৫ই আগস্ট ২০২৪
দুপুর ১টা ৩০মি
ঠিক এই রকম সময়ে দুর্দান্ত উৎকন্ঠা নিয়ে যখন রান্নাঘরে কিছু একটা রান্না করছি, মাহমুদ বলল 'সেনাপ্রধান ভাষণ দেবেন।'
চমকে গিয়েছিলাম। কেন? কি বলবেন? কারফিউ তো চলছে? মার্শাল ল?
উত্তেজনা নিয়ে এসে বসেছিলাম টেলিভিশনের সামনে। তখন হয়ত ইন্টারনেট পাওয়া যাচ্ছিল। ঠিক মনে নেই।
এবং ফেসবুকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা 'শেখ হাসিনা পালিয়েছেন!' 'আলহামদুলিল্লাহ' এরকম পোস্ট দিয়েছিল, যদ্দুর মনে পরে।
সেই মুহুর্তটা! গায়ের লোম দাড়িয়ে গিয়েছিল। একি সত্যি???
আমার জীবনে এটাই সবচেয়ে গুরুত্ববহ মুহুর্ত!
আমার এই ছোট্ট জীবনে এরচেয়ে বড় কোন অবিশ্বাস্য সুন্দর ঘটনা আর নাই।
হয়ত সব বাংলাদেশিদের জীবনেই।।
শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য, শুধু আরো আরো সম্পদের জন্য একজন মানুষ একদম নিরপরাধের বুকে যত ইচ্ছা গুলি চালাতে যে প্রস্তুত ছিল... গুলি চলছিল... মরছিলো অগণিত। শিশু, কিশোর, তরুণ, বৃদ্ধ,.. . বাছ বিচারহীন..
আগের ১৬/১৭ বছরের ফ্যাসিবাদের হিসাব না করলেও৷ শুধু ২০২৪ এর জুলাই- আগস্টের কটা দিনের নির্মমতা!
আর সেই মুহুর্তে দুর্দমনীয় এক সাহসী জাতির বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো..
সেই কথাটা কান থেকে মুছে না
'গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা, একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না! এইটাই হইলো সবচেয়ে বড় সমস্যা!'
এইটাই সত্যি বিজয় এনে দিয়েছিল!!
সেই সব বীরদের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা!
৫ আগস্ট ২০২৪ এক অবিস্মরনীয় দিন। এটা এ জাতির জন্য সৃষ্টিকর্তার দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। 'দিয়ে ধন দ্যাখে মন, কেড়ে নিতে কতক্ষণ!' এরকম একটা কথা অনেক শুনেছি ছোটবেলায়। ইদানিং বার বার মনে পরে, ভয় হয়!!
Sharmin Afroz
Love to write my views. Mathematics is my passion. Cooking, travelling, gardening, parenting, social work are motivations for me.
Sharing knowledge is my madness....
টানা তিন চার দিন ঝুম বৃষ্টির পর পেয়ারা গাছের সব ডাশা পেয়ারা গুলো সাদা হয়ে যেত। বৃষ্টি থামার জন্য মনটা ছটফটে হয়ে থাকত। কাফরুলের ছোট্ট একখন্ড জমিতে আব্বার বোনা চারটা পেয়ারা গাছে জুক্কুর দিয়ে পেয়ারা ধরত। সেগুলোর থেকে বেছে বেছে পুষ্ট গুলোকে শুকনার দিনে পলি ব্যাগ বেধেছি নিজ হাতে।
এইটানা বৃষ্টিতে তারমধ্যে বেশিরভাগই পরিপুর্ণ খাবার উপযোগী সাদাটে আর টসটসে হয়ে গেছে নিশ্চয়ই!
কোনরকম বৃষ্টিটা একটু ঝরলেই বাদুড়ের মতো চিকন চিকন ডালে ঝুলে ঝুলে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে পলিথিনে মোড়া ঢাকনার ভেতর থেকে সেই অমৃত খুঁজে তুলে আনা ছিল আমার অত্যন্ত প্রিয়!
ছোটবেলাটা ঠিক একটা মলমের মতো! ভাবতেই বয়সের ক্ষতে এক অদ্ভুত আরাম!!
10/07/2025
শিক্ষার্থীর ওপর সবচেয়ে বড় চাপ তার অভিভাবকের প্রত্যাশা। তারপর সহযোদ্ধাদের ফলাফলের চাপ। তারপর ফলাফল প্রকাশের পর থেকে প্রতিটা দিন, নিজের মোকাবেলা করা, যতক্ষণ নিজেকে প্রমান করতে না পারছে।
এটা যে কতো বড় ট্রমা, আমি নিজের জীবনে যেমন জানি। নিজের দুই মেধাবী সন্তানকে একসাথে বড় করার পথে একটু একটু করে আরো বেশি বুঝেছি।
অভিভাবক হিসাবে আমাদের প্রত্যাশা কোনদিন কমে নাই, সবকিছু জেনে বুঝেও। মানুষ যে।
তবে, অনেকবার আমি, কিংবা আমার সন্তানেরা প্রত্যাশা ছুয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছি।।
ঠিক সেই সময়টা জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন শিক্ষার্থীর জন্য, সমানভাবে মা-বাবার।।
'ফলাফল খারাপ হলে, মন খারাপ করোনা, এটাই শেষ কথা নয়'... এইসব বলা অনেক সহজ। কিন্তু এটাকে বয়ে নেওয়াটা অনেক কঠিন।
সবার সহযোগিতা ছাড়া, এ সময়টুকু দূর্বিষহ।।
যাদের ফলাফল খুব ভালো হয়েছে, খুশি হও, উৎযাপন করো, কিন্তু যে পারেনি তাকে উপহাস করো না।
আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব বারবার তার কাছে তার ফলাফল জানতে চেও না। তার বাবা মাকে 'আহা, কেন এমন হলে!' 'খারাপ করলো কেন?' বলো না। বরং বলো, 'বাহ! এইচ এস সি তে সময় কম থাকে। মন দিয়ে পড়তে শুরু করে দিক!'
বাবা-মার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন। এই সময়ে একটুও বকা বা কটু কথা না। কী কী ভুল করেছে সেগুলোও এখন বলবার দরকার নাই। আমার আব্বা রেজাল্ট বের হলেই মিস্টি আনতেন। কী রেজাল্ট হলো সেটা বিষয় না। মিষ্টি খেয়ে বিলিয়ে পরিবেশ হাল্কা হয়ে যেত।
আর শিক্ষার্থী শোনো!! জীবনের অনেক পরীক্ষার মতো 'এই যে, যে কোন ফলাফলকে মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়াটাই আরেকটা পরীক্ষা।' বাবা-মার যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনই তোমারও। মাথা ঠান্ডা করো। বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরো। তারও কষ্ট তোমার সমান।
মনে রেখ, 'পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হয়েছে, কোনো ব্যাপার না' এই কথাটা ভুল।
ঠিক কথা হলো, 'নিজেকে বলো, ok,, যা হওয়ার হয়ে গেছে, সেটা নিয়ে পরে থাকলে চলবে না। বরং, আজকের ফলাফল আমাকে সামনের দিনগুলোর জন্য আরো সতর্ক একজন করে তুলুক!'
চলো পিছনের দিকে তাকিয়ে থেকে কোনে বোকামী না করি। চলো সামনের দিনটাকে কাজে লাগাই।
মনে রেখ 'শ্বাস থাকলেই আশ'।।
সকল এসএসসি-২০২৫ শিক্ষার্থীর জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।।
13/05/2025
ধারনা করা হচ্ছে ছেলেটা বারান্দার রেলিং এ বসেছিল। অসাবধানতায় সেখান থেকে নিচে পরে যায়!
আমি আমার সকল চেনাজানা ছেলেমেয়েদের বার বার শুধু একটা কথাই বলি, 'নিরাপদে থাকার চেষ্টা করাটাই প্রথম চাহিদা হবে জীবনে। বিশেষ প্রয়োজনে ঝুঁকি নেওয়াটা ভিন্ন বিষয়!"
'Safety first!'
সবাই বলছে বাবা মার কী হবে, কেমন করে মানবে? আর আমার বুকে বাজে, 'আহারে ছেলে! জীবনের সব রং দেখা বাকী রয়ে গেল তোর! কেন রেলিং এ উঠে বসলি!!?'
নটর ডেমের ফটকে অপেক্ষা করছিল বাবা, ভেতর থেকে এল ছেলের রক্তাক্ত দেহ রাজধানীর নটর ডেম কলেজের এক শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।
30/04/2025
অক্টোবর ২০২২ এর লেখা। ২০২২ এর নিজের হজ্বের অভিজ্ঞতার কিছু কথা। ৯ পর্ব লিখেছিলাম, তারপর আর মনো সংযোগ করতে পারিনি।
প্রতিবছর হজ্বের আগে লেখাটা শেয়ার করি, যদি কারো কাজে লাগে🙏
পর্বঃ ৯
হজ্জ কার উপর ফরজ, আমরা মোটামুটি সবাই জানি। তবু আরেকবার বলি। শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে সামর্থ্যবানের জন্য হজ্জ করা ফরজ।
মনে রাখবেন 'শারীরিক' এবং 'অর্থনৈতিক'!
অনেকেই শুধু অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু শারীরিক সামর্থ্যও সমান প্রয়োজন। আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটাকে কম গুরুত্ব দেই।
আপনি যদি হার্ট পেসেন্ট হন, লো প্রেসার বা হাই ব্লাড প্রেসার ইত্যাদি নিয়মিত কিছু শারীরিক দুর্বলতায় পৌঁছে গিয়ে থাকেন, তাহলে প্রথমে নিজেকে হজ্জের কায়িক পরিশ্রমের জন্য প্রস্তুত করুন। হজ্জের দু' তিনমাস আগ থেকেই নিজের প্রেসারকে কন্ট্রোলে আনুন। বেশি বেশি ব্যায়াম এবং হাটার অভ্যাস করুন, অন্তত প্রতিদিন একঘন্টার বেশি পরিশ্রম করুন। নিজেকে গরমে, ঘামে, হাটাহাটিতে পরিচিত করে নিন। এমনকি যারা সুস্থ অথচ জীবনযাপনে আরাম প্রিয়, তারা সুস্থ শরীরে গিয়েও অসুস্থ হয়ে পরেন।
ঠিক এই ব্যাপারটাই আমাদের মুযদালিফায় হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। মাঝরাতে ওনাকে যখন ডেকে দেওয়া হয়, উনি ঘুম চোখেই রওনা হলেন। কাছাকাছি টয়লেট পার হয়ে চলে গেলেন সামনে। কতদুর চলে গিয়েছিলেন জানা যায় নাই। পরে উনি সেন্সলেস হয়ে পথে পরে যান।
আশেপাশের মানুষ তাকে মুখে পানি দিয়ে জ্ঞান ফিরালেও, ভাই তখন কিছুই মনে করতে পারছিলেন না, ফলে তাদের কোন তথ্যও দিতে পারেননি।
মুযদালিফায় ময়দানে সবার তাড়া থাকে, সুর্য ওঠার আগেই বেরিয়ে যাওয়ার, হয়ত সেজন্যই জ্ঞান ফেরার পর তাকে নিয়ে আর ব্যস্ত থাকেনি কেউ।
এর পরের ঘটনা ভীষণ আশ্চর্যজনক।
উনি জ্ঞানহীন অবস্থায় কাগজপত্র ও অর্ধেক ইহরাম ছাড়াই ভিড়ের সাথে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলেন জামারাতে। লোকের কাছ থেকে পাথর চেয়ে নিয়ে পাথরও মারলেন। এবং পথ চিনে আমাদের আগেই হোটেলে পৌঁছে গেলেন।
মুযদালিফা থেকে জামারার দুরত্ব ৬ কিমি এর মতো। এ পথটুকু সবাইকে হেঁটে যেতে হয়। স্বাভাবিক সুস্থ মানুষ আমরা যখন হেঁটে যাচ্ছিলাম তখনও ভিড়ের মধ্যে দলছুট হয়ে পরবার পুরো সম্ভাবনা থাকে। মাঝেমাঝেই এক দলের অংশবিশেষ ভিড়ের চাপে ঢুকে যায় আরেক দলের মাঝখানে। তখন বাকিরা দলছুট হওয়ার ভয়ে হুড়োহুড়ি শুরু করে। অথচ পথ একটাই। সময়ও হাতে আছে। দৌঁড়ে পৌঁছাতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নাই। সুতরাং খুব শান্তশিষ্ট ভাবে হেঁটে যাওয়াই উত্তম।
আরো ভালো হয়, যদি মিনায় যাওয়ার আগে, মানে ৮ই জিলহজ্জের আগেই জামারা থেকে মিনা এবং নিজেদের হোটেলে ফেরার পথটা চিনে রাখা যায়। আমরা যদি ৬ই জিলহজ্জ শিশায় বসে না থেকে জামারাতে যাওয়া আসার পথটা ব্যাক্তিগতভাবে চিনে রাখতাম, তাহলে দলের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে না আগালেও চলতো। ধীরে সুস্থে জামারায় পৌছাবো, পাথর ছুড়ে মারব, নিজের মনে একটু দোয়া পড়ব, তারপর আবার ধীরেধীরে ফিরে যাব মিনা অথবা হোটেলে।
কিন্তু যেহেতু আমরা পথ চিনি না, হজ্জ গাইড মুনির ভাইও হোটেলে ফিরবার পথ চিনে না..ব্যাস উল্টো পথে হেটে আরো দুই কিমি চলে গেলাম। প্রচন্ড রোদ। পিপাসায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। ক্ষুদাও পেয়েছে। পথে জায়গায় জায়গায় পানির কল, থেমে থেমে পানি খাই, মুখ ভিজাই আবার হাটি..! খেজুর ছিল, বিস্কিট, আপেল। ভাগাভাগি করে তাই খেয়ে হাঁটি হোটেলের দিকে..
ব্যক্তিগতভাবে আমি কিন্তু হাঁটতে পারি না। একবারে দুই কিমি কখনো হেঁটেছি বলে মনে পরে না। হজ্জের আগে একটু হাঁটতে শুরু করেছিলাম। সর্বোচ্চ চল্লিশ মিনিট, ঢাকার সন্ধ্যার তাপমাত্রায়।
আজ সেখানে দশ থেকে বারো কিমি হেঁটেছি। ছায়ায়, ভোরের আলোয়, তারপর গনগনে সুর্যের তাপে। সেইসাথে পিঠে বোঝা, ক্ষুধা তৃষ্ণা!
হজ্জের এই অংশটুকুর জন্যই প্রয়োজন শারীরিক সামর্থ্য।
আমাদের সাথে একজন অল্পবয়সী বউ ছিল। পাথর মেরে জামারা থেকে বের হয়ে সে রাস্তায় বসে পরল। জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে, দাঁত লেগে যাচ্ছে। সবাই তাড়াতাড়ি একটু ছায়া দেখে দাড়িয়ে পরলাম। মেয়েটার মুখে মাথায় পানি ছিটিয়ে, আঙুল ঢুকিয়ে দাঁত ছুটানো হলো। হয়তো হাইপো, কিংবা প্রেসার লো। তার মুখে খেজুর দিলাম। একজন কেউ চকলেট দিল।
আমাদের সাথেই এক রিটায়ার্ড বিধবা ভদ্রমহিলা ছেলের সাথে এসেছেন। অসুস্থ নন, কিন্তু শারীরিক সামর্থ্য কম, উনি হুইল চেয়ার নিয়েছিলেন।
উনি ওনার হুইল চেয়ারটা মেয়েটাকে দিলেন, নিজে হাঁটতে শুরু করলেন।
তখনো ভাইয়ের কোনো খবর জানি না। ভাবি নিস্তব্ধ হয়ে আছেন। তার হুইল চেয়ার ঢেলে নিচ্ছে আরেক ভাই। কখনো কখনো বদল হচ্ছে হাত। মাঝে মাঝেই ঢালু রাস্তা। উপরমুখি উঠতে জান বেরিয়ে যায়। হুইল চেয়ার নিয়ে আরো বেশি কস্ট হয়।
আমাদের ৮ জনের কোরবানি মুয়াল্লেমের কোরবানির সাথে হবে না। আলাদা নিজেরা ব্যবস্থা করেছে। মাহমুদ আর কামরুজ্জামান ভাই যাবেন ফার্ম হাউজে। সকাল নটায় সেখানে পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন ভাবি সহ আমাদেরকে হোটেলে পৌঁছে দিতে হবে আগে। আমরা তাই মিনায় না গিয়ে হোটেলের দিকে হাঁটছি।
পথেই ওয়াটস আপ গ্রুপে খবর পাওয়া গেল ভাই হোটেলে ফিরে এসেছেন।
মুহূর্তে পুরো কাফেলায় একটা শোকর গোজার পরিবেশ তৈরি হলো। প্রত্যেকটা মানুষ যেন তার আপনজন ফিরে আসার খবর পেয়েছে। সবাই তার পাশের জনকে বলতে থাকলো, 'এই শুনেছ নাকি, সেই হারিয়ে যাওয়া ভাই ফিরে এসেছেন।'
হোটলে পৌঁছে মাহমুদরা সোজা ডাইনিং এ চলে গেল। খেয়ে বেরিয়ে পরলো কোরবানির উদ্দেশ্যে।
আপাতত আমাদের মেয়েদের আর কোন কাজ নাই। কোরবানি হওয়ার আগ পর্যন্ত ইহরাম অবস্থা। কোরবানি হয়ে গেলে এক কর পরিমান চুল কেটে ইহরাম মুক্ত হয়ে যাব। এখন তাই খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নেওয়া।
এরপর রইল আর একটাই বড় কাজ। কাবা শরীফ তাওয়াফ এবং সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সায়ী করা। আজ করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হতো। কিন্তু মাহমুদদের ফিরতে ফিরতেই বিকেল হয়ে গেল। সবাই সিদ্ধান্ত নিল, আগামীকাল সকাল সকাল চলে যাব 'মসজিদুল হারাম' অর্থাৎ বায়তুল্লাহ। তারপর বিকেলে জামারায় গিয়ে পাথর নিক্ষেপ।
এবং পরের দিন শুধু পাথর নিক্ষেপ...
মনের মধ্যে একই সাথে দুটো অনুভব.. শেষ হয়ে আসল এতোবড় একটা কাজ❤️❤️...শেষ হয়ে যাচ্ছে জীবনের বড় একটা অধ্যায়😢😢
চলবে...
[যদিও এরপর আর লিখি নাই, তবু চলবে টা মুছি না। হয়ত আবার লিখব খানিকটা, অথবা হয়ত এখানেই শেষ!]
30/04/2025
সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২২ এর লেখা। রিপোস্ট করছি। এবারের হাজীদের কথা ভেবে🙏
#নিজের_কথা
#হজ্জ_এবং_কিছু_অভিজ্ঞতা
পর্বঃ ৮
আরাফা থেকে মুযদালিফায় ইচ্ছা করলে হেটেও যাওয়া যায়। কিন্তু আমরা বাসে যাব। এই বাসে ওঠার ব্যাপারটা পুরো হজ্জ কার্যক্রমে সবচেয়ে ভোগান্তির ছিল। হয় সেটা আমাদের মোয়াল্লেমের সমস্যা অথবা সৌদি সরকার বিষয়টা সুন্দর করে হ্যান্ডেল করতে পারছেন না।
আমি জানি না, কেন প্রত্যেক হাজির জন্য বাসের একটা সিট রিজার্ভেশন থাকে না। মানে ধরুন, আমি ৩৯ নম্বর মোয়াল্লেমের ৬টা বাসের ৩নং টির ১৩নম্বর সিট পেলাম। আমাকে সেটা জানিয়ে দেয়া হবে আগেই। প্লেনের মতোই বাস স্টপেজেও আমি লাইনে দাড়িয়ে অপেক্ষা করব। কেবল মাত্র নির্দিষ্ট বাসটিতে আমি উঠতে পারব।
এটা কোন কঠিন বিষয় হবার কথা নয়।
কিন্তু বিষয়টা এমন হয় না। শুধু এয়ারপোর্ট থেকে মক্কা এবং মক্কা থেকে এয়ারপোর্ট এই দুবার বিষয়টা খানিকটা এরকম ছিল।
কিন্তু মক্কা থেকে মদিনা, মদিনা থেকে আজিজিয়ার শিশা, শিশা থেকে মিনা, মিনা থেকে আরাফা...প্রত্যেকবার হাজিদের মধ্যে একটা ছোটাছুটি, কে কার আগে উঠতে পারে.. যেটা হজ্জের সমস্ত সৌন্দর্যকে নস্ট করে দেয়।
আরাফা থেকে মুযদালিফায় যাবার বাস ধরবার জন্য, আমাদের এক সাথি ভাই, উনি আগেও হজ্জ করেছেন, সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই আমাদের নিয়ে সুর্যাস্তের বেশ কিছুক্ষণ আগেই যেখানে বাস দাড়াবে সেদিকে রওনা হলেন।
আমি ভিষণ চিন্তায় পরে গেলাম। সুর্যাস্তের আগে আরাফা ত্যাগ করা যাবে না। আমি খুব ধীরে হাটছি। মাহমুদকে টেনে ধরে স্লো করে দিচ্ছি গতি। আবার দলছুট হয়ে পরার ভয়ে হাটছিও পিছু পিছু।
আরাফা যেখানে শেষ হয় তার কাছাকাছি পৌঁছে সবাই থামলো। মুয়াল্লেমের গাইড কে খুঁজে দলে ভিড়িয়ে নিয়ে বাসের দিকে আগাচ্ছি। বাসগুলো আরাফার সীমানার ভেতরে এসে দাঁড়িয়েছে। (এই জায়গাটা আবছা হয়ে এসেছে মনের মধ্যে। আমরা হয় সুর্যাস্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম গেটের কাছে। অথবা বাস ছিল সীমানার ভেতর। সুর্যাস্তের পরপর বাস ছেড়েছিল।) অসংখ্য বাস পরপর দাঁড়িয়ে। এখন সবাইকে একসাথে রওনা হতে হবে। একই গন্তব্য। কিন্তু যে কোন বাসে ওঠা যাবে না। এমনকি ৩৯ লেখা যে কোন বাসেও ওঠা যাবে না। মুয়াল্লেম এসে ড্রাইভারকে কনফার্ম না করলে বাসে উঠতে দিবে না ড্রাইভার। এদিকে মুয়াল্লেম লোক এনেছে ২৫০ র ও বেশি। সে একজন, সেও দৌড়াচ্ছে। আমরা অনেক যুূূ্দ্ধ করে একটা বাসের দরজার কাছে পৌঁছে দাড়িয়ে আছি। কোত্থেকে মুয়াল্লেম ছুটে এসে ড্রাইভারকে আইডি দেখিয়ে বলে গেল তুলে নিতে। গেট খুলতেই আমরা হুরমুর করে বাসে উঠে পরলাম। সামনেই তিনজনের একটা সিট খালি পেয়ে আমরা মহিলারা তিনজন বসলাম। রুবি ভাবি বসলেন পাশেই ভাই এর সাথে। বাকিরা পিছন দিকে যে যেমন সুযোগ পেল, বসে পরল।
সুর্যাস্তের পরপর বাস রওনা হলো। বাস চলছে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে। দু’পাশের ফুটপাতে হাজার হাজার মানুষ তখনও তাদের বাসের জন্য দাড়িয়ে অপেক্ষা করছে। এই অবস্থা দেখে ভাই এর প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করলাম। ভাগ্যিস উনি বুদ্ধি করে আগেই রওনা হয়েছিলেন। যদি সুর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফার তাঁবুতে বসে থাকতাম, তারপর রওনা হলে বাসই ধরতে পারতাম না।
আমরা ৮ জনের যে দলটা হজ্জে গিয়েছিলাম সবাই পঞ্চাশের আশেপাশে বয়স। একজন ক্যানসার পেসেন্ট। উনি ছাড়া বাকিরা এখনও দৌড়ে বাস ধরবার সামর্থ্য রাখি। কিন্তু যারা বয়স্ক, হুইল চেয়ার হাজি। তারা এই ভিড়ে এভাবে বাস ধরা খুবই বিপজ্জনক।
একথা না বলে পারছি না, 'হজ্জের সময় বাস-সার্ভিস টা টিকেট সিস্টেম হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এবং সেটা সম্ভব।'
হয়ত হবে। সবকিছুই তো সহজ করা হচ্ছে।
যা হোক, আমাদের হজ্জ গাইড বললেন, 'আমরা চেষ্টা করব মুযদালিফায় এমন একটা জায়গায় নামতে যেন টয়লেট কাছে থাকে। এবং সেখানে তাহাজ্জুূদ পর্যন্ত থেকে ভোরের আগেই মুযদালিফার শেষ প্রান্তের দিকে এগিয়ে যাব যেন সুর্য ওঠার আগেই বেরিয়ে পরতে পারি।'
তখন এটাকেই ঠিক-সিদ্ধান্ত মনে হয়ে ছিল। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতার পর মনে হয়েছে, মুযদালিফায় পৌঁছানোর পর থেকে আর তাড়াহুড়োর কিছু নাই।এরপরের কাজগুলোর জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়।
কাজগুলো কি কি একটু বলিঃ
মাগরিবের নামাজ না পরেই আমরা রওনা হয়েছিলাম। সেটাই নিয়ম। হজ্জের দিনগুলোতে এই একটা কাজ সব হাজিকে একযোগে করতে হবেঃ
'৯ই জিলহজ্জ আরাফার ময়দানে থাকা অবস্থায় সুর্যাস্ত যাবে। এবং অনতিবিলম্বে আরাফা ত্যাগ করতে হবে। রওনা হতে হবে মু্যদালিফার উদ্দেশ্যে।'
এরপর থেকে কাজ গুলোর জন্য সময়কাল পর্যাপ্ত।
১) ১০ই জিলহজ্জ রাতে মুযদালিফায় পৌঁছানো
২) পৌঁছেই জামাতে মাগরিব ও এশার কসর নামাজ আাদায়।
৩) মুযদালিফায় রাতে ঘুমানো।
৪) ফজরের নামাজ পরার পর বেশ কিছুক্ষন মুযদালিফা থাকা।
৫) বেশ একটু ফর্শা হয়ে আসলে, সুর্য উদয়ের আগেই মুযদালিফা ত্যাগ করা।
আমরা সম্ভবত রাত বারোটা নাগাদ মুযদালিফায় পৌঁছালাম।
মুযদালিফায় কিন্তু কোন তাঁবু থাকে না। খোলা প্রান্তর। বাসে মাহমুদের সিট পরেছিল পিছন দিকে। আমি বাসের সামনের দিকে ছিলাম। বাস থেকে নেমে আমি, রুবি ভাবি আর ভাই একটু এগিয়ে দাঁড়িয়ে প্রান্তর জুড়ে শুয়ে থাকা মানুষদের দেখছি। চাঁদের আলো, মাঠের অন্ধকার দুর করতে পারছে না। এরমধ্যেই বাস চলে যাওয়ার শব্দ পেয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি মাহমুদ সহ বাকিরা নাই। বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠল। মুহুর্তে মনে হল আমি মাহমুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। অবচেতনে মুখ দিয়ে উচ্চস্বরে বেরিয়ে আসল 'মাহমুদ কই? মাহমুদ?' এবং ছুটে গেলাম যেখানে বাসটা ছিল সেখানে।
সামনেই নিজের এবং আরো কারো একটা ব্যাগ কাধে বিভ্রান্ত মাহমুূদ আমাকে খুঁজছে।
পুরো হজ্জ সময়কালটাতেই হারিয়ে যাওয়ার ভয় বা বলা যায় মাহমুদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আমাকে অস্থির করে রাখত। বিষয়টা খানিকটা বাতিকের মতো হয়ে গিয়েছিল।
এবং বাস্তবে সেই রাতে আমাদের দলেরই একজন মুযদালিফায় হারিয়ে গেল।
মুযদালিফায় হারিয়ে যাওয়া বা দলছুট হয়ে পরার সম্ভাবনা অনেক। কারন কয়েকটি। এক- রাতের অন্ধকার। দুই- খোলা ময়দান। তিন- বাস থেকে নামিয়ে দিচ্ছে যে কোন অনির্দিষ্ট স্থানে। চার- মিনা এবং আরাফার ব্যতিক্রমী জীবনযাপন একটা ঘোর তৈরি করে। ইত্যাদি।
সুতরাং মুযদালিফার সময়টুকু খুব সতর্ক থাকতে হবে। নিজেদের দল থেকে কোনভাবেই যেন আলাদা না হন। অন্ধকার ময়দানে নিজের জায়গা থেকে স্রেফ দশ গজ দুরেও আপনার সবকিছু অচেনা মনে হবে। আপনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পরার পর দল যদি তার জায়গা বদল করে তাহলেও আপনি আর দলকে খুঁজে পাবেন না।
তবে মুযদালিফায় হারিয়ে গেলে বা দলছুট হলে, মনে রাখবেন, সুর্যোদয়ের আগেই মুযদালিফা থেকে বেরিয়ে পরবেন। সকল হাজিরা তখন একই গন্তব্যের দিকে হাটে, জামারার দিকে। তাই আপনি শুধু ভিড়ের সাথে আগাতে থাকুন। পৌঁছে যাবেন জামারাতে। এবং দলের লোকজনকে বলে রাখুন, দলছুট হয়ে পরলে আপনাকে যেন জামারায় পাথর নিক্ষেপ করার পর জামারা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথের মুখ এসে খুঁজে নেয়।
এছাড়া আপনার আইডি অথবা/এবং হাতের বেল্ট টি যত্ন করে সাথে রাখবেন। তাহলে সৌদি পুলিশ সেটা থেকে তথ্য নিয়ে আপনাকে আপনার মুয়াল্লেমের কাছে পৌঁছে দিবে।
যা হোক, মুযদালিফায় বাস আমাদের নামিয়ে দিয়ে গেল পথের ওপর। যেখানে নামাল আমরা সেখানেই মেয়েরা আর ছেলেরা দুটো দলে যার যার চাদর পেতে নিলাম।
রাস্তার ওপারেই টয়লেট এবং অজু করবার জায়গা। সবাই অজু সেরে এসে জামাতে নামাজে দাড়াল। কিবলা মুখি হয়ে দাড়াতে গিয়ে দেখা গেল মেয়েরা সামনে পরে যাচ্ছে। তখন শুধু ছেলেরাই জামাতে প্রথমে মাগরিব তারপর এশার নামাজ পরে নিল। মেয়েরা নিজেদের মতো নামাজ পরলাম।
বাসে এক বাক্স শুকনা খাবার দিয়েছিল। অনেকেই সেটা এখন খেয়ে নিল। কেউ কেউ চিড়া ধুয়ে খেল।
মুযদালিফায় রাতটা কাটিয়ে কাল সকালে জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করতে যেতে হবে। তাই সবাই যার যার পাথর কুড়াতে নেমে পরল।
আমরা চাদর পেতেছি নুড়ি পাথরেরই ওপর। সারাটা
জমিন ছোট ছোট পাথরের সমষ্ঠি। বিছানায় বসেই পাথর সংগ্রহ করা যায়। তবু আমি চাদর ছেড়ে উঠলাম।
কাল সকালে পাথর লাগবে ৭টি। ১০ই জিলহজ্ব শুধু বড় জামারাতে পাথর মারতে হবে সুর্য মধ্যম আকাশে হেলে পরবার আগেই।
এছাড়াও ১১ ও ১২ জিলহজ্ব প্রতিদিন তিনটি জামারাতে ৭টি করে ২১টি পাথর লাগবে। কোন কারনে ১২ তারিখ রাতে মিনায় থেকে গেলে, ১৩ জিলহজ্জও পাথর মারতে হবে।
মোট পাথর নিবেন (৭+২১*৩)= ৭০টি বা তার চেয়ে কিছু বেশি।
আমাকে বলা হয়েছিল পাথর হবে ছোলা বা বুটের সাইজের, এবং একটু যেন মসৃন গোলাকার হয়। আমি সেই মতো খুব সুন্দর দেখে প্রায় ৮০/৮৫ টা পাথর নিলাম একটা ছোট কাপড়ের ব্যাগে। যদিও পরে দেখেছি, বিভিন্ন জন বিভিন্ন আকারের পাথর নিয়েছিল।
পাথর কুড়ানো হয়ে গেলে সবাই নুড়ি পাথরের ওপর চাদর পেতে শুয়ে পরল। অনেকেই শুয়েই ঘুমিয়ে পরল। কিন্তু আমার ঘুম আসলো না, চাদরের নিচে পাথরগুলো থেকে যেন আগুনের হল্কা বেরুচ্ছে। তখন দোজখের আগুনের কথা ভেবে ভয় হলো। এই সামান্য সহ্য করতে পারছি না। ভীষণ ক্লান্তি স্বত্তেও কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে উঠে পরলাম।
একটা পাকিস্তানি পরিবার পাশে বসেছিল। তাদের সাথে দুজন টিনএজার এবং একটা বাচ্চা মেয়ে। মা সহ চারজনের পরনেই কালো বোরকা। ওরা কোন চাদর টাদর পাতল না। মাঝে মাঝে আমাদের দলের হুইল চেয়ারগুলোতে পালা করে বসছে। মেয়েদুটোকে আমার চাদরে বসতে বললাম। ওরা বসে পরল পাশে, তারপর মোবাইলে ডুবে গেল😢।
আমি উঠে টয়লেটের কাছে গিয়ে লম্বা লাইন পেলাম। বেশ অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। এদিকে গাইড মুনির ভাই সবাই কে তাড়া দিচ্ছেন। তাহাজ্জুদ পরে নিয়ে আমরা সামনের দিকে আগাব। নিজে অজু করে বসার জায়গায় ফিরে এসে পিছনে তাকিয়ে দেখে নিলাম মাহমুদ উঠেছে কিনা। এতো কাছেও বোঝা যায় না কোনটা মাহমুদ।
পুরো মাঠ জুড়ে ন্যাড়া মাথার সাদা ইহরাম পর পুরুষ মানুষ গুলোকে আলাদা করা যায় না। সবাইকে একরকম লাগে। বিশেষ করে শুয়ে থাকা মানুষগুলোকে আরো একরকম মনে হয়।
সৌদি আরবে এসে মাহমুদ একটা সাদার ওপর সবুজ টুপি পড়ে। মসজিদে লোকের ভিড়ে সেই টুপি দেখে মাহমুদকে সহজেই আলাদা করতে পারি। কিন্তু ইহরামের সাথে তো টুপি পড়ে না, আর এখন তো শুয়েই আছে। তাকিয়ে থাকতে দেখে মাহমুদ উঠে এসে জানতে চায়, কিছু লাগবে কিনা? বলে যায়, গুছিয়ে ফেলো, রওনা দিতে হবে।
মুযদালিফায় এসে আমি ভাবিদের থেকে আলাদা হয়ে পরেছিলাম। অন্য পাশে রুবি ভাবি উঠেছেন দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু সায়মা ভাবি আর মুক্তা তখনো ওঠে নি। আশেপাশের লোকেরা তাদের জাগাতে চেষ্টা করছেন।
এদিকে গাইড তাড়া দিচ্ছেন। আমরা যারা নামাজ পরে নিয়েছিলাম তারা ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। মোটামুটি সবাই গুছিয়ে নেওয়ার পর সবাই আছে কিনা এটা চেক করতে গিয়ে দেখা গেল আমাদের সাথের এক-ভাই ঘুম থেকে উঠে টয়লেটে যে গেলেন এখনো ফিরে আসে নি।
সাধারণ ব্যাপার।
ঘুম থেকে উঠে টয়লেটে গিয়েছে। ফিরে আসতে দেরি হচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষন অপেক্ষা করেও যখন উনি ফিরছেন না, সবাই টয়লেট গুলোতে খুঁজতে গেল। কোথাও নাই।
মাহমুদ ঘাম দিচ্ছে। কি হবে এখন? কাছের টয়লেটের পরের সারির টয়লেট গুলোতেও দরজায় নক করে লোক বের করে করে দেখে আসল। সেখানেও নাই।
ভয়ের ব্যাপার হলো, উনি যেহেতু ঘুম থেকে উঠেই টয়লেটে গেছেন তাই তার সাথে কিছু নাই। আইডি, মোবাইল, এমন কি ইহরামের উপরের কাপড় টাও না।
সবচেয়ে প্রথম, খারাপ কথা গুলোই মনে আসে। স্ট্রোক করল কি? পথে ঘাটে পরে রয়েছেন কি? যদি তাই হয়, চিকিৎসা পেতে দেরি হলে!!
কাফেলার সবাই সিদ্ধান্ত নিল, আপাতত এখানেই ফজর পর্যন্ত বসবে, তাহলে উনি যদি ফিরে আসেন আমাদের খুঁজে পাবেন।
প্রত্যেকটা মানুষের এটা ফরজ হজ্জ। জীবনে আর কখনো আসার সুযোগ হবে কিনা! সবাই চিন্তিত। কি করবে এখন। যিনি হারিয়ে গেছেন তার স্ত্রী এবং বোন রয়েছে আমাদের সাথে। এদিকে সুর্য উঠবার আগেই মুযদালিফা ছাড়তে হবে।।
সবাই ভাই এর উদ্দেশ্যে দুরাকাত নফল নামাজ পরলাম। একসাথে হাত তুললাম আল্লাহর কাছে।
পাশেই আরেক কাফেলার লোকেরা মাইক নিয়ে এসেছে। দেখেই মাহমুদ দৌড়ে গেল। তারাও বাংলাদেশি। মাইকটা চেয়ে নিয়ে হারানোর এনাউন্সমেন্ট করা হলো।
এরপর ভাবির সাথে বসল সবাই। সুর্য উঠে যাবার আগেই মুযদালিফা ছাড়তে হবে। ভাইকে এই ময়দানে ছেড়ে যাওয়া লাগবে! একজন স্ত্রী হওয়ার কারনেই ভাবির বুকের ভেতরে চলতে থাকা ঝড় আমাকেও সমান স্পর্শ করলো। কায়মনোবাক্যে বার বার শুধু বলতে থাকলাম, 'আল্লাহ, ভাইকে সুস্হ অবস্থায় ফেরত দিও! সুস্থ ফেরত দিও!'
ভাবিকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে এক উদ্বিগ্ন, শোকাহত কাফেলা জামারার উদ্দেশ্যে রওনা হল!
30/04/2025
২০২২ এর হজ্ব থেকে ফিরে ৯ পর্ব নিজের অভিজ্ঞতা গুলো লিখেছিলাম। প্রতিবার হজ্বের আগে, মনে হয় আবার শেয়ার করি। যদি কারো কাজে আসে।
#নিজের_কথা
#হজ্জ_এবং_কিছু_অভিজ্ঞতা
পর্বঃ ৭
দশদিন চলে গেল। লেখায় মন বসাতে পারছি না। অথচ এই লেখাটা আমার শেষ করতেই হবে। নিজের সঙ্গে নিজের বাজি। অফিস, পারিবারিক কিছু বিশেষ দায়দায়িত্ব আর মুষলধারার বৃষ্টি নিজের মনোযোগকে একত্রিত হতে বাঁধা দিচ্ছে। হালকা হওয়ার জন্যে মাঝে মাঝে তুচ্ছাতিতুচ্ছ আনন্দে নিজেকে ডুবিয়ে দিচ্ছি...।
সামনে শুক্র আর শনির ছুটি। মনকে একত্রিত করার চেষ্টা করা যাক।
গত পর্বে থেমেছিলাম মিনাতে আমার জন্য বরাদ্দ এক টুকরো ম্যাট্রেসে এসে। সেইখান থেকেই সামনে আগানো যাক।
শিষা থেকে মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ৬টা বাসের মধ্যে আমাদেরটা সবার শেষে ছেড়েছিল। মিনায় পৌঁছে দেখি আমরা পৌঁছে গেছি দুটা বা তিনটা গাড়ির আগেই। তাই তাঁবুতে তখনও অনেক বিছানা দখল হতে বাকি।
সত্যিই সবাই জমি দখলের মতো যার যার মালামাল ছুড়ে দিয়ে বিছানা দখল করছে। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। অথচ তখনও প্রচুর জায়গা ফাঁকা। মুক্তা আর সায়মা ভাবি আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন। আমি এবং রুবি ভাবি তাদের পাশেই জায়গা নিলাম।
মাটিতে ফোমের ম্যাট্রেস, সাদা চাদর পাতা। একটা মাঝারি সাইজের বালিশ। সব ধবধবে সাদা। তাই বিছানার চাদর আর প্লাস্টিক বালিশ এখানে বের করার দরকার হলো না। প্রায় সবাই যার যার বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে, বিছানার পায়ের কাছেই যার যার ব্যাগ। আমিও পা লম্বা করে দিয়ে বসে পরলাম। বসে বসে দেখছি। নানান রকম মানুষ। বেশিরভাগ আমার বয়সী বা আমার থেকে বয়স্ক। কমবয়সী মেয়ে পাঁচ-ছয় জন। বাংলাদেশের লোকেরা সচ্ছল হওয়া স্বত্তেও অল্প বয়সে হজ্জ করে না। আমিও তার বাইরে না। যুক্তি হলো হজ্জ ধরে রাখা যাবে না। যদিও বিষয় টা ধরে রাখার নয়। তোমার ওপর ফরজ হওয়া মাত্র আদায় করো। নিজের স্বার্থেই। কেননা, যত বয়স বাড়বে শরীরের সামর্থ্য কমবে।
একটু পরই রাতের খাবার নিয়ে এলো। লেবানিজ রুটি আর চানা ডাল। ফল আছে সাথে। আপেল নাকি মাল্টা, ভুলে গেছি। ম্যাট্রেস গুলো এমন করে পাতা, মাঝে কোন জায়গা নাই। যে দু'জন হজ্জ গাইড খাবার দিতে এসেছে, তাদের জন্যে মহিলাদের ভেতর দিয়ে যেয়ে সবার হাতে খাবার পৌঁছে দেওয়া কঠিন হবে। কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকল। সুযোগ পাওয়া মাত্র ভিরে গেলাম ডিস্ট্রিবিউশন এর কাজে। ছোট ছোট ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের বাটিতে ডাল। কিন্তু রুটি ৬টা করে এক ব্যাগে। পলিব্যাগ ছিড়ে একেকজন কে দুটো করে দিতে হবে। ম্যাট্রেসের ওপর কিন্তু হাটা যায় না, পা ডেবে যায়। লোকের ঘাড়ে উল্টে পরার বন্দোবস্ত।
তবু হাতে হাতে সব বিলি হয়ে গেল। নিজেরটা নিয়ে বসেছি। এ জিনিস সত্যিই খাওয়া যায় না। এই রুটিটা গ্রিল চিকেন দিয়ে র ্যাপ বানালে মজা করে খাওয়া যেত। মাখোমাখো ডাল দিয়ে এই শক্ত রুটির একটা খাওয়াই একটা পরীক্ষা। আমার একপাশে রুবি ভাবি, অন্যপাশে দুর গ্রাম থেকে আসা মাঝ বয়সী একজন, হয়ত আমারই বয়সী হবে কিন্তু গ্রামের জীবনের ধুলোমাটির ছায়া বয়সের তুলনায় আরো বুড়িয়ে দিয়েছে তাকে।
উনি খাবার নেয় নাই। খেতে খেতে টুকটুক করে গল্প হতে থাকলো..
'খাবার নিলেন না, রাতে কি খাবেন তাহলে?'
উত্তরে বললেন, এদের খাবার উনি খেতে পারেন না। বমি পায়। গ্যাস হয়। গত পনের দিন মুলতঃ চিড়া আর গুড় খেয়ে থাকছেন। রোগা একজন মানুষ। পনের দিনে ওজন আরো কমেছে। কথা বলেন আঞ্চলিক ভাষায়। হজ্জের কি করনীয় কিছু বোঝেনও না। এবছরের ধান ব্যাঁচা টাকা দিয়ে হজ্জে এসেছেন স্বামী স্ত্রী দুজনে। বুঝতে পারছি, গ্রামের স্বচ্ছল গৃহস্থ। শুধুই ধান বেঁচে নয়, সে যেটুকু বুঝতে পারবে তাকে সেটুকুই জানানো হয়েছে।
বলল, 'দুজনের প্রায় ১৩/১৪ লাখ টাকা লেগেছে।'
বেড়ে ওঠা, পারিপার্শ্বিকতা, শিক্ষা, মুল্যবোধ... সবদিক থেকেই মানুষটা আমার থেকে সম্পুর্ণ ভিন্ন। তবু মিশে যেতে আমার কোন সমস্যা হলো না। পাশাপাশি শুয়ে গল্প হলো অনেকক্ষণ। কথা বলতে বলতে উনি একসময় ঘুমিয়ে পরলেন।
আমি হজ্জ গাইডটা নিয়ে বিছানায় কাত হলাম।
হজ্জ শুরু হয়ে গেছে। করনীয় কাজ গুলো জেনেছি আগেই। এখন শুধু একটা কাজ করবার পর পরবর্তী কাজের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখা।
হজ্জের কোন ফরজ যদি বাদ বা ভুল হয়, তাহলে হ্জ্জ বাতিল হয়ে যাবে।
হজ্জের ওয়াজিব বাদ পড়লে বা ভুল হলে হজ্জ বাতিল হয় না, তবে প্রতি ভুলের জন্য মক্কা শরীফেই একটি কোরবানি দিতে হয় যাকে 'দম' বলে।
আর কোনো সুন্নত ছুটে গেলে তার জন্য হজ্জ বাদ হয় না বা দম দেওয়ারও প্রয়োজন পরে না। তবু সুন্নত কেন ছুটে যেতে দিব, আদায় করার সর্বোচ্চ চেষ্টা তো থাকতে হবে মনে।
গতপর্বে আমরা হজ্জের সব কাজগুলো ক্রমানুসারে জেনেছি। আজ সেটাকে একটু 'ফরজ', 'ওয়াজিব' আর সুন্নতে ভাগ করে নেওয়া যাকঃ
ফরজঃ
#ইহরাম এবং/বা হজ্জের নিয়ত করা
#আরাফার ময়দানে অবস্থান করা
#তাওয়াফ করা।
(এর কোনটি বাদ পরলে হজ্জ হবে না)
ওয়াজিবঃ
# মুযদালিফায় রাত কাটানো
# পাথর নিক্ষেপ
# সায়ী করা
# কোরবানি করা
#মাথা মুন্ডন/চুল কাটা
#বিদায়ী তাওয়াফ
সুন্নতঃ
হজ্জের বাকি সকল আমলই সুন্নত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:
(১) ইহরামের পূর্বে গোসল করা
(২) পুরুষদের সাদা রঙের ইহরামের কাপড় পরিধান করা।
(৩) তালবিয়াহ পাঠ করা
(৪) ৮ই যিলহজ্জ দিবাগত রাত মিনায় অবস্থান করা
(৫) কেরান ও ইফরাদ হাজীদের তাওয়াফে কুদূম করা। ইত্যাদি।
তবে কোন কারণে সুন্নত ছুটে গেলে দম দিতে হয় না।
প্রথম কথা হলো, মনকে স্থির করুন। বলুন, কোন ভুল করা চলবে না। কারন আপনি জীবনে মাত্র একবার 'ফরজ হজ্জ' করবার সুযোগ পাবেন। প্রথমবার যে হজ্জটি করবেন, সেটাই ফরজ হজ্জ। এরপর যতবারই সুযোগ আসুক জীবনে, সেগুলো সব হয়ে যাবে নফল।
তাহলে, জীবনে মাত্র একবার যে ফরজটি আদায় করতে পারবেন সেখানে সবকাজই যেন ঠিকঠাক করে করতে পারেন সেই চেষ্টাই থাকুক মনে...
মিনায় কোন বিশেষ আমল নাই। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর, দিনের বিশেষ সময় গুলোতে নফল নামাজ, প্রতিবার অজুর পর দু'রাকাত তাহিয়াতুল অজু, কোরান তেলওয়াত বা দোয়া দরুদ পাঠ।
আমরা সমবয়সী চারজন মহিলা একদলে। পাশাপাশি থেকেছি। পুরো হজ্জের সময়টাতে আমাদের মধ্যে একটা অলিখিত সমঝোতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কে কখন ঘুম থেকে জাগবো, কার পরে কাকে ডেকে দিতে হবে এগুলো একটা রুটিনে চলে এসেছিল। আর সেই ছোটবেলার মতো, একজন একটা আমল করছে দেখলেই অন্যরাও সেটা করতে শুরু করেছি। হয়ত একজন সব কাজা নামাজের নিয়তে ২০ রাকাত নামাজ পড়ল, আরেকজন হয়ত কোরানের বিশেষ কোন সুরা পড়ছে, কেউ হয়ত আজ দু'বার তাওয়াফ করেছে, ফজরের নামাজের পর মসজিদে থেকে গেল সুর্য ওঠা পর্যন্ত... এইভাবে একজনের ভালো কাজ দেখে আরেকজন সেটা করতে চেষ্টা করেছি।
আবার দলে থাকার কারনেই মাঝে মাঝে খামোখা গল্পগুজব মেতে উঠে নিজেরাই নিজেদের বলেছি, 'একটু দম না ছাড়লে তো দম বন্ধ হয়ে যাবে!'
যদিও এই গল্পগুজব শয়তানের ওসওয়াসা। এটা এড়িয়ে গিয়ে একমনে দোয়াকালামে ডুবে থাকতে পারলেই সবচেয়ে ভালো। কিন্তু শয়তান দাঁড়িয়ে থাকে আশেপাশেই। সে ডেকে নিয়ে গল্পে বসায়, কখনো গিবত করায়, কখনো মতবিরোধ সৃষ্টি করায়।
'আল্লাহ যখন হাজিদের মাফ করে দিতে থাকেন, শয়তান তখন রাগে দুঃখে নিজের মুখে মাটি মাখায়' এমন কিছু আমি শুনেছিলাম। হজ্জের সময়ে এবং তারপর বাড়ি ফিরেও বেশ কিছুদিন আমার মনে হতো মাটি হাতে শয়তান কে আমি আমার সামনে বা পাশেই অনুভব করছি। যখনই আমার হজ্জের নমনীয়তা ভেঙে পরত, আমি যেন দেখতাম পাশেই শয়তান মাটি ফেলে দিয়ে মহা খুশিতে হাত তালি দিচ্ছে। মাঝে মাঝে বাসার লোকজনের সাথে হঠাৎ হঠাৎ কোন কান্ড করে ফেলে, বলেছিও সে কথা।
সেই ঘোর, সেই আচ্ছন্নতা, হজ্জের সেই আধ্যাতিকতা, সব কেটে যাচ্ছে.. কেটে গেছেই!
সকালে তাবুর বাইরে বড় বড় ফ্লাস্কে চা রেখে গেছে কেউ। সরকার হতে পারে। তাবু থেকে বেরিয়ে চা আনলাম। সকালে নাস্তা সেই রুটি আর ডাল। আজ সাথে পিনাট বাটার, মাল্টা। তারপর অলস একটা সকাল। কোরান তেলওয়াত, তসবি পরেই সবাই সময় পার করল।
দুপুরে সৌদি বাবুর্চির রান্না করা ভাত সবজি আর চিকেন। আমি সর্বভুক, খেয়ে নিতে ঝামেলা হলো না। কিন্তু লবন ঝাল নিয়ে যাদের সমস্যা তাদের ব্যাগ থেকে কালোজিরার ভর্তা বের হলো। পরস্পর ভর্তা আদান প্রদান চললো।
এভাবেই মিনাতে অলস একটা দিন কেটে গেল। আজ সন্ধ্যায়ই আরাফার উদ্দেশ্য রওনা হতে হবে। মাহমুদ জানাল, 'কিছু মালামাল এখানে রেখে যাব।' আরাফা আর মুযদালিফার জন্য যেটুকু না হলেই নয় তা ব্যাগে গুছিয়ে নিলাম।
যতদুর জানি, ৯ই জিলহজ্জ সুর্য হেলে পরবার আগেই আরাফার ময়দানে অবস্থান নিতে হয় এবং সুর্য অস্ত যাওয়ার পরপরই মাগরিবের নামাজ না পড়েই আরাফা থেকে বের হয়ে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হয়।
কিন্তু বর্তমানকালে আমরা যারা পথঘাট চিনি না, নিজেরা মিনা থেকে আরাফাতে বা আরাফা থেকে মুযদালিফায় যেতে পারব না, মসজিদে নামিরা থেকে ঠিক সময়ের মধ্যে আরাফায় ফিরে আসতে পারব না, তাদেরকে মুয়াল্লেমের প্লান অনুযায়ী কাজগুলো করতে হয়। এবং তখন কিছু কিছু সুন্নত ছুটে যায়।
যেমন ৮ই জিলহজ্জ রাতে মিনায় থেকে ফজরের নামাজ পরে আরাফার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া সুন্নত।
কিন্তু আমরা মিনা থেকে আরাফার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম ৮ই জিলহজ্জ রাতেই।
কারন, ৯ই জিলহজ্জ আরাফায় পৌছাতেই হবে। ঐদিন না পৌছাতে পারলে হজ্জ হবে না। এর কোনো কাফ্ফারা নাই। এছাড়া সুর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান করতে হবে। কোন কারনে এর আগেই আরাফার সীমানা থেকে বের হলে সুর্যাস্তের আগেই ফিরে আসতে হবে। অন্যথায় দম দিতে হবে। এখন, এই লক্ষ লক্ষ হাজিকে একসাথে তো পথে নামানো যায় না। হেটে বা গাড়িতে, যেভাবেই হোক। তাই ধাপে ধাপে রওনা হওয়া..
কারন যাই হোক, এখানে কিছুটা মন কস্ট রয়ে যায়। নিজেরা সব চিনলে, হয়ত ভোরে রওনা দিয়ে, মসজিদে নামিরায় পৌঁছে খুতবা শুনতাম, যোহর আর আসরের কসর ও জমা নামাজ একত্রে পরে, আরাফা অংশে প্রবেশ করে দোয়ায় ডুবে থাকতাম সুর্যাস্ত পর্যন্ত। তারপর নামিরা মসজিদের পাশ দিয়ে হেটে হেটে চলে যেতাম মুযদালিফায়।
কিন্তু এটা আসলে কোনভাবেই সম্ভব না। ভিনদেশ, ভিন্ন ভাষা, যানবাহন স্বল্পতা ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আরাফার সীমানা চিনতে পারা, মুযদালিফার সীমানা চিনতে পারা, সঠিক সময়ের মধ্যে সে জায়গায় পৌঁছানো, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা...লক্ষ মানুষের ভিড়ে..
তাই মুয়াল্লেমের পরিকল্পনা অনুযায়ী ৮ই জিলহজ্জ রাতেই আরাফায় পৌঁছে গেলাম। বাস থেকে নেমে ভেতরটা কেঁপে উঠল। পৌঁছে গেছি আরাফার ময়দানে🙏🙏।
আরাফার তাবু মিনার থেকে আলাদা। এখানে একটা তাবুর ভেতরেই পুরুষ ও মহিলাদের থাকার ব্যবস্থা। তাবুতে প্রবেশ করে বামে পুরুষ আর ডানে মহিলা।
মুয়াল্লেমের লোকেরা মাঝ বরাবর কাপড় দিয়ে পর্দার ব্যবস্থা করছে। এহরামের সাদা কাপড় বেঁধে বেঁধে। কিন্তু সেটা এক মানুষ সমান উচু হলো না। দাড়ালে এপাশ থেকে ওপাশ সব দেখা যায়। এখানে বিছানাগুলো আরো কাছাকাছি।
এবার আমরা পৌছালাম সবার শেষে। তখন শুধু তাবুর দরজার মুখে তিনটা বিছানা একসাথে ফাঁকা। আর কোথাও একসাথে একাধিক বিছানা খালি নাই। মাহমুদ সেখানেই আরেকটা ম্যাট্টেস এনে দিল। যাতে অন্তত একটা রাত একসাথেই চারজন কাত হয়ে থাকা যায়।
আরাফায় পৌঁছে গেছি। কি বিছানা, কি খাবো, কেমনে ঘুমাবো এইসব আসলে তুচ্ছ। বরং আরাফায় যতক্ষণ আছো, ডাকো আল্লাহকে। ক্ষমা চাও। নিজের একাউন্টে ক্রেডিট জমা করো...
আমি বসে পরলাম এক কোনায়। একেবারেই তাবুর দরজায় পরে গেছে একটা বিছানা। লোকের যাতায়াতের পথ। রুবি ভাবি তাবুর ভেতরের দিকে একটা সিট পেলেন। রাতের জন্য উনি সেখানে চলে গেলেন।
এরমধ্যেই আরো লোক ঢুকছে। তাদের মধ্যে দুজন সেই বাড়তি বেডটাতে জায়গা নিল। আরো একটা ম্যাট্রেস কেউ দিয়ে গেল।
জায়গা ফাঁকা রইল না। এরমধ্যেই অজু সেরে এসে কেউ কেউ নামাজে বসে গেছে। আমিও অজু করে আসলাম।
মিনার সাথে আরাফার অবস্থানের পার্থক্য একটাই, পুরুষ এবং মহিলারা এক তাবুতে। এখানে তাবু বড়, একটাতেই অনেক মানুষ। পুরুষরা আপনাকে দেখতে পাচ্ছে। সুতরাং এখানে আপনাকে শোয়া- বসা, চলাফেরায় পর্দার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। আর সব একই রকম।
রাতটা নামাজ, আমল আর এর ফাঁকে ফাঁকে এক কাতের ঘুমে ভোর হয়ে গেল।
ভোরে উঠেই হাজিরা একে একে গোসল করে নিতে শুরু করল। শুনলাম আরাফায় গোসল করাটা সুন্নত। কিন্তু বাথরুমের অবস্থা ভালো নয়। সেখানে উপর থেকে এসির পানি সারা বাথরুমে শাওয়ারের মতো পরছে। ভেতরে ঢুকে, বাথরুম পর্যন্ত পৌঁছাতে একবার ভিজব। আবার বাথরুমের জন্য ভিজেই লাইনে দাড়ানো, আবার ভিজে বেরিয়ে আসা...নিজেকে পাক পবিত্র মনে হয় না তখন আর। তাই আমার এই সুন্নতটাও ছুটে গেল। আমি পারত পক্ষে বাথরুম মুখো হলাম না।
আজ শুক্রবার! সবাই বলাবলি করছিল, এটা খুবই সৌভাগ্যের ব্যাপার। কারো কারো মতে জুমার দিনের হজ্জ জুমার দিন ছাড়া অন্য দিনের তুলনায় ৭০ কারো মতে ৭২ হজ্জের সমান। কিন্তু এর পক্ষে কোন সহীহ হাদিস নাই। ১৪০০ বছর পর এই সব বিষয় গুলোর সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ নাই। তবে নিঃসন্দেহে শুক্রবার মুসলমানের জন্য উত্তম দিন। রয়েছে দোয়া কবুলের বিশেষ মুহুর্ত, আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত কোন একটা সময়ে। সব হাজির মন তাই উৎফুল্ল।
৭০ বা ৭২ হজ্জ হোক না হোক, শুক্রবারে আরাফার ময়দানে থাকতে পারাটাই অনেক বড় পাওয়া। থেকে থেকে এই বিষয়টাও মনকে শিহরিত করছে।
মনের মধ্যে একটা কস্ট রয়ে গেল। মুয়াল্লেম 'নামিরা' মসজিদে যেতে দিলেন না কাউকে। তাঁবুতেই খুতবা পাঠ, জামাতে যোহরের কসর নামাজ পরালেন। খুতবার সময় বলে দিলেন, আসর থেকে মাগরিবের সময় টুকুতে দোয়া পড়তে। তারপর সবাই তার সাথে আল্লাহর কাছে হাত তুললাম।
আমি আর মাহমুদ ঠিক করলাম, তাবু থেকে বাইরে বের হয়ে খোলা ময়দানে বসে একসাথে দোয়া দরুদ পড়ব। তাই অজু করে বেলা তিনটা সারে তিনটার দিকে দু'জনে তাবু থেকে বেরিয়ে এলাম।
তাবু থেকে আরাফার খোলা ময়দান ঠিক পাহাড়ের মতো ঢাল না। সামান্য উঁচু। সেখানে উঠবার জন্যও পিচ ঢালা পথ। সেটা একটা সমতলে মিশেছে। সমতলটুকু খানিকটা গার্ডেনের মতো করার চেষ্টায় কিছু বৃক্ষ জাতীয় গাছ লাগানো। গাছগুলোকে দেখে মনে হয় জোর করে ধরে এনে আটকে রাখা প্রানীর মতো। পানির অভাবে সবুজ পাতা গুলো বিবর্ন।
ভীষণ রোদে চারপাশ ঝলসে যাচ্ছে। ছায়ার আসায় হাজিরা অনেকেই সেই চিকন শুকনা গাছ গুলোর গোড়ায় গিয়ে বসেছে। ছায়া যেন উড়ে যাচ্ছে গনগনে বাতাসে।
আমরা দু'জনেও একটা গাছকে সামনে রেখে কিবলা মুখি হয়ে বসলাম। তারপর নির্দিষ্ট করে একটা খতম শুরু করলাম।
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলক, ওয়ালাহুল হামদ, ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাই'ইন ক্বদির।' ১০০ বার
'সুরা ইখলাস' ১০০ বার
'দরুদে ইব্রাহিম' ১০০ বার। সেভাবেই মুয়াল্লেম সাহেব বলে দিয়েছিলেন।
তারপর দু'জন নিজের নিজের মোনাজাতে হাত তুললাম। মিনা এবং আরাফার ময়দানে মনকে যতটা সম্ভব আল্লাহর চিন্তায়, জীবনে নিজের করা ভুল গুলোর জন্য অনুতাপে ডুবিয়ে রাখতে পারলেই সফলতা। জানা-অজানা ভুল গুলোর জন্য মাফ চাও। তওবা করো, যেন একই ভুল তোমাকে দিয়ে আর না হয়। নিজের জন্য সুস্থতা চেয়ে নাও আর পাপশুন্য ভবিষ্যত। মোনাজাতে যতটুকু সম্ভব অন্তর থেকে কাঁদতে পারো কাঁদো।।
'হে আল্লাহ, তুমি হজ্জ কবুল করো। আমাকে মাফ করো। পাপ কাজ, ভুল কাজ থেকে দুরে রাখো। আবার এখানে আসার তৌফিক দাও। আমিন।'
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Website
Address
West Dhanmondi
Dhaka
1209