দাঁড়িপাল্লা
অর্জন
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই আমাদের মূল ?
হ্যা মানে বাংলাদেশ
জামায়াত কর্মীদের হামলা করলো বিএনপির কর্মীরা, উল্টো নিজেরা পকেট থেকে টাকা বিলিয়ে প্রচার করলো জামায়াতের নামে, কি ঘৃণিত এদের মিথ্যাচার!
[ ক ]
সুখ কী?—এই প্রশ্নটা মানুষের সুপ্রাচীনকালের। সুখের সংজ্ঞা নির্ণয় করতে কতশত রকমের তথ্য আর তত্ত্ব মানুষ যুগে যুগে দাঁড় করিয়েছে তার কোনাে ইয়ত্তা নেই। সুখকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য মানুষ কখনাে আশ্রয় নিয়েছে দর্শনের, কখনাে বিজ্ঞানের। কখনাে সে বস্তুবাদের চাকচিক্যময় বিলাসিতাকেই মনে করেছে সুখের অন্তর্নিহিত রহস্য। আবার কেউ কেউ একান্ত স্রষ্টার মাঝে নিজেকে সঁপে দেওয়ার মধ্যেই খুঁজে নিয়েছে নিজের সুখ। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, সুখ আসলে কী?
আধুনিক বিজ্ঞান যখন তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে, রহস্যাবৃত জিনিসগুলাে যখন মানুষ জেনে নিচ্ছে একের পর এক, যখন শহরগুলাে ভরে উঠছে ইট-পাথরের ইমারতে, যখন বন-জঙ্গল উধাও হয়ে কল-কারখানায় ছেয়ে যাচ্ছে বিরান ভূমি, তখন একদল লােক এসে আমাদের জানাল—সুখ আসলে ভােগে। এই দুনিয়াকে উপভােগ করার মধ্যেই আছে সুখ। যার বাড়ি আছে, গাড়ি আছে, যশ-খ্যাতি আছে, আছে আমােদ-ফুর্তির জন্য বর্ণাঢ্য সকল আয়ােজনের সামথ্য—জগতে সে-ই হলাে সুখী। তারা হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতাে আমাদের এমন পার্থিব সুখের দিকে আহ্বান করতে লাগল। তাদের বাঁশির মধুর সুরে দুলে উঠল আমাদের মন। তারা আমাদের বােঝাতে সক্ষম হলাে যে, এই জীবনটাই শেষ। মৃত্যুই সবকিছুর সমাপ্তি। এরপর আর কিছু নেই, কিছু না। কেবল অন্ধকার আর অন্ধকার। সুতরাং, এই জীবনকে যে যত বেশি উপভােগ করতে পারবে, সে তত বেশি সুখী মানুষ।
আমরা শুনলাম। এরপর সুখী মানুষ হবার জন্য নেমে পড়লাম একটা দুরন্ত প্রতিযােগিতায়। এই প্রতিযােগিতা বড় হবার প্রতিযােগিতা। কাকে ছাড়িয়ে কে বড় হৰ। কাকে ছাপিয়ে কে এগিয়ে যাব। আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারিত হলাে। কাড়ি কাড়ি টাকায় আমাদের ব্যাংক ভরতি থাকতে হবে। আমার নিজস্ব গাড়ি থাকতে হবে, বাড়ি থাকতে হবে। আমাকে জৈবিক সুখ দেওয়ার জন্য একদল সুন্দরী রমণী থাকতে হবে। যশ-খ্যাতি তাে অবশ্যই থাকা চাই। মিডিয়াতে আমি হব ‘টক অব দ্য টাউন, পত্রিকার টক অব দ্য ডে'। আমাকে নিয়ে ফিচার হবে, প্রদর্শনী হবে। আমাকে একনজর দেখার জন্য, আমার একটা অটোগ্রাফের জন্য মানুষ দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকবে, তবেই-না আমি সুখী মানুষ!
কর্পোরেট দুনিয়ায় খ্যাতিই সবকিছু। যার খ্যাতি নেই, সে সুখী নয়। সুখী হতে হলে তাকে খ্যাতি অর্জন করতে হবে। কিছুদিন আগে একটা গুঞ্জন চাউর হয়েছিল জোরেশােরেই। হলিউডের এক অভিনেত্রী তার যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সােচ্চার হয়। অভিনয় জগতে খ্যাতির জন্য তাকে পর্দার পেছনের এবং সামনের পুরুষদের বিছানায় সঙ্গ দিতে হয়েছে। হতে হয়েছে অনেকগুলাে পুরুষের উপভােগের বস্তু। খ্যাতির তাড়না আর মােহে অন্ধ এই অভিনেত্রী হ্যামিলনের সেই বংশীবাদকদের সুরে নিজেকে একাত্ম করে রেখেছিল। ভেবেছিল, এতেই বুঝি সুখ। এতেই বুঝি জীবনের সকল প্রাপ্তি। সেই প্রাপ্তি আর সুখলাভের আশায় বিলিয়েছে নিজের সর্বস্ব। হয়েছে পুরুষদের বিছানার সামগ্রী। যখন তার হুঁশ ফিরল, যখন বুঝতে পারল যে, এটা আসলে সুখ নয়, মরীচিকা—তখন সে সােচ্চার হলাে, প্রতিবাদ জানাল। টুইটারে লিখল If you've been sexually harassed or assaulted, write 'me too' as a reply to this tweet'. 6211 গেল, এই টুইটের প্রতিউত্তরে হাজার হাজার টুইট আসতে লাগল। স্বপ্নিল বলিউড আর হলিউডের হাজার হাজার অভিনেত্রী সেই টুইটের সাথে একাত্মতা ঘােষণা করে ‘Me To0' লিখে প্রতিবাদ জানাল। অর্থাৎ তারাও তাদের সেই সুখের দুনিয়ায় কোনাে-না-কোনভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার। যেই খ্যাতি আর সুখের জন্য মেয়েগুলাে নিজেদের ডুবিয়ে রেখেছিল পার্থিবতা লাভের মধ্যে, সেই সুখ অর্জন করতে গিয়ে নিজেকে বিকিয়ে বসা সেই অভিনেত্রীরা বুঝেছিল, চোখ ধাঁধানাে এই কর্পোরেট দুনিয়া আসলে আস্ত একখণ্ড নরক।
[ খ ]
মিডিয়া আমাদের সামনে যাদেরকে সুখী হিশেবে উপস্থাপন করে, মাঝে মাঝে আমরা তাদের কিছু করুণ পরিণতির গল্প শুনি। লিনকিন পার্কের সেই বিখ্যাত গায়কের কথা মনে আছে? অসম্ভব খ্যাতিতে রাঙানাে ছিল যার ক্যারিয়ার। কী পায়নি লােকটা জীবনে? টাকা, গ্ল্যামার, চাকচিক্যময় জীবন! সবকিছু! তবু কেন তাকে আত্মহত্যা করতে হলাে? এই তাে সেদিন শুনলাম পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত কমেডি শাে ‘মিরাক্কেল'-এর সঞ্চালক মীর আত্মহত্যা করতে চেয়েছেন। একবার কিংবা দুবার নয়, এই পর্যন্ত চার-চারবার নাকি আত্মহননের পথে পা বাড়িয়েছিলেন মীর। কী অদ্ভুত, তাই না? বস্তুবাদী দুনিয়া আমাদের যা দিয়ে সুখী করতে চায়, যা লাভে সুখী হতে বলে তার সবটাই তাে এদের আছে। তবু এরা কেন যেন সুখী নয়। এদের জীবনের কোথাও যেন অসুখী হবার ভীষণ অসুখ।
কয়েকদিন আগে বলিউডের এক উঠতি নায়িকার ঘটনায় মুখর ছিল সােশ্যাল মিডিয়া। অভিনয় জীবনের শুরুতেই তাক লাগিয়ে দেওয়া এই নায়িকা জানিয়েছেন তিনি ভালাে নেই। তার খ্যাতি, বিত্ত-বৈভব কিংবা কর্পোরেট মুগ্ধতার কোনাে অভাব নেই। তবু কোথাও যেন তিনি শান্তি খুঁজে পাচ্ছেন না। সবকিছু থেকেও তার মনে হয় যেন কোথাও আসলে কিছু নেই।
লিনকিন পার্কের সেই গায়ক, মীরাক্কেলের মীর কিংবা নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে খ্যাতি লাভ করা সেই নায়িকা—তারা কি আদৌ সুখী? আদৌ কি তারা তৃপ্ত? সন্তুষ্ট? আদতে সুখের মূল হচ্ছে সন্তুষ্টি। পরিতৃপ্তি। আপনি যখন কোনাে কিছু পেয়ে সন্তুষ্ট হবেন না, তৃপ্ত হবেন না, তখন আপনার মধ্যে একধরনের অস্থিরতা কাজ করবে। যা পেয়েছেন তারচেয়ে বেশি কীভাবে অর্জন করা যায়—সেই নেশা আপনাকে সর্বদা তাড়িয়ে বেড়াবে। আপনি ঘুমের মধ্যেও অস্থির থাকবেন। ঘুম ভাঙলেই আপনার খ্যাতি আর অর্জনের পেছনে দৌড়াতে মন চাইবে। সুখ তাহলে কোথায়?
খালি টাকা আর খ্যাতিই যদি সুখের নিয়ামক হতাে, ফেইসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ হতাে পৃথিবীর সেরা পাঁচজন সুখী মানুষের একজন। সবচেয়ে কম বয়সে বিলিওনিয়ার বনে যাওয়া মার্ক জাকারবার্গ কি আসলেই সুখী? তার রয়েছে অসম্ভব রকম খ্যাতি আর বিত্ত। তবে তাতেই যে সে সন্তুষ্ট তা কিন্তু নয়। অন্য আর দশজনের মতাে বেশি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা জেঁকে বসে আছে তার হৃদয়-মনেও। এই আরও অর্জন, আরও পাওয়ার জন্য যা করা দরকার এই ধরনের লােকগুলাে তার সবটাই করতে পারে। জাকারবার্গও করে। এই তাে সেদিন জাকারবার্গকে মার্কিন আদালতের মুখােমুখি হতে হলাে। তার বিরুদ্ধে অভিযােগ উঠেছে সে নাকি আমেরিকার গত নির্বাচনের সময় মার্কিন ইউজারদের তথ্য ফাঁস করেছে কোনাে থার্ড পার্টির কাছে। এই কাজটার জন্য সে নিশ্চয়ই বিশাল অঙ্কের বান্ডেল পেয়েছে। কিন্তু, দিনশেষে কী মিলল ভাগ্যে? ভৎর্সনা! আর মুখােমুখি হতে হচ্ছে বিচারের। এই যে লােভ, এই যে আরও পাওয়া, আরও বড় হওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযােগিতা, এটা মানুষকে নৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। সে যখন লােভ আর লালসার মধ্যে ডুবে যায়, ভালােমন্দের তফাৎ নির্ণয় করা তার পক্ষে আর সহজ হয় না।
[ গ ]
কর্পোরেট দুনিয়ার কথিত সুখের পেছনে ছুটতে গিয়ে হতােদ্যম হয়ে যাওয়া মানুষের এ রকম আরও অনেক গল্প আছে। এই গল্পগুলাে থেকে শেখার বিষয় হলাে এই—সুখ আসলে শারীরিক নয়, আত্মিক। আত্মার পরিতৃপ্তিই হলাে সুখের কারণ। আমাদের আত্মা যদি প্রশান্ত না হয়, আমাদের আত্মার যে খােরাক তা যদি আমরা লাভ করতে পারি, তাহলে আমাদের সুখী হওয়াটা একটা নিছক অভিনয় মাত্র। সুখ নয়।
সুখের ব্যাপারে কুরআনের আলাদা ভাষ্য রয়েছে। কুরআন সুখকে অর্থ, বিত্ত কিংবা দুনিয়ার চাকচিক্য দ্বারা সংজ্ঞায়িত করেনি; বরং কুরআন সুখ বলতে বুঝিয়েছে আল্লাহর নিকট নিজেকে একান্ত সঁপে দেওয়াকে। সুখ মানে হলাে অন্তরের প্রশান্তি। অন্তরের স্থিরতা। অন্তর যখন প্রশান্ত, প্রফুল্ল থাকে, তখন একজন মানুষ সুখী হয়। যদি অন্তর বিষাদগ্রস্ত থাকে, অন্তরে যদি ভর করে দুখের কালাে মেঘ, তাহলে একজন মানুষের জীবনটা দুঃখ, কষ্ট আর হতাশায় পর্যবসিত হয়। আরবিতে ‘সাকিনা মানে হলাে অন্তরের প্রশান্তি। কুরআনের যত জায়গায় এই ‘সাকিনা’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, সবখানে আমরা ভয়াবহ বিপদ, দুর্যোগ কিংবা দুর্ভোগের ঘনঘটা দেখতে পাই। তবে, সাথে সাথে দেখতে পাই আল্লাহর ওপর ভরসা, তার কাছে নিবেদিত, সমর্পিত কিছু আনুগত্যের নিদর্শন। কুরআন বুঝিয়েছে এটাই সুখ। কুরআনের ভাষায় এটাই অন্তরের প্রশান্তি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের কাহিনিটার কথাই চিন্তা করা যাক। কী এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিন ছিল সেটা! কুরাইশদের অকথ্য, নির্মম, অবর্ণনীয় নির্যাতন থেকে বাঁচতে মক্কা ছেড়ে তিনি যখন মদিনায় যাচ্ছিলেন, তখন তার সাথি ছিল কেবল আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু। পেছনে তাড়া করছে একদল কুরাইশ বাহিনী। হাঁটতে হাঁটতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু একটা গুহার মধ্যে আশ্রয় নিলেন। ওদিকে, কুরাইশ বাহিনীও একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে। তারা এতটাই নিকটবর্তী হয়ে গিয়েছিল যে, কোনাে কুরাইশ সৈন্য যদি নিজের পায়ের দিকে তাকাত, তাহলেই নবিজি সাল্লয়াললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ধরা পড়ে যেতেন। অবস্থা এমন বেগতিক দেখে ঘাবড়ে গেলেন নবিজির সাথি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু। তাকে চিন্তিত দেখে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, চিন্তা করাে না। আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন!
শত্ৰু একেবারে নাকের ডগায়। একটু এদিক-সেদিক হলে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা শতভাগ। আর ধরা পড়লেই নিশ্চিত মৃত্যু। এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু যেখানে অস্থির-অশান্ত, সেখানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরম নির্ভরতায় বললেন, ‘চিন্তা করাে না। আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন! আল্লাহর ওপর এই যে নির্ভরতা, এই যে তাওয়াক্কুল, কুরআন এটাকেই ‘সুখ’, এটাকেই ‘অন্তরের প্রশান্তি হিশেবে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুরআনে বলেছেন-
إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لاَ تَحْزَنْ إِنَّ اللّهَ مَعَنَا فَأَنزَلَ اللّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ
যখন তারা উভয়ে পাহাড়ের একটি গুহায় অবস্থান করছিল, সে তার সঙ্গীকে বলল, তুমি চিন্তা করাে না। আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন! অতঃপর আল্লাহ তার অন্তরে প্রশান্তি দান করলেন।[1]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর ওপর ভরসা করেছেন, আর আল্লাহ তার হৃদয়ে ঢেলে দিয়েছেন প্রশান্তির ফল্গধারা। সেই প্রশান্তির সামনে দুনিয়ার যেকোনাে বিপদ নস্যি, তুচ্ছ। জীবনের এই যে দুঃসময়, দুর্যোগ আর দুর্ভোগের মুহূর্ত, এই মুহূর্তগুলােতে আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার মাঝেই রয়েছে পরিপূর্ণ তৃপ্তি। সুখ। প্রশান্তি। আজকাল মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি ছেড়ে এমন সব বিষয়ে সুখের সন্ধানে ব্যস্ত, যেখানে আদতে মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই নেই।
[1] সুরা তাওবা, আয়াত : ৪০
[ ঘ ]
সুখ কীসে—এই প্রশ্নটা মানব-ইতিহাসের আদিমতম প্রশ্নগুলাের একটা। মানুষ তার অস্তিত্বের শুরু থেকেই এই প্রশ্নের পেছনে ছুটে চলেছে নিরন্তর। বহু বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সমাজবিদ এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং করছেন। কিন্তু, সবাই ঘুরে ফিরে আমাদের সেই বস্তুবাদী দুনিয়ার দিকেই ডেকে চলেন নিরন্তর। বস্তুবাদী দুনিয়াই যদি সুখের আঁকড়া হবে, কেন আমরা সেই দুনিয়ার করুণ আর্তচিৎকার শুনি প্রতিনিয়ত? কেন সেই দুনিয়া থেকে চাপা কান্নার স্বর আমাদের কানে এসে বাজে? কেন সেই দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষগুলাে বেছে নেয় আত্মহননের পথ?
আগেই বলেছি, বস্তুবাদী দুনিয়ার চোখ ধাঁধানাে এসব আয়ােজনে সুখ নেই। এগুলাে নিজের আত্মার সাথে প্রবঞ্চনা বৈ কিছু না। সুখের নাম করে নেহাত মরীচিকার পেছনে দৌড়ানাে। সুখ আসলে কোথায়—এই প্রশ্নের সবচেয়ে স্পষ্ট, সবচেয়ে যৌক্তিক উত্তরটা এসেছে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে। তিনি বলেছেন—
মানুষের শরীরে এমন একটি মাংসপিণ্ড আছে যেটা সুস্থ থাকলে মানুষের সারা শরীর সুস্থ থাকে। আবার যেটা অসুস্থ হলে মানুষের সারা শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর তা হলাে অন্তর। [1]
কোন সেই মাংসপিণ্ড? সেটা হলাে অন্তর। অন্তর যদি সুস্থ থাকে, সতেজ থাকে, তাতে যদি ভর না করে কোনাে আত্মপ্রবঞ্চনা, তাহলে সেই মানুষটা সুখী। আবার যার হৃদয় আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত, সে যতই সুখী হওয়ার ভান করুক, সেটা দিনশেষে স্রেফ অভিনয়।
বিখ্যাত “Yes! Magazine একবার সুখী হওয়ার কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক উপায় নিয়ে ফিচার করেছিল। সুখী হওয়ার জন্য তারা যে কয়েকটা উল্লেখযােগ্য কারণ চিহ্নিত করেছিল তার মধ্যে একটা হলাে—তুলনা এড়িয়ে চলা। অর্থাৎ একজন দিনদিন ধনী থেকে ধনী হচ্ছে বলেই যে আমাকেও ধনী হতে হবে, এ রকম মানসিকতা এড়িয়ে চলা। বরঞ্চ নিজেকে নিয়ে, নিজের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা।
কুরআনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব যে, আমাদের রব ঠিক সেই পথই বাতলে দিয়েছেন যা আজকের দার্শনিকেরা সুখী হওয়ার জন্য নিয়ামক বানাচ্ছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন—
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى
কখনােই সে-সমস্ত বস্তুর দিকে তাকাবেন না, যা আমি তাদের (দুনিয়াপূজারীদের) উপভােগের জন্য দিয়েছি। এসব দিয়ে আমি তাদের পরীক্ষা করি। বস্তুত, আপনার প্রতিপালকের দেওয়া রিযিকই হলাে সবচেয়ে উত্তম ও সবচেয়ে বেশি স্থায়ী [1]
আজকের দুনিয়ায় অসুখী হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত এই দুনিয়াপূজাই। মানুষ সম্পদের মােহে বিভাের। তার প্রতিবেশী দিনের পর দিন সম্পদের পাহাড় বানাচ্ছে বলে তাকেও যেভাবে তােক সম্পদশালী হতে হবে। তার কলিগের টয়ােটা ব্র্যান্ডের গাড়ি আছে বলে তারও একটা টয়ােটা ব্রান্ডের গাড়ি থাকতে হবে। তার বন্ধু Iphone 11 চালায় বলে তাকেও Iphone 11 ব্যবহার করতে হবে। এই যে অসুস্থ প্রতিযােগিতা, এই প্রতিযােগিতা মানুষকে আল্লাহর রাস্তা থেকে বিচ্যুত করে দেয়। আমরা ছিটকে পড়ি সত্যিকার সুখের রাস্তা থেকে, যে রাস্তায় আমাদের দেহ-মন প্রশান্তি লাভ করে। এজন্যেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের তুলনা এড়িয়ে চলতে বলেছেন। যারা দুনিয়াপূজায় মত্ত হয়ে আছে, তাদের দিকে ফিরে তাকাতে নিষেধ করেছেন এবং এও বলেছেন, কেবল তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা রিযিক হিশেবে আমাদের দান করেছেন।
সুখী হবার জন্য Yes! Magazine-এর পরের উপায় হলাে— Smile, even when you don't feel like it.' অর্থাৎ হাসুন, এমনকি যখন দুঃখ ভর করে মনে, তখনাে। যারা হাসতে পারে, তাদের প্রচণ্ড আশাবাদী মানুষ হিশেবে দেখা হয়। তাদের মনের মধ্যে সবসময় একটা আশার আলাে জ্বলজ্বল করে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
কোনাে ভালাে কাজকেই ছােট মনে করাে না, এমনকি যদি সেটা তােমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলাও হয়।
জারির ইবনু আব্দিল্লাহ আল-বাজালি রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, যেদিন থেকে আমি ইসলামে দাখিল হই, সেদিন থেকে এমন কোনােদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়নি যখন তার মুখে হাসি ছিল না! [3]
হকোণে যদি আশা না থাকে, যদি মানুষের পরম একটা ভরসার স্থল, নির্ভরতার কেন্দ্র না থাকে, তাহলে সে মানুষ প্রচণ্ড হতাশায় ডুবে যাবে। আমরা যদি জীবনের প্রতিকূলতার কথা চিন্তা করি, তাহলে নবিজির জীবনই আমাদের সামনে সবচাইতে বড় উদাহরুণ। মানবজীবনে এমন কোনাে বিপদ নেই, এমন কোনাে দুর্যোগ নেই যা নবিজি সালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে নেমে আসেনি। তদুপরি তিনি সর্বদা আশাবাদী মানুষ ছিলেন। তিনি কখনােই হতাশ হননি। তার জীবন ছিল হাসিখুশি, কর্মচঞ্চল।
Yes! Magazine-এর সেই ফিচারে সুখী হবার উপায় হিশেবে আরও বলা ছিল- কৃতজ্ঞ হওয়া, দান করা, এমনকি টাকার পেছনে হন্যে হয়ে না ছোেটাকেও তারা সুখী হওয়ার নিয়ামক হিশেবে উল্লেখ করেছিল। তারা বলেছিল, ‘Put money low on your list of properties ।'
ইসলামে কৃতজ্ঞ হওয়ার ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। একজন মুমিনের পুরাে জীবনটাই কৃতজ্ঞতার বাঁধনে বাঁধা। সে হাঁচি দিলে বলে—আল-হামদু লিল্লাহ' অর্থাৎ ‘সমত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার। আবার যখন সে জীবনে কোনাে কিছু অর্জন করে, তখনাে বলে ‘আল-হামদু লিল্লাহ। যেকোনাে মুহূর্তে, যেকোনো পরিস্থিতিতে, হােক সুখের কিবা দুখের—একজন মুমিন সর্বদা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। এজন্যই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, ‘মুমিনের ব্যাপারটাই আশ্চর্যের। তার সকল বিষয়ই কল্যাণকর! সে যখন সুখে থাকে, তখন সে তার রবের প্রতি কৃতজ্ঞ হয় এবং এটা তার জন্য উত্তম। আবার, সে যখন কঠিন দুখকষ্টের ভেতর দিয়ে যায়, তখন সে সবর করে এবং রবের কৃতজ্ঞতা জানায়। এটাও তার জন্য উত্তম। [1]
মুমিনের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র তার রবের কৃতজ্ঞতায় ভরা। আখিরাতের অনন্ত জীবনের সুখের জন্য দুনিয়ার জীবনে মহান আল্লাহ তাআলার আনুগত্য, তার সন্তুষ্টি এবং সন্তোষের পথে হাঁটতে পারাটাই সত্যিকারের সুখ। হ্যামিলনের বংশীবাদকেরা আমাদের যে অদ্ভুত সুরে সুখের পথে ডাকে, সেই পথে আছে কেবল ধোঁকা আর প্রতারণা। কর্পোরেট দুনিয়ার রঙিন চশমা পরে চোখের সামনে দিয়ে তরতর করে আকাশ ছুঁতে থাকা ইট-পাথরের কোঠরে সুখ নেই। সুখ নেই বস্তুবাদী মহলের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত ‘বড় হওয়া’ আর ‘নাম কুড়ানাের মাঝে। এসব নিছকই চোরাবালি। খাদের কিনারায় পা ফসকালে যেমন তলিয়ে যেতে হয় অতল গহ্বরে, এই দুনিয়া ঠিক তেমনই। পা ফসকালেই বিপদ। কুরআনের ভাষায়—
مَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلاَّ لَعِبٌ وَلَهْوٌ
এই দুনিয়ার জীবন নিছক খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।[2]
আপনার রব জানাচ্ছেন এই দুনিয়া হলাে নিছক খেল-তামাশার ক্ষেত্র। একটা ধোঁয়াশা। একটা কূপ। একটা ফাঁদ। এখানে যা সুখ বলে ধরা হয় তা আসলে মরীচিকা। সুখ তাে নিহিত আছে স্রষ্টার আনুগত্যে। এই কঠিন এবং অপ্রিয় সত্য যারা বুঝেছে, তারাই পেয়েছে সত্যিকার সুখের সন্ধান। সুখ তাে কৃতজ্ঞতার অশ্রুতে। সুখ আছে আনুগত্যে মাথা নােয়ানােতে। সুখ আছে বান্দার নিরীহ আকুল ফরিয়াদে।
[ ক ]
‘মানুষ’ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হলাে ‘নাস। প্রসিদ্ধ মতানুসারে শব্দটি ‘নিসইয়ান’(৩) ধাতুমূল থেকে আগত—যার অর্থ ভুলে যাওয়া। আমরা সঠিক পথ ভুলে যাব, বিস্মৃত হব, বিচ্যুত হব বলেই আমাদের নাম নাস তথা মানুষ। সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকেই এই ধারা চলে আসছে। জান্নাতে আমাদের পিতা আদম আলাইহিস সালাম এবং মাতা হাওয়া আলাইহাস সালামও নিজেদের কৃত ওয়াদা থেকে খানিক সময়ের জন্য বিস্মৃত হয়েছিলেন। ভুল করে তারা সেই গাছের ফল ভক্ষণ করে ফেলেছিলেন যা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তাই ‘ভুল করা আমাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য।
আমরা ভুল করব জেনেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দুটো গুণবাচক নাম গাফুর ও রাহীম। ক্ষমাশীল ও অত্যন্ত দয়ালু। এই বিশ্বচরাচরে তার মতন ক্ষমার অধিকারী দ্বিতীয় আর কেউই নেই। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সকল আদম সন্তানই গুনাহগার। তবে তাদের মধ্যে উত্তম সে, যে তাওবা করে।
আরেকটি হাদিস থেকে জানা যায়, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ! তােমরা যদি গুনাহ না করতে, তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তোমাদের জায়গায় এমন এক এত সৃষ্টি করতেন যারা গুনাহ করত এবং তাঁর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করত। ফলে আল্লাহ ও তাদের ক্ষমা করতেন। [১]
যে বান্দা ভুল করে, যে বান্দা আগাগােড়া পাপে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, তার জন্যও তিনি রহমতের দরজা বন্ধ করে দেন না। কোনাে গুনাহগার বান্দার জন্য তিনি বাতাসের অক্সিজেন থামিয়ে দেন না, আকাশের বৃষ্টি থামিয়ে দেন না, থামিয়ে দেন না সূর্যের আলাে, মেঘ, রাতের জোছনা। বান্দা অনবরত ভুল করে আর তিনি অবিরত সুযােগ দিয়ে যান। অপেক্ষায় থাকেন বান্দার রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের। কখন বান্দা নিজের কৃত ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইবে, কখন সে তাওবা করে পাপের দরিয়া থেকে উঠে আসবে, কখন সে তার রবের নির্দেশিত পথের দিকে যাত্রা করবে।
আমরা মনে করি, যে কঠিন কঠিন পাপ আমরা করে বসেছি তার হয়তাে-বা কোনাে ক্ষমা হতে পারে না। আমাদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, আমাদের কৃত পাপের হয়তাে-বা কোনাে ক্ষমা নেই। অথচ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিয়ম কিন্তু এটা নয়। তিনি ক্ষমার পসরা নিয়ে আছেন বান্দাদের গুনাহগুলাে ক্ষমা করার জন্য। তিনি বলছেন-
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
হে আমার বান্দাগণ, তােমরা যারা নিজেদের ওপর যুলুম করে বসেছ, তােমরা আল্লাহর রহমত থেকে কখনােই নিরাশ হয়াে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি ক্ষমাশীল এবং পরম দয়ালু২]
এই যে এই আয়াতটা, মনে হচ্ছে এই আয়াত যেন আমার জন্যই নাযিল করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যেন আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলছেন, হে আমার বান্দা! সেদিন রাতের অন্ধকারে তুমি অমুক অমুক পাপে লিপ্ত ছিলে। স্মরণ করাে তােমার সালাত কাযা করার দিনগুলাে। মনে করার চেষ্টা করাে ইন্টারনেটের অন্ধকার গলিতে দিন মসজিদমুখী হওনি? তুমি নিজের ওপর, নিজের আত্মার ওপর যুলুম করেছ। ডুব দেওয়ার মুহূর্তগুলােকে। ভুলে গেছ সেই দিনগুলাের কথা, যখন তুমি দিনের পর হিমালয়-সমান পাপের বােঝা নিয়ে আজ তুমি আমার সামনে উপস্থিত। তুমি কি ভাবছাে আজ আমি তােমাকে ফিরিয়ে দেবাে? তুমি কি ভাবছাে আজ আমি তােমাকে তিরস্কার করব? তুমি কি ধরে নিচ্ছ আজ আমি তােমার দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নেব? আমার বান্দা, তুমি ভুল ভাবছ! তুমি নিজের ওপর যত যুলুম, যত অত্যাচারই করাে কেন, আমি সর্বদা তােমাকে ক্ষমা করে দেবাে। তুমি কখনােই আমার রহমত থেকে নিরাশ হয়াে না। ভেবাে না যে আমি তােমাকে ক্ষমা করব না, তােমার ডাক শুনব , তােমার আহ্বানে সাড়া দেবাে না। কক্ষনাে এমনটি ভাববে না। তােমার কৃত পাপ কখনােই আমার ক্ষমার চাইতে বড় নয়। তুমি কেবল আমার দিকে ফিরে এসাে। আমার দিকে ঝুঁকে পড়াে। হাত তুলে আমাকে বলাে তােমাকে ক্ষমা করার জন্য। দু-ফোঁটা অশ্রুর বিনিময়ে আমার কাছে চাও। আমি অবশ্যই তােমার ডাকে সাড়া দেবাে।
আমাদের পাপসমূহ মাফ করার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যে আয়ােজন সাজিয়েছেন, সেই আয়ােজন সম্পর্কে জানি না বলেই আমরা তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে পড়ি। আমরা যদি জানতাম যে, ক্ষমালাভের জন্য আমাদের অন্তরের একটু ব্যাকুলতা, হৃদয়ের খানিক আকুলতাকে আল্লাহ কীভাবে মূল্যায়ন করেন, তাহলে আমরা কখনােই হতাশ হতাম না।
একদিন সাহাবিদের কাছে, পূর্বযুগের এক লােকের কথা বলেছিলেন নবিজি। লােকটা ছিল অত্যন্ত সম্পদশালী। তার বিশাল সম্পদের ভান্ডার থেকে সে কোনােদিন আল্লাহর রাস্তায় এক কানাকড়িও খরচ করেনি। উপরন্তু, আল্লাহর ইবাদত থেকেও নিজেকে সে গুটিয়ে রেখেছিল। যখন সে মৃত্যুশয্যায় উপনীত হলাে, যখন জীবনের সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছাল সে, তার মনে আল্লাহর ভয় এসে চেপে বসল। সে তার ধনসম্পদের কথা মনে করল। সম্পদের এই পাহাড় থেকে কোনােদিন একটা পয়সা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার তাড়না সে অনুভব করেনি। নিজের জীবনের এতগুলাে সময় থেকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য বরাদ্দ রাখেনি কোনাে মুহূর্ত। জীবনকে উপভােগ করেছে খেয়ালখুশিমতাে। মৃত্যু শিয়রে এসে দাঁড়াতেই আজ তার এত ভয়, এত শঙ্কা!
লােকটা তার সন্তানদের ডেকে বলল, “বাবারা, বলাে দেখি পিতা হিশেবে আমি কেমন ছিলাম?
তারা বলল, ভালাে।
আল্লাহর সামনে হাজির হওয়ার জন্য যার ঝুলিতে কিছুই নেই, সে আবার ভালাে হতে পারে কীভাবে? তার জন্য তাে ধ্বংস ছাড়া আর কোনাে পথ খােলা নেই।
ছেলেরা নিশ্চপ হয়ে থাকল। লােকটা আবার বলল, “তােমরা এক কাজ করবে। আমি মারা গেলে আমাকে কবর দিয়াে না, বরং আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলাে। এরপর সে ছাইয়ের কিছু অংশ বাতাসে উড়িয়ে দেবে এবং কিছু অংশ সমুদ্রে ভাসিয়ে দেবে।
ছেলেরা বুঝতে পারল না, তাদের পিতা এমন কথা কেনই-বা বলছেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে কি তার ভীমরতি হয়েছে? কিন্তু লােকটা তার সংকল্পে অটল। সন্তানদের এই ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাও করাল। তারা রাজি হলাে এবং লােকটার মৃত্যুর পর সন্তানেরা তাকে পুড়িয়ে সেই ছাই বাতাসে ও সমুদ্রে ভাসিয়ে দিল।
নবিজির ভাষ্য থেকে জানা যায়, কিয়ামতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বাতাস ও সমুদ্রকে বলবেন তাদের কাছে এই লােকের যা যা অংশ আছে তা বের করে দিতে। বাতাস ও সমুদ্র তা বের করে দেবে। লােকটাকে আল্লাহ ওঠাবেন। বলবেন, কেন তুমি এই কাজের নির্দেশ দিয়েছিলে সেদিন?
লােকটা বলবে, আপনার ভয়ে। আমার মনে হয়েছিল, আমার গুনাহের কারণে আপনি আমাকে কখনােই ক্ষমা করবেন না। আমি ভেবেছি, এভাবে নিজেকে ছাই করে ফেললে, বােধকরি, আপনার শাস্তি থেকে বেঁচে যাব।
এই কথা শুনে আল্লাহ বলবেন, যাও, আমি তােমায় ক্ষমা করে দিলাম।[১]
আল্লাহর ক্ষমার পরিধিটা এতই বিশাল! কেবল একটু অনুশােচনা, একটু আন্তরিকতা, হৃদয়কোণে একটু ভয়ের কারণে মুহুর্তেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এ রকম একজন পাপীকেও ক্ষমা করে দেন। অথচ আমরা ভাবছি, আমাদের গুনাহগুলাে হয়তাে ক্ষমা করা হবে না।
গুনাহ করার পরে ভুল বুঝতে পেরে আমরা যখন তাওবা করি, তখন আল্লাহর চাইতে বেশি খুশি আর কেউ হয় না। নবি কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া উট পুনরায় ফিরে পেয়ে উটের মালিক যতটা। খুশি হয়, বান্দা গুনাহের পরে তাওবা করে ফিরে এলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া। তাআলা তার চাইতে বেশি খুশি হন।[1]
ভাবুন তাে! খাঁখাঁ মরুভূমি। দৃষ্টিসীমানায় নেই কোনাে জনবসতির চিহ্ন। যেদিকে দুচোখ যায় কেবল বালি আর বালি। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। এমনই এক পরিবেশে আপনি আপনার সাথে থাকা উটটা হারিয়ে বসেছেন। নিশ্চিত মৃত্যু ব্যতীত আপনার জন্য দ্বিতীয় আর কোনাে পথ খােলা নেই! কারণ, পায়ে হেঁটে এই মরুভূমিপ্রান্তর পার হওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। এই তপ্ত মরুভূমিতে ক্ষুধা, তৃয়া আর অনাহারে আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়বে আপনার শরীর। নিদারুণ পিপাসায় কাতর হয়ে পড়বেন আপনি। ধীরে ধীরে ঢলে পড়বেন মৃত্যুর কোলে। এমন অবস্থায়, যদি চোখের পলকে হারিয়ে যাওয়া উট আপনার কাছে ফিরে আসে, আপনার চেয়ে সুখী জগতে তখন আর কে হতে পারে?
আমরা যখন পাপ করে আল্লাহর কাছে আন্তরিক তাওবা করি, মাফ চাই, চোখের জল ফেলে করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করি, আল্লাহ ওই হারিয়ে যাওয়া উট ফিরে পাওয়া ব্যক্তির চাইতেও বেশি খুশি হন। নবিজির হাদিস থেকে জানা যায়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন, ‘আদম সন্তান! যদি তুমি আমাকে স্মরণ করাে এবং আমার থেকে আশা করাে, তাহলে তােমার কৃতকর্মগুলাে (গুনাহ) আমি অবশ্যই ক্ষমা করে দেবাে। ওহে আদম সন্তান! তােমার গুনাহের পরিমাণ যদি আকাশের মেঘমালাও ছোঁয় এবং এরপর তুমি আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করাে, আমি অবশ্যই তােমাকে ক্ষমা করে দেবাে। আদম সন্তান! আমার সাথে কাউকে শরিক করা ব্যতীত পৃথিবী-পরিমাণ গুনাহের বােঝা নিয়েও যদি আমার সামনে দাঁড়াও, আমি অবশ্যই তােমাকে ক্ষমা করে দেবাে।[২]
এই কথাগুলাের চাইতে উত্তম ভরসার বাণী আমাদের জন্য আর কী হতে পারে? এর চাইতে বেশি স্বস্তিদায়ক আর কারও কথা হতে পারে কি? পাপের অতল সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার পরেও যদি হৃদয়ের কোথাও জিইয়ে রাখি এক টুকরাে বিশ্বাস, যদি হৃদয়গহীনে সুপ্ত রাখি রাহমানের ওপর একটু ভরসা, একটু আস্থা এবং একদিন যদি ইয়ে রাখা সেই বিশ্বাস, সেই সুপ্ত ভরসাতে ভর করে আমরা সত্যি সত্যিই তার সামনে নত হয়ে দাঁড়াই, যদি জীবনের সব ভুল, সব অপরাধ, সব অবাধ্যতার জন্য। তাঁর কাছে অশ্রুসিক্ত নয়নে, অনুনয় ভরা বদনে, কাতর হৃদয়ে ক্ষমা চাইতে পারি, তিনি আশ্বাস দিচ্ছেন, তিনি ভরসা দিচ্ছেন, তিনি ওয়াদা করছেন—তিনি আমাদের সকল পাপ, সকল গুনাহ, সকল অপরাধ, অবাধ্যতা, ভুলভ্রান্তি মাফ করে দেবেন। আমাদের পাপ যদি আকাশের মেঘমালাও স্পর্শ করে, যদি আমাদের অবাধ্যতার পরিমাণ পৃথিবীতেও সংকুলান না হয়, তবু ভয় নেই। আরশের মালিক তবুও আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। আমাদের ঢেকে দেবেন তাঁর পরম মমতার চাদরে।
[ খ ]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আবু তালিবের কথা মনে আছে? সেই ব্যক্তি যার ঘরে নবিজি পার করেছিলেন শৈশব, কৈশাের এবং যৌবনেরও অর্ধেক সময়। আবু তালিব সেই ব্যক্তি যিনি ছিলেন নবিজির একজন পরম অভিভাবক। একজন সত্যিকার শুভাকাঙ্ক্ষী। মক্কার মুশরিকদের পক্ষ থেকে নবিজির ওপরে যখনই কোনাে বিপদ এসেছে, সেই বিপদের সামনে সবার আগে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন আবু তালিব। নবিজির শৈশবে আবু তালিব ছিলেন একজন পিতার মতন দয়া। কৈশােরে নবিজির মাথার ওপরে ছিলেন একটি বটবৃক্ষের ছায়ার মতন। আর যৌবনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নবিজির একজন সত্যিকার অভিভাবক।
আবু তালিব নবিজিকে কখনােই ভ্রাতুস্পুত্র জ্ঞান করেননি। কখনাে নিজের সন্তান থেকে আলাদা চোখে দেখেননি। বাবা-মা এবং দাদাকে হারানাের পর আবু তালিবের হাতেই তাে নবিজির বেড়ে ওঠা। সেই আবু তালিবের জন্য নবিজির হৃদয়েও ভালােবাসার কোনাে কমতি ছিল না। কিন্তু খুবই দুঃখজনক ব্যাপার হলাে, যে চাচার হাতে নবিজির অর্ধেক জীবন অতিবাহিত হয়ে গেল, যার ছায়া মাথায় নিয়ে নবিজি পথ চলছিলেন, যার গৃহে নবিজি পেয়েছিলেন থাকার স্থান, যার কাঁধে নবিজি লাভ করেছিলেন পিতৃসম স্নেহ–সেই আবু তালিব কিনা পান করতে পারেননি ইসলামের অমৃত সুধা! ইসলামের ঝান্ডাধারী নবিকে যিনি জীবন দিয়ে আগলে রেখেছিলেন, সেই আবু তালিবই কিনা শেষ পর্যন্ত মুশরিক থেকে গেলেন। তিনি জানতেন তার প্রাতুস্পুত্র আল্লাহর প্রেরিত নবি। তিনি জানতেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া। সাল্লাম সাধারণ কোনাে মানুষ নন, একজন নবি। আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য। আসা একজন বার্তাবাহক। তথাপি আবু তালিবের বংশমর্যাদা, তার পূর্বপুরুষদের। ধর্ম রীতিনীতি তার সামনে সত্যের চেয়েও প্রবল হয়ে দাঁড়াল। সত্যকে আনিকা। করার পরিবর্তে, বংশীয় গৌরবই তার নিকট প্রাধান্য পেল।
যখন আবু তালিবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলাে, যখন বিছানায় জীবনের শেষ মুহূর্তগুলাে অতিক্রম করছিলেন রাসুলের প্রাণাধিক প্রিয় চাচা, যখন জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছটফট করছিলেন তিনি, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পাশে দাঁড়ানাে ছিলেন। অশ্রুজলে বুক ভাসিয়ে তার হাত ধরে বারে বারে অনুরােধ করছিলেন কালিমা উচ্চারণ করার জন্য। কিন্তু নাহ। আবু তালিবের সেই সৌভাগ্য ছিল না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মুমূর্ষ আবু তালিবের বিছানার পাশে বসে তার মুখ দিয়ে তাওহিদের ঘােষণা উচ্চারণ করাতে চাচ্ছিলেন, ঠিক তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন আরও একজন ব্যক্তি। তার নাম আব্দুল্লাহ ইবনু আবি উমাইয়া। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন চাচা আবু তালিবকে শাহাদাহ পাঠ করাতে তৎপর, ব্যতিব্যস্ত, তখন আব্দুল্লাহ ইবনু আবি উমাইয়া ব্যস্ত ছিলেন আবু তালিবকে কুমন্ত্রণা দেওয়ার কাজে। আব্দুল্লাহ বলছিলেন, “ওহে আবু তালিব, শেষ সময়ে এসে তুমি কি তােমার পিতৃধর্ম ত্যাগ করে বসবে? ওহে আবু তালিব, জীবনের সন্ধিক্ষণে এসে তুমি কি সত্যিই পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে? মুহাম্মাদের প্ররােচনায় জীবনসায়াহ্নে তুমি কি আমাদের উপাস্যদের অস্বীকার করে বসবে?
সেদিন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাচা আবু তালিবের মন গলাতে পারেননি। আবু তালিব শাহাদাহ পাঠ না করে মুশরিক অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেন। তবে সেই আব্দুল্লাহ ইবনু আবি উমাইয়া? যে কিনা আবু তালিবকে ফুসলিয়ে ছিলেন শাহাদাহ পাঠ না করার জন্য, তার কী হলাে শেষে? হ্যাঁ, সেই আব্দুল্লাহ ইবনু আবি উমাইয়া শেষে ইসলামের অমৃত সুধা পান করেছিলেন। যিনি একদিন আবু তালিবকে পিতৃধর্ম ত্যাগ না করার জন্য, পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ না করার জন্য তাদের উপাস্যদের অস্বীকার না করার জন্য তাড়না জুগিয়েছিলেন, সেই তিনিই কিনা পিতৃধর্ম, পূজিত বংশীয় উপাস্যদের পায়ে ঠেলে ঘােষণা দিয়ে বসলেন এক ইলাহর, এক মাবুদের, এক আল্লাহর! সেই আব্দুল্লাহ ইবনু আবি উমাইয়া পরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তায়েফের যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহিদ হয়েছিলেন।[1] ।
ভাবুন তাে! মৃত্যুর বিছানায় যিনি আবু তালিবকে কুমন্ত্রণা, কুপরামর্শ জুগিয়েছিলেন, সই তিনিই পরে শাহাদাহ পাঠ করে হয়ে গেলেন একজন সােনার মানুষ! শুধু তা-ই নয়, জিহাদে অংশগ্রহণ করে তিনি লাভ করেছেন শহিদ হবার মর্যাদাও! সুবহানাল্লাহ! সেই আব্দুল্লাহ ইবনু আবি উমাইয়া অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়লেন শহিদদের মিছিলে। আর আবু তালিবের জন্য দুহাত তুলে আমরা যে একটু দুআ করব, সেই সুযােগটাও রইল না। আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এই যে দৃষ্টান্ত—এখান থেকে আমরা কোন জিনিসটা উপলব্ধি করব? আমরা যারা নিজের আত্মার সাথে, নিজের নফসের সাথে, নিজের শরীরের সাথে যুলুম করেছি, আমরা যারা ভাবছি যে, আমাদের সেই যুলুমের, সেই পাপের কোনাে ক্ষমা হয়তাে নেই, তাদের জন্য আব্দুল্লাহ ইবনু আবি উমাইয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু চমৎকার একটি দৃষ্টান্ত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে সম্মানিত করেছেন। তাকে শহিদদের কাতারে স্থান দিয়েছেন। আল্লাহ যদি তাকে ক্ষমা করতে পারেন, আপনাকে কেন করবেন না? আপনার রব আর আব্দুল্লাহ ইবনু আবি উমাইয়ার রব তাে একই। আপনারা দুজনে তাে একই মনিবের দাস। একই ইলাহর বান্দা। যিনি আব্দুল্লাহকে ক্ষমা করতে পারেন, তিনি আপনাকেও ক্ষমা করবেন। শুধু আশা রাখুন। ফিরে আসুন তার কাছে যিনি সমস্ত ক্ষমার আধার।
[ গ ]
পবিত্র কুরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সুরাটা হলাে সুরাতুল ফাতিহা। সুরা ফাতিহা হলাে উম্মুল কুরআন তথা কুরআনের মা। প্রতিদিনের ফরয সালাতে আমরা ১৭ বার সুরা ফাতিহা তিলাওয়াত করি। এই সুরার শুরুটা হয়েছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রশংসাবাক্য দিয়ে। আমরা ঘােষণা দিই—আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। সমস্ত প্রশংসা তার জন্যে যিনি বিশ্বজাহানের রব। এরপর আমরা বলি—আর রাহমানুর রাহীম। মালিকি ইয়াওমিদদ্বীন। আর রাহমানুর রাহীম' মানে হলাে ‘যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। আর ‘মালিকি ইয়াওমিদদ্বীন’ মানে হলাে যিনি বিচার দিনের মালিক ।
এখানে আল্লাহর দুটো গুণের কথা পরপর উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমে বলা হয়েছে আল্লাহ হচ্ছেন পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। এরপর বলা হলাে তিনি হলেন বিচার দিনের মালিক। আচ্ছা, কখনাে কি মনে এই ভাবনার উদয় হয়েছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কেন তাঁর ‘আর রাহমানুর রাহীম’ গুণটাকে ‘মালিকি ইয়াওমিদদ্বীন’ গুণের আগে স্থান দিয়েছেন? তিনি তাে চাইলে বলতে পারতেন, মালিকি ইয়াওমিদদ্বীন। আর রাহমানুর রাহীম। কিন্তু তিনি সেভাবে বলেননি। কেন বলেননি?
বিচারক তিনিই যিনি আপনার ভালােমন্দ দুটো কাজেরই হিশেব চাইবেন। বিচার। করার জন্য তার দুটোরই পরিপূর্ণ হিশেব দরকার। আর সেই বিচারক যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা, তখন ব্যাপারটা কেমন হবে? তার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কি কোনাে পাপ লুকোনাে যাবে? তার কাছ থেকে গােপন করা যাবে কোনাে গুনাহ, কোনাে অবাধ্যতা? জীবনের পরতে পরতে আমরা যে অহরহ পাপ করছি, তার অবাধ্য হচ্ছি, সেসবের কোনাে হিশেবই কি আল্লাহর কাছ থেকে লুকোনাের সুযােগ। আছে? বিচারের মাঠে তিনি যদি কঠোর হওয়া শুরু করেন, তাহলে আমাদের কেউই তাঁর ক্রোধ থেকে বাঁচতে পারব না।
কিন্তু তিনি যে ‘বিচারক, সেই গুণের কথা উল্লেখ করার আগে তিনি বলেছেন তিনি হলেন ‘পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। তার রয়েছে অসীম দয়ার ভান্ডার। তিনি বিচারকের আগে দয়ালু। এর অর্থ হলাে—আমরা যারা প্রতিনিয়ত নিজেদের প্রবৃত্তির ধোঁকায় হাবুডুবু খাচ্ছি, যারা দিনের পর দিন তাঁর অবাধ্য হচ্ছি, গুনাহের অথৈ সাগরে মজে রয়েছি, আমরা যদি আন্তরিকতার সাথে তাঁর দিকে ফিরে আসি, যদি অনুতপ্ত হৃদয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা চাই, তাহলে তিনি আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। বিচারকের ভূমিকার আগে যে তিনি দয়ালু হবার ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি আপনার বিচার করার আগে আপনাকে দয়া করবেন যদি আপনি বলেন, হে রাহমানুর রাহীম! প্রতিনিয়ত গুনাহের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি। হেন কোনাে পাপ নেই যা আমি করছি না। রাতের অন্ধকারে, দিনের আলােতে আমি একজন পাপী। আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরা আজ পাপের কালিমায় দূষিত। আমার হৃদয়-মন আজ গুনাহের ভারে জর্জরিত। তবুও, মালিক আপনি তাে রাহমানুর রাহীম। গাফুরুর রাহীম। আমি আজ নত মস্তকে, বিনীত চিত্তে, আকুল হৃদয়ে আপনার ক্ষমাপ্রার্থনা করছি, আপনি আমায় ক্ষমা করে দিন।
তিনি আমাদের জন্য সুযােগ বরাদ্দ রেখেছেন। ফিরে আসার সুযােগ। ক্ষমা লাভের সুযােগ। ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার সুযােগ। তাই তিনি সুরা ফাতিহায় ‘মালিকি ইয়াওমিদদ্বীন’ গুণের আগে আর রাহমানুর রাহীম’ গুণের কথা উল্লেখ করেছেন এখন আমাদের উচিত সেই সুযােগ লুফে নেওয়া। তাঁকে বিচারক হিশেবে পাওয়ার। আগে রাহমানুর রাহীম হিশেবে পেয়ে যাওয়া।
[ ঘ ]
আপনি ভাবছেন আপনার পাপের কোনাে ক্ষমা নেই। অথচ, আপনার স্মরণ করা। উচিত সেই উদ্ধত, অহংকারী ফিরাউনের কথা যে নিজেকে আল্লাহর আসনে বসিয়ে। নিয়েছিল। যে প্রতাপশালী ফিরাউন নিজেকে দাবি করেছিল মানুষের রব হিশেবে, যে হত্যা করেছিল বনি ইসরাইলের হাজার হাজার নিস্পাপ শিশুকে, সেই ফিরাউনের। কাছে যখন সত্যের দাওয়াত-সহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুসা আলাইহিস সালাম এবং তার ভাই হারুন আলাইহিস সালামকে পাঠাচ্ছেন, তখন তিনি বললেন_
فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى
তােমরা দুজন তার সাথে নরম সুরে কথা বলবে। হয়তাে সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা আমাকে ভয় করবে [1]
ফিরাউনের মতাে উদ্ধত, অহংকারী, সীমালঙ্ঘনকারী জালিমের সাথে কথা বলার সময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন যেন তার সাথে নরম সুরে, কোমল গলায় কথা বলা হয়। ফিরাউনের মতাে অবাধ্য জালিমের ক্ষেত্রে যদি আল্লাহর অবস্থান এ রকম হয়, আপনার সাথে কীরকম হবে ভাবুন তাে? আপনি তাে তাঁকেই সিজদা দেন, তাঁর কাছেই সাহায্য চান, আপনার মঙ্গল-অমঙ্গল সবকিছুর জন্য তাঁর ওপরই ভরসা করেন। মাঝে মাঝে শয়তানের ওয়াসওয়াসায় পড়ে পাপ করে ফেলেন। আপনার পাপের পরিমাণ তাে ফিরাউনের পাপের সমান নয়। ফিরাউনের জন্যে যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সুযােগ বরাদ্দ রাখেন, তাকে উদ্দেশ্য করে যদি আল্লাহ বলতে পারেন হয়তাে সে উপদেশ গ্রহণ করবে, আপনার বেলায় রাব্বল আলামিনের মহত্ত্ব, ক্ষমা আর দয়ার পরিমাণ কেমন হবে ভাবতে পারেন? তাই, সুযােগ হারাবেন না। আপনি পাপ করবেন জেনেই তিনি তাঁর ক্ষমার ঘােষণা দিয়ে রেখেছেন। আপনি যদি পাপ করে তাওবাই না করেন, তিনি ক্ষমা করবেন কাকে বলুন তাে? রাতের গভীর কালাে অন্ধকারে আল্লাহর কাছে কাঁদুন। তিনি আপনার জীবনকে আলাে ঝলমলে দিনে পরিণত করে দেবেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চমৎকার, আশা জাগানিয়া এই হাদিসটির কথাগুলাে শুনুন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দা আমাকে যেমন ভাবে, আমি তেমন। সে যখন আমার। কথা স্মরণ করে, তখন আমি তার সাথে থাকি। সে যদি মনে মনে আমাকে স্মরণ করে, আমিও মনে মনে তাকে স্মরণ করি। সে যদি কোনাে সভায় আমাকে স্মরণ করে, আমি । তারচেয়েও ভালাে সভায় তার কথা উল্লেখ করি। সে আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে। এলে, আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। আর সে যদি এক হাত এগােয়, আমি দু-হাত এগিয়ে যাই। সে আমার দিকে হেঁটে এলে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই। [১]
আপনার আমার সকল অবাধ্যতা, সকল ঔদ্ধত্যের পরেও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের জন্য সুযােগ তুলে নেননি। আমাদের জন্য বন্ধ করে দেননি ফিরে আসার রাস্তা। তিনি জানিয়ে রাখছেন, আমি যদি তাকে স্মরণ করি, তিনিও আমাকে স্মরণ করবেন। কত বড় একটা ব্যাপার এটা, ভাবুন তাে! আমি দুনিয়ায় বসে আল্লাহকে স্মরণ করলে তিনি সাত আসমানের ওপর থেকে আমাকে স্মরণ করবেন। কোনাে টেলিফোন নয়, কোনাে ইমেইল, চিঠি কিংবা বায়বীয় কোনাে মাধ্যম নয়। কেবল অন্তরের গভীর থেকে তাকে একটুখানিই স্মরণ! আমি যদি আল্লাহকে আমার কোনাে আড্ডায় স্মরণ করি, আমার আড্ডার বন্ধুরা যখন দুনিয়াবি আলাপে মেতে উঠতে চায়, তখন যদি আমি তাদের সুমহান আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিই, যদি বলি তােমরা আল্লাহকে ভয় করাে, মিথ্যে বলাে না, আল্লাহর অবাধ্য হয়াে না, অসৎ পথে পা বাড়িয়াে না, তখন আসমানের অধিপতি ফেরেশতাদের সমাবেশে আমার কথা স্মরণ করেন। আমার নাম উত্থাপন করেন। সম্মানিত ফেরেশতাদের সামনে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমার কথা বলছেন, আমার নাম নিচ্ছেন, চোখ দুটো বন্ধ করে এই দৃশ্যটা একটু ভাবুন তাে!
মহান রব, যিনি হলেন গাফুরুর রাহীম, অসীম, অনিঃশেষ দয়ার সাগর, তিনি আপনার-আমার ফিরে আসার চেষ্টাগুলােকে এতটাই মূল্যায়ন করেন। আমরা যদি পাপের রাস্তা ছেড়ে তাঁর দিকে এক বিঘত হেঁটে যাই, তিনি আমাদের দিকে এক হাত হেঁটে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমরা এক হাত গেলে তিনি দু-হাত এগিয়ে আসেন। আমরা যদি তার দিকে হেঁটে যাই, তিনি আমাদের দিকে দৌড়ে আসেন। তিনি কতভাবেই-না। আমাদের ক্ষমা করতে চান। কত উপায়েই-না তিনি খােলা রেখেছেন অপার ক্ষমার দুয়ার।
তিনি তাঁর পরিচয় মেলে ধরেছেন গাফুরুর রাহীম’ হিশেবে। অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। তার ক্ষমা সবসময় তাঁর ক্রোধের ওপর বিজয়ী। হয়। আমাদের গুনাহর পরিমাণ যদি আকাশ ছুঁয়ে যায়, পৃথিবী যদি আমাদের। গুনাহগুলােকে সংকুলান দিতে ব্যর্থ হয়, যদি আকাশ আর জমিনের মাঝে আমিই। সবচেয়ে বড় গুনাহগার, সবচেয়ে বড় পাপী, সবচেয়ে নিকৃষ্ট, অথর্ব, অপদার্থ হয়ে। থাকি, তবুও হতাশ হবার কিছু নেই। আকাশের মেঘ কখনাে সূর্যকে ঢেকে দিতে পরে না। মেঘ ফুঁড়ে সূর্যের আলাে ঠিকই ঠিকরে বেরিয়ে আসে। অন্তরে পাপের যে মেঘ ঘনীভূত হয়ে আছে, সেগুলােও ধুয়েমুছে যাবে। সেই মেঘের কোলেও সূর্য হাসবে। হৃদয়ের অন্দরমহলে কেবল একটু জায়গা খালি রাখি যেখানটায় উচ্চারিত হবে, ‘আল্লাহুম্মাগফিরলি! আল্লাহুম্মাগফিরলি! হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করে দিন। ও আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করে দিন!
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Website
Address
Dhaka