17/07/2024
আশুরার দিন (১০ই মহররম) ইমাম হুসাইন (রাঃ) প্রতিপক্ষের কয়েক জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম ধরে উচ্চস্বরে সম্বোধন করে বললেন : ‘হে শাবাছ্ বিন্ রাব্‘ঈ! হে হাজ্জার্ বিন্ আব্জার্! হে কায়স্ বিন্ আশ্‘আছ! হে ইয়াযীদ বিন্ হারেছ্! তোমরা কি আমাকে এ বলে পত্র লিখনি যে, ‘ফল পেকে গেছে এবং যমিন সবুজে ঢেকে গেছে; আপনি যদি আসেন, তাহলে আপনার খেদমতে একটি সুসজ্জিত বাহিনী দেখতে পাবেন?’…‘তোমরা আমার নসবের (বংশ পরম্পরার) বিষয়টি স্মরণ কর, ভেবে দেখ, আমি কে। তোমাদের হুঁশ হোক; তোমরা নিজেদের ধিক্কার দাও এবং ভেবে দেখ যে, আমাকে হত্যা করা এবং আমার মর্যাদা বিনষ্ট করা কি তোমাদের জন্য জায়েয? আমি কি তোমাদের রাসূলের কন্যার পুত্র নই? আমি কি তাঁর (রাসূলের) স্থলাভিষিক্ত ও চাচাত ভাইয়ের পুত্র নই- যিনি সকলের আগে ঈমান এনেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যা এনেছিলেন তার সত্যতা স্বীকার করেছিলেন?’ ‘সাইয়্যেদুশ্ শুহাদা হামযাহ্ কি আমার চাচা নন?’ ‘জা‘ফর তাইয়ার- আল্লাহ্ তা‘আলা যাঁকে কারামতস্বরূপ দু’টি পাখা দিয়েছেন যাতে তিনি তা দিয়ে বেহেশ্তের ভিতরে উড়তে পারেন, তিনি কি আমার চাচা নন?’ ‘তোমরা কি জান না যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) আমার ও আমার ভাই সম্পর্কে এরশাদ করেছেন : ‘এ দু’জন হচ্ছে বেহেশ্তে যুবকদের নেতা।’?’…-(হায়াতুল ইমামিল হুসাইন, ৩য় খন্ড, পৃ. ১৮৪)
ইমাম হুসাইন (রাঃ) শিমারকে বললেন : ‘তোমার কি এ ব্যাপারেও কোন সন্দেহ আছে যে, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর কন্যার সন্তান? আল্লাহর শপথ, এ বিশ্বে পূর্ব ও পশ্চিমের দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী ভূখন্ডে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর কন্যার পুত্র আমি ছাড়া আর কেউ নয়। তোমার জন্য পরিতাপ! আমি কি তোমার কাউকে হত্যা করেছি যে, আমার কাছ থেকে তার রক্তের বদলা আদায় করতে চাচ্ছ? আমি কি তোমার কোন সম্পদ বিনষ্ট করেছি, নাকি আমার কাঁধে কারও কেসাসের দায় রয়েছে যা তুমি কার্যকর করতে চাচ্ছ?
ইমাম হুসাইন (রাঃ) এরপর ইয়াযীদী বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সম্বন্ধে বলতে লাগলেন : ‘হে কুফাবাসী! তোমাদের মায়েরা তোমাদের শোকে ক্রন্দন করুক। তোমরা আল্লাহ্ তা‘আলার এ নেক বান্দাহ্কে দাওয়াত করেছিলে এবং বলেছিলে : আমরা আপনার পথে জীবন বিলিয়ে দেব। কিন্তু এখন তোমরা তার বিরুদ্ধে তোমাদের তলোয়ারগুলোকে উন্মুক্ত করেছ এবং তাকে সকল দিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছ। তোমরা তাকে এ বিশাল পৃথিবীর যেখানে ইচ্ছা চলে যাবার জন্য সুযোগ দিচ্ছ না। এখন সে বন্দীর মতো তোমাদের হাতে আটকা পড়ে আছে। তোমরা তাকে এবং তার পরিবারের নারী ও কন্যাদের ফোরাতের পানি পান করতে বাধা দিয়েছ, অথচ ইহুদী ও খ্রিস্টান গোত্রসমূহের লোকেরাও সেখান থেকে পানি পান করছে। এমনকি পিপাসায় আমাদের পশুগুলোর প্রাণও ওষ্ঠাগত হয়েছে এবং সেগুলো ছটফট করছে ও গড়াগড়ি দিচ্ছে। তোমরা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর বংশধরদের ব্যাপারে তাঁর বর্ণিত মর্যাদার সীমারেখাকেও রক্ষা করনি। মহাপিপাসার দিনে আল্লাহ্ তোমাদের পরিতৃপ্ত না করুন।’ (কিতাবুল ইরশাদ : শেখ মুফিদ, ২য় খন্ড, পৃ. ৯৭)
হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে পুনরায় বলেন : ‘হে লোকসকল! ধ্বংস ও দুঃখ তোমাদের ঘিরে ফেলুক; কারণ, (মনে করে দেখ,) কেমন বর্ণনাতীত আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস সহকারে তোমরা আমাকে দাওয়াত করেছিলে! আর এ কারণেই আমি এখানে এসেছি। আমি খুব দ্রুত তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে এখানে এসেছি। কিন্তু আমরা তোমাদের হাতে যে তলোয়ার অর্পণ করেছিলাম তা-ই আমাদের বিরুদ্ধে কোষমুক্ত করেছ। আর আমরা আমাদের দুশমন ও তোমাদের দুশমনদের বিরুদ্ধে যে অগ্নি প্রজ্বলিত করেছিলাম তোমরা তাকেই আমাদের বিরুদ্ধে প্রচন্ডতর করে তুলেছ। তোমরা তোমাদের বন্ধুদের বিরুদ্ধে ও দুশমনদের সপক্ষে যুদ্ধের জন্য দাঁড়িয়ে গিয়েছ, যদিও তারা না তোমাদের সাথে ইনসাফ ও সুবিচারের সাথে আচরণ করেছে, না তাদের দ্বারা তোমাদের কোন কল্যাণ হবে বলে আশা করা যায়, আর না আমরা এমন কোন কাজ করেছি যে কারণে আমাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের শত্রুতা ও আগ্রাসনের সঙ্গত কারণ থাকতে পারে।…আমি বলছি, তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর এবং আমাকে হত্যা কর না। কারণ, আমাকে হত্যা করা বা অবমাননা করা তোমাদের জন্য জায়েয নয়। আমি তোমাদের রাসূলের কন্যার সন্তান, আর আমার নানী খাদীজাহ্ তোমাদের রাসূলের স্ত্রী। হয়ত রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর সেই কথা তোমাদের কাছে পৌঁছে থাকবে যে, তিনি এরশাদ করেছেন : ‘হাসান ও হুসাইন হচ্ছে বেহেশতবাসী যুবকদের দুই নেতা।’ হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ, ওয়াদা ভঙ্গ করা, বিশ্বাসঘাতকতা ও চুক্তি ভঙ্গ করা তোমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তোমাদের (তোমরা হচ্ছ এমন বৃক্ষতুল্য যার) মূল ধোঁকা, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার সাথে মিশে গেছে। তোমাদের শাখা-প্রশাখাসমূহ এর ওপর ভিত্তি করেই প্রসারিত হয়েছে। তোমরা হচ্ছ সর্বাধিক নোংরা- নিকৃষ্টতম ফল; তাই তোমরা স্বীয় বাগান-মালিকের গলায় আটকে যাও এবং আত্মসাৎকারী ও লুণ্ঠনকারীদের জন্য সুস্বাদু ও সুখাদ্য হয়ে যাও। (তুহাফুল উকূল, ৪র্থ খন্ড, পৃ. ১৭৪; আল-ইহতিজাজ, ২য় খন্ড, পৃ. ৯৯; মাকতালুল হুসাইন : খারাযমী, ২য় খন্ড, পৃ. ৬)
আমাদের রব অত্যন্ত মহান। কিন্তু তোমরা অত্যন্ত খারাপ বান্দাহ্। তাই তাঁর আনুগত্যের অঙ্গীকার করেও এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনলেও রাসূলের পরিবার-পরিজন ও বংশধরদের ওপর চড়াও হয়েছ এবং তাদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছ। শয়তান তোমাদের ওপর বিজয়ী হয়েছে, তাই তোমরা মহান আল্লাহর কথা ভুলে গিয়েছ। তোমরা ধ্বংস হও। তোমরা যা চাচ্ছ সে ব্যাপারে আমি বলছি : ইনণা লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘উন্। এরা হচ্ছে এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা ঈমান আনার পরে কাফের হয়েছে। দূর হোক আল্লাহ্র রহমত যালেমদের কাছ থেকে।’ (বিহারুল আনওয়ার, ৪৫তম খন্ড, পৃ. ৫)
(সংগৃহীত)