02/10/2026
প্রতিদিন সকালে যে চকচকে চালের ভাত, টাটকা মাছ, আর উজ্জ্বল রঙের ফলমূল আমরা পরম তৃপ্তিতে পরিবারের মুখে তুলে দিচ্ছি, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক একটি মরণবাণ। বাংলাদেশ আজ এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি মানুষের তৈরি এমন এক কৃত্রিম সংকট যা আমাদের প্রতিদিনের রান্নাঘর ও খাবারের পাতকে নিঃশব্দে গ্রাস করে নিচ্ছে। বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজালের বর্তমান বাস্তবতা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নয়, এটি আসলে একটি কাঠামোগত ‘নীরব গণহত্যা’। কিন্তু এই মহাসংকটের মূলে ঠিক কী রয়েছে? এটি কি শুধুই কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত লোভ, নাকি এর পেছনে দায়ী আমাদের বর্তমান পুঁজিতান্ত্রিক বৈশ্বিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো?
বর্তমানে দেশের এমন কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য নেই যা দূষণ ও ভেজালের বাইরে রয়েছে। চালের উজ্জ্বলতা বাড়াতে ক্যাডমিয়াম ও ইউরিয়া, ফল দ্রুত পাকাতে এবং আকর্ষণীয় করতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, মাছ ও শুঁটকি দীর্ঘদিন তাজা রাখতে বিষাক্ত ফরমালিন ও লিথাল কীটনাশক, এমনকি শিশুদের প্রধান খাদ্য তরল দুধে কাপড়ের ডিটারজেন্ট ও হাইড্রোজেন পারক্সাইড মেশানোর মতো লোমহর্ষক ঘটনাও এখন প্রাত্যহিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। গুঁড়া মসলায় ইটের গুঁড়া আর টেক্সটাইল ডাই মেশানো যেন একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এগুলোর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের উপর। দেশের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন ভিড় বাড়ছে কিডনি বিকল হওয়া রোগী, লিভার সিরোসিস এবং পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষদের। চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশে গত এক দশকে ক্যান্সারের যে জ্যামিতিক বৃদ্ধি, তার অন্যতম প্রধান কারণ এই বিষাক্ত ও কেমিক্যালযুক্ত খাবার। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম—শিশুরা। শৈশব থেকেই এই ভেজাল খাবার গ্রহণের ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এই ভয়াবহ সংকটকে কেবল দুর্নীতি আর কতিপয় অসৎ ব্যবসায়ীর কারসাজি- এমন সাদামাটা ভাবে আমরা বহুদিন দেখেছি কিন্তু কোন সমাধান হয়নি, তাই আমাদের সমাজ ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা করতে এই সংকটটির গভীর বিশ্লেষণ এখন সময়ের দাবী। এই সংকটের পেছনে নিশ্চিতভাবেই দায়ী বর্তমান স্রষ্টাবিবর্জিত সেক্যুলার পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা। পুঁজিবাদ যেহেতু স্রষ্টার সাথে সম্পর্কহীন বা উচ্চতর নৈতিকতাহীন ধর্মনিরপেক্ষ (Secular) কাঠামোর উপর ভর করে চলে, সেহেতু বর্তমান সমাজের মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবল একটি উপাদান—'ব্যক্তিগত মুনাফার সর্বোচ্চকরণ' (Profit Maximization)।
পুঁজিবাদী দর্শনের জনক অ্যাডাম স্মিথ তার ‘অদৃশ্য হাত’ (Invisible Hand) তত্ত্বে বলেছিলেন, মানুষের নিজের স্বার্থ বা মুনাফা খোঁজার প্রবণতাই সমাজকে সেরা পণ্য দিতে বাধ্য করবে। কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, যখন নৈতিকতার চেয়ে মুনাফাকে বড় করে দেখা হয়, তখন ব্যবসায়ীরা ক্রেতার কল্যাণের চেয়ে নিজের পকেট ভারী করার অন্ধ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে। এছাড়া বর্তমান করপোরেট ও ভোগ্যপণ্যবাদী (Consumerism) সংস্কৃতি মানুষকে শেখায়—যেভাবেই হোক ধনী হতে হবে, কারণ টাকা ও সামাজিক প্রদর্শনই মানুষের একমাত্র মর্যাদার মাপকাঠি। ফলে, গোপনে মাছ বা দুধে বিষ মিশিয়ে হলেও উৎপাদন খরচ কমানো এবং বাজারে টিকে থাকার এক নোংরা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদদের মতে, এখানে আরেকটি বড় সমস্যা হলো ‘তথ্যের অসমতা’ (Information Asymmetry)। বিক্রেতা বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো খুব ভালো করেই জানে সে খাবারে কী বিষ মেশাচ্ছে, কিন্তু ক্রেতা সম্পূর্ণ অন্ধকারে থেকে চকচকে বিজ্ঞাপন দেখে সেই পণ্য কিনছে। এটি পুঁজিবাদের এমন এক সিস্টেমিক ফ্ল বা কাঠামোগত অবক্ষয়, যা সাধারণ মানুষকে ‘নীরব গণহত্যাকারী’ এসকল বিভিন্ন বিক্রেতাদের সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি করে ফেলে।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন জাগে: মানুষ কি সচেতন নয়? আইন কেন এই গোপন অপরাধ ধরতে পারছে না? পুঁজিবাদী মনীষীরা (যেমন মিল্টন ফ্রিডম্যান) দাবি করেন, সরকার যদি কঠোর 'রেফারি'র ভূমিকা পালন করে জালিয়াতি বন্ধ করতে পারে, তবেই পুঁজিবাদ সফল হবে। কিন্তু আমাদের দেশসহ সব পুঁজিবাদী দেশগুলোতে দেখা যায়, বৃহৎ পুঁজির মালিক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলো অনেক সময় প্রশাসন ও তদারকি সংস্থাকেই প্রভাবিত বা করায়ত্ত (Regulatory Capture) করে ফেলে।
তাছাড়া, সমাজের সব মানুষের সচেতনতা বা শিক্ষার লেভেল কখনো সমান হয় না। আধুনিক পুঁজিবাদী দীক্ষায় দীক্ষিত একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বা কর্পোরেট ব্যবসায়ী অত্যন্ত সচেতন হয়েও তার মেধাকে কাজে লাগিয়ে এমন সূক্ষ্মভাবে ভেজাল মেশান যা সাধারণ ল্যাবে ধরাও কঠিন। অন্যদিকে, একজন দরিদ্র কৃষক বা ক্ষুদ্র বিক্রেতা রাসায়নিকের সুদূরপ্রসারী বৈজ্ঞানিক ক্ষতি না বুঝেই কেবল দু-পয়সা বাড়তি লাভের আশায় ক্ষতিকর উপাদান মেশায়। ফলে, কেবল রাষ্ট্রীয় আইন বা মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্টের জরিমানা দিয়ে এই মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত অপরাধের স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না।