22/07/2019
ঢাকা কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ-
--------------------------------------------------------
১৮৪১ সালে উপমহাদেশের অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা কলেজ। এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার ৩৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই সময়ের পূর্ব বাংলার অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা কলেজ ছিলো সেরা। বাংলাদেশ তথা পূর্ববাংলার সবচেয়ে প্রাচীন কলেজ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আজ অবধি। আমরা ঢাকা কলেজের ইতিহাস সম্পর্কে অনেকে জানি না। বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো বিদ্যাপিঠ হিসেবে খ্যাত প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু ঢাকা কলেজ থেকেই। আসুন আমরা জেনে নেই কিভাবে ঢাকা কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি হলো।
১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা কলেজ একটি বড় সম্মান লাভ করে। সেবছর থেকে ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান ক্লাশ খোলা হয়, অর্থাৎ বিজ্ঞান বিষয়ক নতুন নতুন বিষয় পড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এটা ছিলো একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন কেননা, এর মাধ্যমে পূর্ববাংলার তরুণদের মধ্যে আধুনিক যুগের হাতিয়ার, বিজ্ঞান বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা সম্ভব হয়ে ওঠে। বিজ্ঞান ক্লাশগুলো খোলার পর ঢাকা কলেজে ছাত্র ভর্তির হিড়িক পড়ে যায়। একই সঙ্গে এ কলেজের অবকাঠামোগত পরিবর্তনও হয়। এরপরও নানা ঘাতপ্রতিঘাত থাকলেও, ঢাকা কলেজ শিক্ষাক্ষেত্রে তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছিলো, যার সোনালী ফসল ছিলো ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি।
ঢাকা কলেজের কার্জন হল যেভাবে ঢাবির হলোঃ-
------------------------------------------------------------------
১৯০৪ সালের ঢাকা প্রকাশ লিখেছিল"ঢাকা কলেজ নিমতলীতে স্থানান্তরিত হইবে। এই কলেজের সংশ্রবে একটি পাঠাগার নির্মাণের জন্য সুযোগ্য প্রিন্সিপাল ডাক্তার রায় মহাশয় যত্নবান ছিলেন। বড়লাট বাহাদুরের আগমন উপলক্ষে ভাওয়ালের রাজকুমারগণ এ অঞ্চলে লর্ড কার্জন বাহাদুরের নাম চিরস্মরণীয় করিবার নিমিত্তে 'কার্জন হল' নামে একটি সাধারণ পাঠাগার নির্মাণের জন্য দেড় লক্ষ টাকা দান করিয়াছেন।" ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে, ঢাকা কলেজের ক্লাস নেয়া হতে থাকে কার্জন হলে। পরবর্তী সময়ে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে কার্জন হল অন্তর্ভুক্ত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের জন্য, যা আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।
ঢাকা কলেজের ছাত্রাবাস যেভাবে ঢাবির হলোঃ-
----------------------------------------------------------------
পরবর্তীতে সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং-এ নতুন দুটি ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এতে বহু ছাত্র উপকৃত হয়। হোস্টেলের নামকরণ করা হয় সেক্রেটারিয়েট মুসলিম হোস্টেল । এ ছাত্রাবাসের খাবার কক্ষটি (ডাইনিং রুম) ছিলো বিরাটাকার। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে এখানেই বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের একাদশ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।কিন্তু পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ঢাকা কলেজের হিন্দু হোস্টেল রূপান্তরিত হয়ে হয় ঢাকা হল, যা বর্তমান শহীদুল্লাহ হল, এবং সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ের মুসলিম হোস্টেলটি হয়ে যায় মুসলিম হল, যা বর্তমানে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল।
জেনে নেই আরো ইতিহাসঃ-
------------------------------------
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগ থেকেই ঢাকা কলেজ পূর্ববাংলার শিক্ষা প্রসারে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরও ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হতো। ঢাকা কলেজের শিক্ষার মান ঐসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে ভালো ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন ছাত্র সংকটে ভুগছিলো তখন ঢাকা কলেজ কয়েক বছর তাদের স্নাতক শ্রেনীতে ভর্তিও বন্ধ রাখে। যাতে সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড.আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার তার একটি বক্তব্যে বলেছিলেন,“তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার আমন্ত্রণ বাতিল করে ঢাকা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষের অনুরোধে ঢাকা কলেজে যোগদান করেন। কারণ, যেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের মান ভালো ছিলো।
ঢাকা কলেজ ১৮৭৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে এর অধিভুক্তও হয়েছিলো। কিন্তু তারা অবকাঠামো দিকে নজর দেয়নি।
সেসময়ে ঢাকা কলেজের অবস্থান কেমন ছিলো একটি লেখায় দেখা যায়,“১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে দেশে জুনিয়র স্কলারশিপ পরীক্ষার নিয়ম-কানুনে কিছু রদবদল করা হলে স্কলারশিপপ্রাপ্ত ছাত্রসংখ্যা বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, দেশে নতুন নতুন জেলা স্কুল এবং ইঙ্গ-বাংলা স্কুল থেকে ঠিক এসময়ই বেশি সংখ্যক ছাত্র এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করে যারা বৃত্তি নিয়ে ঢাকা কলেজে পড়তে আগ্রহী হয়ে পড়ে।
বৃটিশ আমলের শুরু থেকেই বাংলাদেশের যতো আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছিলো তার সবগুলোতেই ছিলো ঢাকা কলেজের ছাত্র-শিক্ষদের অপরিসীম অবদান। বাংলাদেশ তথা পূর্ববাংলার শিক্ষার প্রসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ৮০ বছর আগ থেকেই ঢাকা কলেজ ভূমিকা রাখছে।
বর্তমানে, ঢাবির অধিভুক্ত কলেজগুলো নিয়ে যে আন্দোলন হচ্ছে সেটায় ঢাকা কলেজকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র সঠিক ইতিহাস না জেনেই ঢাকা কলেজকে নিয়ে কটুক্তি করেছে। যে মানুষ নিজের শিকড় ভুলে যায় সে মানুষ হতে পারে না সে মানুষ নামের কলংক। তার এটা জানা উচিত ছিলো যে ঢাকা কলেজের সাবেক ক্যাম্পাস,ভবন আর হল ব্যবহার করেই আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা কলেজের উপর দাঁড়িয়েই এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সুতরাং, ইতিহাস না জেনে না বুঝে ঢাকা কলেজের নামে কটুক্তি করা তার কতো বড়ো অন্যায়ের কাজ সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
সর্বোপরি, ঢাকা কলেজ আমাদের প্রাণের কলেজ। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের ত্যাগের কারণে আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তাদের অধিভূক্ত থেকে আমাদের সম্মানহানি আর মানবো না।
আমরা এর প্রতিকার চাই। ঢাকা কলেজ ইজ ঢাকা কলেজ। তারা কারো গোলামি করে বাঁচতে চায় না। আমরা আমাদের মতো করে বাঁচতে চাই। ঢাকা কলেজ জিন্দাবাদ।💓
তথ্য সুত্র ঃ উইকিপিডিয়া