18/03/2022
তেল - আমেরিকা, চীন এবং সৌদি আরব
মার্কিন ডলার বাদ দিয়ে চীনা মুদ্রায় চীনের কাছে তেল বিক্রির পথে হাটতে পারে সৌদি আরব। আর যদি এইটা ঘটে তাহলে আমেরিকার জন্য সেটি হবে একটি ভয়াবহ ব্যাপার।
বর্তমানে আমেরিকার সুপার পাওয়ার থাকার সব থেকে বড় কারন হচ্ছে পেট্রো ডলার ব্যাবস্থা। পেট্রো ডলার ব্যাবস্থা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সব সময় ডলারে কেনা বেচা হবে। অন্য কারেন্সিতে নয়।
আমরা যত সোর্স থেকে তেলের দাম/দামের চার্ট দেখি, সব সময়ই সেটা ডলারের বিপরীতেই দেখে থাকি।
আমেরিকার সাথে সৌদি আরব এবং অন্যান্য তেল সমৃদ্ধ দেশের চুক্তি রয়েছে যে, তেল সব সময় আন্তর্জাতিক বাজারে, ডলারে কেনাবেচা হবে। সেই সকল চুক্তি ইচ্ছায় হোক কিংবা বিপদে পরে হোক, করা হয়েছে! সেই মোতাবেকই তেল কেনা বেচা হচ্ছিল। এখানে বলে রাখা ভাল হবে যে, ১৯৭১ সালে রিচার্ড নিক্সন, স্বর্ণ ভিত্তিক মুদ্রা ব্যাবস্থা বাতিল ঘোষণা করার ফলে ডলারের বিপরীতে স্বর্ণের মজুদ ব্যাবস্থার ইতি ঘটে, অর্থাৎ ডলার ছাপানোর ক্ষেত্রে সেই পরিমান স্বর্ণ মজুদ রাখা হয় না। সেই হিসাবে সাধারনভাবে ডলার একটা কাগুজে নোট ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু তার পরেও ডলার একটা মুল্যবান কারেন্সি হিসাবে গন্য হত বা এখনও হচ্ছে যেহেতু তেল কিনতে হলে ডলার লাগবেই। তার মানে, ডলারের কোন ইনট্রিন্সিক ভ্যালু নেই; কিন্তু ডলারের মুল্য নির্ধারিত হচ্ছে ডিমান্ড এবং সাপ্লাই এর উপর। যেহেতু সকল দেশেরই তেল লাগবে, তার মানে সকল দেশেরই তেল কেনার জন্য ডলারও লাগবে। আর যেহেতু সকল দেশেরই ডলার লাগবেই তাই আমেরিকা ইচ্ছা মত ডলার ছাপাতে পারে। ইচ্ছা মত বিভিন্ন দেশকে লোন দিতে পারে। আবার এই ইনট্রিন্সিক ভ্যালুবিহীন কারেন্সি লোন দিয়ে, তার উপর ইন্টারেস্টও নেয়। একই সাথে, সেই দেশে এইসব ফেভারের জন্য প্রভাবও বিস্তার করতে পারে।
এখানে বুঝতে হবে আমেরিকা যত বস্তা বস্তা ডলার ছাপায় তার বেশীরভাগই আমেরিকার বাইরেই থাকে। অন্যান্য দেশ সব সময় চেষ্টা করে কিভাবে ডলার কামানো যায়। সেটা এক্সপোর্ট, রেমিটেন্স ইত্যাদি যত ভাবেই হোক না কেন। এতে করে, এত এত কাগজ ছাপানোর পরেও ডলার তার শক্তি ধরে রাখতে পারে।
এক কথায় পেট্রো ডলার ব্যাবস্থা মার্কিন ডলারকে সমগ্র বিশ্বে শক্তিশালী করে তুলেছে এবং তেল সম্বৃদ্ধ দেশসমূহসহ অন্য দেশসমূহসহকে আমেরিকার উপর নির্ভরশীল করে রেখেছে।
আমেরিকা বিভিন্ন কারন দেখিয়ে যত যুদ্ধ করেছে তার আসল কারন ছিল তেল। আর যাদের সাথে যুদ্ধে যাওয়া খেত্র প্রস্তুত করা যায়নি তাদের উপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যাপারগুলো ছিল তেল কেন্দ্রিক অথবা ডলারের বাইরে গিয়ে তেল লেনদেনে চেষ্টা করার জন্য। ইরাক, লিবিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইরান এই দেশগুলোর খেত্রে ব্যাপারটা সেরকমই।
এখন সৌদি আরব যদি অন্য কারেন্সিতে তেল রপ্তানি শুরু করে তাহলে অন্য দেশগুলোর ডলারের উপর থেকে বিশ্বাস কমতে থাকবে। আর চীন, রাশিয়া সহ আরও অনেক দেশ ইতিমধ্যে চেষ্টায় আছে আমেরিকার আধিপত্যকে ভেঙ্গে দিতে। তেল লেনদেনের ক্ষেত্রে যদি ডলারের মনোপলি ভেঙ্গে যায় তাহলে ডলার একদমই কাগুজে মুদ্রায় পরিনত হবে। তখন অন্য দেশগুলো (যাদের হাতে ডলার আছে) তারা আমেরিকাকে বলবে, তোমার ডলার তোমার কাছে রাখো আর আমাকে যে কোন একটা প্রোডাক্ট দাও। অর্থাৎ ডলার একদমই কাগুজে মুদ্রায় পরিনত হওয়ার আগেই দেশগুলো তাদের হাতে থাকা ডলার আমেরিকায় পাঠায় দিয়ে যেকোন ধরনের প্রোডাক্ট নিয়ে কেটে পরতে চাইবে। এতে করে আমেরিকা থেকে সম্পদ বের হয়ে যাবে আর আমেরিকাতে শুধু কিছু কাগজ ঢুকবে।
এমন অবস্থায় আমেরিকার ভিতরের অবস্থা হবে, অনেক অনেক কাগুজে মুদ্রা আছে কিন্তু তার বিপরীতে প্রোডাক্ট কম। এতে করে ইনফ্লেশন আকাশচুম্বী হবে এবং ডলার কারেন্সি হিসাবে ধ্বসে পড়বে। এর পর একটা বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দার দিকে যাবে। তারপর আমরা হয়ত নতুন কোন সুপার পাওয়ার দেখব। সেটা হয়তোবা চীন হতে পারে।
তাই পরবর্তীতে তেল নির্ভর রাজনীতি কোন দিকে যায় সেটা খেয়াল রাখাটা একটা গুরুত্ত্বপুর্ন বিষয় হবে।
© Shihab Alam Khan