18/03/2026
শেষ! রমজানটা পার হয়ে গেল, ২৮ টি রোজা চলে গেল। এই সময়টা একটু থেমে নিজেকে একটা প্রশ্ন করা দরকার। সেটি হলো, আমার রমজানটা কেমন গেল, সেটা না… বরং আমি আল্লাহর কাছে কতখানি এক্সেপ্টেড হলাম?
কারণ রমজানের আসল লক্ষ্য ছিল শুধু রোজা রাখা না। লক্ষ্য ছিল, আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়া। আমরা অনেকেই একটা ভুল করি। আমরা ভাবি রোজা মানে শুধুই আমি কতগুলো রোজা রাখলাম, কত পেইজ কুরআন পড়লাম, কত রাত তারাবি পড়লাম। কিন্তু আল্লাহ সংখ্যার দিকে তাকান না, আল্লাহ তাকান হৃদয়ের দিকে।
হয়তো কেউ খুব বেশি কিছু করতে পারেনি, কিন্তু সে চুপচাপ একদিন কারো কষ্ট কমিয়েছে, কাউকে ক্ষমা করেছে, নিজের অহংকারটা ভেঙেছে। আল্লাহর কাছে এই কাজগুলো অনেক বড় হতে পারে।
আপনি কি এই রমজানে কারো জন্য দোয়া করেছেন, যে আপনার কোনো উপকার করে নি? আপনি কি কাউকে মাফ করে দিয়েছেন, যাকে মাফ করা কঠিন ছিল? আপনি কি কোনো গুনাহ ছেড়েছেন, যেটা আপনি অনেকদিন ধরে করছিলেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আসলে বলে দেয়, আপনার রমজান কেমন গিয়েছে?
আমরা সবাই চাই, ঈদের দিন খুশি থাকতে। কিন্তু আসল খুশিটা আসে তখনই, যখন মনে হয়, হয়তো আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিয়েছেন। হয়তো আল্লাহ আমার দিকে তাকিয়ে খুশি হয়েছেন।
এই শেষ কয়েকটা দিন একটা অন্যরকম সুযোগ।
এখন আর নতুন কিছু শুরু করার সময় না, এখন সময়টা নিজের ভিতরটা পরিষ্কার করার। যার সাথে সম্পর্ক খারাপ, ঠিক করে ফেলা। যে গুনাহটা ছাড়তে পারেননি, আজ থেকেই ছাড়ার নিয়ত করা। যে দোয়াটা অনেকদিন ধরে করতে চান, আজকে আল্লাহর সামনে মন খুলে বলে ফেলা।
কারণ আমরা জানিনা, এই সুযোগটা আবার পাবো কিনা।
হয়তো এই রমজানে আমরা পারফেক্ট হতে পারি নি। কিন্তু আমরা যদি সত্যি চেষ্টা করে থাকি, আল্লাহ সেই চেষ্টাকেই ভালোবাসেন।
15/03/2026
রমজান মানে শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করা না।
রমজান মানে আত্মাকে জাগানো, আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া।
অনেকেই মনে করেন রোজা রাখলেই হলো, সারাদিন একটু বেশি ঘুমিয়ে কাটালে কষ্ট কম হবে। কিন্তু এই ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল। রোজা কষ্ট কমানোর জন্য না, রোজা হলো কষ্টকে অর্থবহ করার জন্য। আল্লাহ আমাদেরকে শুধু না খেয়ে থাকতে বলেননি; তিনি আমাদেরকে তাকওয়া অর্জনের জন্য রোজা দিয়েছেন।
যদি পুরো দিন ঘুমিয়ে কাটাই, তাহলে আমরা কী পেলাম? না কুরআনের তিলাওয়াত হলো, না যিকির বাড়লো, না আত্মসমালোচনা হলো। রোজার সময়টা জীবনের সবচেয়ে বরকতময় সময়গুলোর একটি। এই সময়ে প্রতিটি দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বাড়ে, প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। অথচ আমরা যদি সেই সময়টাকে ঘুমের মধ্যে হারিয়ে ফেলি, তাহলে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করছি।
হ্যাঁ, শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নেওয়া জরুরি। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে দিনকে রাত বানিয়ে ফেলা, ফজরের পর থেকে আসর পর্যন্ত অকারণে ঘুমিয়ে থাকা, এটা রোজার চেতনার সাথে যায় না। রোজা আমাদেরকে শৃঙ্খলা শেখায়, ধৈর্য শেখায়, আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখায়। ঘুমিয়ে পালিয়ে যাওয়া এই শিক্ষার বিপরীত।
ভাবুন তো, এই রমজান হয়তো আমাদের জীবনের শেষ রমজান। যদি সত্যিই শেষ হয়, তাহলে কি আমরা চাইবো এটা ঘুমের মধ্যে কেটে যাক? নাকি চাইবো প্রতিটি দিন কুরআন, দোয়া, ইস্তেগফার আর সৎকাজে ভরে উঠুক?
রমজানকে “রেস্ট মাস” না বানিয়ে “রিটার্ন মাস” বানাই।
কম ঘুম, বেশি সচেতনতা।
কম অলসতা, বেশি ইবাদত।
রোজা আমাদের দুর্বল করার জন্য না, আমাদেরকে শক্তিশালী বানানোর জন্য।
তাই এই রমজানে সিদ্ধান্ত হোক আমরা শুধু রোজাদার হবো না, আমরা হবো সচেতন রোজাদার।
12/03/2026
নুসাইবা বিনতে কা’ব রাদিয়াল্লাহু আনহা,
তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন উম্মে উমারা রাদিয়াল্লাহু আনহা নামে। তিনি শুধু ঘরের কাজ, ইবাদত, সন্তান প্রতিপালনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি ছিলেন সাহস, ত্যাগ, এবং ঈমানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
নুসাইবা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন আনসারী। অর্থাৎ তিনি মদিনার একজন সাহাবিয়া। ইসলাম যখন মদিনায় পৌঁছায়, তিনি সত্যকে চিনেছিলেন। ভয় পাননি। দেরি করেননি। তিনি ঈমান এনেছিলেন।
তিনি ছিলেন সেই নারীদের একজন, যারা আকাবার বাইআতে অংশ নিয়েছিলেন। সেই বাইআতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। একজন নারী হয়েও তিনি সামনে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
এখানেই প্রথম শিক্ষা আছে। ঈমান শুধু অনুভূতি নয়, ঈমান দায়িত্ব।
তিনি বিবাহ করেন জায়েদ বিন আসিম রাদিয়াল্লাহু আনহুকে। তাঁর দুই ছেলে ছিলেন আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং হাবিব বিন জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু। তাঁদেরকে তিনি ঈমানদার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন।
এখানে দ্বিতীয় শিক্ষা আছে।মা শুধু সন্তান বড় করেন না, মা সন্তান গড়ার কারিগর।
উহুদের যুদ্ধে তিনি প্রথমে পানি বহন করতেন।আহতদের সেবা করতেন।
কিন্তু যখন যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিপদের মুখে পড়েন, তখন উম্মে উমারা রাদিয়াল্লাহু আনহা অস্ত্র হাতে নেন। তিনি নিজেকে ঢাল বানিয়ে রাসূলকে রক্ষা করেন। তিনি আঘাত পেয়েছেন, আহত হয়েছেন, তবুও পিছু হটেননি।
এখানে তৃতীয় শিক্ষা আছে। সংকটের সময় সাহসী মানুষই কাজে লাগে।
তারপর আসে কঠিন পরীক্ষা। তাঁর ছেলে হাবিব বিন জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে মিথ্যাবাদী মুসাইলিমা নির্মমভাবে হত্যা করে। এটা কোনো সাধারণ কষ্ট নয়। এটা একজন মায়ের হৃদয় ভেঙে দেওয়ার মতো আঘাত। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি।
এখানে চতুর্থ শিক্ষা আছে। ঈমান থাকলে কষ্ট মানুষকে থামাতে পারে না।
এরপর ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি অংশ নেন। বয়স অনেক ছিল, তবুও যান।
সেই যুদ্ধে তাঁর একটি হাত কেটে যায়। কিন্তু তাঁর দৃঢ়তা কাটেনি।
এখানে পঞ্চম শিক্ষা আছে। সত্যের পথে থাকলে শরীর দুর্বল হতে পারে, মন দুর্বল হয় না।
এই জীবনী থেকে আমাদের জন্য তিনটি কাজ খুব স্পষ্ট।
এক, নিজের ঈমানকে শক্ত করুন।
দুই, সন্তানকে শুধু দুনিয়ার জন্য নয়, আখিরাতের জন্য গড়ুন।
তিন, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে ভয়কে জয় করুন।
আজ থেকেই একটি ছোট নিয়ত করুন। আমি আল্লাহর জন্য শক্ত থাকবো।
আমি দায়িত্ব নেবো। আমি আমার ঘর থেকে ঈমানের পরিবেশ তৈরি করবো।
আল্লাহ আমাদের উম্মে উমারা রাদিয়াল্লাহু আনহার মতো দৃঢ় ঈমান দান করুন। আমিন।
12/03/2026
হিজরতের সময়। মক্কা ছেড়ে মদিনায় যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ছোট একটি পরিবার রওনা হলো। আবূ সালামা রা., তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামা রা., এবং তাঁদের শিশুপুত্র সালামা।
কিন্তু পথেই বাধা এল।
উম্মে সালামা রা.-এর গোত্রের লোকেরা এসে দাঁড়াল। তারা বলল, তাদের মেয়েকে তারা মদিনায় যেতে দেবে না। আবূ সালামা রা. একা যেতে পারেন, কিন্তু স্ত্রীকে নিয়ে যেতে পারবেন না। আবু সালামা রা. আপত্তি করলেন। তিনি স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে যেতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু জোর করে তাঁকে আলাদা করে দেওয়া হলো। তাঁকে একাই মদিনার পথে পাঠানো হলো।
এরপর শিশুপুত্রকে নিয়ে আরেক বিরোধ শুরু হলো। পিতার বংশের লোকেরা বলল, সন্তান তাদের বংশের। টানাটানির মধ্যে শিশুটির হাত আঘাতপ্রাপ্ত হলো। এক মায়ের সামনে তাঁর সন্তানের এই কষ্ট। অথচ তিনি অসহায়।
শেষ পর্যন্ত তিনজন তিন জায়গায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। স্বামী মদিনায়। উম্মে সালামা রা. তাঁর পিতৃগৃহে। সন্তান অন্যদের কাছে।
উম্মে সালামা রা. প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে বসতেন। কাঁদতেন। স্বামীর জন্য, সন্তানের জন্য। প্রায় এক বছর কেটে গেল। তবুও তিনি ধৈর্য হারাননি। অভিযোগ করেননি। আল্লাহর উপর ভরসা রেখেছিলেন।
অবশেষে কিছু মানুষের হৃদয় নরম হলো। তারা বলল, সন্তানকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। উম্মে সালামা রা. তাঁর সন্তানকে ফিরে পেলেন। এরপর তিনি নিজেই মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। একা। কোলে ছোট শিশু। সামনে দীর্ঘ মরুভূমির পথ।
পথে তাঁর দেখা হলো উসমান ইবনে তালহা রা.-এর সঙ্গে। তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। কিন্তু তিনি ছিলেন সম্মানিত ও নীতিবান মানুষ। তিনি বুঝলেন, একজন নারী একা এভাবে যাত্রা করতে পারে না। তিনি নিজেই দায়িত্ব নিলেন তাঁকে নিরাপদে মদিনা পৌঁছে দেওয়ার। পুরো পথ সম্মান বজায় রেখে সঙ্গ দিলেন। অবশেষে মা ও সন্তান নিরাপদে মদিনায় পৌঁছালেন।
এই ঘটনা আমাদের কয়েকটি গভীর শিক্ষা দেয়।
প্রথমত, ধৈর্য কখনো বৃথা যায় না। এক বছরের বিচ্ছেদ শেষ পর্যন্ত মিলনে পরিণত হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর উপর ভরসা রাখলে তিনি অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে সাহায্য পাঠান।
তৃতীয়ত, কঠিন সময় মানুষকে ভেঙে দিতে পারে, কিন্তু ঈমান থাকলে মানুষ টিকে থাকে।
জীবনে বিচ্ছেদ আসতে পারে। অপমান আসতে পারে। অনিশ্চয়তা আসতে পারে। কিন্তু আল্লাহ যদি সাথে থাকেন, তাহলে শেষটা ভালোই হয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ধৈর্য, ভরসা এবং দৃঢ় ঈমান দান করুন। আমিন।
12/03/2026
একদিন স্বামী-স্ত্রী বসে কথা বলছিলেন। তাঁরা ছিলেন উম্মে সালামা রা. এবং তাঁর স্বামী আবু সালামা রা.। দাম্পত্য জীবনের গভীর ভালোবাসা আর আখিরাতের চিন্তা মিলেমিশে ছিল তাঁদের কথায়।
উম্মে সালামা রা. বললেন, তিনি দোয়া করেন যেন তাঁরা দুজন একসাথে জান্নাতে থাকেন। আবু সালামা রা. তখন বললেন, যদি তিনি আগে ইন্তেকাল করেন, তবে স্ত্রী যেন আবার বিবাহ করেন। কথাটি শুনে উম্মে সালামা রা. কষ্ট পেলেন। তিনি ভাবতেই পারছিলেন না, স্বামীর পর অন্য কাউকে বিয়ে করবেন।
কিন্তু আবু সালামা রা. দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। তিনি বললেন, যদি তিনি আগে চলে যান, তবে আল্লাহ যেন তাঁর স্ত্রীর জন্য তাঁর থেকেও উত্তম স্বামীর ব্যবস্থা করেন।
উম্মে সালামা রা. অবাক হলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, তাঁর স্বামীর চেয়ে উত্তম কে হতে পারে।
কিছুদিন পর আবু সালামা রা. যুদ্ধে আহত হলেন এবং পরে ইন্তেকাল করলেন। উম্মে সালামা রা. গভীর শোকে ভেঙে পড়লেন। তখন তাঁর মনে পড়ল রাসূলুল্লাহ সা. শিখিয়ে দেওয়া একটি দোয়া। যখন কোনো বিপদ আসে, তখন বলা হয় আমরা আল্লাহর এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ, আমাকে এই বিপদে সওয়াব দিন এবং এর বদলে উত্তম কিছু দিন।
তিনি দোয়া পড়লেন। কিন্তু অন্তরে ভাবছিলেন, এর থেকে উত্তম আর কী হতে পারে।
ইদ্দত শেষ হওয়ার পর একদিন মুহাম্মাদ সা. তাঁর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। উম্মে সালামা রা. বিস্মিত হলেন। তিনি তাঁর তিনটি আশঙ্কার কথা জানালেন। তিনি বললেন, তিনি ঈর্ষাপরায়ণ স্বভাবের। তাঁর বয়স হয়েছে। তাঁর ছোট ছোট সন্তান আছে।
রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে আশ্বস্ত করলেন। তিনি তাঁর জন্য দোয়া করবেন। বয়স কোনো বাধা নয়। আর সন্তানদের দায়িত্বও তিনি নেবেন।
অবশেষে বিয়ে সম্পন্ন হলো। উম্মে সালামা রা. হলেন উম্মুল মুমিনীন। তখন তিনি বুঝতে পারলেন আবু সালামা রা. এর সেই দোয়ার অর্থ। আল্লাহ সত্যিই তাঁকে তাঁর স্বামীর থেকেও উত্তম একজন স্বামী দান করেছেন।
এই ঘটনা আমাদের কয়েকটি বড় শিক্ষা দেয়।
প্রথমত, বিপদের সময় হতাশ না হয়ে দোয়া করতে হয়। মানুষ যখন ভাবে সব শেষ, তখন আল্লাহ নতুন দরজা খুলে দেন।
দ্বিতীয়ত, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু দুনিয়ার নয়, আখিরাতেরও। একে অপরের জন্য দোয়া করা সত্যিকারের ভালোবাসার প্রকাশ।
তৃতীয়ত, আল্লাহর পরিকল্পনা আমাদের চিন্তার চেয়ে অনেক বড়। আমরা যা হারাই, তার বদলে আল্লাহ এমন কিছু দিতে পারেন যা আমরা কল্পনাও করিনি।
জীবনে কিছু হারালে মনে রাখবেন, আল্লাহ কিছু না কিছু রেখে দিয়েছেন আপনার জন্য। ধৈর্য ধরুন। দোয়া করুন। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই ভরসা ও তাওফিক দান করুন। আমিন।
11/03/2026
অনেকেই রমজান এলে খুব যত্ন করে রোজা রাখি। সাহরিতে উঠি, ইফতারের প্রস্তুতি নিই, দিনের ক্লান্তি সহ্য করি। কিন্তু একবার নিজেকে জিজ্ঞেস করি, পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ ঠিকমতো আদায় করছি তো?
রোজা ফরজ, ঠিক। কিন্তু নামাজও তো ফরজ। বরং নামাজ ইসলামের স্তম্ভ। যে স্তম্ভের উপর পুরো দীন দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যদি রোজা রাখি, কিন্তু নামাজ ছেড়ে দিই, তাহলে যেন একটি ঘর বানাতে গিয়ে তার মূল ভিত্তিটাই ফেলে দিচ্ছি।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, “নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” নামাজ আমাদের হৃদয়কে পরিষ্কার করে, ঈমানকে শক্ত করে, রোজার স্বাদকে গভীর করে। নামাজ ছাড়া রোজা শুধু ক্ষুধা আর পিপাসা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু নামাজের সাথে রোজা হলে তা হয়ে যায় তাকওয়ার প্রশিক্ষণ।
প্রিয় নবী ﷺ বলেছেন,
“মানুষ ও কুফরের মাঝে পার্থক্য হলো সালাত ত্যাগ করা।” ভাবুন তো, যে আমলটি আমাদের ঈমানের পরিচয় বহন করে, সেটিই যদি আমরা অবহেলা করি, তাহলে রোজার সৌন্দর্য কীভাবে পূর্ণ হবে?
রমজান শুধু রোজার মাস নয়, এটা ফিরে আসার মাস। নতুন করে শুরু করার মাস। তাই চলুন, আমরা সিদ্ধান্ত নিইরোজা যেমন রাখবো, তেমনি পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজও সময়মতো আদায় করবো। কোনো অজুহাত নয়। কাজের ব্যস্ততা নয়। ক্লান্তি নয়।
আর যদি সুস্থ থাকি, সামর্থ্য থাকে, তাহলে তারাবিহ নামাজও আদায় করবো। কারণ এটি সুন্নাহ মুয়াক্কাদাহ, রাসূল ﷺ এর প্রিয় আমল। রমজানের রাতগুলো যেন খালি না যায়।
এই রমজানেই আমরা আমাদের জীবনকে ব্যালেন্স করি ফরজের উপর দৃঢ় হয়ে, সুন্নাহর মাধ্যমে তা সুন্দর করি।
10/03/2026
হযরত মারিয়াম আ. ছিলেন একজন অত্যন্ত পবিত্র ও আল্লাহভীরু নারী। আল্লাহ তাঁর জন্য একটি বিশেষ পরীক্ষা ঠিক করেছিলেন।
আল্লাহর হুকুমে তিনি গর্ভবতী হলেন। কোনো স্বামী ছাড়া। এটা ছিল অলৌকিক ঘটনা। কিন্তু সমাজ তো অলৌকিকতা বোঝে না। মানুষ প্রশ্ন করবে, সন্দেহ করবে, অপবাদ দেবে। এই ভয় থেকেই মারিয়াম আ. সবার থেকে দূরে সরে গেলেন। এক নির্জন জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নিলেন। একটি খেজুর গাছের নিচে বসে রইলেন। তিনি তখন একা।
এর মধ্যেই প্রসব বেদনা শুরু হলো। তীব্র ব্যথা। পাশে কেউ নেই। সাহায্য করার কেউ নেই। সেই কষ্টে তিনি বললেন, যদি এর আগে তিনি মারা যেতেন, যদি কেউ তাকে মনে না রাখত, তাহলে হয়তো এই অপবাদ সহ্য করতে হতো না। এটা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত।
ঠিক তখনই আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন। তাঁর পায়ের নিচ দিয়ে ঝর্ণা প্রবাহিত হলো। তাঁকে বলা হলো, খেজুর গাছ নেড়ে দাও। তাজা খেজুর পড়ে যাবে। খাও, পানি পান করো, মন শান্ত রাখো। ভাবুন, মরুভূমির মতো জায়গায় ঝর্ণা এবং তাজা ফল। আল্লাহ যখন সাহায্য করেন, তখন অসম্ভবও সম্ভব হয়ে যায়।
এরপর জন্ম নিলেন ঈসা আ.।
কিছুদিন পর মারিয়াম আ. শিশুকে নিয়ে নিজের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে এলেন। মানুষ তাঁকে দেখে অবাক হলো। তাঁরা অভিযোগ করতে লাগল। বলল, তাঁর পরিবার তো সৎ ছিল, তাহলে তিনি কীভাবে এমন করলেন।
মারিয়াম আ. কোনো জবাব দিলেন না। তিনি শুধু শিশুর দিকে ইশারা করলেন। মানুষ বলল, দোলনায় থাকা শিশুর সাথে কীভাবে কথা বলা যায়।
তখন অলৌকিক ঘটনা ঘটল। শিশু ঈসা আ. কথা বললেন। তিনি বললেন, তিনি আল্লাহর বান্দা। আল্লাহ তাঁকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবী বানিয়েছেন। এইভাবে আল্লাহ নিজেই তাঁর মায়ের সম্মান রক্ষা করলেন।
এই ঘটনা আমাদের কী শেখায়।
যখন আপনি একা মনে করবেন, তখনও আল্লাহ পাশে থাকেন।
যখন মানুষ অপবাদ দেবে, তখনও সত্য বদলায় না।
সবসময় তর্ক করে নিজেকে প্রমাণ করতে হয় না। কখনো আল্লাহ নিজেই আপনার পক্ষে কথা বলেন।
কষ্ট এলে মনে রাখুন, মারিয়াম আ. একা প্রসব করেছেন, অপবাদ সহ্য করেছেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে ছেড়ে দেননি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ধৈর্য, পবিত্রতা এবং তাঁর উপর পূর্ণ ভরসা দান করুন। আমিন।
10/03/2026
একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হলো। তাঁর নাম রাখা হলো মারিয়াম। তাঁর পিতা ছিলেন ইমরান আ.। তাঁর মা ছিলেন হান্না আ.। তাঁরা ছিলেন ধার্মিক, জ্ঞানী এবং আল্লাহভীরু মানুষ। বহু বছর তাঁদের কোনো সন্তান ছিল না। কিন্তু তাঁরা হতাশ হননি। তাঁরা আল্লাহর উপর ভরসা রেখেছিলেন।
হান্না আ. একদিন দোয়া করলেন। তিনি নিয়ত করলেন, আল্লাহ যদি সন্তান দেন, তবে সেই সন্তানকে বাইতুল মুকাদ্দাসের খেদমতে উৎসর্গ করবেন।
আল্লাহ তাঁদের দোয়া কবুল করলেন। কিন্তু জন্ম নিল কন্যা সন্তান।
হান্না আ.একটু বিস্মিত হলেন। তিনি ভেবেছিলেন পুত্র সন্তান হবে। কারণ সে সময় মসজিদের খেদমতে সাধারণত ছেলেরা থাকত। কিন্তু আল্লাহ জানতেন তিনি কী দিচ্ছেন। অর্থাৎ, আল্লাহর দেওয়া কন্যাটির ভেতরে বিশেষ মর্যাদা ছিল।
আল্লাহ নিজেই মারিয়াম আ. কে কবুল করলেন। তাঁকে পবিত্রতার জন্য নির্বাচন করলেন। মারিয়াম আ. বড় হলেন জাকারিয়া আ. এর তত্ত্বাবধানে। তিনি মসজিদে থাকতেন। ইবাদত করতেন। শান্তভাবে আল্লাহর সাথে সময় কাটাতেন।
একদিন জাকারিয়া আ. এসে দেখলেন, মারিয়ামের কাছে অমৌসুমী ফল রয়েছে। শীতের সময়ে গ্রীষ্মের ফল। গ্রীষ্মের সময়ে শীতের ফল। তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কোথা থেকে এলো।
মারিয়াম আ. খুব সহজভাবে বললেন, এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে। এই ছোট উত্তরেই বড় ঈমান লুকিয়ে আছে। তিনি জানতেন, রিজিক মানুষ দেয় না। আল্লাহ দেন।
এই গল্প থেকে আমরা কী শিখি।
প্রথমত, সবর করলে আল্লাহ উত্তম কিছু দেন। হান্না আ. দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছেন। আল্লাহ তাকে এমন কন্যা দিয়েছেন, যার নাম কুরআনে এসেছে।
দ্বিতীয়ত, নিয়ত খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু সন্তান চাননি। তিনি চেয়েছিলেন আল্লাহর জন্য একটি সন্তান। তাই আল্লাহ তার সন্তানের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন।
তৃতীয়ত, আল্লাহ যা দেন, তা-ই উত্তম। আমরা কখনো ছেলে চাই, কখনো নির্দিষ্ট কিছু চাই। কিন্তু আল্লাহ আমাদের জন্য যা ঠিক, সেটাই দেন।
চতুর্থত, সন্তান আমানত। তাকে দুনিয়াবি সাফল্যের জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গড়ে তুলতে হবে।
আজ নিজের কাছে প্রশ্ন করুন। আমরা কি আমাদের সন্তানদের আল্লাহর পথে গড়তে চাই, নাকি শুধু দুনিয়ার জন্য। আল্লাহ আমাদের সঠিক নিয়ত, সবর এবং নেককার সন্তান দান করুন। আমিন।
10/03/2026
আপনি কি কল্পনা করতে পারেন, একজন মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাসতে পারে।
হযরত আসিয়া আ. পেরেছিলেন।
তিনি তখন মাটির উপর শুয়ে আছেন। হাত পা বাঁধা। শরীর ব্যথায় অবশ। মাথার উপর বিশাল পাথর তোলা হয়েছে। চারপাশে ফেরাউনের সৈন্যরা দাঁড়িয়ে আছে। মৃত্যু একেবারে সামনে।
তার অপরাধ ছিল একটাই।
তিনি আল্লাহকে বেছে নিয়েছিলেন।
ফেরাউন তাকে প্রশ্ন করেছিল, সে কি তার স্বামীকে ছেড়ে মুসার রবকে বেছে নিয়েছে! আসিয়া আ. কোনো ভয় দেখাননি। কোনো তর্ক করেননি। খুব শান্তভাবে বলেছিলেন, তিনি আল্লাহকেই বেছে নিয়েছেন।
এই কথাটাই ছিল তাঁর সাহস। এই কথাটাই ছিল তাঁর ঈমান।
যন্ত্রণা বাড়ছিল। শরীর আর সহ্য করতে পারছিল না। কিন্তু তাঁর মন তখন অন্য জায়গায় ছিল। তিনি আসমানের দিকে তাকালেন। শেষ মুহূর্তে তিনি মানুষের দিকে তাকাননি। তিনি আল্লাহর দিকে তাকিয়েছিলেন।
তিনি দোয়া করেছিলেন, যেন আল্লাহ তাঁর কাছে জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করে দেন এবং তাকে ফেরাউন ও তার কাজ থেকে মুক্ত করেন।
আল্লাহ তাঁর দোয়া ফিরিয়ে দেননি। মৃত্যুর আগেই আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের সেই ঘর দেখিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহর সান্নিধ্যের সেই দৃশ্য তাঁর চোখের সামনে খুলে গিয়েছিল।
ঠিক তখনই আসিয়া আ. হেসে উঠেছিলেন।
ব্যথা তখনো ছিল। পাথর তখনো মাথার উপর। কিন্তু তাঁর চোখে তখন জান্নাত। তাঁর হৃদয়ে তখন আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হওয়ার প্রশান্তি।
সৈন্যরা বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে ছিল। এত কষ্টের মধ্যেও কীভাবে একজন মানুষ হাসতে পারে।
তিনি হাসছিলেন কারণ তিনি হারেননি। তিনি হাসছিলেন কারণ তিনি আল্লাহকে বেছে নিয়েছিলেন। আর আল্লাহ তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন।
এই ঘটনা আমাদের খুব গভীর কিছু শেখায়।
আল্লাহর সাথে সম্পর্ক থাকলে মানুষ কখনো একা থাকে না। আসিয়া আ. প্রাসাদে একা ছিলেন। নির্যাতনের সময় একা ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ ছিলেন। আর সেটাই যথেষ্ট ছিল।
দোয়ার শক্তি কত বড়, সেটাও আমরা এখান থেকে শিখি। শেষ মুহূর্তে করা একটি দোয়া জান্নাতের দরজা খুলে দিতে পারে।
আর যখন জীবনে কষ্ট আসে, তখন এই ঘটনাটা মনে করুন। আপনার কষ্ট বড় মনে হতে পারে। কিন্তু আসিয়া আ এর কষ্টের তুলনায় সেটা কতটা।
তিনি পাথরের নিচে থেকেও হাসতে পেরেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, আল্লাহ দেখছেন।
আজ আমাদের কাছেও আল্লাহ একইভাবে দেখছেন। আমাদের কান্না শুনছেন। আমাদের নীরব সবর জানেন।
পছন্দ আমাদের হাতে। দুনিয়াকে বেছে নেব, নাকি আল্লাহকে।
যে আল্লাহকে বেছে নেয়, আল্লাহ তাকে কখনো হারতে দেন না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দিন। আমিন।
09/03/2026
একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হলো। শিশুটি ছিল অসম্ভব সুন্দর। আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ শুধু একবার তাঁকে দেখে যাওয়ার জন্য আসত। তাঁর নাম রাখা হলো আসিয়া।
তাঁর পিতা-মাতা ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও জ্ঞানী মানুষ। দীর্ঘদিন তাঁরা সন্তানহীন ছিলেন। রাতের পর রাত আল্লাহর দরবারে কেঁদেছেন। তাঁরা নিয়ত করেছিলেন, আল্লাহ যদি সন্তান দেন, তবে তাঁকে আল্লাহর পথেই উৎসর্গ করবেন।
আল্লাহ তাঁদের দোয়া কবুল করলেন। একটি কন্যাসন্তান দিলেন।
আসিয়া বড় হতে থাকলেন ঈমানের পরিবেশে। কুরআন, আদব, আখলাক সবই তিনি শিখেছেন তাঁর পিতা-মাতার কাছ থেকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ তাঁকে চিনত তাঁর সৌন্দর্য নয়, তাঁর চরিত্রের জন্য।
একই সময় অন্য এক ঘরে বড় হচ্ছিল এক ছেলে। তার নাম ছিল ফেরাউন। কৃষকের ঘরে জন্ম নেওয়া এই ছেলেটি বড় হতে হতে অন্যায়ের পথে জড়িয়ে পড়ে। তার আচরণে মানুষ কষ্ট পেত। পুরো গ্রাম তাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে উঠেছিল।
একসময় গ্রামবাসীরা সিদ্ধান্ত নেয়, যদি তাকে এমন একজন চরিত্রবান মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো সে বদলে যাবে। সেই খোঁজ এসে থামে আসিয়ার ঘরে।
এই প্রস্তাব শুনে আসিয়ার পিতা-মাতা গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তাঁরা জানতেন ফেরাউন কেমন মানুষ। তাঁরা রাতে জায়নামাজে বসে কাঁদলেন। তাঁরা বললেন, তাঁরা তো সন্তান চেয়েছিলেন আল্লাহর জন্য।
শেষ পর্যন্ত তাঁরা আসিয়াকে ডেকে নিলেন। তাঁর মতামত জানতে চাইলেন।
আসিয়া খুব শান্তভাবে বললেন, তিনি যেতে রাজি। তিনি বললেন, হয়তো আল্লাহ তাকেই এই পরীক্ষার জন্য বেছে নিয়েছেন। হয়তো তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ কোনো হৃদয় বদলে দিতে চান।
এই সিদ্ধান্ত ছিল সহজ নয়। এটি ছিল নিজের স্বাচ্ছন্দ্য, নিজের নিরাপত্তা এবং নিজের ভবিষ্যৎকে আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত।
বিয়ে হলো। আসিয়া চলে গেলেন ফেরাউনের ঘরে।
প্রাসাদে সবকিছু ছিল। সম্পদ, ক্ষমতা, রাজকীয় জীবন। কিন্তু আসিয়া বুঝতে পারলেন, আরাম আর শান্তি এক জিনিস নয়। তিনি গোপনে ইবাদত করতেন। আল্লাহর সাথে নিজের সম্পর্ক আগলে রাখতেন। প্রাসাদের ভিড়ের মধ্যেও তিনি আল্লাহর কাছে একান্ত থাকতেন।
ফেরাউন বদলায়নি। সময়ের সাথে সাথে সে আরও অহংকারী হয়ে উঠল। একসময় সে নিজেকেই উপাস্য দাবি করতে শুরু করল।
যখন মুসা আ. নবুওয়াত পেলেন এবং সত্যের আহ্বান ছড়িয়ে পড়ল, তখন আসিয়া নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে নিলেন। তিনি জানতেন, সত্যের পথে থাকা মানেই কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া।
এই কাহিনি আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয়। বিয়ে মানেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, এমন নয়। কখনো কখনো আল্লাহ কাউকে বদলানোর জন্য নয়, নিজেকে ঠিক রাখার জন্যই আমাদের কোথাও পাঠান।
আসিয়ার জীবন শেখায়, একজন নারী তাঁর ঈমান নিয়ে যে কোনো পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। প্রাসাদে হোক বা কঠিন বাস্তবতায়, নিয়ত ঠিক থাকলে আল্লাহ যথেষ্ট হন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে এমন দৃঢ়তা দিন, যেন আমরা পরিস্থিতির কাছে হার না মানি, বরং আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে পারি। আমিন।
09/03/2026
হযরত ফাতিমা রা. ছিলেন জান্নাতের নারীদের সরদার। তাঁর এই মর্যাদা হঠাৎ করে আসেনি। তাঁর এমন কিছু গুণ ছিল, যা তাঁকে আল্লাহর কাছে এত উচ্চ স্থানে পৌঁছে দিয়েছিল। সেসব গুণ আজও আমাদের জীবনের জন্য পথনির্দেশ।
প্রথম গুণ ছিল লজ্জাশীলতা। লজ্জা মানে দুর্বলতা নয়। লজ্জা মানে নিজের মূল্য বোঝা। আজ আমরা অনেক সময় স্মার্ট হওয়াকে ভুলভাবে বুঝি। মনে করি পোশাক ছোট হলে বা আচরণ খোলামেলা হলে সেটাই আধুনিকতা। কিন্তু প্রকৃত সৌন্দর্য আসে চরিত্র থেকে।
ফাতিমা রা. ছিলেন গভীরভাবে লজ্জাশীল। তাঁর লজ্জাবোধ এতটাই দৃঢ় ছিল যে মৃত্যুর পরেও তিনি নিজের পর্দার বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তিনি চাইতেন যেন তাঁকে রাতে দাফন করা হয় এবং তাঁর কবর সাধারণের দৃষ্টির আকর্ষণ না হয়। এই লজ্জা তাঁকে ছোট করেনি। বরং আল্লাহর কাছে বড় করেছে।
দ্বিতীয় গুণ ছিল বিনয়।
বিনয় মানে নিজেকে ছোট করা নয়। বিনয় মানে নিজের শক্তির মাঝেও নরম থাকা। ফাতিমা রা. এর বিনয়ই তাঁকে জান্নাতের নারীদের নেত্রী বানিয়েছিল।
তৃতীয় গুণ ছিল সংযম এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা।
ফাতিমা রা. এর সংসার ছিল খুবই সাধারণ। তিনি নিজ হাতে কাজ করতেন। কঠোর পরিশ্রমে তাঁর হাতে ফোসকা পড়ত। একদিন কষ্টের কথা বলতে তিনি তাঁর বাবা মুহাম্মাদ সা. এর কাছে গিয়েছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে দুনিয়ার সহজ সমাধান দেননি। বরং এমন একটি আমল শিখিয়েছিলেন, যা আল্লাহর সাথে সম্পর্ককে শক্ত করে। এরপর থেকে ফাতিমা রা. আর কোনো সাহায্য চাননি। তিনি সেই আমল নিয়মিত করতেন। আর আল্লাহ অদৃশ্যভাবে তাঁর কাজ সহজ করে দিতেন।
এই তিনটি গুণ আমাদের জন্যও সম্ভব। লজ্জাশীলতা আমাদের সম্মান বাড়ায়। বিনয় আমাদের সম্পর্ক সুন্দর করে। সংযম আমাদের অন্তরকে শক্ত করে।
আজ যদি আমরা একটি ছোট সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে সেটাই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে। আচরণে সংযম আনব। কথায় বিনয় রাখব। নিজের মূল্য বুঝে চলব। আর আল্লাহর উপর ভরসা রাখব।
ফাতিমা রা. একজন নারী ছিলেন। আমাদের মতোই মানুষ ছিলেন। তিনি পেরেছিলেন। আল্লাহ চাইলে আমরাও পারব। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দিন। আমিন।
09/03/2026
হযরত খাদিজা রা. তখন একা। শরীরজুড়ে তীব্র যন্ত্রণা। সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে এসেছে। অথচ পাশে কেউ নেই। যাঁরা একসময় তাঁর সম্মান করত, তাঁর কাছেই সাহায্যের জন্য আসতো, আজ তারাই তাঁর দরজায় পা রাখেনি।
কারণ একটাই। তিনি আর তাঁর স্বামী মুহাম্মাদ সা. সত্যকে গ্রহণ করেছিলেন। আর সেই সত্য গ্রহণ করার অপরাধে কুরাইশ নারীরা তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল।
দাসী ধাত্রী ডাকতে গিয়েছিল। কেউ আসেনি। ঘরটা নিস্তব্ধ। ব্যথা বাড়ছে। এই অবস্থায় খাদিজা রা. মানুষের দিকে তাকাননি। তিনি জানতেন, মানুষ চলে যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহ ছেড়ে যান না।
তিনি চোখ বন্ধ করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। তাঁর অন্তর থেকে একটাই কথা বের হয়েছিল। হে আমার রব, তুমি আছো। তুমিই আমার জন্য যথেষ্ট।
ঠিক তখনই ঘরে অদ্ভুত এক প্রশান্ত আলো ছড়িয়ে পড়ে। খাদিজা রা. দেখলেন, দুইজন নারী তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের চেহারা থেকে শান্তি আর নূর ঝরে পড়ছে। তাঁরা তাঁকে সাহস দিলেন। সাহায্য করলেন। প্রসব সম্পন্ন হলো। জন্ম নিল কন্যা সন্তান।
প্রসবের পর খাদিজা রা. জানতে চাইলেন, তাঁরা কারা। একজন নিজেকে পরিচয় দিলেন আসিয়া হিসেবে। যিনি ছিলেন ফেরাউনের স্ত্রী। আরেকজন বললেন, তিনি মারিয়াম।ঈসা আ. এর মা।
যে শিশুর জন্মের সময় আল্লাহ আসমান থেকে সাহায্য পাঠান, সেই শিশু ছিলেন ফাতিমা রা.।
এই ঘটনা আমাদের খুব স্পষ্ট একটি শিক্ষা দেয়। যখন পুরো দুনিয়া আপনার বিপক্ষে দাঁড়ায়, যখন আপনাকে একা করে দেয়, তখনও আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে একা ছেড়ে দেন না। সাহায্য আসে। কখনো মানুষের মাধ্যমে, কখনো এমনভাবে যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।
ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ ছিলেন, যাঁরা অপমান সহ্য করেছেন, অন্যায় সহ্য করেছেন, কিন্তু প্রতিশোধ নেননি। তাঁরা জানতেন, নিজের কষ্টের বিচার আল্লাহর হাতে তুলে দিলে সেটাই সবচেয়ে নিরাপদ।
আজ আমাদের জীবনেও এমন সময় আসে। পরিবারে সমস্যা থাকে। চারপাশে কেউ দ্বীনের পথে চলে না। তখন হতাশ হওয়া সহজ। কিন্তু দায়িত্ব সবার নয়। দায়িত্ব নিজেরটা ঠিক করার। নিজের ঘরটা ঠিক করার। নিজের সন্তানের জন্য সেই পরিবেশ তৈরি করার, যা আমরা হয়তো পাইনি।
আল্লাহ কাউকে একা ছেড়ে দেন না। শুধু শর্ত একটাই। আমরা যেন তাঁর পথ ছেড়ে না যাই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই ভরসা নিয়ে বাঁচার তাওফিক দিন। আমিন।