26/03/2020
সুদীর্ঘ এই আলোচনাটি বেশ কিছুদিন আগেই লেখা। তখন করোনার নামও শোনা যায়নি। এই মুহূর্তে এই ভাইরাসটিই সবার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এটি কতটা প্রাকৃতিক, কতটা genetically modified এনিয়েও বিতর্কের শেষ নেই। কে দায়ি চিন না আমেরিকা ? এ নিয়েও বাজার গরম। যারা থ্রিলার বা গোয়েন্দা উপন্যাস পড়েছেন তাঁরা জানেন, দৃশ্যত যাকে অপরাধী মনে হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটি ঘটেনা। সবার আঙুল যেদিকে যাচ্ছে, সে হয়ত কোনো অপরাধই করেনি। যাক, আজ যে বিষয়টি [সামান্য অংশ মাত্র] এখানে রাখছি, সে সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যে আদৌ কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা জানা নেই। সেই অর্থে অনেকের কাছেই নতুন। কেউ কেউ জানলেও সেটি অনেকাংশেই অস্পষ্ট। এর পরেও কতটা স্পষ্ট হবে বলা কঠিন, কারণ অত্যন্ত স্পর্শ কাতর বিষয় হওয়াতে নিজস্ব বিশ্লেষণটিই এখানে দেওয়া যাবেনা। এছাড়াও আলোচনাটি প্রায় একটি বইয়ের আকারের। অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জন্যই সামান্য একটি অংশ দিলাম। অমৃতস্য পুত্রাঃ দ্বিতীয় খণ্ডের জন্য জন্য তুলে রেখেছিলাম। বিশ্ব পরিস্থিতির আঁচটি আগাম উপলব্ধি করেই এটি লিখে ফেলা-বইটিতে স্থান পাওয়া বেশ কিছু বিস্ফোরক বিষয়ের মধ্যে এটি অন্যতম। যদি অবশ্য প্রকাশ অবধি পৌঁছোয়।
যুদ্ধ—প্রতিবাদ, প্রকৃতি এবং পরিকল্পনা-- আলবার্ট পাইকের সেই রহস্যময় চিঠি / দেবাশিস লাহা
------------ ---- ---
আর একজন আছেন, যিনি প্রকৃতির অনস্বীকার্য mechanism হিসেবেই যুদ্ধকে দেখেছেন। ম্যালথাস। টমাস রবার্ট ম্যালথাস [১৭৬৬—১৮৩৪] জনসংখ্যা, প্রকৃতি এবং সভ্যতাকে পাশাপাশি রেখে এমন সুগভীর পর্যবেক্ষণ তাঁর আগে কেউ রাখেননি। ম্যালথাসের গবেষণা[ Malthusianism হিসেবে খ্যাত] পরবর্তীতে আরও সমৃদ্ধ, [কিঞ্চিৎ পরিবর্তিতও] হলেও সারকথা বা নির্যাসটিকে কখনই অবহেলা করা যাবেনা।
যে কোন প্রজাতিরই বৈশিষ্ট্য হল অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে বংশ বৃদ্ধি করা। সে সাপই বলুন আর ব্যাঙই বলুন। অথবা সর্বত্রগামী নেড়ি কুত্তাই বলুন। মশা মাছি তো ছেড়েই দিলাম। তবু পৃথিবীতে সাপ, ব্যাঙ, বাঘ হরিণ ইত্যাদির সংখ্যার কখনও লাগামছাড়া বৃদ্ধি হয়নি। সে ব্যবস্থা প্রকৃতিই করে রেখেছে। ব্যাঙকে খাওয়ার জন্য সাপ আছে, মশাকে খাওয়ার জন্য টিকটিকি। এতেও কাজ না হলে আছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়—ভূমিকম্প, বন্যা, খরা, দাবানল, অগ্নুৎপাত। মানুষের দ্বারা সংগঠিত হত্যালীলা তো আছেই। রাজাদের শিকারেই নেশায় বাঘও প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছিল। কিন্তু মানুষ ? তার তো কোনো natural predator অর্থাৎ স্বাভাবিক খাদক নেই । এক কালে বন্য জন্তু জানোয়ারের আক্রমণে মানুষ মরলেও এখন তা অত্যন্ত বিরল ঘটনা।যদিও মশা এখনও মারছে, তাও পর্যাপ্ত নয়। বাকি রইল প্রাকৃতিক বিপর্যয়। কিন্তু তাতেও আর তেমন মরে কই। মানে যে হারে বৃদ্ধি হচ্ছে সেই তুলনায়।আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আগাম সতর্কতার ব্যবস্থা, উদ্ধার কার্য ইত্যাদির ব্যবস্থা প্রাণহানী অনেক কমিয়ে ফেলেছে। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে মানুষের গড় আয়ু বেড়েই চলেছে। অথচ বংশবৃদ্ধি হয়েই চলেছে। কিছু কিছু জনগোষ্ঠীর জন্মহার কমলেও সামগ্রিক বিচারে তা অতি নগন্য। এই মুহূর্তে এই প্রাণিটির সংখ্যা প্রায় ৭.৬ বিলিয়ন অর্থাৎ প্রায় আটশ কোটি । দু দুটো বিশ্বযুদ্ধ না ঘটলে সেটা কোথায় ঠেকত বলা মুশকিল। কিন্তু পৃথিবীর সম্পদ তো আর বাড়ছে না। ভাঁড়ার সীমিত। ম্যালথাস আশা করেছিলেন মানুষ একদিন এই সত্য উপলব্ধি করবে। সে নিজেই বংশবৃদ্ধির ব্যাপারে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু তেমনটি ঘটেনি। তবে এই আকাশ ছোঁয়া মানুষের সংখ্যাকে কমাবে কে ? কেন মানুষই কমাবে । তবে জন্মনিয়ন্ত্রণ করে নয়, একে অপরকে হত্যা করে। তার জন্যই ইজম, তার জন্যই ধর্ম, তার জন্যই মতবাদ, তার জন্যই যুদ্ধ।
ম্যালথাসের কলমেই বিষয়টি দেখে নেওয়া যাক। তিনি কী বলতে চাইছেন ?
Famine seems to be the last, the most dreadful resource of nature. The power of population is so superior to the power in the earth to produce subsistence for man, that premature death must in some shape or other visit the human race. The vices of mankind are active and able ministers of depopulation. They are the precursors in the great army of destruction; and often finish the dreadful work themselves. But should they fail in this war of extermination, sickly seasons, epidemics, pestilence, and plague, advance in terrific array, and sweep off their thousands and ten thousands. Should success be still incomplete, gigantic inevitable famine stalks in the rear, and with one mighty blow, levels the population with the food of the world.
— Thomas Robert Malthus
[An Essay on the Principle of Population (1798) page-140]
“দুর্ভিক্ষই সম্ভবত সর্বশেষ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক সম্পদ ![ ভাবুন অনাহারে মরার মাধ্যমটিকে resource বলা হচ্ছে !] জনসংখ্যার শক্তি [প্রকৃতির] সংস্থান তৈরির সাধ্যের চেয়ে অনেক বেশি বলেই কোনো না কোনো ভাবে অকাল মৃত্যুর ছায়া মানব সভ্যতাকে ঘিরে থাকবে। মানুষের পাপই জনসংখ্যা হ্রাসের সক্রিয় এবং সফল মাধ্যম। এই পুঞ্জীভূত পাপই বিপুল সেনাবাহিনীর জন্ম দেয়, যুদ্ধের মাধ্যমেই এই ভয়ংকর কাজটি [জনসংখ্যা হ্রাস, গণহত্যা আর কি!] তারা নিজেরাই সম্পন্ন করে। যদি যুদ্ধও জনসংখ্যা হ্রাসে ব্যর্থ হয়, ভয়াবহ জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারী, প্লেগ ইত্যাদি প্রাণঘাতী রোগ হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করবে।এর পরও যদি অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা না ছোঁয়া যায়, দানবীয় দুর্ভিক্ষ অপেক্ষায় আছে, এক আঘাতেই বিশ্বের জনসংখ্যা খাদ্য সংস্থানের সমানুপাতিক হয়ে যাবে।”
নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়,রোগ, মহামারি এমন কি যুদ্ধকেও প্রকৃতির “মেকানিজম” হিসেবেই দেখেছেন। বেদান্ত দর্শনই বলুন আর উইলিয়াম ব্লেক—ম্যালথাসই সর্বপ্রথম নির্দিষ্ট একটি তত্ত্বের আকারে যুদ্ধ বিগ্রহের “সদর্থক” দিকটি তুলে ধরেন। কোনো রাখ ঢাক না করেই। স্পষ্ট ভাষায়। সোজা কথায় যুদ্ধকে অনিবার্য হিসেবেই তুলে ধরেন।
ম্যালথাস তত্ত্বের সমালোচনা হয়নি এমন নয়। তবে সবচেয়ে বেশি চটেছিলেন কার্ল মার্ক্স। ক্যাপিটাল নামক মহাগ্রন্থটির বেশ বড় অংশ জুড়েই এই ক্রোধ চোখে পড়ে। নিছক সমালোচনা নয়, রীতিমত গালাগাল। কেন বলুন তো ? মার্ক্স সাহেবের ভাষা দিয়েই শুরু করি--"nothing more than a schoolboyish, superficial plagiary of De Foe, Sir James Steuart, Townsend, Franklin, Wallace" [Dus Capital] ম্যালথাসের উপর একটি ফুটনোটে উনি এই ভাষাতেই আঘাত হেনেছেন। অর্থাৎ ম্যালথাসের থিওরিটি নাকি শিশুসুলভ। তিনি নাকি স্যার জেমস, স্টুয়ার্ট, ফ্র্যাংকলিন, ওয়ালেস ইত্যাদি পণ্ডিতদের রচনা টুকে নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। অথচ কী অবাক কাণ্ড দেখুন ! মার্ক্স সাহেবের ক্রোধ “original” দের উপর বর্ষিত হলনা, টার্গেট হলেন “বেচারা” ম্যালথাস। তিনি নাকি বুর্জোয়াদের চামচে !চাকর ! "lackey of the bourgeoisie"—হ্যাঁ, মার্ক্স সাহেব এই ভাষাই ব্যবহার করেছিলেন। কেন এই অভিযোগ ? মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা ভদ্রলোকটি মনে করতেন ম্যালথাস শুধু গরীব মানুষকেই দোষ দিয়েছেন ! কেন এমন ধারণা হল ? ওই যে দরিদ্ররাই তো জনসংখ্যা বাড়ায় ! [তবে এই দরিদ্ররা মূলত কোন মতবাদের, সেটা অবশ্য বুদ্ধিমান মার্ক্স সাহেব চেপে গিয়েছেন] যাক, মার্ক্স সাহেব বললেন ম্যালথাস লোকটি ভারি মন্দ। তিনি বুর্জোয়া অর্থাৎ মালিক শ্রেণির শোষণ, অত্যাচারের বিরুদ্ধে না বলে শুধু গরীবদেরই দোষ দিয়ে গেছেন। তাঁর এই গরীব বিরোধী তত্ত্ব সর্বহারা শ্রেণিকে দাবিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত হবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নামে বলপূর্বক বা আইনের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদনে লাগাম টানা হতে পারে। কী বুঝলেন ? মার্ক্স সাহেব কিন্তু ভুল বলেননি।সমগ্র বিশ্বেই এবিষয়ে জল্পনা বাড়ছে। এদেশে তো বটেই । জনসংখ্যা আইন এলো বলে। কোন সম্প্রদায়টির জন্মহার এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি এবং কারা এই আইনে সবচেয়ে বেশি অখুশি হবে, বোঝার জন্য পণ্ডিত হওয়ার দরকার নেই। মার্ক্স সাহেবও এই high fertility-র ব্যাপারটা নিশ্চয় জানতেন। তাই প্রিয়তম জনগোষ্ঠীর জন্য কি তিনি আগেভাগেই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন ?
মার্ক্স, এঙ্গেল্স, লেনিন, মাও এখন অস্তাচলে। কতিপয় যে দু একটি রাষ্ট্রে টিকে আছে, সেখানেও ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে আপোষ করেই। কিন্তু ম্যালথাস এখনও বহাল তবিয়তে। মার্ক্স সাহেবের চোখে চোখ রেখে অবিরাম হেসে চলেছেন। প্রশ্ন জাগতেই পারে এত বিস্তার কেন ? এত বিশদই বা কেন ? উইলফ্রেড ওয়েন থেকে শুরু করে জি বি শ, ম্যালথাস, মার্ক্স পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার পরও কিছু থাকে ? অবশ্যই থাকে ! কী থাকে ? কেন, শিরোনামটি খেয়াল করেননি বুঝি ? “প্রতিবাদ”, “প্রকৃতির” পর কী লেখা আছে বলুন তো ? ঠিক ধরেছেন—“পরিকল্পনা” ! কিসের পরিকল্পনা ? কেন যুদ্ধের ! পরিকল্পনা ছাড়া কি যুদ্ধ হয় ? ওই যে সার্জিয়াসের পর্যবেক্ষণ--“Soldiering is the coward’s art of attacking mercilessly when you are strong, and keeping out of harm’s way when you are weak.”
হ্যাঁ। পরিকল্পনা ছাড়া যুদ্ধ করা যায়না। জেতা তো অসম্ভব। শক্তিশালী শত্রুকে সমীহ করেই চলতে হয়। এতে অবাক হওয়ারও কিছু নেই। এবার যদি প্রশ্ন করি, এই যে পরিকল্পনা, সেটা যুদ্ধকালীন অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, নাকি আগে থেকে ? কোথায়, কোন সীমান্তে, কোন ফ্রন্টে কত সেনা মোতায়েন করতে হবে, বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী, পদাতিক, সাপ্লাই লাইন কীভাবে সামলানো যাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। বলাই বাহুল্য আক্রমণকারী দেশ এসবের প্রস্তুতি অনেক আগেই নিয়ে থাকে। কারণ সে-ই যুদ্ধটা শুরু করতে চলেছে। পূর্বানুমান না থাকলে আক্রান্ত দেশটির তেমন কোনো পরিকল্পনাই থাকেনা। কিন্তু কতদিন আগে ? মানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কতদিন আগে এই আক্রমণ/ যুদ্ধের পরিকল্পনা হয়ে থাকে ? এক সপ্তাহ ? এক মাস ? বড় জোর এক বছর ? তাই তো ? এবার ধরুন কেউ আপনাকে বলল, দুই শত বছর আগেই দু দুটো বিশ্বযুদ্ধের [First World War, 1914, Second World War 1939] পরিকল্পনা হয়ে গিয়েছিল, তবে আপনার কেমন প্রতিক্রিয়া হবে ? বিশ্বাসই করতে চাইবেননা। এও কি সম্ভব ! এরপর যদি বলি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছকটাও ওই ২০০ বছর আগেই কষা হয়েছিল, মানে তেমনই দাবি করা হচ্ছে, অবশ্যই প্রমাণ সহ, তবে আপনার চোখদুটো ছানাবড়ার আকৃতি ধারণ করবে কিনা, ভেবে দেখেছেন ? বেশ, এবার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নিন। এমনই একটি চিঠির খোঁজ পাওয়া গেছে। ১৫ই অগাস্ট ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে লেখা। অর্থাৎ প্রায় দুশো বছর আগে লেখা। কার লেখা ? আলবার্ট পাইক নামক এক প্রভাবশালী কবি, লেখক, সুবক্তা, চিন্তাবিদ, যুদ্ধ বিশারদের। ফ্রিম্যাসনস [Freemasons] নামক একটি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কাকে লিখেছিলেন ? জুইসেপ্পি ম্যাৎসিনি [Giuseppe Mazzini] নামের জনৈক ইটালিয়ান পলিটিশিয়ানকে। কী আছে সেই চিঠিতে ? ইতিমধ্যেই জানিয়েছি। আবার বলছি। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী কারণে, কোন পরিপ্রেক্ষিতে, কাদের মধ্যে হবে, ফলাফলই বা কী হবে, ১৮৭১ সালের সেই চিঠিতেই লিখে গিয়েছেন। পরিকল্পনাই বলুন অথবা ভবিষ্যৎবাণী—সবই হুবহু মিলে গিয়েছে। শুধু প্রথম বা দ্বিতীয় নয়, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথাও আছে সেই চিঠিতে। বিস্তারিত আলোচনার আগে সেটিই পড়ে নেওয়া যাক। কিন্তু কোথায় আছে এই চিঠি ? কীভাবেই বা জানা গেল ! ক্যানাডিয়ান নৌবাহিনীর ভূতপূর্ব আধিকারিক উইলিয়াম গাই কার [William Guy Carr, 1895—1959] Satan, Prince of the World শীর্ষক বই লেখেন। এটিই তাঁর সর্বশেষ গ্রন্থ। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে রচিত।এর কয়েক বছর আগে [১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে] Pawns in the Game শীর্ষক গ্রন্থটিতেই লেখক উইলিয়াম কার পাইক সাহেবের চিঠিটি প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন। ১৯৫৯ সালের বইটি তারই সংযোজন মাত্র। তবে আরও বেশ কিছু নতুন তথ্য এবং বিশ্লেষণ আছে। সুদীর্ঘ ছয় সাত দশক আগে শুরু হওয়া বিতর্ক, শোরগোল সাম্প্রতিককালে আরও তীব্র আকার নিয়েছে। পাশ্চাত্য সংবাদপত্র, নিউজ পোর্টাল সর্বত্রই শোরগোল পড়ে গেছে। ডেইলি স্টার, এক্সপ্রেস, ডেইলি মেইল ইত্যাদি যাবতীয় সংবাদপত্রই এবিষয়টিকে শিরোনাম করেছে। কেন এই নতুন করে খুঁড়ে ফেলা ? অবশ্যই বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি। বিশ্ব জুড়ে ক্রমবর্ধমান জিহাদি হানার পটভূমিকায় আলবার্ট পাইকরাই তো ফিরে ফিরে আসবেন। আসুন পড়ে ফেলা যাক সেই চিঠি--
“The First World War must be brought about in order to permit the Illuminati to overthrow the power of the Czars in Russia and of making that country a fortress of atheistic Communism,”
“The Second World War must be fomented by taking advantage of the differences between the Fascists and the political Zionists. This war must be brought about so that Na**sm is destroyed and that the political Zionism be strong enough to institute a sovereign state of Israel in Palestine.”
“The Third World War must be fomented by taking advantage of the differences caused by the ‘agentur’ of the ‘Illuminati’ between the political Zionists and the leaders of Islamic World. The war must be conducted in such a way that Islam (the Moslem Arabic World) and political Zionism (the State of Israel) mutually destroy each other.”
[BY RORY MCKEOWN, 7 MAR 2016, Daily Star]
একই বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন আগে পরে অন্যান্য সংবাদপত্রগুলিতেও এই খবরটি প্রকাশ পায়। সব ক্ষেত্রেই হেডলাইনটি প্রায় একই রকম ছিল -- Chillingly accurate 200-year-old letter predicts WW3 and final battle against Islam ! অর্থাৎ শিরদাঁড়া ঠাণ্ডা করে দেওয়ার মত সঠিক একটি চিঠিতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভবিষ্যৎবাণী ! কী সেই ভবিষ্যৎবাণী ? আসুন সহজ বাংলায় বুঝে নেওয়া যাক।
“প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য কারণ এর মাধ্যমেই ইলুমিনাটি [Illuminati—পরে বিশদ আলোচনা রাখছি] রাশিয়ার জার শক্তিকে উৎখাত করবে এবং দেশটিকে নাস্তিক সমাজতন্ত্রের দুর্গে পরিণত করবে।”
“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্ররোচনা আসবে ফ্যাসিবাদী এবং পলিটিকাল জায়োনিস্টদের[ইহুদি আধিপত্যকামী গোঁড়া রাজনৈতিক শক্তি] মধ্যে তীব্র মতভেদের মাধ্যমে। এই যুদ্ধটিও অনিবার্য যার ফলে নাজিবাদ ধ্বংস হবে এবং রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ইহুদিরা এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠবে যে নিজেদের রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠা করে ফেলবে।”
“তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটবে পলিটিকাল জায়োনিস্ট[ রাজনৈতিক ইহুদিশক্তি] এবং ইসলামিক বিশ্বের মধ্যে। এক্ষেত্রেও ইলুমিনাটির সদস্যরা মদত দেবে। যুদ্ধটা এমনভাবেই হবে যাতে করে ইহুদি এবং মুসলমানরা একে অপরকে ধ্বংস করে ফেলে।”
কী ! চোখ কপালে ওঠার দশা না ? ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে লেখা একটা চিঠি ! কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন ? পরিকল্পনা না ভবিষ্যৎবাণী ? আলবার্ট পাইক তো নস্ট্রাদামুসের মত কোনো জ্যোতিষী নন। তবে ? সে আলোচনায় পরে আসছি। আপাতত দেখে নিই প্রথম দুটি বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপারে তিনি কতটা সঠিক। ইলুমিনাটি কী বা কারা সে আলোচনায় পরে আসছি। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল হুবহু মিলে গেছে। রাশিয়ার জার শাসক নিকোলাস দ্বিতীয়কে উৎখাত এবং হত্যা করে [সপরিবারে] লেনিনের বলশেভিক দল ক্ষমতায় আসে, যা নভেম্বর বিপ্লব নামে পরিচিত। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে[ অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীনই এই বৈপ্লবিক ঘটনাটি ঘটে। বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাটি রাশিয়াতেই প্রতিষ্ঠিত হয় যা কালক্রমে সুবিশাল এবং শক্তিশালী সোভিয়েত ইউনিয়নের পত্তন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রেও পাইকের পর্যবেক্ষণ হুবহু মিলে গেছে। ফ্যাসিবাদী-নাজিবাদীদের সঙ্গে ইহুদিদের সংঘাতকে কেন্দ্র করেই এই মহাযুদ্ধটি ভয়াবহ আকার নেয়। ষাট লক্ষ ইহুদি [আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান] নাজি হত্যালীলার শিকার হয়। প্রত্যক্ষভাবেই। নৃশংসতা, বর্বরতার নমুনা হিসেবে বেশ কয়েকটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, গ্যাস চেম্বারকে ভয়াবহ স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। [এবিষয়ে একটি বিশদ আলোচনা এই বইতেই আছে] কিন্তু হিটলার –মুসোলিনিরা [অক্ষ শক্তি] শেষ পর্যন্ত ব্রিটেইন, আমেরিকা, ফ্রান্সের [মিত্র শক্তি] কাছে পরাজিত হয়। নির্যাতিত ইহুদিদের সুপ্রাচীন স্বপ্নটিও পূর্ণ হয়। নিজের দেশ, নিজের ভূমি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ইহুদি রাষ্ট্র ইজরায়েল। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই মে। অর্থাৎ আলবার্ট পাইক আবার ফুল মার্কস !
প্রথম দুটো না হয় হুবহু মিলে গেছে, কিন্তু তৃতীয়টি কি মিলবে ? সে বিষয়ে পরে আসছি। তার আগে আরও কয়েকটি বিষয় এবং ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া জরুরি। নইলে ব্যাপারটা আবছাই থেকে যাবে। ১] আলবার্ট পাইক ২] ফ্রিম্যাসনস [Freemasons] ৩] ইলুমিনাটি [Illuminati] ৪] উইলিয়াম কার—তাঁর চিন্তাভাবনা এবং বইপত্র। ৫] সাম্প্রতিক বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষণ, ক্রমশ দুর্বল হতে থাকা ইসলামি বিশ্ব, সৌদির শিবির বদল, এরদোগানের উত্থান, ইলুমিনাটি এবং নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারকে কেন্দ্র করে ভ্লাদিমির পুটিনের বিস্ফোরক পর্যবেক্ষণ।
১] আলবার্ট পাইক [১৮০৯—১৮৯১] সম্পর্কে আগেই বলেছি। তবে আলোচনার স্বার্থে আরও কিছু জানা জরুরি। প্রকৃত অর্থেই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী [ইংরেজিতে যাকে varsatile genius বলা হয়] ব্যক্তিত্বটি সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য [Freemasonry সহ, যা পরবর্তী অংশ আলোচ্য] অধ্যাপক Waite Arthur EdWard এর রচিত Albert Pike and Freemasonry [ Kessinger Publishing] বইটি থেকে নিয়েছি। আগ্রহী পাঠকেরা পড়ে দেখতে পারেন।
আলবার্ট পাইক সাহেবের জন্ম ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস-এ। পিতা মাতার নাম যথাক্রমে বেঞ্জামিন, এবং সারাহ। পাইকের পূর্বপুরুষ ওই এলাকায় প্রায় দুই শত বছর আগে, ১৬৩৫ নাগাদ বসবাস শুরু করেন। জন পাইক, তাঁরই এক পূর্বপুরুষ নিউ জার্সিতে উডব্রিজ নামক একটি লোকালয়ের পত্তন করেন। অর্থাৎ আলবার্ট পাইক বেশ প্রতিপত্তিশালী একটি পরিবারের অংশ ছিলেন। তাঁর মেধাও প্রশ্নাতীত। ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এখানেই একটি অদ্ভুত বাঁক আছে [এক্ষেত্রে twist ইংরেজি শব্দটি ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত হবে]। এই বিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়টি তাঁর কাছে প্রথম দু বছরের দক্ষিণা বা টিউশন ফি এক সঙ্গে দাবি করে বসে। কী কারণে এই দাবি সঠিক জানা যায়না। হয়ত সেই সময় তেমনই নিয়ম ছিল। অথবা পাইক সাহেবকে দেখে টাকার কুমির মনে হয়েছিল। কিন্তু পাইক কী করলেন ? উনি কি রাজি হয়ে গেলেন ? উঁহু তবে তো আর পাঁচটা লোকের মতই অনন্তে হারিয়ে যেতেন, ভার্সেটাইল আলবার্ট পাইক হয়ে ওঠা সম্ভব হতোনা। সবিনয়ে এই প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে তিনি স্বশিক্ষাকেই বেছে নিলেন, অর্থাৎ self education ! অনেকটা আমাদের রবি ঠাকুরের মত। প্রথাগত শিক্ষার বাইরে অন্যরকম একটি জগত। পরবর্তীকালে এই বিদ্যার উপর ভর করেই তিনি একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু ছ ফুটের উপর দশাসই চেহারা, ১৪০ কেজি ওজন কেশরীর মত কেশ যার সেই পুরুষটি কি শিক্ষকতা করেই কাটিয়ে দেবেন? এমন হয় নাকি ! অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন। চলতি ইংরেজিতে যাকে এডভেঞ্চার বলে। প্রথম গন্তব্য নিউ মেক্সিকো। দিব্যি ঘুরছিলেন। আবিষ্কারের উন্মাদনায় নতুন নতুন ভূখণ্ড। কিন্তু বিপদ তো আর বলে আসেনা। ভরসার বাহন ঘোড়াটি বিদ্রোহ করে বসল । লাগাম ছিঁড়ে পগার পার। অগত্যা আর কী করেন। তাওস পর্যন্ত হেঁটে গেলেন। দূরত্ব কতটা ধারণা আছে ? পাঁচশ কিলোমিটার। এখানেই শেষ নয়। মাঝে কিছুদিনের বিরতি। তারপর আবার পাড়ি দিলেন প্রায় ১৩০০ মাইল। এর মধ্যে প্রায় সাতশ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে ! অসামান্য দৈহিক এবং মানসিক শক্তির অধিকারী এই মানুষটির জীবনে এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এই সময়েই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। ইণ্ডিয়ান উপজাতিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব, মেলামেশা তাঁকে জীবন এবং জগত সম্পর্কে নতুন জ্ঞান, অভিজ্ঞতা দেয়। ইতিমধ্যে তিনি আইন পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হন। রেড ইণ্ডিয়ানদের অধিকার, সুরক্ষা নিয়ে বেশ কিছু আইনি লড়াই লড়েন। সরকারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনে মধ্যস্থতাও করেন। বৈবাহিক জীবন কখনও সামাজিক কর্মকাণ্ডের অন্তরায় হয়ে ওঠেনি। আইন নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি কবিতাও লিখেছেন সমান স্বাচ্ছন্দ্যে। সমসাময়িক সাহিত্য জগতে তা যথেষ্ট সমাদৃত হয়। ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে ফেলে আসা বৃত্তটি সম্পূর্ণ হয়। যে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর কাছে দু বছরের টিউশন ফি আগাম চেয়েছিল, সে-ই হার্ভার্ডই তাঁকে সাম্মানিক মাস্টার্স অফ আর্টস ডিগ্রিটি প্রদান করে।
তাঁর বর্ণময় জীবনটি কখনই এক রঙের মুখাপেক্ষী থাকেনি।নিছক অভিযান, আইন অথবা কবিতা নয়, তিনি মেক্সিকান আমেরিকান যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। আরকানসাস মাউণ্টেড ডিভিশন নামক একটি অশ্বারোহী বাহিনীর ক্যাপ্টেন হিসেবে বুয়েনা ভিস্টার যুদ্ধও লড়েন। এই সময়ই তিনি তাঁর উর্ধ্বতন কর্নেল রোয়ানের সঙ্গে মতভেদের কারণে ডুয়েলে জড়িয়ে পড়েন। একে অপরকে বেশ কয়েক রাউণ্ড গুলিও ছোঁড়েন। সৌভাগ্যক্রমে দুজনেই বেঁচে যান। যুদ্ধ শেষে তিনি আবার কবিতার জগতে ফিরে যান। তবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে কখনই ভাঁটা পড়েনি। সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি নেটিভ আমেরিকানদের সঙ্গে আরও কিছু চুক্তি করেন। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারাল পদে নিযুক্ত হন। নেটিভ ইণ্ডিয়ানদের দ্বারা গঠিত অশ্বারোহী বাহিনীকে প্রশিক্ষণও দেন। তাঁর প্রশিক্ষিত ক্যাভ্যালরি [অশ্বারোহী বাহিনী] একটি যুদ্ধে জয়লাভও করে। কিন্তু এরপরই আবার উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের সঙ্গে মতানৈক্যে জড়িয়ে পড়েন। রীতিমত লিখিতভাবে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানান। ফল যা হওয়ার তাই হয়। তাঁর বিরুদ্ধেও পাল্টা অভিযোগের বন্যা বয়ে যায়। পাইকের বাহিনী নাকি শত্রু সেনার উপর অনৈতিক অত্যচার চালায়। তাঁর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অর্থ এবং সরঞ্জাম তছরূপের অভিযোগও আনা হয়। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়। ঝামেলা এড়ানোর জন্য তিনি আরকানসাসের পাহাড়ি এলাকায় চলে যান। এক প্রকার পালিয়েই যান বলা চলে। সেখান থেকেই পদত্যাগের চেষ্টা করে যান। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো অভিযোগই প্রমাণিত হয়নি। পদত্যাগ পত্র গৃহীত হলে তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন।
এর পরই তিনি ফ্রিমেসনস [Freemasons] সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত হন। মেসনিক লজ [Masonic Lodge] যেটি ফ্রিমেসনদেরই একটি এলাকাভিত্তিক শাখা, তাঁর গন্তব্য হয়ে ওঠে। পরবর্তী অনুচ্ছেদেই এই বিষয়টিতে আসব। তার আগে আলবার্ট পাইকের জীবনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করব। যা তাঁর ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক এমনকি দার্শনিক চিন্তাভাবনাটিই বদলে দিয়েছিল। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি একটি ব্যতিক্রমী বই লিখে ফেলেন। নিছক ব্যতিক্রমী বললে কম বলা হবে। রীতিমত অভাবনীয়। সুদূর আমেরিকার একটি খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এমন একটি বিষয়ে আগ্রহ এবং গবেষণা যা সত্যিই বিস্ময়কর। কী বিষয় ? প্রাচীনতম বেদ! ঋকবেদ! বইটির নাম -- Indo-Aryan Deities and Worship as Contained in the Rig-Veda. বাংলা করলে দাঁড়ায়—“ইন্দো এরিয়ান দেবদেবী এবং তাঁদের উপাসনা যা ঋকবেদে আছে !” মৃত্যুর উনিশ বছর আগে রচিত [১৮৯১ সালে তাঁর মৃত্যু হয়] এই বইটি ঘিরে নিছক কৌতূহল নয়, রহস্যও দানা বেঁধেছে। আলবার্ট পাইকের পরবর্তী কর্মকাণ্ড [সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগের পর] এই বৈদিক দর্শন দ্বারা কতটা প্রভাবিত হয়েছিল, নিরন্তর গবেষণা তাঁকে কোনো বিশেষ দিশা দিয়েছিল কিনা, যা তাঁকে এমন একটি চিঠি লিখতে অনুপ্রাণিত করে থাকবে। নিছক প্রজ্ঞা দিয়েই কি এমন নিখুঁত ভবিষ্যৎবাণী করা সম্ভব ? Freemasons নামক রহস্যময় গুপ্ত সংগঠনটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া এবং কালক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা—এমন একটি সংগঠন যা বার বার নিষিদ্ধ হয়েছে, চার্চের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে—বেদান্ত দর্শনের আলোই কি পাইককে এই জাতীয় চিন্তাভাবনায় উদবুদ্ধ করেছিল ! এমন অসংখ্য প্রশ্ন যারা উত্তরের অপেক্ষায় আছে। আলবার্ট পাইকের শেষ ইচ্ছেটা কী ছিল ? প্রশ্নটা সঠিকভাবে করা হলনা—অন্ত্যেষ্টির বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছেটা কেমন ছিল ? বোকা বোকা শোনাচ্ছে না ? খিস্টান পরিবারে জন্ম, মৃত্যুর পর তো কবরে যাওয়ারই কথা। না, পাইকের তেমন ইচ্ছে ছিলনা। মৃত্যুর অনেক আগেই রীতিমত লিখিত নির্দেশ রেখে গিয়েছিলেন, যাতে তাঁকে কবর নয়, চিতায় পোড়ানো হয়। যদিও তাঁর ইচ্ছেটি রাখা হয়নি। আত্মীয় স্বজনের চাপে কবরই দেওয়া হয়। তাতে কিছু যায় আসেনা। তাঁর ইচ্ছেটি এখনও ভাবনার রসদ যুগিয়ে চলে। খ্রিস্টান হয়েও তিনি কেন সনাতন মতে অগ্নি দেবতার আশ্রয়ে যেতে চাইলেন? বৈদিক সংস্কৃতিতে অগ্নির অপরিসীম ভূমিকা এবং তাতপর্যই কি তাঁকে এই সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রাণিত করে নি ? দ্বিমতের প্রশ্নই নেই।
২] ফ্রিম্যাসনস [Freemasons] বা ফ্রিম্যাসনরি [Freemasonry] নামক সংগঠনটি সম্পর্কে কিঞ্চিৎ জ্ঞান না থাকলে আলবার্ট পাইকের এই রহস্যময় চিঠিটির [যা তিনটি বিশ্বযুদ্ধের ভবিষ্যৎবাণী করেছে] পটভূমিকা এবং কার্যকারণ বুঝে ওঠা যাবেনা। জীবনের শেষ পর্বটি এই সংগঠনটির কাজেই ব্রতী থেকেছেন। আত্মনিয়োগ করেছেন বললেও কম বলা হয়। কেমন এই সংগঠন ? কী উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে উঠেছিল ? কখন গড়ে উঠেছিল ? পরবর্তীতে নিষিদ্ধই বা হল কেন ?[ফরাসি বিপ্লবের সময়] ইলুমিনাটির [পরবর্তী আলোচনাতেই থাকছে] সঙ্গে ফ্রম্যাসনস-এর যোগসূত্রই বা কতটুকু ? জুইসেপ্পি ম্যাৎসিনি [Giuseppe Mazzini] নামক এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইটালিয়ান রাজনীতিককে তিনি এই চিঠিটি লিখেছিলেন।ম্যাৎসিনি [১৮০৫—১৮৭২] ইটালির ঐক্যস্থাপনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভূখণ্ডগুলিকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী দেশ গঠনই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। ভারতের বল্লভ ভাই প্যাটেলের সঙ্গে তাঁকে তুলনা করা যায়। আপাদমস্তজ জাতীয়তাবাদী এই মানুষটি মার্ক্সবাদ তথা সমাজতন্ত্রের কট্টর বিরোধী এবং সমালোচক ছিলেন।আরেক সমসাময়িক ইটালিয়ান নেতা গ্যারিবল্ডিও তাঁকে প্রভূত শ্রদ্ধা করতেন। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ফল হিসেবে গড়ে প্যারিস কমিউনের তীব্র বিরোধিতাও করেন। এই কারণে স্বয়ং কার্ল মার্ক্স তাঁকে প্রতিক্রিয়াশীল বলে অভিহিত করেন।জুইসেপ্পি ম্যাৎসিনি মার্ক্সীয় শ্রেণিসংগ্রাম এবং বস্তুবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন। শ্রেণি সংগ্রাম নয়, শ্রেণি সমন্বয়েই আস্থা রেখেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর ভাবনার সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের সাদৃশ্য পাওয়া যায়। এমন একটি মানুষের সঙ্গে পাইকের যোগাযোগ গড়ে ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কারণ ম্যাৎসিনির চিন্তনও সনাতন ধর্মের অনুরূপ ছিল। যা পাইককে প্রভাবিত করেছিল।
বলাই বাহুল্য এই ফ্রিম্যাসনস [Freemasons] বা ফ্রিম্যাসনরি [Freemasonry] নিছক একটি পেশাদার রাজমিস্ত্রিদের সংগঠন ছিলনা। যদিও শুরুতে তেমনভাবেই গড়ে উঠেছিল। ম্যাসন [mason] শব্দটির অর্থ a person skilled in cutting, dressing, and laying stone in buildings অর্থাৎ যে ব্যক্তি পাথর কাটা, সঠিক আকৃতি দেওয়া এবং বাড়ি ঘর অট্টালিকায় স্থাপন করার কাজটি করে থাকেন। কিন্তু আলবার্ট পাইকের পেশা তো তা ছিলনা। শিক্ষক, সৈনিক, কবি, লেখক হিসেবেই তাঁর পরিচয়। তবে কেন এই সংগঠনে যুক্ত হলেন ?
কারা বানিয়েছিল এই সংগঠন ? হ্যাঁ প্রথমে পেশাদারি ম্যাসনদের গিল্ড হিসেবেই এটির আত্মপ্রকাশ। চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে। মূলত স্টোন ম্যাসন অর্থাৎ পাথর কাটা শিল্পীদের নিয়েই এই সংগঠনটির সূত্রপাত। ম্যাসনদের প্রশিক্ষণ, সম্মান দেওয়া এবং বিপদে আপদে পাশে থাকা, মানে অন্যান্য গিল্ড যা করে থাকে। ক্লায়েন্ট বা ক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা, কথোপকথন, যোগাযোগও অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। সদস্যদের যোগ্যতা, আগ্রহ অনুযায়ী মূলত তিনটি স্তর বা পদ মর্যাদা ছিল—অ্যাপ্রেন্টিস [Apprentice] অর্থাৎ শিক্ষানবিশ, জার্নিম্যান বা ফেলো[Journeyman] অর্থাৎ সাধারণ সদস্য, এবং মাস্টার ম্যাসন। এই সংগঠন তিনটি ডিগ্রি প্রদান করত। ডিগ্রিপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষ বা বডিকে ক্র্যাফট অথবা ব্লু লজ বলা হত। কিন্তু ঠিক কীভাবে, কোন পটভূমিকায় এমন একটি সংগঠনের জন্ম হল, সেবিষয়ে ধোঁয়াশা আছে। নানা মুনির নানা মত। যেমন প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক টমাস ডি কুয়েন্সি [1785 – 8 December 1859] তাঁর একটি গ্রন্থে [Rosicrucians and Freemasonry] বলেছেন রসিক্রুসিয়ানিজম [ইহুদি মিষ্টিসিজম, খ্রিস্টানিটির কিছু অংশ ইত্যদির মিশ্রণে গঠিত একটি আধিভৌতিক মতবাদ। এই মতবাদে বিশ্বাস রাখা মানুষ মনে করে তাঁরা প্রত্যেকেই গুপ্ত জ্ঞানের অধিকারী যা প্রাচীন কাল থেকেই বংশ পরম্পরায় পেয়ে আসছেন। ]নামক একটি বিশেষ মতবাদের ফসল হিসেবেই ফ্রিম্যাসনরির জন্ম। একই পর্যবেক্ষণ রেখেছেন জার্মান অধ্যাপক বুহলে।
কিন্তু সাধারণ একটি গিল্ডের সঙ্গে এই জাতীয় মতবাদের যোগাযোগ কেন ? এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অমিত একটি সম্ভাবনা এবং রহস্য, যা আলবার্ট পাইককে আকর্ষণ করেছিল। কেবল পেশাদার ম্যাসন এবং আনুষঙ্গিক কর্মকাণ্ড দিয়ে সূত্রপাত হলেও পরবর্তীকালে এর সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন পেশার ব্যক্তিরাও জড়িয়ে পড়ে এবং কর্মসূচিও অনেক ব্যাপক, বিস্তৃত হয়ে ওঠে।ম্যাসনরি শব্দটি সাংকেতিক অর্থে পরিণত হয়। নিছক অট্টালিকা নয়, সমাজ, রাষ্ট্র নির্মাণেও অবদান রাখতে শুরু করে। সদস্য হওয়ার মাপকাঠি এবং শর্তাবলীর দিকে চোখ রাখলেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সপ্তদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কোনো সময়ে এই পরিবর্তন আসে। এই পেশা ছাড়াও অন্য পেশার মানুষ যুক্ত হতে থাকেন, যারা real masons নন, speculative masons ! অর্থাৎ ধরে নেওয়া হচ্ছে তাঁরাও ম্যাসন বা মিস্ত্রি কিন্তু বাস্তবে তা নন। অদ্ভুত না ? তাই আলবার্ট পাইকের মত কবি, লেখক, সৈনিকও অনায়াসে ঢুকে পড়লেন। তৈরি হল অনেক নতুন নিয়ম কানুন, বিধি নিষেধ। যেমন সদস্যপদ পেতে চাইলে এক সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তায় [supreme being] বিশ্বাস। এবং সেই অনুযায়ী শাস্ত্র সম্মত শপথ গ্রহণ। কেবলমাত্র পুরুষরাই সদস্য হতে পারবেন ইত্যাদি।
ফ্রিম্যাসনস [Freemasons] বা ফ্রিম্যাসনরি [Freemasonry] সংগঠনটি ক্রমে ক্রমে অত্যন্ত প্রভাবশালীদের, রাজনীতি থেকে অর্থনীতি, বুদ্ধিজীবী থেকে কূটনীতিক, সাহিত্যিক থেকে সমাজতাত্ত্বিক এমন বিবিধ ক্ষেত্র থেকে সদস্যপদ সংগ্রহ শুরু করল এবং গুপ্ত কার্যক্রম রূপায়নের মাধ্যমে প্রভূত শক্তিশালী হয়ে উঠল। কী জাতীয় কার্যক্রম ? “কিং মেকার” পরিভাষাটির সঙ্গে পরিচয় আছে নিশ্চয় ? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন রাজা তৈরি করা। আরও বিশদে বললে রাজনীতির অন্দরমহলে প্রবেশ করে দেশ বিদেশের কূটনীতি, অর্থনীতি এমনি ক্ষমতা কেন্দ্রগুলি নিয়ন্ত্রণ করা। নিছক আমেরিকা নয়, ফ্রান্স, ব্রিটেইন, জার্মানি থেকে শুরু করে ইউরোপের প্রায় সব দেশেই এই সংগঠনটির গুপ্ত কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে। বিবিধ কর্মকাণ্ডের মধ্যে প্রধান কাজই ছিল রোম্যান ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ধর্মীয় কুসংস্কার, কুপ্রথা ইত্যদিকে নির্মূল করা, চার্চের প্রতি সহানুভূতিশীল সরকার অথবা সামাজিন সংগঠনগুলিকে হটিয়ে দেওয়া। এক কথায় একটি প্রগতিশীল সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে নিজেদের পরিচালিত করা। তাই ফ্রম্যাসনরির প্রধানতম শত্রু হয়ে উঠেছিল রোম্যান ক্যাথলিক চার্চ। প্রণিধানযোগ্য এই যে ফ্রিম্যাসনরি-র উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্যই প্রটেস্ট্যান্ট [protestant- খ্রিস্টান ধর্মের প্রগতিশীল শাখা] ছিলেন অর্থাৎ গোঁড়া রোম্যান ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধেই তাঁদের অবস্থান। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে ইউরোপের যাবতীয় প্রগতিশীল আন্দোলন, বিপ্লব, বিদ্রোহ সর্বত্রই এঁদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অংশগ্রহণ ছিল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক, ফ্রিম্যাসনরি বিশেষজ্ঞ ডেভিড হ্যারিসন [ যিনি এই বিষয়ের উপরেই ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন] ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ১লা সেপ্টেমবর [ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে] একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লেখেন-- Freemasonry and the French Revolution, যার মুখবন্ধটি পর্যবেক্ষণযোগ্য—
It seems that during the eighteenth century, whenever there was a revolution, Freemasons were not far away. The American Revolution had many masons leading the cause and with the outbreak of the French Revolution in 1789, Freemasons were again leading various factions, with Louis Philippe II, Duke of Orleans, Grand Master of the Grand Orient, being prominent. But Freemasons were divided, their differing views and loyalties challenging not only the course of the Revolution, but the perception of Freemasonry in France and around the globe. Masonic symbolism featured prominently in revolutionary propaganda; in official pamphlets symbols like the All-Seeing Eye and the Plumb-Rule were used to portray the supposed enlightenment and justice brought about by the French Revolution.
অর্থাৎ “ অষ্টাদশ শতাব্দীতে যেখানে, যখনই কোনো বিপ্লব ঘটত ফ্রিম্যাসনদের অংশগ্রহণ অবধারিতই ছিল। আমেরিকান বিপ্লবেও প্রত্যক্ষভাবে অনেক ম্যাসন [হা !হা ! রাজমিস্ত্রি ভাববেননা] প্রত্যক্ষভাবেই অংশ নিয়েছিলেন, ফরাসি বিপ্লবের ক্ষেত্রেও যা একই ভাবে প্রযোজ্য। এই ফ্রিম্যাসনরাই এই সময় বিভিন্ন বিপ্লবী ফ্যাকশনকে পরিচালনা করেছিলেন। সামনের সারিতে ছিলেন লুই ফিলিপ্পি দ্বিতীয়, ডিউক অফ অরলিনস [Duke of Orleans], গ্র্যাণ্ড মাস্টার অফ দ্য গ্র্যাণ্ড ওরিয়েন্ট প্রমুখ। কিন্তু এঁদের মধ্যেও মতভেদ ঘটছিল। আর এই মতানৈক্য, কেবলমাত্র বিপ্লবের অভিমুখটিকে চ্যালেঞ্জ জানায়নি, ফ্রান্স এবং সমগ্র বিশ্ব জুড়ে ফ্রিম্যাসনরি মতবাদটিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। বিপ্লবী প্রচারে ম্যা