আবু লাহাবের দুই ছেলের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুই মেয়ের এঙ্গেইজমেন্ট হয়েছিলো!
নবুওয়াত লাভের আগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই উতবা এবং উতাইবার সাথে তাঁর মেয়ে রুকাইয়া এবং উম্মে কুলসুমের বিয়ে হয়।
সেই যুগে এরকম বিয়ে খুব স্বাভাবিক ছিলো।
ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে হয় আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে।
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহা ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার কে ছিলেন?
চাচা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আপন চাচাতো ভাই আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু।
তেমনি তাঁর চাচা আবু তালিবের দুই ছেলে অর্থাৎ তাঁর চাচাতো ভাইদের সাথে মেয়ের বিয়ে 'ঠিক' হয়।
এখান থেকে বুঝা যায় নবুওয়াত লাভের আগে আবু লাহাবের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্পর্ক বেশ ভালোই ছিলো।
কিন্তু, নবুওয়াত লাভের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন পাবলিকলি দ্বীনের দাওয়াত দিলেন, তখন সবার আগে বিরোধিতা করে তার চাচা আবু লাহাব!
আমাদের সময় দেখা যায় ছোটোবেলা থেকে মা-বাবা ছেলে-মেয়ের বিয়ে ঠিক করে। বন্ধুর, আত্মীয়ের সন্তানের সাথে বিয়ে দিবে।
তৎকালীন আরবেও এই কালচার ছিলো। উপরের দুটো উদাহরণের পাশাপাশি ক্ল্যাসিক্যাল আরেকটি উদাহরণ দেখা যায়— আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার উদাহরণ।
তাঁর প্রথমে এঙ্গেইজমেন্ট (বিয়ের কথাবার্তা) হয়েছিলো যুবাইর ইবনে মুতইমের সাথে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে (খাওলা বিনতে হাকিম রাদিয়াল্লাহু আনহার মাধ্যমে) যখন আবু বকর মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব পান, তখন তিনি ছুটে গেলেন মুতইম ইবনে আদির বাড়ি।
কারণ, তাদের সাথে বিয়ের কথা দেয়া।
গিয়ে শুনতে পান তারাই এই বিয়ে বাতিল করার জন্য আলোচনা করছে। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু যে কারণে এসেছিলেন, সেটা সফল হয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়ে রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা এবং উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহার উদাহরণ থেকেও বুঝা যায়— তাদের এঙ্গেইজমেন্টের সময় বয়স ১০ এর নিচে ছিলো।
সূরা লাহাব নাযিলের পর আবু লাহাব তার ছেলেদেরকে চাপ প্রয়োগ করে, তারা যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়েদেরকে তালাক দেয়।
উতবা রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহাকে তালাক দেয়।
উতাইবা উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহাকে তালাক দেয়।
উতাইবা শুধুমাত্র বিয়ে বাতিলই করেনি, সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তার চাচাতো ভাইকে কষ্ট দেয়ার জন্য তাকে গিয়ে বলে— আমি যেভাবে তোমার মেয়েকে তালাক দিলাম, তেমনি তোমার ধর্মকেও অস্বীকার করলাম।
এই বলে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে থুথু ফেললো! যদিও সেই থুথু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর পড়েনি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বিরুদ্ধে বদদুআ করেন।
উতাইবা কিছুদিন পর একটা বাণিজ্যিক সফরে যায়। যাত্রাপথে এক জায়গায় বিশ্রাম নেয়ার সময় একটা সিংহ আসে। কাফেলার সবাই ভয়ে কাপছে। কিন্তু, সেই সিংহ আর কাউকে টাচ না করে উতাইবা নিয়ে খেয়ে ফেলে!
এই হলো আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বেয়াদবির শাস্তি।
রুকাইয়া আর উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহুন্নার কথা চিন্তা করুন।
তাদের জীবনে এটা কতো বড় ট্রাজেডি ছিলো। ইসলাম গ্রহণের কারণে, বাবা নবী হবার কারণে তাদের বিয়ে ভেঙ্গে যায়!
পরবর্তীতে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়ে রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করেন।
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহার খালা সা'দা বিনতে কুরাইজ তার বোনপোর বিয়ে উপলক্ষে একটি কবিতা লিখেন। বাংলাভাষী একজন কবি সেই কবিতার অনুবাদও করেন।
উসমান ও রুকাইয়া এই দম্পতি উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে এজ এ কাপল সর্বপ্রথম হিজরত করেন।
তারা মক্কা ছেড়ে চলে যান আবিসিনিয়ায়।
বদর যুদ্ধে মুসলিমরস জয়লাভ করে। মদীনার সবাই ইসলামের প্রথম বড় সামরিক বিজয় উদযাপন করছে, শুকরিয়া আদায় করছে।
সেইদিনই ঘটে এক ট্রাজিক ঘটনা।
রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা এইদিন ইন্তেকাল করেন!
উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা, যার বিয়ে ঠিক হয়েছিলো উতাইবার সাথে। যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বেয়াদবি করে।
রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহার ইন্তেকালের পর সেই উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করেন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু।
উতাইবার সাথে বিচ্ছেদের অন্তত ১২ বছর পর উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে হয় সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে লজ্জাশীল উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে।
উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহার জায়গা থেকে চিন্তা করুন। তাঁর বোনেরও বিয়ে ভেঙ্গেছিলো, কিন্তু বোনের বিয়ে হয় সেরা মানুষের সাথে। আর তাঁকে অপেক্ষা করতে হয় প্রায় ১২ বছর।
১২ বছর অপেক্ষার পর জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবীর সাথে তাঁর সংসারজীবন ছিলো মাত্র ৬ বছরের।
নবম হিজরিতে উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা ইন্তেকাল করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুই মেয়েকে বিয়ে করে 'যুন-নুরাইন' উপাধি পাওয়া উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ৬ বছরের ব্যবধানে হারান এই দুই নূর!
আর এই দুজনকে বিয়ে করার সুযোগ পেয়েও নিজেদের ইগোর কারণে সুযোগ হাতছাড়া করেছিলো উতবা ও উতাইবা!
উতাইবা কাফির অবস্থায় মারা গেলেও উতবা মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করে।
লেখক - আরিফুল ইসলাম
দাওয়াহ
প্রচার করো একটি আয়াত হলেও।
উম্মতের বড় আলেম ও কুরআনের তাফসিরকারকদের নেতা
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন:
“চার ব্যক্তির প্রতিদান আমি দিতে সক্ষম নই—
১. যে ব্যক্তি আমাকে আগে সালাম দেয়।
২. যে ব্যক্তি মজলিসে আমার জন্য জায়গা করে দেয়।
৩. যে ব্যক্তি আমার প্রয়োজন পূরণের জন্য হাঁটতে হাঁটতে তার পা ধূলিমলিন করে ফেলে।
৪. আর চতুর্থ ব্যক্তির প্রতিদান আমার পক্ষ থেকে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ দিতে পারবেন না।”
তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো:
“তিনি কে?”
তিনি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বললেন:
“সে ব্যক্তি— যার কোনো প্রয়োজন হয়েছে। সে সারা রাত চিন্তা করেছে কার কাছে যাবে। তারপর আমাকে তার প্রয়োজন পূরণের উপযুক্ত মনে করেছে এবং তার প্রয়োজন আমার কাছে পেশ করেছে।”
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
“মানুষের প্রয়োজন পূরণ করার মধ্যে এমন এক আনন্দ রয়েছে— যা কেবল সেই ব্যক্তি জানে, যে নিজে সেটার অভিজ্ঞতা লাভ করেছে।”
সুতরাং তুমি ভালো কাজ করো— তা যত ছোটই মনে হোক না কেন।
কারণ তুমি জানো না কোন সৎকর্মটি তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।
শাইখ আবদুর রহমান আস-সে‘দী রহিমাহুল্লাহ বলেন:
গভীর চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের পর আমি দেখেছি—
যে যিকিরগুলো বেশি বেশি করার জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়েছে
কিতাব ও সুন্নাহতে—সেগুলো ছয়টি যিকির।
এই ছয়টি যিকির, যা আমি তোমাকে বলব, তোমার দীর্ঘ লড়াই—দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট, রোগ এবং গুনাহর বিরুদ্ধে— এগুলোই তোমার অগ্রভাগের অস্ত্র ও কার্যকর হাতিয়ার।
১️ প্রথম যিকির: (রাসুলের ওপর সালাত পাঠ) সারাদিন এটাকে আঁকড়ে ধরো। দিনের শেষে দেখবে—তুমি অনেক বেশি সালাত পড়েছ।
২️ দ্বিতীয় যিকির: (বেশি বেশি ইস্তিগফার) যদি আল্লাহ তোমাকে তাওফিক দেন এবং অবসর সময়ে সাহায্য করেন— তুমি যেন বেশি বেশি বলো: “আস্তাগফিরুল্লাহ”।
৩️ তৃতীয় যিকির: (ইয়া যাল-জালালি ওয়াল-ইকরাম)
এই যিকির বেশি করা প্রায় পরিত্যক্ত সুন্নাহগুলোর একটি, অথচ রাসুল ﷺ আমাদের এটার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাসুল ﷺ বলেছেন:
“আলিয্যু বি ইয়া যাল-জালালি ওয়াল-ইকরাম”
অর্থ: এটাকে বেশি পড়ো, লেগে থাকো।
রাসুল ﷺ বিশেষভাবে এই দুই নাম উল্লেখ করেছেন, কারণ এতে রয়েছে গভীর রহস্য।
ইয়া যাল-জালাল অর্থ: হে সৌন্দর্য, পরিপূর্ণতা ও মহিমার অধিকারী
ওয়াল-ইকরাম অর্থ: হে দানশীলতা ও অনুগ্রহের অধিকারী
তুমি যদি এর গভীরে যাও, দেখবে—
তুমি একসাথে প্রশংসা করছ এবং চাচ্ছও!
ভাবো—তুমি দিনে শত শত বার আল্লাহকে বলছ:
“ইয়া যাল-জালাল”—নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমার ওপর সন্তুষ্ট হবেন।
আর শত শত বার বলছ: “ওয়াল-ইকরাম”—
আল্লাহ তোমার প্রয়োজন জানেন এবং তোমাকে দেবেন।
৪️ চতুর্থ যিকির:
(লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ)
এই কথাটি রাসুল ﷺ বহু সাহাবিকে বলেছেন
এবং এটাকে জান্নাতের ভাণ্ডারগুলোর একটি বলেছেন।
তুমি যদি বেশি বেশি এটা পড়ো,
তাহলে আল্লাহর ব্যবস্থাপনায়
অদ্ভুত লুতফ, অনুগ্রহ ও নিয়ামত দেখতে পাবে।
৫️ পঞ্চম যিকির:
এটা আল্লাহর নবী ইউনুস আলাইহিস সালামের দোআ— “লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমীন”
এই যিকির দুঃখকে পরাস্ত করে
এবং আনন্দ নিয়ে আসে।
৬️ ষষ্ঠ যিকির:
“সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার”
একটি নিয়ম মনে রাখো:
যিকির, দোআ ও রুকইয়ার উপকার, ফল ও প্রভাব নির্ভর করে—
বারবার করা, লেগে থাকা, পুনরাবৃত্তি এবং গভীর চিন্তার ওপর।
তুমি যত বেশি আল্লাহকে স্মরণ করবে,
তত বেশি আল্লাহর ভালোবাসা পাবে।
তুমি যত বেশি দোআয় অনুরোধ করবে, তত বেশি কবুল হওয়ার দরজা খুলবে।
তুমি যত বেশি শরঈ রুকইয়া পুনরাবৃত্তি করবে, তত বেশি শয়তানকে পরাস্ত করতে পারবে এবং হিংসার বিষ দূর হবে।
- শাইখ আস-সে‘দী রহিমাহুল্লাহ,
আকিদা, তাওহিদ, আখলাক ও আহকাম শিক্ষা, পৃ. ৪৭।
II গুনাহের কিছু দুনিয়াবি ক্ষতি II
গুনাহের কারণে আখেরাতে আযাব ভোগ করার পাশাপাশি দুনিয়াতেও এর কিছু আযাব ভোগ করতে হয়। সেগুলো থেকে সংক্ষেপে কিছু উল্লেখ করছি—
১. গুনাহের কারণে মেধাশক্তি কমে যায়। অনেকেই অভিযোগ করেন, কোনো কিছু মনে রাখতে পারেন না। বিশেষ করে তালিবুল ইলমদের মধ্যে এমন অভিযোগ শোনা যায়। কেউ কেউ মেধা বৃদ্ধির জন্য পুষ্টিকর খাবারও খেয়ে থাকে, অথচ এই আযাবের অন্যতম কারণ গুনাহ ত্যাগে অসতর্ক থাকা। গুনাহের চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকায় পড়া বা ভালো জিনিস মনে স্থায়ী হয় না।
২. গুনাহের কারণে শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। ফলে সুস্থতার নেয়ামত থেকে মাহরুম হতে হয়। অনেকে বাহ্যিকভাবে শক্তিশালী হলেও দেহ ও মনে দুর্বল হয়ে পড়ে, অল্পতেই ভেঙে যায়। কিছু গুনাহ তো সরাসরি দেহে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
৩. গুনাহ প্রকাশ হয়ে গেলে সবার কাছে লজ্জিত হতে হয়। সুনাম ও সুখ্যাতি হারিয়ে যায়।
৪. দুআর স্বাদ চলে যায়। এমনকি দুআর অভ্যাসও কমে যায়। এতে মানুষ ধীরে ধীরে রবের কাছ থেকে দূরে সরে যায়।
৫. বেশি গুনাহের কারণে গুনাহের অনুভূতি নষ্ট হয়ে যায়। অন্তরে অনুশোচনার বোধ থাকে না। এভাবে মানুষ তাওবা থেকে মাহরুম হয়ে যায়।
৬. ইলমের বরকত থাকে না। যা শেখা হয় সেটাও দ্রুত ভুলে যায়, অথবা প্রয়োজনে মনে আসে না।
৭. গুনাহগারের কথায় কোনো প্রভাব থাকে না। তার বক্তব্য শ্রোতাদের ওপর প্রভাব ফেলে না।
৮. পরিবারের অধীন লোকেরা তার কথা মানে না। কারণ, সে গুনাহের দ্বারা আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হয়েছে, ফলে আল্লাহ তাআলাও তার অধীন লোকদেরকে অবাধ্য বানিয়ে দেন।
৯. গুনাহের কারণে সবসময় পেরেশানিতে ভুগতে হয়। মাথায় হাজারো চিন্তা থাকে। এসব কারণে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। দুনিয়ার জীবন তার কাছে বিস্বাদ হয়ে যায়। এভাবে আখেরাতও খোয়ায়, দুনিয়াও শান্তি পায় না।
১০. সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, লাগাতার গুনাহের কারণে মানুষ আল্লাহ তাআলার দৃষ্টির আড়াল হয়ে যায়। ফলে সে রহমত ও বরকত থেকে মাহরুম হয়ে যায়।
বই : কবিরা গুনাহ
লেখক : ইমাম শামসুদ্দীন আয যাহাবী রহ.
05/10/2025
আল্লাহ সুবহানাহু'ওয়া তায়ালা সূরা আল মু’মিনূন এর ৯৯-১০০ আয়াতে বলেন:
"অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু আসে, সে বলে, ‘হে আমার রব! আমাকে আবার ফেরত পাঠান।যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি যা আমি আগে করিনি।’ না, এটা হবার নয়। এটা তো তার একটি বাক্য মাত্র যা সে বলবেই। তাদের সামনে বারযাখ থাকবে উত্থান দিন পর্যন্ত।"
[সূরা আল মু’মিনূন - ৯৯-১০০]
তাফসীর:-
এখানে ارْجِعُونِ [ইরজ্বি‘ঊন্] শব্দটি এসেছে, যার মূল অর্থ, ‘তোমরা আমাকে ফেরৎ পাঠিয়ে দাও’। এখানে লক্ষণীয় যে, সম্বোধন করা হচ্ছে আল্লাহ্কে অথচ বহুবচনের ক্রিয়াপদ ব্যবহার করা হয়েছে। এর একটি কারণ এ হতে পারে যে, এটি সম্মানার্থে করা হয়েছে যেমন বিভিন্ন ভাষায় এ পদ্ধতি প্রচলন আছে। [কুরতুবী] দ্বিতীয় কারণ কেউ কেউ এও বর্ণনা করেছেন যে, আবেদনের শব্দ বারবার উচ্চারণ করার ধারণা দেবার জন্য এভাবে বলা হয়েছে। যাতে তা ‘আমাকে ফেরত পাঠাও, আমাকে ফেরত পাঠাও, আমাকে ফেরত পাঠাও’ এর অর্থ প্রকাশ করে। এ ছাড়া কোন কোন মুফাসসির এ মত প্রকাশ করেছেন যে, رَبِّ [রব] বলে সম্বোধন করা হয়েছে আল্লাহ্কে এবং ارْجِعُونِ [ইরজ্বি‘ঊন্] তা শব্দের মাধ্যমে সম্বোধন করা হয়েছে এমন সব ফেরেশতাদেরকে যারা সংশ্লিষ্ট অপরাধী আত্মাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। [কুরতুবী]
অর্থাৎ মৃত্যুর সময় যখন কাফের ব্যক্তি আখেরাতের আযাব অবলোকন করতে থাকে, তখন এরূপ বাসনা প্রকাশ করে, আফসোস, আমি যদি পুনরায় দুনিয়াতে ফিরে যেতাম এবং সৎকর্ম করে এই আযাব থেকে রেহাই পেতাম। [ইবন কাসীর]
অন্য আয়াতেও এসেছে, “আর আমরা তোমাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তোমরা তা থেকে ব্যয় করবে তোমাদের কারও মৃত্যু আসার আগে। অন্যথায় মৃত্যু আসলে সে বলবে, ‘হে আমার রব! আমাকে আরো কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে আমি সাদাকাহ দিতাম ও সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হতাম!’ আর যখন কারো নির্ধারিত কাল উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ্ তাকে কিছুতেই অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা আমল কর আল্লাহ্ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।’’ [সূরা আল-মুনাফিকূনঃ ১০-১১] আরও এসেছে,
“আর সেখানে তারা আর্তনাদ করে বলবে, ‘হে আমাদের রব! আমাদেরকে বের করুন, আমরা যা করতাম তার পরিবর্তে সৎকাজ করব।’ আল্লাহ্ বলবেন, ‘আমরা কি তোমাদেরকে এতো দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে, তখন কেউ উপদেশ গ্ৰহণ করতে চাইলে উপদেশ গ্ৰহণ করতে পারতো? আর তোমাদের কাছে সতর্ককারীও এসেছিল। কাজেই শাস্তি আস্বাদন কর; আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” [সূরা ফাতিরঃ ৩৭] কিন্তু তাদের সে চাওয়া পূরণ করা হবে না। [ইবন কাসীর]
[অর্থাৎ ফেরত পাঠানো হবে না। নতুন করে কাজ শুরু করার জন্য তাকে আর দ্বিতীয় কোন সুযোগ দেয়া যেতে পারে না। তাছাড়া যদি তাদের কথামত তাদেরকে পাঠানোও হতো তারপরও তারা আবার অন্যায় করত। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “আর তারা আবার ফিরে গেলেও তাদেরকে যা করতে নিষেধ করা হয়েছিল আবার তারা তাই করত” [সূরা আল-আন‘আমঃ ২৮] [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
‘বারযাখ’ এর শাব্দিক অর্থ অন্তরায় ও পৃথককারী বস্তু। দুই অবস্থা অথবা দুই বস্তুর মাঝখানে যে বস্তু আড়াল হয় তাকে বারযাখ বলা হয়। [ফাতহুল কাদীর] এ কারণেই মৃত্যুর পর কেয়ামত ও হাশার পর্যন্ত কালকে বারযাখ বলা হয়। কারণ এটা দুনিয়ার জীবন ও আখেরাতের জীবনের মাঝখানে সীমা প্রাচীর। আয়াতের অর্থ এই যে, মরণোম্মুখ ব্যক্তির ফেরেশতাদেরকে দুনিয়াতে পাঠানোর কথা বলা শুধু একটি কথা মাত্র, যা সে বলতে বাধ্য। কেননা, এখন আযাব সামনে এসে গেছে। কিন্তু এখন এই কথার ফায়দা নেই। কারণ, সে বারযাখে পৌঁছে গেছে। বারযাখ থেকে দুনিয়াতে ফিরে আসে না এবং কেয়ামত ও হাশর-নশরের পূর্বে পুনর্জীবন পায় না, এটাই নিয়ম।
-----------------------------------------------------
তাফসীর:- আবু বকর জাকারিয়া
আর মাত্র কয়েকটি দিন পরই দ্বারস্থ হবে পবিত্র যিলহজ্জ্ব মাস—বছরের সবচেয়ে বরকতময় ও মহিমান্বিত দশদিন। এই দশ দিনকে মহান আল্লাহ সুবহানহু ওয়া তা’আলা যে কতটা ভালোবাসেন, তা বোঝা যায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র হাদীস থেকেই। তিনি বলেন:
❝আল্লাহ্ তা’আলার নিকট যিলহজ্জ্বের প্রথম দশ দিনের ইবাদত অপেক্ষা অধিক পছন্দনীয় আর কোনো ইবাদত নেই।❞
(সহিহ বুখারী, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪৫৭)
রমাদান মাসের গুরুত্ব আমরা প্রায় সবাই জানি, কিন্তু যিলহজ্জ্বের এই দশ দিনের মাহাত্ম্য সম্পর্কে আমরা অনেকেই অবহিত নই। অথচ এই দিনগুলো এমন এক সুবর্ণ সুযোগ, যখন একজন মুমিন বান্দা আল্লাহর কাছে নিজেকে সর্বোচ্চভাবে নিবেদিত করতে পারে।
এই পবিত্র দশ দিনের জন্য আমাদের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত, তা নিম্নে তুলে ধরা হলো:
১. যিলহজ্জ্ব সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন:
এই মাসের ফযিলত, বিধি-বিধান ও কুরবানীর মাসায়েল সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে রাখা আবশ্যক, বিশেষ করে যারা কুরবানীর নিয়ত করেছেন।
২. দৈনন্দিন কাজের প্রস্তুতি:
যেহেতু এই দশ দিন বিশেষ বরকতের, তাই দুনিয়াবি ব্যস্ততা কমিয়ে রাখতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো মাস শুরুর আগেই সেরে রাখার চেষ্টা করুন, যেন ইবাদতের জন্য সময় বের করা সহজ হয়।
৩. ইবাদতের একটি পরিকল্পনা তৈরি:
আলাদা একটি ইবাদত পরিকল্পনা তৈরি করুন—যেখানে ফরজ সালাত, নফল ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ও দোয়া অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৪. নফল রোযা রাখা:
এই দশকে যতটা সম্ভব রোযা রাখার চেষ্টা করুন, বিশেষ করে ৯ যিলহজ্জ্ব—আরাফার দিন। এ দিনের রোযা এক বছরের গুনাহ মোচনে সহায়ক।
৫. যিকির ও ইস্তিগফার বৃদ্ধি:
বেশি বেশি ইস্তিগফার, দরুদ শরীফ ও তাকবির বলুন। আরাফার দিনে রাসূল ﷺ প্রদত্ত বিশেষ দোয়া পড়ুন:
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ
৬. তাকবিরে তাশরিক পাঠ:
৯ যিলহজ্জ্ব ফজর থেকে ১৩ যিলহজ্জ্ব আসর পর্যন্ত ২৩ ওয়াক্ত ফরজ সালাতের পর উচ্চস্বরে এই তাকবির পাঠ করা ওয়াজিব:
اَللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ، وَلِلَّهِ الْحَمْدُ
যারা ভুলে যেতে পারেন, তারা নামাযের জায়গায় কাগজে লিখে রাখতে পারেন।
৭. প্রতিদিন সদকা করা:
সাধ্যমতো প্রতিদিন কিছু না কিছু দান করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। ছোট হলেও প্রতিদিনকার দান আপনাকে আল্লাহর নৈকট্য এনে দিতে পারে।
৮. অহেতুক কাজ থেকে বিরত থাকা:
এই দিনগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় সময় ব্যয় না করা, টেলিভিশন ও অন্যান্য মনোযোগ বিভ্রান্তকারী জিনিস থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করা উচিত।
৯. অন্যদের সচেতন করা:
নিজে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও পরিচিতজনদের এই দশকের গুরুত্ব সম্পর্কে জানান এবং তাদের আমলে উৎসাহ দিন।
আসুন, আমরা এই পবিত্র দিনগুলোকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করি। নিজেদের পরিশুদ্ধ করি, আত্মা ও কর্মে যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারি।
কার্টেসি:- ডেইলি ইসলাম
"পৃথিবীতে বিচরণশীল প্রতিটি মানুষই অভাবী, লোভী। তবে মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা জান্নাতের প্রতি লোভী হয় এবং আল্লাহর মুখাপেক্ষী থাকে। অন্যদিকে মুনাফিকরা দুনিয়ার প্রতি লোভী হয় এবং মানুষের মুখাপেক্ষী থাকে।"
— ইয়াহইয়া (রহ.)
সূত্র: হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১০/৬৬
❝শীঘ্রই এমন একটি যুগ আসবে, বাইরে থেকে মানুষকে মানুষই মনে হবে, কিন্তু ভেতর থেকে তারা হবে নেকড়ের চেয়েও নিকৃষ্ট।
তাদের যুবকেরা হবে ধূর্ত। শিশুরা হবে অস্থির, অশান্ত। বৃদ্ধরা হবে সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ থেকে বিরত।
তাদের মাঝে পাপিষ্ঠরা হবে সম্মানিত ও প্রভাবশালী।
আর মুমিনরা হবে অপমানিত ও অধীনস্থ।❞
~ইবরাহিম ইবনু আদহাম (রহিমাহুল্লাহ)
এক লোক খলিফা ‘উমারের সামনে কোনো একটি বিষয়ে কাছে সাক্ষী দিয়েছিল। তখন তিনি তাকে বলেন: “আমি তোমাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তবে, এটা তেমন কোন সমস্যা নয়। তুমি এমন কাউকে নিয়ে এসো যে তোমাকে চেনে।”
লোকদের মধ্য থেকে একজন বলল, “আমি তাকে চিনি।”
‘উমার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি তার ব্যাপারে কী জানেন?” সে বলল, “সে উত্তম চরিত্রের মানুষ এবং দীনদার।”
‘উমার জিজ্ঞেস করলেন, “সে কি আপনার এমন নিকটতম প্রতিবেশী যার সাথে আপনার সব সময় দেখা সাক্ষাৎ দেখা হয়?” সে বলল, “না।”
তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তার সাথে আপনার কি কখনও কোনো আর্থিক কোন লেনদেন হয়েছে, যার মাধ্যমে আপনি তার তাকওয়া সম্পর্কে জানতে পেরেছেন?” সে বলল, “না।”
তারপর তিনি জিজ্ঞেস করেন, “সে কি কখনো আপনার সফরসঙ্গী ছিল, যে সময় আপনি তার চারিত্রিক মাহাত্ম ও উত্তম আচার-ব্যবহার সম্পর্কে জেনেছেন?” সে বলল, “না।”
‘উমার (রা.) তখন বলেন, “তাহলে আপনি তাকে মোটেই চিনেন না।
বই: 'উমার ইবন খাত্তাব: জীবন ও শাসন
"সর্বাবস্থায় হতাশা বা অতীত নিয়ে মনোকষ্ট অনুভব করা যাবে না। কখনোই মনে করা যাবে না যে, যদি আমি এরূপ করতাম তাহলে হয়ত এরূপ হতো অথবা এরূপ না করলে হয়ত এরূপ হতো না। এ ধরণের আফসোস মুমিনের জন্য নিষিদ্ধ। বিপদ এসে যাওয়ার পর মুমিন আর অতীতকে নিয়ে আফসোস করবেন না; বরং আল্লাহর সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এভাবেই নির্দেশনা দিয়েছেন"।
~ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহ.)
"পুরো পৃথিবী এক ঘণ্টার দুঃখেরও যোগ্য নয়। সেখানে গোটা জীবন এ পৃথিবীর জন্য দুঃখ করে কাটানোর কি আদৌ কোনো মানে আছে? আবার এজন্য মুসলিম ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করারও কি কোনো যৌক্তিকতা আছে? অথচ দুনিয়াতে আপনার জীবনকালই সামান্য!"
— ইয়াহইয়া ইবনু মুয়ায (রহ.)
সূত্র: তাহযীবুয যুহদ আল-কাবীর, ৮৪
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Website
Address
Dhaka