04/06/2025
ইয়াওমে আরাফার রোযার ফজিলত
--------------------------------------------------
হযরত আবু কাতাদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السّنَةَ الّتِي قَبْلَهُ، وَالسّنَةَ الّتِي بَعْدَهُ.
আরাফার দিনের (নয় যিলহজ্বের) রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করি যে, (এর দ্বারা) আগের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬২
প্রকাশ থাকে যে, উক্ত হাদীসে বর্ণিত ইয়াওমে আরাফা দ্বারা যিলহজ্বের নয় তারিখ উদ্দেশ্য। এই তারিখের পারিভাষিক নাম হচ্ছে ইয়াওমে আরাফা। কেননা এই রোযা আরাফার ময়দানের আমল নয় বরং আরাফার দিন তো হাজ্বীদের জন্য রোযা না রাখাই মুস্তাহাব। হাদীস শরীফে এসেছে-
عَنْ أُمِّ الْفَضْلِ بِنْتِ الْحَارِثِ،أَنّ نَاسًا تَمَارَوْا عِنْدَهَا يَوْمَ عَرَفَةَ، فِي صِيَامِ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: هُوَ صَائِمٌ، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: لَيْسَ بِصَائِمٍ، فَأَرْسَلْتُ إِلَيْهِ بِقَدَحِ لَبَنٍ، وَهُوَ وَاقِفٌ عَلَى بَعِيرِهِ بِعَرَفَةَ، فَشَرِبَهُ.
উম্মুল ফযল বিনতে হারেছ বলেন, তার নিকট কতক লোক ইয়াওমে আরাফায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রোযার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করছিল। কেউ কেউ বলছিল, তিনি রোযা আছেন। আর কেউ কেউ বলছিল, তিনি রোযা নেই। উম্মুল ফযল একটি পেয়ালাতে দুধ পাঠালেন। নবীজী তখন উটের উপর ছিলেন। তিনি দুধ পান করলেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১২৩
আরাফার দিন আল্লাহর রাসূল রোযা রাখেননি। একারণে ফকীহগণ হাজ্বীদের জন্য আরাফার দিন রোযা না রাখা উত্তম বলেছেন। আবু কাতাদা রা.-এর হাদীস দ্বারা ইয়াওমে আরাফায় রোযা রাখা মুস্তাহাব প্রমাণিত হয়। সুতরাং বুঝা গেল, আবু কাতাদাহ রা.-এর হাদীসে ‘ইয়াওমে আরাফা’ দ্বারা নয় যিলহজ্ব অর্থাৎ ঈদের আগের দিনই উদ্দেশ্য। সুতরাং আমাদের দেশের চাঁদের হিসেবে যেদিন নয় তারিখ হয় সেদিনই রোযা রাখা হবে। সৌদির হিসাবে আরাফার দিন অনুযায়ী নয়।
উল্লেখ্য, তাকবীরে তাশরীক সংক্রান্ত হাদীসেও ইয়াওমে আরাফা দ্বারা নয় যিলহজ্বই উদ্দেশ্য। কেননা এ আমলও আরাফার সাথে নির্দিষ্ট কোনো আমল নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, মাসিক আলকাউসার, জানুয়ারি ২০১৩ ঈ. (দুটি প্রশ্ন ও তার উত্তর : ইয়াওমে আরাফার রোযা ও কুরবানীর সাথে আকীকা)
*****
ইয়াওমে আরাফা : গুরুত্ব ও ফযীলত
--------------------------------------------------
এ দিন আল্লাহর কাছে অনেক মহিমান্বিত। এদিনেই আল্লাহ তাআলা এ দ্বীনকে পূর্ণতা দানের ঘোষণা দিয়েছেন এবং বান্দাদের প্রতি তাঁর নিআমতকে পূর্ণ করেছেন। এদিনেই হজ্বের মূল আমল উকূফে আরাফা। কুরআনে কারীমে আল্লাহ এ দিনের কসম করেছেন। এ দিনের দুআ আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ দুআ। এ দিনের রোযার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার দুই বছরের গুনাহ মাফ করেন। এদিন আল্লাহ সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন।
যে আয়াত নাযিল হয়েছে ইয়াওমে আরাফায়
আরাফার দিনেই ঐ আয়াত নাযিল
হয়েছে, যে আয়াতে আল্লাহ তাআলা এ দ্বীনের পূর্ণতাদানের ঘোষণা দিয়েছেন। তারেক ইবনে শিহাব বর্ণনা করেন, এক ইহুদী ওমর ইবনে খাত্তাব রা. কাছে এল এবং বলল-
يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ آيَةٌ فِي كِتَابِكُمْ تَقْرَءُونَهَا، لَوْ عَلَيْنَا نَزَلَتْ، مَعْشَر الْيَهُودِ، لَاتّخَذْنَا ذَلِكَ الْيَوْمَ عِيدًا، قَالَ: وَأَيّ آيَةٍ؟ قَالَ: اَلْیَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِیْنَكُمْ وَ اَتْمَمْتُ عَلَیْكُمْ نِعْمَتِیْ وَ رَضِیْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِیْنًا .
হে আমীরুল মুমিনীন! আপনাদের কিতাবে (কুরআনে) একটি আয়াত রয়েছে, উক্ত আয়াত যদি আমরা ইহুদীদের উপর নাযিল হত তাহলে আমরা ঐ দিনকে ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করতাম। ওমর রা. জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ আয়াত? সে তখন বলল-
اَلْیَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِیْنَكُمْ وَ اَتْمَمْتُ عَلَیْكُمْ نِعْمَتِیْ وَ رَضِیْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِیْنًا .
[আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিআমত পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম। -সূরা মায়েদা (৫) : ৩]
ওমর রা. বলেন-
إِنِّي لَأَعْلَمُ الْيَوْمَ الّذِي نَزَلَتْ فِيهِ، وَالْمَكَانَ الّذِي نَزَلَتْ فِيهِ، نَزَلَتْ عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ بِعَرَفَاتٍ فِي يَوْمِ جُمُعَةٍ.
আমি খুব ভালো করে জানি, এ আয়াত কবে নাযিল হয়েছে, কোথায় নাযিল হয়েছে। এ আয়াত নাযিল হয়েছে এক জুমার দিন, আরাফায় (আশিয়্যাতা আরাফা-আরাফার বিকেলে)। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৩০১৭; সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৮৮
ইয়াওমে আরাফায় বান্দাকে মুক্তি দেওয়া হয় জাহান্নাম থেকে
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ইরশাদ করেন-
مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النّارِ، مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ، وَإِنّهُ لَيَدْنُو، ثُمّ يُبَاهِي بِهِمِ الْمَلَائِكَةَ، فَيَقُولُ: مَا أَرَادَ هَؤُلَاءِ؟
আরাফার দিনের মত আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার নিকটবর্তী হন এবং বান্দাদের নিয়ে ফিরিশতাদের সাথে গর্ব করেন। আল্লাহ বলেন, কী চায় তারা? -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩৪৮
জাবের রা. থেকে বর্ণিত আরেক বর্ণনায় রয়েছে-
يَنْزِلُ اللهُ إِلَى السّمَاءِ الدّنْيَا فَيُبَاهِي بِأَهْلِ الْأَرْضِ أَهْلَ السّمَاءِ، فَيَقُولُ: انْظُرُوا إِلَى عبادي شعثا غبرا ضاحين، جاؤوا مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ يَرْجُونَ رَحْمَتِي، وَلَمْ يَرَوْا عَذَابِي، فَلَمْ يُرَ يَوْمٌ أَكْثَرُ عِتْقًا من النار من يوم عرفة.
আল্লাহ তাআলা নিকটতম আসমানে আসেন এবং পৃথিবীবাসীকে নিয়ে আসামেনর অধিবাসী অর্থাৎ ফিরিশতাদের সাথে গর্ব করেন। বলেন, দেখ তোমরা- আমার বান্দারা উস্কোখুস্কো চুলে, ধুলোয় মলিন বদনে, রোদে পুড়ে দূর-দূরান্ত থেকে এখানে সমবেত হয়েছে। তারা আমার রহমতের প্রত্যাশী। অথচ তারা আমার আযাব দেখেনি। ফলে আরাফার দিনের মত আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। -সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৩৮৫৩
আরাফার দুআ শ্রেষ্ঠ দুআ
ইয়াওমে আরাফায় যে দুআ-যিকির করেছেন নবীগণ
যিলহজ্বের দশকের মধ্যে ইয়াওমে আরাফা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ দিনে দুআ-যিকিরের গুরুত্ব আরো বেশি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও নবীগণ এ দিনে যে দুআ-যিকির করেছেন তা হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
خَيْرُ الدّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ، وَخَيْرُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّونَ مِنْ قَبْلِي: لَا إِلَهَ إِلّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
শ্রেষ্ঠ দুআ (-যিকির) আরাফার দুআ। এ দিনের দুআ-যিকির হিসেবে সর্বোত্তম হল ঐ দুআ, যা আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণ করেছেন। তা হল-
لَا إِلَهَ إِلّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
-জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৫৮৫; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ৩৭৭৮
*****
প্রশ্ন : এবার ঈদুল আযহা হয়েছে শনিবার। শুক্রবার আমাদের এখানে অনেকেই রোযা রেখেছিলেন। কিন্তু জুমআর বয়ানে খতীব সাহেব বললেন, আজকে যারা রোযা রেখেছেন তারা হারাম কাজ করেছেন। রোযা রাখতে হবে আরাফার দিন, যেদিন আরাফার ময়দানে হাজিরা উকূফ করেন। কারন হাদীস শরীফে ‘ইয়াওমে আরাফা’র রোযার কথা বলা হয়েছে। নয় যিলহজ্বের কথা বলা হয়নি। যারা ‘ইয়াওমে আরাফা’কে নয় যিলহজ্ব বলে ব্যাখ্যা করে তারা ভুল ব্যাখ্যা করে।
তাঁর এসব বক্তব্যে মুসল্লীদের মাঝে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। তর্ক-বিতর্কও হচ্ছে। কুরআন-হাদীসের দলীলসহ সঠিক সমাধান জানালে উপকৃত হব।
উত্তর : যিলহজ্বের প্রথম দশ দিন অতি ফযীলতপূর্ণ। এই দশদিনের আমল ও ইবাদত আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। বিখ্যাত সাহাবী আবু হুরায়রা রা. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের ইরশাদ বর্ণনা করেছেন-
ما من أيام العمل الصالح فيهن أحب إلى الله من هذا الأيام، قيل : ولا الجهاد في سبيل الله؟ قال : ولا الجهاد في سبيل الله إلا من خرج بنفسه وماله فلم يرجع من ذلك بشيء.
অর্থাৎ এমন কোনো দশক (দশদিন) নেই, যার নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোর চেয়েও বেশি প্রিয়। আরজ করা হল, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি নয়? বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়, তবে যে তার প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে বের হয়েছে এবং কোনো কিছু নিয়েই ফিরে আসেনি (অর্থাৎ শাহাদাত বরণ করেছে)। আলমুসনাদ, আহমদ, হাদীস : ১৯৬৮
হাদীসটি সহীহ বুখারীতে আছে। (দ্র. হাদীস : ৯৬৯, কিতাবুল ঈদাইন); ফতহুল বারী, ইবনে রজব ৬/১১৩
এ হাদীসে যিলহজ্বের দশ দিনের আমল-ইবাদতের ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। রোযাও একটি নেক আমল। তবে যেহেতু ঈদের দিন রোযা রাখা নিষেধ তাই ঈদের দিন বাদ দিয়ে তার আগের নয় দিন রোযা রাখাও এ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লামা ইবনে হায্ম জাহেরী রাহ.ও এই হাদীসের কারণে যিলহজ্বের প্রথম নয়দিন রোযা রাখা মুস্তাহাব বলেছেন।
তো যারা ঈদের আগের দিন রোযা রেখেছেন (যা ছিল নয় যিলহজ্ব) তারা হারাম কাজ করেছেন বলে দাবি করা উপরোক্ত হাদীসের সরাসরি বিরোধী।
তেমনি ‘ইয়াওমে আরাফা’র রোযা সম্পর্কে প্রশ্নে যে বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে তা-ও সঠিক নয়। এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ হাদীসে-
(صيام يوم عرفة أحتسب على الله أن يكفر السنة التي قبله والسنة التي بعده)
‘ইয়াওমে আরাফার রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, তিনি এর দ্বারা এর আগের এক বছরের ও পরের এক বছরের গোনাহ মাফ করবেন।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৬২
‘ইয়াওমে আরাফা’অর্থ নয় জিলহজ্ব। এটিই সঠিক ব্যাখ্যা। কারণ এই রোযা আরাফা বা উকুফে আরাফার আমল নয়; তা ঐ তারিখের আমল। ‘ইয়াওমে আরাফা’হচ্ছে ঐ তারিখের (নয় যিলহজ্বের) পারিভাষিক নাম। যেহেতু ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ রোকন হজ্বের প্রধান রোকন উকুফে আরাফা ঐ স্থানের তারিখ হিসাবে নয় যিলহজ্বে আদায় করা হয় তাই এ তারিখেরই নাম পড়ে গেছে ‘ইয়াওমে আরাফা’। একারণে যেসব আমল আরাফা বা উকূফে আরাফার সাথে বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট নয়; বরং যিলহজ্বের নয় তারিখের সাথে সংশ্লিষ্ট, সেগুলোকেও ‘ইয়াওমে আরাফা’র আমল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, নয় তারিখে বা ঈদের আগের দিন আমলটি করতে হবে।
এ প্রয়োগের কারণে (নয় যিলহজ্বকে ‘ইয়াওমে আরাফা’বলা) আরাফা ও তার নিকটবর্তী অঞ্চলে তো কোনো বিভ্রান্তি হয় না, কিন্তু দূরত্বের কারণে ঐ অঞ্চলের সাথে যেসব অঞ্চলের তারিখের পার্থক্য হয় সেখানে-যারা এই প্রয়োগের সঠিক অর্থ সম্পর্কে অবগত নয় তাদের-বিভ্রান্তি ঘটে। যেমনটা প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে ঘটেছে।
এ প্রয়োগের (ইয়াওমে আরাফা অর্থ নয় যিলহজ্ব) আরেকটি দৃষ্টান্ত ‘তাকবীরে তাশরীক’। এটি আরাফা বা উকুফে আরাফার বিশেষ আমল নয়। এটি শুরু হয় নয় যিলহজ্ব ফজর থেকে, অথচ যে দলীল দ্বারা নয় তারিখ থেকে তাকবীরে তাশরীক শুরু হওয়া প্রমাণিত তাতেও ‘ইয়াওমে আরাফা’শব্দই আছে। দলীলের আরবী পাঠ এই-
عن علي رضي الله عنه : أنه كان يكبر بعد صلاة الفجر يوم عرفة، إلى صلاة العصر من آخر أيام التشريق، ويكبر بعد العصر.
رواه ابن أبي شيبة في مصنفه وإسناده صحيح كما في الدراية.
আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৫৬৭৭, ৫৬৭৮
এখানেও কি ‘ইয়াওমে আরাফা’অর্থ নয় যিলহজ্ব করা ভুল?
দ্বিতীয়ত, গোটা মুসলিম উম্মাহর ইজমা আছে যে, ইয়াওমে আরাফার পরের দিনটিই ইয়াওমুন নাহর।
এটি প্রমাণ করে, ‘ইয়াওমে আরাফা’একটি তারিখের নাম, আর তা হচ্ছে নয় যিলহজ্ব, যেমন ‘ইয়াওমুন নাহর’একটি তারিখের নাম, আর তা হচ্ছে দশ যিলহজ্ব। কোনো অঞ্চলের অধিবাসীরা যদি ঐ অঞ্চলের তারিখ অনুযায়ী ইয়াওমুন নাহরের অর্থ দশ জিলহজ্ব ধরে ইয়াওমে আরাফার এমন কোনো অর্থ করেন, যদ্বারা সেখানের তারিখ হিসেবে তা হয়ে যায় আট যিলহজ্ব, তাহলে সেটা হবে এক উদ্ভট, হাস্যকর ও ইজমা বিরোধী কথা। কারণ ইয়াওমে আরাফা ও ইয়াওমুন নাহরের মাঝে আরেকটি দিন স্বীকার করে নেওয়া ইজমার সরাসরি বিরোধী।
তো এ জাতীয় বিচ্ছিন্ন চিন্তা ও বক্তব্য আরো কিছু ক্ষেত্রেও বিচ্ছিন্নতাকে অনিবার্য করে তুলবে, যা নিয়ে এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনার অবকাশ নেই।
উল্লেখ্য, আমাদের অঞ্চলে এবার নয় যিলহজ্ব ছিল শুক্রবার। একারণে শুক্রবারকে রোযার জন্য নির্দিষ্ট না করার হাদীসটিও কেউ উদ্ধৃত করতে পারেন। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, বাইতুল্লাহর তাওয়াফকালে হযরত জাবির রা.কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল,
‘শুক্রবারে রোযা রাখতে কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন।’তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, এই ঘরের মালিকের কসম!’
এই হাদীসে শুধু নিষেধের কথা বর্ণিত হয়েছে। তার ক্ষেত্র, পর্যায় ও তাৎপর্য সঠিকভাবে বুঝতে হলে এ হাদীসের অন্যান্য বর্ণনা এবং এ বিষয়ের অন্যান্য হাদীস সামনে রাখতে হবে। কিছু হাদীস লক্ষ্য করুন :
১. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা কেউ জুমুআর দিন রোযা রেখো না তবে যদি তার আগের বা পরের দিন রোযা রাখো (তাহলে অসুবিধা নেই)।
لا يصم أحدكم يوم الجمعة إلا أن يصوم قبله أو يصوم بعده. رواه البخاري ومسلم واللفظ له.
-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৯৮৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৪৪/১৪৭, কিতাবুস সিয়াম
২. অন্য বর্ণনায় আবু হুরায়রা রা. থেকে আছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা জুমার রাতকে অন্যান্য রাত থেকে আলাদা করে ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করো না। এবং জুমার দিনকে অন্যান্য দিন থেকে আলাদা করে রোযার জন্য নির্ধারণ করো না। তবে তা (জুমার দিন) যদি তোমাদের কারো রোযায় পড়ে যায় তাহলে অসুবিধা নেই।
لا تختصوا ليلة الجمعة بقيام من بين الليالي، ولا تختصوا يوم الجمعة بصيام من بين الأيام، إلا أن يكون في صوم يصومه أحدكم.
-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৪৪/১৪৮
৩. খোদ জাবির রা.-এর হাদীসটির মূল পাঠ, যা নাসায়ীর সুনানে কুবরায় রয়েছে-
محمد بن عباد بن جعفر قال : قلت لجابر : أسمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم ينهى أن يفرد يوم الجمعة بصوم؟ قال : إي ورب الكعبة.
এতে জুমআর দিন রোযা রাখা নয়; বরং শুধু জুমআর দিনকে রোযার জন্য নির্দিষ্ট করে নেওয়াকে নিষেধ করা হয়েছে।
(দ্র. আসসুনানুল কুবরা নাসায়ী, হাদীস : ২৭৬০-২৭৬২ ফাতহুল মুলহিম ৩/১৫৪)
এই সকল রেওয়ায়েত ও হাদীসের কারণে সহীহ বুখারীর বিখ্যাত ভাষ্যকার ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, এসব হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়, জাবির রা.-এর হাদীসের কোনো বর্ণনায় যে নিষেধ সাধারণভাবে বর্ণিত হয়েছে তা বিশেষ অবস্থার মাঝে সীমাবদ্ধ।
আরো প্রমাণিত হয় যে, যারা জুমার আগের বা পরের দিনও রোযা রাখে, কিংবা জুমার দিনটি পড়ে যায় তার সাধারণ অভ্যাসের রোযার তারিখে, যেমন কারো আইয়ামে বীযের রোযা রাখার অভ্যাস আছে (আর এর কোনো দিন জুমার দিন হল) কিংবা বিশেষ কোনো দিবসের যেমন ইয়াওমে আরাফার রোযা রাখার অভ্যাস আছে আর ঐ তারিখটি জুমার দিন হল, তার জন্য এ দিন (আলাদা করেও) রোযা রাখা বৈধ (হারাম নয়)। তেমনি কেউ মান্নত করল, অমুক যেদিন আসবে কিংবা অমুক যেদিন সুস্থ হবে সে দিন রোযা রাখব আর (ঘটনাক্রমে) দিনটি জুমার দিন হল, তার জন্যও (শুধু) এদিন রোযা রাখা জায়েয।-ফাতহুল বারী ৪/২৭৫ (সংক্ষেপিত)
হাদীস শরীফে জুমার দিনকে রোযার জন্য আর জুমার রাতকে ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করতে কেন নিষেধ করা হল-এ বিষয়ে আলিমগণ বিভিন্ন তাৎপর্য উল্লেখ করেছেন। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রাহ.-এর ভাষায় এর একটি তাৎপর্য হল, শরীয়ত যখন এ দিবসকে বিশেষ কিছু ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করেছে এবং এর ফযীলত বর্ণনা করেছে তখন আশঙ্কা ছিল অতিউৎসাহীরা নিজেদের পক্ষ হতে এদিনের রোযাকেও বাড়িয়ে নিবে। এই বাড়াবাড়ির পথ বন্ধ করার জন্য এ আদেশ জারি করা হয়েছে। (এ থেকে জুমার রাতকে ইবাদতের জন্য নির্ধারণ না করার আদেশের তাৎপর্যও বোঝা যায়)। (দ্র. হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ; ফতহুল মুলহিম ৩/১৫৫-১৫৬)
যাহোক, উপরের আলোচনা থেকে অন্তত এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে, ইয়াওমে আরাফা (নয় যিলহজ্বের) রোযার উদ্দেশ্যে যারা এদিন রোযা রেখেছেন তাদের ক্ষেত্রে জুমার দিন রোযা না-রাখার আদেশ সম্বলিত হাদীস প্রয়োগ করার সুযোগ নেই।
[ মাসিক আলকাউসারের বিভিন্ন সংখ্যা থেকে সংগৃহীত ]
#ইয়াওমে_আরাফা_মাসিক_আলকাউসার