06/04/2025
ছাত্র গড়ার কারিগর কারা?
আমার মাদরাসাজীবনের সূচনা হয় গাজীপুরের বরমী মাদরাসায়। মকতব থেকে তাইসীর পর্যন্ত পড়েছি। তাইসীরে ৩৫/৪০ জন ছাত্র ছিল। বেফাক পরীক্ষায় খুব সম্ভবত এক বিষয়ে ফেল করেছিলাম।
আমাদের সাথে ইরশাদুল্লাহ নামে একজন ছাত্র পড়ত। নেত্রকোনার মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সাহেবের সাথে সে বরমী এসেছিল। সে হাফেজ ছিল এবং মোটামুটি বয়স ছিল তার। আর আমি ছিলাম বাচ্চা পোলাপান। তাইসীর পড়ে সে চলে যায় মাদানীনগর, আমি চলে যাই বনানী মাদরাসায়।
মাঝখানে আর দেখা হয়নি। ২০০৬ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ গিয়ে দাখেলা হল, আলহামদুলিল্লাহ। পড়াশোনা শুরু করলাম। কিছু দিন পর আমাদের রুমে একজন ছাত্রের সাথে ইরশাদুল্লাহ আসল। রুমে ঢোকার পর আমি তাকে চিনি ফেলছি। কিছু ক্ষণ পর বললাম, আপনার নাম এটা, আপনার বাড়ি ওখানে?
আশ্চর্য হল। তারপর পরিচয় দিলাম। সে বলল, তুই এখানে কেমনে? আমি তো ভাবছি তোর পড়ালেখা হবে না। হওয়ার কথা না। প্রচণ্ড দুষ্ট আর পড়ালেখায় উদাসীন ছিলে। সে বড় হওয়ার কারণে আমি কেমন ছিলাম এটা তার কাছ থেকে জেনেছি।
মীযান থেকে মেশকাত পর্যন্ত লাগাতার ৭ বছর বনানী কড়াইল মাদরাসায় পড়েছি। আমি মেধাবী না, এমনকি পরিশ্রমীও ছিলাম না। জালালাইনের বছর থেকে পড়ালেখা কিছুটা বুঝতে শুরু করেছিলাম। যতটুকু পড়ালেখা হয়েছে, সবটুকু আল্লাহর খাস রহমত এবং আমার উস্তাযগণের পরিশ্রমের ফসল।
মীযানের বছর দীর্ঘ অসুস্থ ছিলাম। এসে দেখি কিতাব প্রায় শেষ। বড় হুজুর বললেন, ছুটে যাওয়া সবক আমার কাছে ধরে নিবি। হুজুর মীযান ও ইলমুস সরফ পড়াতেন।
এরপর নাহুমীরের বছর। মোটামুটি পড়াশোনা হয়েছে। বেফাক পরীক্ষায় সম্ভবত জায়্যিদ জিদ্দান হয়েছিলাম। নাহুমীর শেষ হলেও ইবারত পড়তে ঝামেলা হতো। তারপর হেদায়াতুন্নাহুর বছর বড় হুজুর যাদুত তালেবীন পড়াতেন। কিতাব শুরু করার আগে ইবারত পড়ার জরুরি বিষয়গুলো আবার ইজরা করালেন। এর দ্বারা বিরাট উপকার হল।
তখন থেকে ইবারতে আর কোনো ঝামেলা হয়নি। শরহেবেকায়ার বছর পালিয়ে বাড়ি চলে গেছিলাম। উস্তাদগণের মাধ্যমে আবার ফেরত আসি। তবে বেফাক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট হয়নি।
প্রত্যকে উস্তায কঠিন পরিশ্রম করে আমাদের পড়াতেন, ক্লাসের বাহিরে নেগরানি করতেন, পড়া বলে দিতেন, হাতের লেখা শেখাতেন। বানান শেখাতেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে, শরহেবেকায়ার বছর কিশোরগঞ্জী হুজুর পর্দার আড়ালে কিতাব নিয়ে বসে থাকতেন। সামান্য ভুল হলেই সতর্ক করতেন।
হবিগঞ্জী হুজুর পাঠাগারের দায়িত্বে ছিলেন। আমাকে হুজুরের সঙ্গে রেখে পাঠাগারের দায়িত্ব পরিচালনা করতেন। ফলে ছাত্রদের বক্তৃতা লেখা, বই পড়া ইত্যাদির সুযোগ হয়। সম্ভবত এ কারণে এক-দুই অক্ষর লেখার সুযোগ পেয়েছি এখন।
মেশকাতের শারহুত তীবী, মিরকাত এবং তালিকুস সাবী ইত্যাদি কিতাব বড় হুজুর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সিলেটী হুজুর দিয়েছিলেন বায়যাবীর শরাহ শেখযাদাহ। কোনো কিতাব না বুঝলে সিলেটী হুজুর ছিলেন ভরসা। এভাবে সকল উস্তাদ আমাদের পেছনে মেহনত করতেন।
আমার মনে হয়, আমি বড় মাদরাসায় পড়লে কিছুই হতে পারতাম না। ভালো ছাত্রদের ভীড়ে হারিয়ে যেতাম। দারুল উলুম দেওবন্দে প্রথম বছর দাখেলা পাওয়া ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়। ঠিক একইসময় জানতে পারি বেফাকে মেধাতালিকায় নাম এসেছে। আলহামদুলিল্লাহ।
বনানী কড়াইল মাদরাসা ছিল তখন ছোট্ট মাদরাসা। ভালো ভালো ছাত্র এসে বেশি দিন থাকত না। ওরা বড় বড় মাদরাসায় চলে যেত। তখন রাহমানিয়া ও জামেউল উলুমের সুনাম ছিল বেশি। আমাকেও ওরা বলত, চল তোকে ভর্তি করিয়ে দেবো। আমার যাওয়া হয়নি। যেতে পারিনি। এক মায়ার বন্ধনে উস্তাযগণ আটকে ফেলেছিলেন।
আমার মনে হয় ছাত্র গড়ার আসল কারিগর ছোট্ট মাদরাসা। তার মানে এই না যে, বড় মাদরাসার অবদান নেই। বড় মাদরাসা তো শুধু ভালো ভালো ছাত্র ভর্তি করে, খারাপ ছাত্রদের সুযোগই দেয় না।
আমার উদ্দেশ্য হল, উস্তাদ ভালো হলে ছোটো মাদরাসায় পড়লেও সমস্যা নেই।
লিখেছেন: মুফতি মহিউদ্দীন কাসেমী হাফিজাহুল্লাহ