12/04/2019
কৃষ্ণগহ্বরের প্রথম ছবি: অসম্ভব যখন বাস্তবতায় পরিণত হলো।
জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে আজকের দিনটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। যা চিরকাল অদেখা থেকে যাবে বলে মানুষ ভেবেছে, সেই অদেখা আজ দেখা দিল। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কৃষ্ণগহ্বরের ছবিতোলা হয়েছে। আজ সেই ছবি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে সবার জন্য। বেঁচে থাকলে আজ সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন স্টিফেন হকিং। বিবিসিতে ব্ল্যাকহোল নিয়ে দুটো লেকচার দিয়েছিলেন তিনি। মজা করে বলেছিলেন,
কেউ যদি আসলেই কৃষ্ণগহ্বর শনাক্ত করতে পারে, তাহলে আমি নোবেল পেয়ে যাব!
হাতে হাতে পুরষ্কার হয়তো পাননি, কিন্তু নোবেলের চেয়ে বড় কিছু অর্জন করেছেন তিনি। ওপার থেকে কি দেখছেন তিনি? কে জানে!
ইভেন্ট হরাইজন নামের একটি টেলিস্কোপ কৃষ্ণগহ্বরের এই ছবিটি তুলেছে। গ্যালাক্সি মেসিয়ার ৮৭ এর কেন্দ্রে থাকা কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তুলেছে এই নভোটেলিস্কোপটি। এই প্রকল্পের পরিচালক এবং কেমব্রিজের হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী শেপার্ড ডোলম্যান বলেছেন,
মানুষ জনমভর যাকে দেখা অসম্ভব বলে ভেবে এসেছে, আজ তা-ই দেখছি আমরা। শুধু দেখিইনি, এর ছবিও তুলেছি!
আসলে, কৃষ্ণগহ্বরের গল্পের শুরুতে সবার আগে আইনস্টাইনের কথা চলে আসে। চন্দ্রশেখরের গল্পটা চলে যায় আড়ালে। অথচ ১৯৩৯ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন একটি পেপার লিখেছিলেন, যার বিষয়বস্তু ছিল-
মহাকর্ষের টানে নক্ষত্র কখনো সংকুচিত হয়ে ধ্বসে পড়তে পারে না। কারণ, একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে পদার্থকে জোর করেও সংকুচিত করা সম্ভব নয়।
অনেক বিজ্ঞানীই আইনস্টাইনের এই মতামতের সঙ্গে একমত ছিলেন না। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিরোধী ছিলেন আমেরিকান বিজ্ঞানী জন হুইলার। অনেক দিক থেকেই যিনি আসলে ব্ল্যাক হোলের এই গল্পের নায়ক। ১৯৫০ থেকে '৬০ এর মধ্যকার গবেষণাগুলোতে তিনি বেশ জোর দিয়ে বলেছিলেন, একটা সময় এসে প্রায় সব নক্ষত্রই শেষ পর্যন্ত নিজের উপরেই ধ্বসে পড়বে। আর এই সম্ভাবনা সত্য হলে সেটা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্য কী ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে, সে ব্যাপারেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সেইসঙ্গে নক্ষত্রের এই ধ্বংসাবশেষ বা কৃষ্ণগহ্বরের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে অগ্রীম ধারণা করতে পেরেছিলেন তিনি। তবে এর শুরুটা করেছিলেন চন্দ্রশেখর।
একটি সাধারণ নক্ষত্রের জীবনকালের বেশিরভাগ সময় জুড়ে, বেশ কয়েক বিলিয়ন বছরব্যাপী নক্ষত্রটি তার নিজের মহাকর্ষীয় টানের বিরুদ্ধে নিজেকে ধরে রাখতে পারে। এক্ষেত্রে যে শক্তি লাগে, সেটা আসে নক্ষত্রের বুকে ঘটে চলা নিউক্লিয়ার ফিউশনের ফলে সৃষ্ট থার্মাল প্রেশার (Thermal Pressure) থেকে। আর, এই ফিউশন প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন পরিণত হয় হিলিয়ামে।
নাসার ভাষ্যমতে, নক্ষত্ররা হলো প্রেশার কুকারের মতো। নক্ষত্রের বুকে যে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া ঘটে, তার ফলে যে বিস্ফোরক বল তৈরি হয়, সেটি একটি বহির্মুখী চাপ সৃষ্টি করে। এই বহির্মুখী চাপ মহাকর্ষকে বাধা দেয়। এ কারণে মহাকর্ষ তারার অভ্যন্তরীণ পদার্থগুলোকে টেনে ভেতরের দিকে আনতে চাইলেও পারে না।
ধীরে ধীরে একসময় নক্ষত্রের এই নিউক্লিয়ার জ্বালানী ফুরিয়ে যায়। তখনই নক্ষত্রটি সংকুচিত হতে শুরু করে। এ সময় কোনো কোনো নক্ষত্র নিজেদেরকে ধরে রাখার একটি উপায় বের করে নেয়। উপায়টি হলো, ‘সাদা বামন’ নক্ষত্রে পরিণত হওয়া। সুব্যহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর ১৯৩০ সালে প্রথমবারের মতো আমাদেরকে দেখিয়েছিলেন, সাদা বামন নক্ষত্রের ভর সূর্যের চেয়ে সর্বোচ্চ ১.৪ গুণ বেশি হতে পারে।
কথা হচ্ছে, কোনো নক্ষত্রের ভর তার চেয়েও বেশি হলে তখন কী হবে?
নক্ষত্রটি নিজের ভরের ফলে সৃষ্ট মহাকর্ষের টানে সংকুচিত হয়ে পরিণত হবে কৃষ্ণগহ্বরে। এই কৃষ্ণগহ্বরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে মহাকর্ষ প্রচন্ড রকম শক্তিশালী। স্বয়ং আলোও এখান থেকে বের হয়ে আসতে পারে না। অথচ আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব স্বীকার করে নেয় যে, মহাবিশ্বের সবচেয়ে গতিশীল বস্তু হলো আলো।
তার মানে দাঁড়াচ্ছে, একবার কিছু কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে ঢুকে পড়লে আর বেরিয়ে আসতে পারবে না। আমাদের সৌভাগ্য, কৃষ্ণগহ্বরের এই রাক্ষুসে ক্ষুধার দৌরাত্ম্য আসলে তার চারপাশের ঘটনা দিগন্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ঠিক এই সীমানা পর্যন্তই কৃষ্ণগহ্বরের প্রবল মহাকর্ষ আলোকে আটকে রাখতে পারে। তবে ঘটনা দিগন্তের বাইরেও এর কিছুটা প্রভাব তো পড়েই (আসলে অনেক বেশিই পড়ে। ভুলে গেলে চলবে না, সূর্য যেমন তার ভর দিয়ে সৌরজগতকে ধরে রেখেছে, তেমনি একটি গ্যালাক্সির সব কিছুকে নিজের সাথে ধরে রাখে কৃষ্ণগহ্বর)।
এই প্রভাবের ফলেই কিছু কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্তের একটু বাইরে চারপাশ জুড়ে জমা হয় গ্যাসের দলা, ধুলোবালি এবং মহাকাশে ভেসে বেড়ানো মহাজাগতিক পদার্থ বা উল্কা। মথ যেমন আলোর বুকে আত্মাহুতি দেয়, তেমনি এরাও কৃষ্ণগহ্বরের বুকে আত্মবলি দেয়ার অপেক্ষায় থাকে।
কথা হচ্ছে, যে কৃষ্ণগহ্বর থেকে কিছুই বেরিয়ে আসতে পারে না, সেটার ছবি তোলা কীভাবে সম্ভব? এটা বোঝার জন্য চলে যেতে হবে হকিংয়ের কাছে। এই মানুষটি জীবনের বেশিরভাগ সময় চুপচাপ হইলচেয়ারে বসে ভেবেছেন। পুরো মুখে মাত্র একটি পেশী নাড়াতে পারতেন! অথচ তার ক্ষুরধার মস্তিষ্ক থেকে একের পর এক চমকে দেয়া ভাবনা-তত্ত্ব বেরিয়ে এসেছে। যেন অদ্ভুত এক জাদুকর ঝোলা থেকে একের পর এক খরগোশ বের করেই চলেছেন!
হকিং বললেন, ঘটনা দিগন্ত পেরিয়ে যারা আত্মবলি দেয়, তাদের ভর কৃষ্ণগহ্বরের ভরের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে ঘটনা দিগন্তের আকার অর্থাৎ কৃষ্ণগহ্বরের সীমানা বেড়ে যায়। এর সঙ্গে আবার মহাবিশ্বের এনট্রপি বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। তার এই তত্ত্বের সূত্র ধরে জ্যাকব বেকেনস্টাইন নামের এক বিজ্ঞানী দেখালেন, এনট্রপি থেকে কৃষ্ণগহ্বরের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বের করা সম্ভব। এ থেকে আবার এর আকার আকৃতি ও ভর সম্পর্কে জানা যাবে।
সমস্যা হলো, কোনো বস্তুর এনট্রপি থাকলে তার অবশ্যই তাপমাত্রা থাকতে হবে। কিন্তু তাপমাত্রা থাকলে সেখান থেকে অবশ্যই সেখান শক্তির বিকিরণ হতে হবে। কিন্তু কৃষ্ণগহ্বর তো কোনো বিকিরণ করে না! তাহলে উপায়?
বিজ্ঞানীরা পড়লেন বিপদে। উপায় বাতলে দিলেন হকিং। বললেন, অনেক তো আপেক্ষিকতা তত্ত্ব হলো। এবার একটু কোয়ান্টাম বলবিদ্যার দিকে তাকানো যাক। পল ডিরাক কোয়ান্টাম বলবিদ্যা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন, শূন্যস্থান বা ভ্যাকুয়াম আসলে শূন্য নয়। এটি আসলে শক্তির সাগর। সেই শক্তি ব্যবহার করে প্রতি মুহূর্তে জোড়ায় জোড়ায় জন্ম নিচ্ছে কণারা (Particles)। ভর-শক্তির এই রুপান্তরের পেছনের রেসিপি বাতলে দিয়ে গেছেন স্বয়ং আইনস্টাইন; E = mc2!
তবে, এই কণাদেরকে আমরা দেখতে পাই না। কারণ এরা একটু অন্যরকম। জোড়া কণার একটি আরেকটির প্রতিকণা বা এন্টিম্যাটার (Antimatter)। এদের বৈশিষ্ট্য হলো এরা জন্মের পরমুহূর্তেই পরস্পরের উপরে হামলে পড়ে এবং একে অন্যকে ধ্বংস করে দেয়। এ সময় ছোটখাটো বিস্ফোরণ বা শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটে। এই বিস্ফোরণের ফলে যে শক্তি তৈরি হয়, তার কিছুটা ভ্যাকুয়াম থেকে বেরিয়ে আসে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মহাবিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা গুপ্তশক্তি বা ডার্ক এনার্জির উৎপত্তিও এর মাধ্যমেই হয়। যেহেতু এই কণাদেরকে আদৌ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, তাই এদেরকে বলা হয় ভার্চুয়াল কণা।
বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বললেন, এই ভার্চুয়াল কণারাই আমাদেরকে কৃষ্ণগহ্বর দেখার কাজে সাহায্য করবে। ভার্চুয়াল কণা-জোড়টি যদি কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্তের একেবারে প্রান্তসীমায় তৈরি হয়, তাহলে জোড়ার একটিকে কৃষ্ণগহ্বর চট করে গিলে নিতে পারে। ফলে মুক্তি পেয়ে যেতে পারে আরেকটি কণা। কোনোভাবে এই কণা যদি মুক্তি পায়, তাহলে সে মহাকাশে প্রাণপণে ছুট দেবে।
এখানে পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সব ব্যাপার কাজ করে। তবে, সহজ করে এর মধ্যকার 'কিন্তু'টা বুঝে নেওয়া যাক। ভার্চুয়াল কণাজোড় (Particle Pair) যেহেতু একে অন্যের বিপরীত বা প্রতিকণা, তাই একটি ধনাত্মক শক্তিধর হলে, আরেকটি হয় ঋণাত্মক শক্তিধর। এখন কোনোভাবে মুক্তি পাওয়া কণাটি যদি ধনাত্মক হয়, তার মানে কৃষ্ণগহ্বরের গিলে নেওয়া কণাটি ঋণাত্মক। এই ঋণাত্মক শক্তি কৃষ্ণগহ্বরের মোট শক্তির সঙ্গে যোগ হলে কী হবে, বলুন তো?
বাচ্চাকালের গণিত জানলেই বোঝা যায় এটি। প্লাসের সঙ্গে মাইনাস যোগ হলে মাইনাস হয়! হ্যাঁ, তার মানে এই কণাটি গিলে নেওয়ার ফলে কৃষ্ণগহ্বরের শক্তি কমে গেল। এদিকে, ধনাত্মক কণাটির শক্তি কিন্তু ঋণাত্মক কণাটির সমান (কেবল চিহ্নটাই বিপরীত)। তার মানে, কৃষ্ণগহ্বরের সেই শক্তি কিন্তু এই কণাটি বয়ে নিয়ে এসেছে।
কৃষ্ণগহ্বরের এই বিকিরণের নামই হলো হকিং বিকিরণ (Hawking Radiation)। অর্থাৎ কৃষ্ণগহ্বরকে দেখতে হলে হকিং বিকিরণ শনাক্ত করতে হবে!
ঠিক এই কাজটিই করেছে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ। হকিং বিকিরণ শনাক্ত করার মাধ্যমে কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্তের ছবি তুলেছে। সেইসঙ্গে এর মাধ্যমে কৃষ্ণগহ্বরটির ব্যাপারে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা গিয়েছে। যেমন, জানা গেছে, মেসিয়ার ৮৭ গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কৃষ্ণগহ্বরটির ভর সূর্যের ৬.৫ বিলিয়ন গুণের মতো।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কৃষ্ণগহ্বরটির দিকেও চোখ রেখেছিল ইভেন্ট হরাইজন। কিন্তু মিল্কিওয়ের চেয়ে মেসিয়ার ৮৭ গ্যালাক্সির মহাকর্ষীয় টান অনেক বেশি। ফলে এর চারপাশে ঘুরতে থাকা ধুলো-বালি-পাথর-গ্যাস ইত্যাদির মেঘ অনেক ধীরে ধীরে ঘোরে। সেজন্যেই, পৃথিবী থেকে ৫৫ আলোকবর্ষ দূরের এই কৃষগহ্বরটিই ছবিই আগে তুলেছে ইভেন্ট হরাইজন। আপনি, আমি, আমরা যারা আজকের দিনটিতে বেঁচে আছি, আমরা নিঃসন্দেহে পরম সৌভাগ্যবান। স্বয়ং হকিং একটুর জন্যে তার সারা জীবনের মুগ্ধতার ছবিটি দেখে যেতে পারলেন না। অথচ আমরা সেই সুযোগ পেয়েছি।
বুড়ো বয়সে আপনি নিশ্চয়ই এই গল্পটা শোনাতে পারবেন নাতি-নাতনিকে। আইনস্টাইনকে যদিও পাইনি, কিন্তু আমরা বেঁচে ছিলাম হকিংয়ের সময়ে। আমরা দেখেছি, এই মানুষটি জীবনভর হুইল চেয়ারে বসে থেকেই যুগান্তকারী সব ভাবনা ভেবে গেছেন। এবং তার কথা সত্য প্রমাণিত করে, অদেখার বেড়াজাল ডিঙিয়ে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানীরা ছবি তুলেছেন ৫৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের এক কৃষ্ণগহ্বরের। আজকের দিনটি মানবসভ্যতার জন্য একটি মাইলফলক।
References:
[1] Black Holes: The Reith Lectures by Stephen Hawking
প্রতিবেদন ---- Uchsash Tousif
তথ্য সংগৃহিত রাজা সিং।
তথ্যসূত্রঃ এবং ছবি সংগ্রহ ---- রোর বাংলা।