13/05/2026
প্রথম বিয়েই সবার ওপর সমভাবে বাধ্যতামূলক নয়। শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক সুস্থতা বিবেচনায় ব্যক্তিভেদে হুকুম পরিবর্তন হয়।
আঞ্চলিক ভিন্নতা, লাইফস্টাইল এবং জনপদের প্রচলিত খাদ্যাভ্যাস পুরুষ-মহিলার শারীরিক গঠন, জৈবিক চাহিদা ও মনস্তত্ত্বে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। সেকারণে মধ্যপ্রাচ্যের পুরুষের সক্ষমতা গাজীপুর-ময়মনসিংহে বসবাসরত পুরুষের অর্জন করা অত্যন্ত টাফ।
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে প্রচলিত ধারার সাথে এরা ধীরেধীরে খাপেখাপে মিলে যায়। এই মিলনের পর যখন ব্যতিক্রম দেখতে পায় তখন তারা শকড হয়। উত্তেজিত হয়ে তা ভেঙে পুরনো বন্ধনে ফিরতে হয় উদগ্রীব। এক্ষেত্রে শরীয়াহ নমনীয় অবস্থান বজায় রাখে। শরীয়াহর নীতি হল, যদি সমাজে প্রচলিত কোনো অভ্যাস বা চর্চিত বিষয় ইসলামী ধারার সাথে সাংঘর্ষিক না হয় তাহলে সেগুলো এক অভিযানে ভেঙে না ফেলে কৌশলগত পরিকল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাওয়াতের মাধ্যমে অল্প অল্প পরিবর্তন করা। উরুফ ভেঙে ফেললে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই হয় বেশি।
শরীয়াহর নীতি অনুযায়ী পুরুষদের জন্য বিশেষ শর্তসাপেক্ষে চারটি বিয়ে পর্যন্ত বৈধ। কুরআন স্পষ্টভাবে সমতা বা আদল বজায় রাখার শর্ত দিয়েছে। তবে ইসলামে দ্বিতীয় বিবাহকে একটি 'অনুমতি' হিসেবে রাখা হয়েছে। এটিকে এমন কোনো 'আবশ্যকীয় সুন্নাহ' বা 'ওয়াজিব' করা হয়নি যা সমাজে গণহারে প্রচার বা ক্যাম্পেইন করতে হবে। শরীয়াহর মেজাজ হলো, এটি প্রয়োজনের ভিত্তিতে ব্যবহৃত হবে, শখের বশবর্তী হয়ে বা অন্যের অধিকার নষ্ট করে নয়।
এবার সামাজিক উরুফের দিকে একটু তাকান। আপনি যে মহিলাকে বিয়ে করলেন তার পারিবারিক দূর অতীতের ইতিহাসেও কেউ দ্বিতীয় বিবাহ করে নি। তার মা, খালা, ফুফু, বোন কারোরই এই অভিজ্ঞতা নেই। সে জেনেই এসেছে যে, জামাই তার একার। জামাইয়ের পাশে অন্যকোনো নারীকে সতীন হিসেবে দেখার কল্পনাও তাকে বিমর্ষ করে তোলে। তীব্র শীতের দিনেও সে ঘেমে যায় মানসিক অস্থিরতায়।
এমন প্রেক্ষাপটে যেখানে একটি বিয়ের পর দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রীর ওপর বড় ধরনের মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয় নেমে আসে, সেখানে একে ঢালাওভাবে প্রচার করা কতটুকু কল্যাণকর তা ভাববার বিষয়। ফিকহ শাস্ত্রের একটি মূলনীতি হলো—"ক্ষতি দূর করা উপকার অর্জনের চেয়ে অগ্রাধিকার পায়" (دَرْءُ الْمَفَاسِدِ مُقَدَّمٌ عَلَى جَلْبِ الْمَصَالِحِ)
যদি ক্যাম্পেইনের ফলে পরিবারে অশান্তি, বিবাহবিচ্ছেদ এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, তবে এমন ক্যাম্পেইন শরীয়াহর 'মাকাসিদ' বা উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। কারণ এরদ্বারা শর'ঈর সীমার ভেতর مصالح العباد অর্জিত হয় না।
মহিলারা সাধারণত জামাইয়ের ভাগ কাউকে দিতে চায় না। এটা তাদের মৌলিক ফিতরাত। এতে তেমন সমস্যা নেই। শরীয়াহতে ছাড় আছে। কিন্তু তাদের এই সাধারণ ফিতরাতই পুরুষের অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের কারণে কুফরিতে রূপান্তরিত হতে পারে। বৈধ বিধানের প্রতি তাদের এমন বিদ্বেষ বা শব্দচয়ন হতে পারে যা তাদেরকে প্রকারান্তরে ঈমান থেকেই ছিটকে ফেলে দেবে। অথচ আপনার দ্বিতীয় বিয়ের চেয়ে প্রথম স্ত্রীর আধ্যাত্মিকতা ঠিক রাখার চেষ্টা এবং আল্লাহর বিধিবিধানের ওপর শতভাগ আস্থা অর্জনে কৌশলী হওয়া অতীব জরুরি।
উপর্যুক্ত সামগ্রিক দিক বিবেচনায় এই দেশে মাসনার "পাখি ভাই বা IMB"-এর মতো ব্রোকার প্রতিষ্ঠানের দরকার পড়ে না। একেবারেই শরীয়াহর মেজাজের বাইরে গিয়ে নিজস্ব সীমাবদ্ধ বোঝ থেকে দাঁড়ানো এসব প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের ফাঁকফোকর ভেদ করে এমনকিছু মহিলা মাওলানাদের ঘরে ঢুকে যাচ্ছে যাদের অতীত-বর্তমান মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ। বিস্তারিত আলাপ আপাতত করছি না। তবে এগুলো বন্ধ না হলে বড় ধরনের একটা বিপর্যয় অত্যাসন্ন।
কোনো রাখঢাক এবং জড়তা ছাড়াই বলছি, IMB-এর নীতিনির্ধারকরা সমাজ বিপ্লবে এক রত্তি উপকার করতে না পারলেও ব্যাপক ক্ষতি করবে। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্বকে ঠেলে দেবে এমন একটা বিদ্বেষের জায়গায়, যেখানে কুফর আছে, ঈমান নেই।
আমি এসব প্রতিষ্ঠানের ওপেন-ডোর এক্টিভিজম বন্ধের জোরালো দাবি জানাচ্ছি। তাদের গায়রতহীন প্রচারণা ইসলামের গাম্ভীর্য নষ্ট করছে প্রতিনিয়ত। বিয়ের প্রয়োজন হলে বান্দার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হবেন। উছিলা হবে চারপাশের মানুষ এবং প্রতিবেশীরা। IMB-এর হাতে এই দায়িত্ব দিলে সংসার একটা হয়ত গড়বে, কিন্তু পুরনোটা ভেঙে খানখান হয়ে যাবে। শুরু হবে সামাজিক অবক্ষয়।
লেখক : নজরুল ইসলাম