18/05/2026
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় “রিডিং সংকট”।
কেন শিশুরা বাংলা ও ইংরেজি পড়তে পারছে না? সমাধান কোথায়?
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় একটি বড় সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে—অনেক শিক্ষার্থী বাংলা ও ইংরেজি রিডিং পড়তে পারছে না। একজন শিক্ষক হিসেবে সরাসরি ক্লাস নেওয়ার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, এই সমস্যাটি হঠাৎ সৃষ্টি হয় না; বরং ছোট ছোট দুর্বলতা জমতে জমতেই একসময় শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি রিডিং থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
সমস্যার মূল শুরু কোথায়?
একজন শিশু যখন প্রথম শ্রেণিতে ওঠে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তার বর্ণ পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না।
সে ঠিকভাবে বাংলা বর্ণ বা ইংরেজি letter চিনতে পারে না, কিন্তু তারপরও তাকে পরবর্তী শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করা হয়।
ফলে ধীরে ধীরে—
বর্ণ চিনতে না পারা
বর্ণ মিলিয়ে শব্দ গঠন করতে না পারা
শব্দ থেকে বাক্য পড়তে না পারা
উচ্চারণে ভুল
পড়ার প্রতি ভয় ও অনাগ্রহ
—এসব মিলিয়ে তৈরি হয় “রিডিং সংকট”।
যেখানে একটি শিশু “ক” চিনতেই পারে না, সেখানে “কমল” পড়া তার জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়।
একইভাবে ইংরেজিতে letter sound না জেনে word reading সম্ভব হয় না।
কেন এই দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে?
১. অভিভাবকের অসচেতনতা
অনেক অভিভাবক শিশুদের খুব ছোট বয়সে স্কুলে পাঠান, কিন্তু বর্ণ শেখা বা প্রতিদিন পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না।
তাদের মূল লক্ষ্য থাকে “প্রথম শ্রেণিতে উঠানো”, কিন্তু শিশুর ভিত্তি শক্ত হলো কিনা সেটি গুরুত্ব পায় না।
২. অশিক্ষিত বা কম শিক্ষিত পারিবারিক পরিবেশ
অনেক পরিবারে শিশুকে ঘরে নিয়মিত পড়ার সহযোগিতা দেওয়ার মতো পরিবেশ থাকে না।
ফলে বিদ্যালয়ের শেখা বিষয় ঘরে চর্চা না হওয়ায় শিশুর শেখা স্থায়ী হয় না।
৩. দুর্বল ভিত্তি নিয়েই পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া।
প্রতিটি শ্রেণিতে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হয়।
কিন্তু পুরোনো ভিত্তিই যদি দুর্বল থাকে, তাহলে নতুন পাঠের সাথে পুরোনো পাঠের সংযোগ তৈরি হয় না।
ফলে শিশুর কাছে পড়াশোনা ধীরে ধীরে জটিল ও ভীতিকর হয়ে ওঠে।
৪. গতানুগতিক শিক্ষাদান পদ্ধতি
শিশুরা আনন্দ, খেলা, গল্প, ছবি, গান ও কার্যক্রমভিত্তিক শিক্ষায় দ্রুত শেখে।
কিন্তু এখনো অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো একঘেয়ে পদ্ধতিতে বর্ণ ও শব্দ শেখানো হয়।
ফলে শিশু আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
৫. ইংরেজি উচ্চারণ ও phonics দুর্বলতা
ইংরেজি ভাষায় শুধু letter চিনলেই হয় না; sound বা ধ্বনি জানতে হয়।
A, B, C মুখস্থ করলেই reading হয় না।
letter sound → blending → word formation — এই ধাপে শেখানো অত্যন্ত জরুরি।
৬. বিদ্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতি
লোডশেডিং, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, মহামারি, পারিবারিক সমস্যা ইত্যাদি কারণে অনেক শিশু বিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
কিছুদিন স্কুলে না গেলে তারা আগের শেখা বিষয়ও ভুলে যায়।
৭. আধুনিক কৌশলের অভাব
বর্তমান যুগে শিশুকে শেখাতে activity-based learning, phonics method, digital content, picture reading, storytelling ইত্যাদি আধুনিক কৌশল ব্যবহার করা জরুরি।
শুধু বই পড়িয়ে রিডিং দক্ষতা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
তাহলে সমাধান কী?
বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম (NCTB/NAPE) ও বাস্তব শ্রেণিকক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি—
১. ভিত্তি শক্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তীর্ণ নয়
প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে বিশেষভাবে বর্ণজ্ঞান ও রিডিং দক্ষতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
শিশু বর্ণ না চিনলে তাকে পরবর্তী স্তরের চাপ দেওয়া উচিত নয়।
২. প্রতিদিন নির্ধারিত “রিডিং ক্লাস” চালু করা
প্রতিটি বিষয়ের পাশাপাশি আলাদা Reading Session থাকা জরুরি।
এবং এর জন্য আলাদা মূল্যায়ন ও নম্বর থাকা উচিত, যাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সবাই গুরুত্ব দেয়।
৩. বাংলা ও ইংরেজিতে ধাপে ধাপে শেখানো
বিশেষ করে ইংরেজিতে—
single letter sound
two-letter word
three-letter word
four-letter word
—এভাবে ধাপে ধাপে শেখাতে হবে।
বাংলাতেও—
বর্ণ → যুক্তবর্ণ → শব্দ → বাক্য → অনুচ্ছেদ
এই ক্রমানুসারে শেখাতে হবে।
৪. আনন্দময় ও আকর্ষণীয় শিক্ষাদান
শিশুরা খেলতে খেলতেই সবচেয়ে বেশি শেখে। তাই—
flash card
picture reading
rhyme
storytelling
pair work
reading game
ব্যবহার বাড়াতে হবে।
৫. শতভাগ বিদ্যালয় উপস্থিতি নিশ্চিত করা
নিয়মিত উপস্থিতি রিডিং দক্ষতা উন্নয়নের অন্যতম শর্ত।
বিদ্যালয় ও অভিভাবককে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
৬. অভিভাবক সচেতনতা বৃদ্ধি
অভিভাবকদের বোঝাতে হবে— “শুধু ক্লাসে উঠানো নয়, পড়তে পারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
প্রতি মাসে Parent Meeting করে শিশুর Reading Progress জানানো যেতে পারে।
৭. দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা
যারা reading এ পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য remedial class বা ছোট গ্রুপভিত্তিক সহায়তা চালু করা জরুরি।
৮. শিক্ষক প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি
শিশুদের রিডিং শেখাতে phonics, joyful learning ও competency-based teaching বিষয়ে শিক্ষকদের আরও প্রশিক্ষিত করতে হবে।
শেষ কথা
একজন শিশু যদি রিডিং না পারে, তাহলে সে শুধু বাংলা বা ইংরেজিতে নয়—সব বিষয়েই পিছিয়ে পড়ে।
কারণ “রিডিং” হচ্ছে শিক্ষার মূল চাবিকাঠি।
আজ যদি আমরা প্রাথমিক স্তরে বর্ণ, শব্দ ও বাক্যের ভিত্তি শক্ত করতে পারি, তাহলে আগামী প্রজন্ম হবে আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ ও জ্ঞানভিত্তিক।
শিশুকে শুধু “পাশ” করানো নয়—
“পড়তে শেখানো”ই হোক আমাদের প্রথম লক্ষ্য।
13/05/2026
13/05/2026
22/04/2026
21/04/2026
21/04/2026
21/04/2026
17/04/2026