়ের মাধ্যমে নিউজ করিয়েছে 2019 পরবর্তী সময় থেকে।
ত্রিপুরা, মিজোরাম, মেঘালয়ের মত সেনসিটিভ জায়গা গুলোতে প্রানের ফ্যাক্টরি এবং ডিপো থাকায় সেখানে চাকরি করা ভারতীয়দের যাতায়াত খুবই স্বাভাবিক। আর এদের মাধ্যমেই নানা রকম ভিআইপি কিংবা আর্মড মুভমেন্টের ইনফরমেশন বেরিয়ে আসে বলে ধারণা ভারতীয় ইন্টিলিজেন্সের।
প্রাণ আরএফএল এবিষয়ে কখনও স্বীকারোক্তি দেয়নি আবার ভারতও অফিসিয়ালি প্রানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনতে পারেনি। তবে নর্থ ইস্টে বাংলাদেশি কোম্পানির ফুটপ্রিন্ট গত পনেরো বছরে থ্রেট না হলেও এই মুহূর্তে তাদের জন্য বেশ থ্রেটের কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার প্রমান আজ আমরা পেলাম, বাংলাদেশি প্রোডাক্টে ইমপোর্ট রেস্ট্রিকশনের মাধ্যমে।
দ্বিতীয়ত- ভারতের মিনিস্ট্রি অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির অফিসিয়াল স্টেটমেন্টটা যদি আপনি ভালভাবে দেখেন, তাহলে একদম ক্লিয়ার হতে পারবেন তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে।
সেখানে তারা স্পষ্টভাবে বলেছে- বাংলাদেশি প্রোডাক্ট ইম্পোর্টের ক্ষেত্রে তারা কোনো ল্যান্ড পোর্ট ব্যবহার করতে দেবে না। বরং কলকাতা পোর্ট ব্যবহার করতে হবে।
এখানে একটা প্রশ্ন ওঠে। ভারত যদি সত্যিই বাংলাদেশি প্রোডাক্টের উপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা দিতে চায় তাহলে সী-পোর্টের অপশন খোলা রেখেছে কেনো.? নিশ্চয়ই সেটা বন্ধ করে দেওয়ার কথা। কিন্তু এই কাজ না করার কারন- তারাও আমাদের উপর নির্ভরশীল। এজন্য ল্যান্ড পোর্ট বন্ধ রেখে সী পোর্টের দুয়ার খোলা রেখেছে।
এতদিন যাবৎ বাংলাদেশের আখাউড়া, বুড়িমারী, ভোমরা, সুতারকান্দি ল্যান্ড পোর্ট হয়ে ভারতের নর্থ ইস্ট এবং পশ্চিমবঙ্গে মালামাল যেত। এরপর 2021 সাল থেকে নদীপথেও ভারতের কলকাতা পোর্ট ব্যবহার করে মালামাল পরিবহন করা হয়। সেক্ষেত্রে নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা হয়ে কলকাতা পৌঁছাত জাহাজগুলো।
প্রথম চালানে ২৫,০০০ কার্টুন প্রাণ লিচি ড্রিংকস পাঠানো হয়েছিল। প্রাণ আরএফএল এর চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার আহসান খান চৌধুরী তখন জানিয়েছিলেন “স্থলপথে পণ্য পরিবহন করতে যে খরচ, তার চেয়ে ৩০% কম খরচে নৌপথে পণ্য পরিবহন করা সম্ভব”, এবং তখন থেকে ল্যান্ড এবং সী- দুটি মাধ্যমেই ভারতে পণ্য রপ্তানি করে আসছে প্রাণ কম্পানি।
কিন্তু আজ হটাৎ ল্যান্ড পোর্ট রেস্ট্রিক্টেড করার কারণ তারা যেটাই দেখাক, আসল কারন হলো ল্যান্ড ইউজ করলে সবকিছু ফিল্টার করা সম্ভব হয়না। বিভিন্ন রকম আনএক্সপেক্টেড এক্টিভিটিস, ইনফিলট্রেশন হয়েই যায়। কিন্তু সী পোর্টে এটা সম্ভব নয়। তবে এটাই যে একমাত্র রিজন তাই নয়, মাল্টিপল রিজন থাকতে পারে।
কিছুদিন আগে মিজোরামে দুজন বাংলাদেশি বংশদ্ভূত মার্কিন নাগরিক এরেস্ট হয়েছিল। তারা কারা, তাদের থেকে কি তথ্য জানা গেছে-এসব কিছুই ভারত প্রকাশ করেনি। এর আগে মনিপুরে ফরেইন এক্টিভিটিসের কারনে তারা ‛প্রটেক্টেড এরিয়া পারমিট’ আইন চালু করে। এর ফলে কোনো বিদেশি মনিপুরে ঢোকার সুযোগ পাবেনা।
সামগ্রিকভাবে স্যাভেন সিস্টার্সের পরিপূর্ন নিরাপত্তা এবং তাদের রাষ্ট্রীয় বাহিনী গুলোর আর্মড মুভমেন্টকে গোপন রাখতেই বিভিন্ন পদক্ষেপ তারা নিচ্ছে।
বাংলাদেশি প্রোডাক্ট-এ ইমপোর্ট রেস্ট্রিকশন ভারতের “ম্যাক্সিমাইজেশন অফ রিটার্ন এন্ড মিনিমাইজ অফ রিস্ক” নীতির অনুসরণ বলেই আমি মনে করি। কারন বাংলাদেশি কোম্পানির ম্যাসিভ একটিভিটি তাদের নর্থ ইস্টে। একদিকে ল্যান্ড পোর্ট ক্লোজ করে তারা রিস্ক মিনিমাইজ করলো অন্যদিকে সী পোর্টের অপশন খোলা রেখে বাণিজ্য অব্যাহত রাখার সুযোগকে জিইয়ে রেখেছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কি করতে পারে.?
খুব ছোট্ট একটা কাজ করা যেতে হবে।
বাংলাদেশে লাস্ট পনেরো বছরে প্রায় দুই লক্ষ ভারতীয়কে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। এরা বিভিন্ন ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলিতে কাজ করছে। তবে বেশিরভাগ হলো দোকানদার। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই দোকানগুলিকে বলে ‛কোনার দোকান’। আমরা অনেকেই যেগুলিকে মুদির দোকান বা টঙের দোকান বলে জানি।
যশোর-চৌমুহনি রোড, সিলেট হবিগঞ্জ হাইওয়ে, চিটাগং কক্সবাজারের বেশ কয়েকটা রুটে এমন প্রচুর কোনার দোকান দেখা যায়। এসব দোকানদারদের ৮০% জন্মগত বাংলাদেশি না।
৯০ থেকে ৯৫' এর মাঝে কোনো একটা সময়ে চিটাগং ইউনিভার্সিটির কেন্দ্রীয় মসজিদের খাদেম অথবা মুয়াজ্জিনকে এরেস্ট করেছিল ডিজিএফআই। মসজিদে কাজ করা বাদে তার একটা মুদির দোকান ছিল। পরবর্তীতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তার কাছ থেকে একটি মিলিটারি গ্রেড ওয়্যারলেস জব্দ করা হয় এবং তার সাথে ইন্ডিয়ান ইন্টিলিজেন্স এর যোগসূত্র পাওয়া যায়।
তো এই কোনার দোকানগুলো সবসময়ই হান্ড্রেড পার্সেন্ট সন্দেহের তালিকায় থাকে। এদের কাজই হলো কোনো মিলিটারি বা ভিআইপি মুভমেন্ট হলে সেই তথ্য পাচার করা।
যদি কোনোভাবে এই জায়গাটা পরিষ্কার করা যায়, তাহলে সেটা ভারতের বিরুদ্ধে একটি ভাল পদক্ষেপ হবে।
© Shafin Rahman
Send a message to learn more