31/12/2025
দ্বিমাসিক মাদরাসা পত্রিকায় প্রকাশিত-
থার্টিফাস্ট নাইট : জাহেলিয়াতের পুনর্জাগরণ
------------------------------------------------------------
মুহাদ্দিস ইব্রাহিম খলিল, শিক্ষক ও কলামিস্ট।
ফকীহ, তা‘মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, টঙ্গী।
৩১শে ডিসেম্বর প্রতিটি সৌর বর্ষের শেষ দিন। এদিন দিবাগত রাতকে ইংরেজীতে ‘থার্টি-ফার্স্ট নাইট’ বলা হয়। এই বিদায়ী রাত্রির ১২-টা ১ মিনিটে ইংরেজী ক্যালেন্ডারের হিসাবে পরবর্তী নববর্ষ শুরু হয়। যদিও চন্দ্র বর্ষ হিসাবে দিন গণনা শুরু হয় প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর হতে।
প্রতিটি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত আমাদের জানাচ্ছে জীবনের ক্ষয় সম্পর্কে। কিন্তু আমাদের সমাজে একশ্রেণির মানুষের জীবনে বর্ষশেষ ক্ষয়ের বার্তা নিয়ে আসে না, আসে অবক্ষয়ের অনুষঙ্গ হয়ে। এই অসঙ্গতি ও অস্বাভাবিকতা এখন সঙ্গত ও স্বাভাবিক। বহুল চর্চা ও ব্যাপক রেওয়াজের কারণে এগুলো অস্বাভাবিক বলেই মনে হয় না।
বস্তুত বক্রতার যখন বিস্তার ঘটে তখন বাঁকাকে আর বাঁকা বলে মনে হয় না। কিন্তু মনে না হলেই কি বক্রতা দূর হয়? আমাদের চারপাশে এখন কত বক্রতার ছড়াছড়ি! চিন্তার বক্রতা, কর্মের বক্রতা, রীতি-নীতির বক্রতা! সেই বক্রতা সঠিকভাবে উপলব্ধি করলে প্রতিদিনের নামাযে-
اِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِیْمَ
(আমাদের পরিচালিত করুন সরল পথে)- এই প্রার্থনার যথার্থতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সকল বক্রতা ও অস্বাভাবিকতা থেকে মুক্ত হয়ে সঠিক চিন্তা, যথার্থ কর্ম ও ভারসাম্যপূর্ণ স্বভাবের অধিকারী হওয়া একজন মানুষের প্রতিমুহূর্তের প্রয়োজন। এই যথার্থতা ও ভারসাম্য তথা সীরাতে মুসতাকীমের দিশাই রয়েছে কুরআন মাজীদে এবং সুন্নাহ ও সীরাতে। তাই কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী খুব সহজেই মুক্ত থাকে চিন্তা ও কর্মের বক্রতা থেকে।
থার্টিফাস্ট নাইটের অনাচার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এই মহা নিয়ামত এবং সচেতন করে আদর্শহীন মানুষের অবলম্বনহীনতা সম্পর্কে।
ইসলামী সংস্কৃতিতে বর্ষ বিদায় ও বর্ষ বরণের কোন বিধান নেই। প্রতি রাতেই আমরা মৃত্যুবরণ করি। প্রতি প্রত্যুষেই আমরা নতুন জীবন পেয়ে আল্লাহর নিকটে সিজদায় লুটিয়ে পড়ি ও তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি। অতঃপর তাঁর তাওফীক কামনা করে দিবসের কর্তব্যকর্মে নিজেকে নিয়োজিত করি। এজন্যেই ঘুমাতে যাবার সময় বলি-
باسمِك اللهمَّ أموتُ وأحيا يا الله
তোমার নামে আমি মরি ও বাঁচি’। প্রত্যুষে যখন ঘুম থেকে উঠি, তখন বলি,
الحمدُ للهِ الذي أحيانا بعد ما أماتنا وإليه النُّشورُ
‘যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে মৃত্যু দানের পরে জীবন দান করেছেন এবং তাঁর দিকেই হবে আমাদের পুনরুত্থান’। যে মুসলমান দৈনিক রাতে ও সকালে এই দো‘আ পড়ে ও তার প্রভুর নিকটে জীবনের হিসাব পেশ করে, তার জন্য প্রতি রাতই বিদায়ী রাত ও প্রতিটি দিনই নতুন দিন। দিবস ও রাত্রির সৃষ্টিকর্তা হ’লেন মহান আল্লাহ। উভয়টির জন্য পৃথক কর্মসূচী ও কর্ম পরিধি প্রদান করেছেন আল্লাহ। সূর্যকে দিবসে এবং চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজিকে রাত্রিতে মাখলূক্বাতের সেবার জন্য তিনিই নিয়োজিত করেছেন। পানিতে-ভ‚মিতে ও অন্তরীক্ষে সৃষ্ট সকল মাখলূক্বাতকে তিনি মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এসব কিছুই বান্দার প্রতি তাঁর অফুরন্ত দয়ার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তাঁর এই সৃষ্টি কৌশলে কোন ত্রæটি কেউ খুঁজে পাবে না, (মুলক, ৬৭/৩)। কারো কল্যাণ বা অকল্যাণ করার ক্ষমতা দিবস বা রাত্রির নেই। সেকারণে কোন দিন বা রাতকে, কোন সময় বা মুহূর্তকে শুভ বা অশুভ বলে গণ্য করার কোন যৌক্তিকতা নেই।
জীবনকাল মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ পুঁজি। আর তার বিনিয়োগক্ষেত্র হচ্ছে তার নিজের কর্ম। জীবনকাল ভালো কাজে ব্যয় হলে তা ফেরৎ আসবে মুনাফাসহ। আর মন্দ কাজে ব্যয় হলে তা বয়ে আনবে পরিতাপ ও ক্ষতিগ্রস্থতা।
فَمَنْ یَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَیْرًا یَّرَهٗ وَ مَنْ یَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا یَّرَهٗ .
যে কণা পরিমাণ ভালো কাজ করবে সে তা দেখতে পাবে। আর যে কণা পরিমাণ মন্দ কাজ করবে সে-ও তা দেখতে পাবে -(সূরা যিলযাল, ৯৯)। দিন-রাতের গমনাগমন আসলে সতর্ক করছে খরচ হয়ে যাওয়া জীবনকাল সম্পর্কে। প্রতিটি সন্ধ্যা এই বার্তা দিচ্ছে যে, তোমার জীবন থেকে একটি দিবস ফুরিয়ে গেল। প্রতিটি ভোর এই বার্তা দিচ্ছে যে, আরো একটি রাত জীবন থেকে বিদায় নিল। কাজেই ব্যয় হয়ে যাওয়া দিবস ও রজনী যদি ভালো কাজে ব্যয় হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহর শোকরগোযারি, যদি মন্দ কাজে ব্যয় হয়ে থাকে তাহলে ভবিষ্যতের জন্য সংশোধনের সংকল্প- এই তো উপায় মুক্তির ও উন্নতির।
আর এতে কালক্ষেপণ নয়। কারণ এরপর আর প্রত্যাবর্তনের সুযোগ না-ও হতে পারে। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেছেন-
إِذَا أَصْبَحْتَ فَلاَ تُحَدِّثْ نَفْسَكَ بِالمَسَاءِ، وَإِذَا أَمْسَيْتَ فَلاَ تُحَدِّثْ نَفْسَكَ بِالصَّبَاحِ، ... فَإِنَّكَ لاَ تَدْرِي يَا عَبْدَ اللهِ مَا اسْمُكَ غَدًا.
সন্ধ্যায় উপনীত হলে প্রভাতের অপেক্ষা করো না। আর প্রভাতে করো না সন্ধ্যার অপেক্ষা।... কারণ, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার তো জানা নেই কী হবে তোমার বিশেষণ আগামীকাল (জীবিত না মৃত!) -(জামে তিরমিযী, ২৩৩৩)।
কুরআন মাজীদে দিনরাতের গমনাগমন সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-
وَ هُوَ الَّذِیْ جَعَلَ الَّیْلَ وَ النَّهَارَ خِلْفَةً لِّمَنْ اَرَادَ اَنْ یَّذَّكَّرَ اَوْ اَرَادَ شُكُوْرًا.
তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিবসকে পরস্পরের অনুগামীরূপে; তার জন্য যে উপদেশ গ্রহণ করে ও কৃতজ্ঞ হতে চায়। -(সূরা ফুরকান, ৬২)
হাদীছে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন, لا تسبُّوا الدهر، فإنَّ الله هو الدهر ‘তোমরা সময়কে গালি দিয়ো না। আমিই সময়’ অর্থাৎ কালের ¯্রষ্টা। আমার হাতেই সকল ক্ষমতা। আমিই রাত্রি ও দিবসকে যেভাবে চাই আবর্তন করি’। তাই ইসলামী শরীয়তে বর্ষবরণের বা বর্ষ বিদায়ের বা কোন দিবস পালনের কোন বিধান নেই।
রাত-দিনের আসা-যাওয়া একটি ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য ব্যাপার, যা সময়ের চলমানতা সম্পর্কে সচকিত করে। চিন্তাশীল মানুষ উপলব্ধি করেন যে- দিন, সপ্তাহ, মাস ও বছরের রূপে বস্তুত তার নিজের আয়ুই নিঃশেষ হয়ে চলেছে। কাজেই আর অবহেলা নয়, এবার ব্রতী হতে হবে সৎকর্মে এবং ত্যাগ করতে হবে সকল বালখিল্যতা। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-
الكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ، وَالعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ.
বুদ্ধিমান তো সে, যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য কর্ম করে। আর অক্ষম (দুর্ভাগ্য) সে, যে প্রবৃত্তির অনুসারী হয় আর আল্লাহর প্রতি (অলীক) প্রত্যাশা পোষণ করে। -(জামে তিরমিযী, ২৪৫৯)
ইসলামের দৃষ্টিতে থার্টি ফার্স্ট নাইট পালন-
ইসলাম হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত, একমাত্র পরিপূর্ণ, সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত, নিয়ামতপূর্ণ, অপরিবর্তনীয় ও মনোনীত দ্বীন। যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত বলবত থাকবে। যে প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
“নিশ্চয়ই ইসলামই আল্লাহ তায়ালার কাছে একমাত্র দ্বীন।” (সূরা আলে ইমরান, ১৯)
আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
“আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে (দ্বীন ইসলামকে) কামিল বা পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত তামাম বা পূর্ণ করে দিলাম এবং আমি তোমাদের দ্বীন ইসলামের প্রতি সন্তুষ্ট রইলাম।” (সূরা মায়িদার, ৩)
আল্লাহ তায়ালা দ্বীন ইসলামকে শুধুমাত্র পরিপূর্ণ সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত ও নিয়ামতপূর্ণ করেই নাযিল করেননি সঙ্গে সঙ্গে দ্বীন ইসলামকে মনোনীতও করেছেন। তাই দ্বীন ইসলাম ব্যতীত অন্য সমস্ত ধর্ম যা ওহী দ্বারা নাযিল করা হয়েছিল। যেমন- তাওরাত শরীফ, যাবূর শরীফ, ইনজীল শরীফ ও ১০০ খানা ছহীফা এবং মানব রচিত মতবাদ যা পূর্বে ছিল এবং বর্তমানে যা রয়েছে ও ভবিষ্যতে যা হবে সেগুলোকে তিনি বাতিল ঘোষণা করেছেন।
হাদিস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, “হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন,
" أن النبي صلى الله عليه وسلم غضب حين رأى مع عمر صحيفة فيها شئ من التوراة وقال : أفي شك أنت يا ابن الخطاب ؟ ألم آت بها بيضاء نقية ؟ لو كان أخى موسى حيا ما وسعه إلا اتباعي "
একদিন হজরত উমর (রা.) রাসূলের (সা.) নিকট এসে বললেন, হে রাসুল (সা:)! আমরা ইহুদীদের থেকে তাদের কিছু ধর্মীয় কথা শুনে থাকি, যাতে আমরা আশ্চর্যবোধ করি, এর কিছু আমরা লিখে রাখবো কি? রাসূল (সা.) বললেন, তোমরাও কি দ্বিধাদ্ব›েদ্ব রয়েছ? যে রকম ইহুদী-নাছারারা দ্বিধাদ্ব›েদ্ব রয়েছে? অবশ্যই আমি তোমাদের নিকট পরিপূর্ণ, উজ্জ্বল ও পরিষ্কার দ্বীন নিয়ে এসেছি। হযরত মুসা (আ.)ও যদি দুনিয়ায় থাকতেন, তাহলে উনাকেও আমার অনুসরণ করতে হতো।” (মুসনাদে আহ্মদ)
মূলতঃ ‘থার্টি ফার্স্ট’ বলে কোন আনন্দ রাতের খবর এদেশের মানুষ জানত না। বিগত কয়েক বছর যাবত এটি রাজধানীতে দেখা যাচ্ছে এবং রাতটি নতুন আঙ্গিকে জাতির সামনে আবির্ভূত হচ্ছে। বলা যায় রীতিমত একটা ভয়ংকর রাত। এ রাত এখন আনন্দ-ফূর্তির নামে পুরোদস্তুর একটা জংলী রাতে পরিণত হয়েছে। সংসারের দায়িত্বহীন কিছু তরুণ-তরুণী ও আর্থিক দুশ্চিন্তাহীন কিছু ফ‚র্তিবাজ মানুষ এ রাতের প্রধান নট-নটী। বাপের পাঠানো টাকায় যারা নিশ্চিন্তে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে, তাদের একাংশ এ রাতে নেচে-গেয়ে ফূর্তি করে এমন পর্যায়ে চলে যায়, যা মনুষ্যত্বের সীমানা পেরিয়ে জন্তু-জানোয়ারকেও হার মানায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে এ রাতের শিকার জনৈকা বাঁধনের শ্লীলতাহানির ঘটনায় বিগত দিনগুলোতে সারা দেশে তোলপাড় হয়েছিল। তবে যাতে আনন্দ-ফূর্তি ঠিক থাকে, কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে না যায়, সেজন্য পুলিশ প্রটেকশন দিচ্ছেন। রসগোল্লা আলগা রেখে মাছি তাড়ানোর জন্য কর্মচারী নিয়োগ করা যেমন বোকামী, থার্টি ফার্স্ট নাইটের আনন্দ-ফূর্তির অনুষ্ঠানের বৈধতা অব্যাহত রেখে তার বাড়াবাড়ি বন্ধ করার জন্য পুলিশ নিয়োগ করা অনুরূপ বোকামী বৈ কিছুই নয়।
মনে রাখা উচিৎ আমাদের একটু অসর্তকতার জন্য যদি সন্তানরা বিপথগামী হবার সুযোগ পায়। তবে এর ক্ষতির প্রথম শিকার হতে হবে আমাদেরকেই। সমাজে মাথা নিচু হবে আমারই। আপন ঔরসজাত সন্তানের জন্য মানুষের কটু-কাটব্যও হজম করতে হবে কেবল আমাকে। তাছাড়া মরণের পরেও এর জন্য ক্ষতি পোহাতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স:) ইরশাদ করেন,
্রكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ. الإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ, وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَهْوَ مَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ, وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَمَسْؤُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا وَالْخَادِمُ رَاعٍ فِي مَالِ سَيِّدِهِ وَمَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَمَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল আর সবাই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে। ইমাম একজন দায়িত্বশীল; তিনি তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ দায়িত্বশীল তার পরিবারের; সে জিজ্ঞাসিত হবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে। মহিলা দায়িত্বশীল তার স্বামীর গৃহের; সে জিজ্ঞাসিত হবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে। ভৃত্যও একজন দায়িত্বশীল, সে জিজ্ঞাসিত হবে তার মনিবের সম্পদ সম্পর্কে। এককথায়, তোমরা সবাই দায়িত্বশীল আর সবাই জিজ্ঞাসিত হবে সে দায়িত্ব সম্পর্কে।’ (বুখারী : ৮৪৪)
অতএব আমাদের যুব স¤প্রদায়কে যেমন সংযত হতে হবে, তেমনি অভিভাবকদেরও একটু সজাগ সচেতন হতে হবে।
আচ্ছা, আমরা কি ভেবে দেখেছি একটি বছরের বিদায় শুধু আনন্দের বিষয়? কেবলই ফূর্তি ও উল্লাস প্রকাশের উপলক্ষ? নাহ, এ কেবল আনন্দের বিষয় হতে পারে না। বরং এটি আমাদের চিন্তাা-ভাবনা ও পর্যালোচনার মোক্ষম উপলক্ষ বৈ কি। কেন? কারণ, একটি বছরের সাথে সাথে আমাদের জীবন নামক প্রাসাদ থেকে ৩৬৫ দিনের ৩৬৫টি পাথর খসে পড়ে। ছোট হয়ে আসে আমাদের নাতিদীর্ঘ জীবন। আমরা বিগত বছরটি কিভাবে কাটিয়েছি, আগামী বছর কিভাবে কাটাবো এবং এ বছর আমার অর্জন কী কী? ইত্যকার আরো নানা প্রশ্ন ঘিরে ধরা উচিত আমাদের চেতনা জগতকে।
এখন আমাদের আনন্দ-উল্লাসের এতটুকু ফুরসত থাকার কথা নয়। এখন শুধু হিসাব-নিকাশ মেলাবার সময়। হযরত ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স:) বলেন বলেন,
حاسِبوا أنفسَكم قبل أن تُحاسَبوا، وزِنوا أنفسَكم قبل أن تُوزنوا، فإنَّه أخفُّ عليكم في الحسابِ غدًا أن تُحاسِبوا أنفسَكم اليومَ وتزيَّنوا للعَرضِ الأكبرِ، كذا الأكبرِ { يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنْكُمْ خَافِيَةٌ
‘তোমাদের কাছে হিসাব চাওয়ার আগে নিজেরাই নিজেদের হিসাব সম্পন্ন করে নাও, তোমাদের আমল ওজন করার আগে নিজেরাই নিজেদের আমলসমূহ ওজন করে নাও, কিয়ামত দিবসে পেশ হওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত কর। সুসজ্জিত হও সেদিনের জন্য, যেদিন তোমাদের সামনে কোনো কিছু অস্পষ্ট থাকবে না।’
আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে ভেবে দেখা দরকার, আমরা কী করছি? এর পরিমাণ কী? হাসান বছরী (র:) বলেন,
رحم الله عبداً وقف عند همه، فإن كان لله مضى، وإن كان لغيره تأخر
‘আল্লাহ ওই বান্দার ওপর রহম করেন, যে তার পদক্ষেপে থামে। (এবং চিন্তাা করে) যদি তা আল্লাহর জন্য হয় তা সম্পন্ন করে আর যদি তা হয় অন্য কারও জন্য তবে তা বিলম্বিত করে।’ আমরা তো কিঞ্চিৎ নেক আমল করেই তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। ইবনু আবী মুলাইকাহ্ রহ. বলেন,
أدركت ثلاثين من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم كلهم يخاف النفاق على نفسه، ما منهم أحد يقول إنه على إيمان جبريل وميكائيل
‘আমি রাসুলের (স:) ত্রিশজন সাহাবীকে পেয়েছি, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের নিফাক সম্পর্কে সন্ত্রস্ত ছিলেন। তাঁদের কেউ এমন ছিলেন না, যিনি বলতেন যে তিনি জিব্রাঈল এবং মিকাঈলের মতো ঈমানের ওপর আছেন।’
ইতিহাস পর্যালোচনায় শরিয়তের ফায়সালা :
হযরত ইমাম আবু হাফস কবীর (রা.) বলেন, নওরোজ বা নববর্ষ উপলক্ষে যদি কেউ একটা ডিমও দান করে তার ৫০ বৎসরের আমল থাকলে তা বরবাদ হয়ে যাবে।
আজ অনেক মুসলমান থার্টি ফার্স্ট নাইট পালন করছে। ইংরেজি নববর্ষ, ফসলী সনের নববর্ষসহ বিভিন্ন নববর্ষ পালন করছে। আর এতে করে তারা বিজাতি ও বিধর্মীদের সাথেই মিলমিশ রাখছে। তাদেরই অনুসরণ অনুকরণ করছে।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই সব প্রাণীর মাঝে আল্লাহ পাক উনার নিকট কাফিররাই নিকৃষ্ট, যারা ঈমান আনেনি” (সূরা আনফাল, ৫৫)। আর নববর্ষ পালনের দ্বারা সে কাফিরদেরই অনুসরণ-অনুকরণ করা হয়।
হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি যে স¤প্রদায়ের সঙ্গে মিল রাখে, সে তাদের দলভুক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সঙ্গেই হবে।” (সুনানে আবূ দাউদ)
ইতিহাস এটাই প্রমাণ করে যে, সব নববর্ষের প্রবর্তকই বিধর্মীরা। তাই ইসলাম নববর্ষ পালনকে কখনোই স্বীকৃতি দেয় না।
মুসিলম পিতামাতার সন্তানরা এ রাতে ভেসে যায় আল্লাহর নাফরমানীর সয়লাবে। সর্বত্র ছেলেমেয়ের অবাধ মেলামেশা প্রকট রূপ ধারণ করে। তরুণ-তরুণীরা জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে বেড়ায়, রেস্তোরাঁ, পার্ক-উদ্যান, নাইট ক্লাব ইত্যাদিতে। বহু অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে থাকে। নাইট ক্লাব ও ‘অভিজাত’ হোটেলগুলোতে বসে মদের আসর। তরুণ-তরুণীদের প্রলুব্ধ করার জন্য থাকে নানা রকম আয়োজন। ফলে নারী ও মদে পঙ্কিল হয়ে ওঠে বছরের প্রথম দিনরাত্রিগুলো। ‘এ রাতে হোটেল সোনারগাও, শেরাটন, ঢাকা রিজেন্সি, রেডিসন ও হোটেল পূর্বাণীতে জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন ক্লাব ও থ্রি স্টার হোটেলেও তরুণ-তরুণীদের দেওয়া হয় আকর্ষণীয় অফার। এসব অনুষ্ঠানে পানীয় ছাড়াও রাখা হয় নানা আয়োজন।’
বলাবাহুল্য, পাপাচার ও নাফরমানির মধ্য দিয়ে যে বছরের সূচনা তা জাতির জীবনে কতটুকু সুফল বয়ে আনবে তা খুব সহজেই অনুমেয়।
রাজধানীসহ বড় বড় মহানগরী ও পর্যটন নগরীগুলিতে চলে থার্টি-ফার্স্ট নাইটের নামে নানাবিধ আনন্দ-ফূর্তির অনুষ্ঠান ও রাতভর হৈ-হুল্লোড় আর ক্যাসেট ও মাইকবাজির অত্যাচার। তাই একে ‘থার্টি-ফার্স্ট নাইট’ না বলে ‘ফষ্টি-নষ্টি নাইট’ বলাই যথার্থ হবে। পাশ্চাত্যের জান্তব সভ্যতার অংশবিশেষ হলো এই কথিত ‘থার্টি-ফার্স্ট নাইট’ ও ‘ভ্যালান্টাইন্স ডে’ বা ‘ভালোবাসা দিবস’। বাংলাদেশের ধর্মীয় সংস্কৃতি এগুলোকে অস্বীকার করে। মানবতা বিধ্বংসী এইসব অপসংস্কৃতি থেকে জাতিকে রক্ষা করার প্রধান দায়িত্ব সরকারের এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের।
অতএব, শুধু থার্টি-ফার্স্ট নাইটে নয়, বরং দূরদর্শী মানুষের জন্য প্রতি রাত্রিতেই আগামীকাল সুন্দর জীবনের হিসাব করা উচিত। আমাদের আয়ুষ্কাল খুবই সামান্য। তাই জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড ও মিনিটকে হিসাব করে কাজে লাগাতে পারলেই ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে উন্নতি আসবে, নইলে নয়। আল্লাহ আমাদের তরুণ-তরুণীদের ও সমাজ নেতাদের সুমতি দান করুন এবং আমাদের সকল গুনাহ-খাতা মাফ করে সুন্দর মানুষ হবার তাওফীক দান করুন- আমীন।