02/08/2024
দুপুর বেলা তরকারিতে একটু লবন বেশী হওয়ায় ভরা মজলিশে আমার শ্বাশুড়ি মা মাং'সের গরম বাটিটা যখন আমার শ'রীরের উপর ছুড়ে মা'রলেন ছলছল চোখ নিয়ে মনে তখন একটা প্রশ্নই জেগে উঠেছিলো,
-'আচ্ছা! অ'নাথ হয়ে জন্ম নিয়ে কি খুব বড় অপরাধ করে ফেলেছি?অনাথ দের কি বাঁ'চার কোনো অধিকার এই পৃথিবীতে নেই?কোনোভাবেই নেই?
রুবি,আমার একমাত্র ননদ।সে এখন ৭ মাসের অ'ন্তঃস্ব'ত্তা। বাড়িতেআজ তারই স্বাদের অনুষ্ঠান হলো।বাড়িতে আত্মীয় স্বজনের গমগম পরিবেশ।ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রান্না বান্নার সমস্ত কাজ একা হাতে সামলিয়েছি।গরুর মাং'স,খাসির রেজালা,মুরগীর রোস্ট, গলদা চিংড়র ভুনা বড় মাছের মুড়ি খন্ড সহ সমস্ত রান্না নিজের হাতে করেছি।দায়িত্ব নিয়ে খুব ভালোবেসেই করেছি।এক মাত্র ননদ কিনা আমার!হঠাৎ ই মনে পাহাড় সমান আফসোস নিয়ে মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দিলো,-'মামার মুখে শুনেছি আমিও নাকি আমার মায়ের একমাত্র মেয়ে ছিলাম।বাবা আমায় আদর করে রাজকন্যা বলে ডাকতো।হয়তো তার বিশাল কোনো রাজভান্ডার ছিলো না।কিন্তু তার ছোট্ট কুটিরের রাজরানী ছিলো আমার মা।আর তার রাজকন্যা আমি।খুব শখ করেই বাবা আমার নাম রেখেছিলেন রানী।আচ্ছা! আমিও তো অ'ন্তঃস'ত্ত্বা।এই তো দেখতে দেখতে ৫ টা মাস কেটে গেলো।আমার মা থাকলেও বুঝি এমন ঘটা করে আমার স্বাদের অনুষ্ঠান করতো!আমাকেও এমন ভাবে গরুর,মাং'স,খাসির মাং'স,চিংড়ি মাছের ভুনা নাক ডুবিয়ে খাওয়াতো।
-পেটে খুব ক্ষিদে। সকাল হতে শুকনো ক'টা চিড়ে ছাড়া পেটে কিছু পড়েনি।ক্ষুদার য'ন্ত্রণায় শরীর টা কেমন অস্থির অস্থির লাগছে।ছুটে গেলাম রান্না ঘরের দিকে।'দুপুরের আগে রান্নার কাজ শেষ করে গোসল করে রান্না ঘরে উঁকি দিতেই শুনতে পেলাম ফুপু শ্বাশুড়ি গলার স্বর।তিনি আমার শ্বাশুড়ির উদ্দেশ্যেে বলে উঠলেন,
-'রেহানা,তোমার বড় ছেলের বউ টাতো পোয়াতি।সেই সকাল থেকেই দেখছি এই শরীরে কত খাটা খাটনি করছে।আজ না হয় আমাদের মেয়ের সাথে তাকে বসিয়ে একটু ভালো মন্দ নিজের হাতে খাইয়ে দিও।বাপ মা ম'রা মেয়ে!ওর বা আর কি দোষ.........
ফুপুর মুখে পুরো কথা শেষ না হতে হতেই গর্জে উঠলেন আমার শ্বাশুড়ি মা।ভাতের হাড়ি থেকে চামচ উঠাতে উঠাতে বললেন,
-'এতো আহ্লাদ দেখায়েন না তো আপা।জন্মের কিছু বছর পরই বাপ মা কে খেয়েছে।তার এতো শখ আহ্লাদের কি আছে।অনাথ এতিমদের এতো আহ্লাদী হলে চলে না আপা।আপনি বরং খাবার গুলো টেবিলে নিয়ে যান।হাতে অনেক কাজ আমার।
শ্বাশুড়ির মুখে এমন কথা শুনে পেটের ক্ষিদে আর পেটে রইলো না।কোথায় যেনো উধাও হয়ে গেলো।আঁচলের কোনায় চোখ মুছতে মুছতে নিজের ঘরে চলে গেলাম।আরমান,আমার স্বামী তখন পেপার পড়তে ব্যস্ত। বেশ চুপচাপ স্বভাবের একজন গম্ভীর লোক।আমার ব্যপারে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই।আমি খেলাম কি না খেলাম সে বিষয়ে তার কোনো কৌতুহল নেই বললেই চলে।আজকাল মাঝে মাঝে তো সেও আমাকে দু একটা কড়া কথা কথাও শুনিয়ে দেয়।তার অন্যান্য সহকর্মী রা বিয়ে করে নাকি শ্বশুর বাড়ির টাকা পয়সায় রাজার হালে থাকে।তার ছোটো ভাই।আমার দেবর।বেশ কিছুদিন হলো বিয়ে করেছে।প্রায় ই তার শ্বশুর বাড়ি থেকে এটা ওটা পাঠায়।এই তো আজ সকালেই আমার ছোটো জায়ের বাপের বাড়ি থেকে হরেক রকম বাজার সদাই করে পাঠিয়েছে রুবির স্বাদের অনুষ্ঠানে।এই জন্যই আমার ছোটো জা আমার শ্বাশুড়ির কাছে লক্ষীমন্ত্র।আর আমার স্বামী তো এ সব কিছু থেকে বন্চিত।আর সে তো একবেলা খাবারও পায় না শ্বশুরবাড়ির।
--'শুনেছি আমার যখন চার বছর বয়স তখন আমার বাবা মা রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়।দুর্ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাই আমি।তখন থেকে খেয়ে না খেয়ে মামার ঘরেই এক কোনে পড়েছিলাম।বয়স বাড়তে লাগলো,মামার সংসারেও এক প্রকার বোঝা হয়ে দাড়ালাম।সারাদিন হাড় ভাঙা খাটুনি দিয়েও মামির মন জয় করতে পারিনি।শেষমেষ মামা মামির আড়ালে বেশ কষ্ট করেই পঞ্চাশ হাজার টাকা আর ৪ আনা স্বর্ন দিয়ে একজোড়া কানের দুল বানিয়ে রেখেছিলেন আমার বিয়ের জন্য। বিয়ের সময় টাকা আর কানের দুল আমার শ্বাশুড়ির মা'র হাতেই তুলে দেন মামা।বিয়ের পর আর কখনও সে বাড়িতে যাওয়া হয় নি আমার।মাঝে একদিন মামা এসেছিলেন।বাজার থেকে সস্তা মিষ্টি আনাতে বেশ অপমানিতও হতে হয়েছিলো তাকে ।তারপর থেকে আর মামা এ বাড়ি আসেন নি।শুনেছি সেদিন এ বাড়ি থেকে যাওয়ার দিন রাতেই মামা মারা গেছেন।মায়ের শেষ অং'শীদার মামাও যখন চলে গেলেন তখন আর আমার কে আছে এ পৃথিবীতে। তারপর থেকেই খেয়ে না খেয়ে শ্বাশুড়ি,স্বামীর অকথ্য কথা হজম করেই মুখ থুবড়ে পড়ে আছি এ বাড়িতেই।বিয়ের প্রায় বছর পেরুলো।
-'সন্ধ্যা তো গড়িয়ে গেলো।এতো ননীর পুতুল হলে হবে?বাসন গুলো পরিষ্কার করে রান্না ঘরে এসো এবার।অনেক কাজ পড়ে আছে।-'
শ্বাশুড়ির কথায় ভাবনার সুতো কা'টলো আমার।কল তলায় বসে বাসন পরিষ্কার করছিলাম।নিজেকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখের পাতা ভিজে উঠেছে বুঝতেই পারিনি।পেটে এখনও ভীষন ক্ষিদে।সকাল হতে আর কিচ্ছু খাওয়া হয় নি।এটো বাসন পরিষ্কার করতে করতে প্লেটের কোনায় কিছু উচ্ছিষ্ট খাবার চোখে পড়লো।গোটা দুয়েক আস্ত চিংড়ি মাছও পড়ে আছে প্লেটে।খুব লোভ হলো।ছোটো বেলা থেকে চিংড়ি মাছটা আমার খুব প্রিয়।তাই আর লোভ সামলাতে পারলাম না।পেটের যন্ত্রণায় এঁটো খাবার গুলো মুখে তুলে নিলাম।সাথে সাথে চোখ দুটো ভীষন বেপোরোয়া হয়ে উঠলো।নিজের অজান্তেই ডুকরে কেঁদে উঠলাম।আঁচলে মুখ চেপে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে কেঁদে কেঁদে বলে উঠলাম,
-'মা,মাগো! অনাথদের বুঝি কোনো শখ আহ্লাদ থাকতে নেই?