10/03/2025
রোবেন শর্মা-
জীবনের লক্ষ্য ও মানসিক শান্তির পথপ্রদর্শক। তিনি একজন বিশ্ববিখ্যাত মোটিভেশনাল স্পিকার, লেখক এবং উদ্যোক্তা, যিনি তার জীবনের সংগ্রাম এবং সাফল্যের কাহিনির মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের জীবন পরিবর্তন করেছেন। তার গ্রন্থ "দ্য মোন্ক হু সোল্ড হিজ ফেরারি" তাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে এবং আজও এটি জীবনের লক্ষ্য ও মানসিক শান্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে পড়া হয়। তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি শূন্য থেকে শুরু করে নিজের চিন্তাভাবনা, অধ্যাবসায়, এবং সঠিক মনোভাবের মাধ্যমে জীবনে বিপুল সাফল্য অর্জন করেছেন। রোবেন শর্মার জীবনের গল্প এক কথায় অনুপ্রেরণার। শুরুর দিকে তিনি একজন আইনজীবী ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে নিজের আসল উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়ে তিনি জীবনে নতুন পথ খুঁজে পান। তিনি বুঝতে পারেন যে, জীবনের প্রকৃত অর্থ সফলতা বা পুঁজি অর্জনে নয়, বরং শান্তি, আত্মবিশ্বাস, এবং আত্মতৃপ্তির মধ্যে রয়েছে। এই উপলব্ধি তাকে প্রচুর লেখালেখি এবং বক্তৃতা দেওয়ার দিকে পরিচালিত করে, যার মাধ্যমে তিনি বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন। রোবেন শর্মা তার বই ও বক্তৃতার মাধ্যমে শিখিয়েছেন যে, কঠিন সময় এবং সংগ্রাম শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিকাশের পথ, এবং জীবনে প্রকৃত সুখ অর্জন করা সম্ভব যখন আমরা আত্মবিশ্বাসী, উদার ও নিজের প্রতি সত্য থাকি। তার জীবনটা তার নিজস্ব সংগ্রামের একটি চিত্র, এবং তা আমাদের শেখায় যে, সংকট বা ব্যর্থতা আমাদের শেষ কথা নয়, বরং তা আমাদের সাফল্যের দিকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। রোবেন শর্মার জীবন এবং দর্শন হলো এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যে ব্যক্তি তার সংগ্রাম এবং ব্যর্থতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে, বিশ্বের জন্য একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করেছেন। তার জীবনযাত্রা আমাদের শেখায় যে, যখন আমরা নিজের পথ খুঁজে পাই এবং তা অনুসরণ করি, তখন আমরা যে কোন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও নিজেদের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে পারি।
রোবেন শর্মা ১৯৬৪ সালে কানাডার পোর্ট হোপ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব এবং কৈশোর ছিল সাধারণ, কিন্তু তিনি সবসময় বিশেষ কিছু করতে চেয়েছিলেন—এমন কিছু যা তাকে শুধুমাত্র নিজেকে নয়, বরং পৃথিবীকে প্রভাবিত করতে সক্ষম করবে। রোবেন শর্মার শৈশবের অনেকটাই ছিল সাধারণ। তিনি ছোটবেলা থেকেই একজন পরিশ্রমী ছাত্র ছিলেন এবং স্কুলে ভাল ফলাফল করতেন। রোবেন শর্মার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল সুদৃঢ় ও সহায়ক। তিনি বিবাহিত এবং তার দুটি সন্তান রয়েছে। তার পরিবার সর্বদা তাঁর পাশে ছিলেন এবং তার পেশাগত যাত্রায় সহযোগিতা করেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা তার পরিবার এবং তাদের ভালোবাসা। যদিও রোবেন শর্মা পেশাগত জীবনে সমর্থন ও ভালোবাসা পেয়েছেন তার পরিবারের কাছ থেকে, তবুও তার পথটি সহজ ছিল না। তিনি প্রথমদিকে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে। তবে তিনি কখনও হার মানেননি। তার পরিবারও জানত, তিনি একটি উচ্চ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংগ্রাম করছেন, এবং তাদের সহায়তা তাকে সফল হতে সাহায্য করেছে। পরিবার তার জন্য শুধু সমর্থন এবং ভালোবাসার উৎস নয়, বরং তার সংগ্রামের শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে তিনি একদমই জানতেন না যে, ভবিষ্যতে তিনি মোটিভেশনাল স্পিকার বা লেখক হয়ে উঠবেন। শৈশবে তার জীবনে কোনো বড় ধরনের প্রভাবক ছিল না, তবে তার মধ্যে ছিল এক অদম্য ইচ্ছা এবং আত্মবিশ্বাস, যা তাকে নিজের লক্ষ্য অর্জনের পথে নিয়ে যায়। তিনি স্কুলে পড়াশোনায় ভালো ছিলেন, তবে অন্যদের মতন তিনি এক পেশায় সীমাবদ্ধ থাকতে চেয়েছিলেন না। তিনি নিজের পথ খুঁজতে চেয়েছিলেন এবং সেই পথটি তাকে একটি সফল জীবনের দিকে নিয়ে যাবে। রোবেন শর্মা উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডার একজন মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি স্নাতক পড়াশোনা করেন এবং তারপর আইন পড়তে শুরু করেন। তবে, শৈশব থেকেই তার মধ্যে এমন এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল যা তাকে মানুষের মনোভাব এবং ব্যক্তিগত উন্নয়ন বিষয়ে আগ্রহী করে তোলে। তাই আইন পেশায় শুরুর পরও তিনি বুঝতে পারেন, তার আসল উদ্দেশ্য অন্যত্র—মানুষের জীবন বদলে দেয়ার মাধ্যমে সমাজের পরিবর্তন আনা। রোবেন শর্মা প্রথমে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু তার মনে ছিল অন্য কিছু। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তার আসল লক্ষ্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করা এবং তাদের জীবনে পরিবর্তন আনা। সেই সময় তিনি মানবিক উন্নয়ন এবং মোটিভেশনাল স্পিচের দিকে মনোযোগ দেন। শুরুতে, তিনি একটি ছোটো অফিসে কাজ শুরু করেন এবং সেই সময়ে তিনি বিভিন্ন লেখালেখির মাধ্যমে নিজের ধারণা এবং দর্শন মানুষদের সামনে তুলে ধরতে শুরু করেন। রোবেন শর্মা মনে করতেন, "কোনো একজন মানুষ যদি নিজের জীবনের লক্ষ্য নিয়ে সচেতন না থাকে, তবে সে কখনোই সাফল্য পেতে সক্ষম হবে না।" তার এই বিশ্বাস তাকে সাফল্য এনে দেয়।
রোবেন শর্মা একজন প্রফেশনাল পাবলিক স্পিকার হিসেবে তার যাত্রার গল্প আত্মবিশ্বাসের তলানীতে থাকা মানুষদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। তার জীবনযাত্রা কেবলমাত্র সফলতা এবং জনপ্রিয়তার গল্প নয়, বরং এক কঠিন সংগ্রামের এবং আত্মবিশ্বাসের গল্প। তার প্রফেশনাল স্পিকার হিসেবে যাত্রার মূল দিকগুলো তুলে ধরলে এটি এমন একটি চমৎকার উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে, যেখানে শ্রম, অধ্যাবসায়, এবং লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তাঁর জীবনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। তাঁর শুরুটা ছিল খুবই অনিশ্চিত। রোবেন শর্মা তার যাত্রা শুরু করেছিলেন একজন আইনজীবী হিসেবে। তিনি ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্টার্ন অন্টারিও থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং বেশ কিছু বছর কানাডার আইন ক্ষেত্রে কাজ করেন। তবে তিনি সবসময়ই অনুভব করতেন যে, তার জীবনে কিছু একটা বড় এবং আলাদা করার প্রয়োজন। আইনজীবী হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করার পরও, তাঁর মনে ছিল একটা গভীর আশা—নিজের মধ্যে আরো কিছু করার ক্ষমতা রয়েছে, যা মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলবে।
এমন তাড়না হতে তাঁর সিদ্ধান্তে আসে এক বিশাল পরিবর্তন। রোবেন শর্মা একটি মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি নিজের আসল লক্ষ্য অনুসরণ করবেন। যদিও তিনি আইনজীবী হিসেবে সচ্ছলতা এবং সাফল্য অর্জন করেছিলেন, তবুও তিনি মনে করতেন যে, তাঁর লক্ষ্য শুধু অর্থ এবং খ্যাতির পেছনে নয়, বরং মানুষের জীবন পরিবর্তনের জন্য কাজ করা। সে সময় তিনি পড়াশোনা শুরু করেন, আত্ম-উন্নয়ন বিষয়ক বই পড়েন, এবং শেষমেশ তিনি ঠিক করেন, তিনি পাবলিক স্পিকার হিসেবে নিজের জীবনের লক্ষ্য পরিবর্তন করবেন। প্রথম পদক্ষেপে
রোবেন শর্মা তার পরিচিতদের সামনে কথা বলা শুরু করেন এবং ছোট ছোট সেমিনার ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করতে থাকেন। তবে প্রথম দিকে খুব একটা জনপ্রিয়তা ছিল না। দর্শকদের আগ্রহ অর্জন করা তার জন্য ছিল চ্যালেঞ্জিং। তিনি বুঝতে পারলেন, কেবলমাত্র একটি শক্তিশালী বক্তব্য দিয়ে কাজ হবে না, তাকে নিজেকে আরও উন্নত করতে হবে—বক্তৃতার কৌশল শিখতে হবে, শ্রোতাদের মনোযোগ কিভাবে আকর্ষণ করতে হয়, এবং কিভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা যায়।
তবে, রোবেন শর্মার জন্য এই পথে আরও অনেক কঠিন সময় এসেছিল। প্রথমদিকে, তার বক্তৃতায় ছোট দর্শক দলের উপস্থিতি ছিল, এবং কখনও কখনও তার কাজের জন্য যথেষ্ট পারিশ্রমিকও পাওয়া যেত না। কিন্তু তার মধ্যে ছিল এক দৃঢ় বিশ্বাস—“একদিন আমি বিশ্বমানের স্পিকার হব।” সে সময় তিনি নিজেকে প্রমাণ করার জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করতে থাকেন, নিজের দক্ষতা এবং কৌশলগুলো উন্নত করেন, এবং শিখতে থাকেন। রোবেন শর্মার জীবন সেদিন বদলে যায় যখন তার বই "The Monk Who Sold His Ferrari" প্রকাশিত হয়। বইটি দ্রুতই আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই বইটি শুধু তার জীবনের দর্শন নয়, একটি নয়া দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে, যেখানে জীবনের মানে খোঁজা হয় এবং আত্ম-উন্নতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বইটি প্রকাশের পর, রোবেন শর্মার পাবলিক স্পিকিং ক্যারিয়ারও গতি পায়। তিনি পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন সেমিনার, কনফারেন্স, এবং ইভেন্টে বক্তৃতা দিতে শুরু করেন। রোবেন শর্মা আরও বড় পরিসরে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্পোরেট সেক্টরে দাওয়াত পান। তাঁর বক্তৃতায় ছিল সাফল্যের মন্ত্র, আত্মবিশ্বাসী জীবনযাপন, এবং মানসিকতা পরিবর্তন করে জীবনকে নতুনভাবে শুরু করার প্রেরণা। তাঁর বক্তব্যের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, তিনি অল্প সময়ের মধ্যে একটি বিশ্বমানের বক্তা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি শুধুমাত্র একটি ক্যারিয়ার তৈরি করেননি, বরং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার কাজে অবদান রেখেছেন।
একজন প্রফেশনাল স্পিকার হিসেবে আজ রোবেন শর্মা একজন অত্যন্ত সফল এবং বিশ্বব্যাপী পরিচিত পাবলিক স্পিকার। তাঁর বক্তৃতাগুলি এখন শুধু কর্পোরেট শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর আলোচনায় প্রতিটি শব্দের মধ্যে থাকে এক গভীর দৃষ্টি, যা শ্রোতাদের জীবনের মান উন্নত করার জন্য কার্যকরী কৌশল প্রদান করে। তাঁর বক্তৃতাগুলিতে থাকে আত্মবিশ্বাস, কর্মদক্ষতা, কঠোর পরিশ্রম, এবং জীবনে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার চ্যালেঞ্জ।
রোবেন শর্মার যাত্রা প্রমাণ করে যে, কখনো কখনো জীবনের প্রথম ধাপগুলো অনিশ্চিত ও কঠিন হতে পারে, তবে যদি আপনার কাছে দৃঢ় ইচ্ছা, লক্ষ্যের প্রতি ইতিবাচক আবেগ এবং অধ্যাবসায় থাকে, তবে আপনি যে কোন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেন। তার জীবন এবং যাত্রা সব সময় আমাদের অনুপ্রাণিত করে, যে সংগ্রাম এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করা সম্ভব।
প্রকাশকাল
.১০ মার্চ ২০২৫....
সংকলনে
মোহাম্মদ আলম কাউছার
লেখক,
"সফলতা ও মূল্যবোধের কিছু মৌলিক ভাবনা"
( একটি জীবনোপকরণ সমৃদ্ধ আত্ম-উন্নয়ন ও অনুপ্রেরণামূলক গ্রন্থ)
"My English Teacher"
( An unique research for non English speakers, professionals, learners)
গবেষক,
বাস্তবতা ও কল্পরূপ ব্যবস্থাপনা
(Incorporated with the frameworks - 4Rs & 4As)
সি ই ও,
রডল গ্লোবাল কর্পোরেশন
পরিচালক,
ইন্সটিটিউট অব প্রফেশনাল লার্নিং
সদস্য নির্বাহী কমিটি,
প্রফেশনাল পাবলিক স্পিকারস ফোরাম।