29/06/2019
সিজদায়ে সাহও বা ভুলের সিজদা
>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
মানুষের দ্বারা ভুল ভ্ৰান্তি হওয়া স্বাভাবিক। দুনিয়ার কাজে যেমন তার দ্বারা ভুল হয় তেমনি ইবাদাতের কাজেও শয়তান তাকে অনেক সময় ভুলিয়ে দেয়। সে জন্য আল্লাহর রসূল ﷺ বলেন, তোমাদের কেউ যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন (খিনযাব নামক) শয়তান তার মাথা গুলিয়ে দেয়। ফলে সে ধরতে পারে না যে,সে কয় রাকাআত নামায পড়ল। অতএব তোমাদের কারো অবস্থা যখন এরূপ হবে তখন সে বসে দুটো সিজদা দেবে- (বুখারী, মুসলিম,তিরমিজি ৩৯৭ ইফা: মিশকাত ৯২, পৃঃ)। এ সিজদা দুটোকে সিজদায়ে সাহও বা ভুলের সিজদা বলে। ইমাম দাউদ যাহিরী বলেন, নাবী ﷺ -এর ৫ বার সাহুও হয়েছিল- (বাযপুল মানফাআহ ৩৪ পৃঃ)।
আত্তাহিয়াতু ছুটে গেলে
একদা নাবী ﷺ যোহরের নামায পড়ালেন। অতঃপর দুই রাকাআতের পর তিনি (ভুলবশতঃ) আত্তাহিয়াত না পড়ে তৃতীয় রাকাআতে উঠে দাঁড়ালেন। পরিশেষে সালাম ফেরার আগে তিনি বসে বসে আল্লাহু আকবার বলে দু’টো সিজদা দিলেন, তারপর সালাম ফিরলেন। (বুখারী ১২২৫ তা:পা:, মুসলিম ১১৫২ ইফা:, মিশকাত ৯৩, পৃঃ নাসাই ১১৮০ ইফা:)
রসূল ﷺ বলেন, যদি কোন ইমাম দুই রাকাআতের পর আত্তাহিয়াত না পড়ে দাঁড়িয়ে যায় এবং সোজা হয়ে দাঁড়াবার আগেই যদি তার ভুল ধরা পড়ে যায় তাহলে সে বসে পড়বে এবং আত্তাহিয়াতু পড়বে, তাকে সাহও সিজদা দিতে হবে না। আর যদি সে একবারে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায় তাহলে সে আর যেন বসে না যায় এবং সবশেষে দুটো সাহও সিজদা দিয়ে দেয়। (আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত ৯৩, পৃঃ)
চার রাকাআতের জায়গায় দুই রাকাআত হলে
আবু হুরায়রা বলেন, একদা আল্লাহর রসূলﷺ যোহর নামায পড়ালেন এবং দুই রাকাআত পড়ে (ভুলে গিয়ে) সালাম ফিরে দিয়ে উঠে গেলেন;
অতঃপর মাসজিদে পড়ে থাকা একটা কাঠের ওপর ভর দিয়ে বসলেন। তখন মনে হচ্ছিল যে, তিনি যেন রেগে রয়েছেন। তারপর তিনি ডান হাতটি বাম হাতের উপর রাখলেন। ইত্যবসরে তাড়াহুড়াকারীরা চলে গেল এবং বাকি লোকেরা আপোষে বলাবলি করতে লাগলো-নামায কি কমিয়ে দেয়া হয়েছে? ওদের মধ্যে আবু বাকর (রাঃ) এবং “উমরও ছিলেন, কিন্তু রসূলুল্লাহﷺ -এর গভীৰ্য দেখে কেউ কথা বলতে সাহস পাননি। ঐ দলে আর একজন লোক ছিলেন যার হাত লম্বা ছিল। তাঁকে যুলইয়াদাইন (দুই হাত ওয়ালা) বলা হত। তিনি নাবী ﷺ-কে বললেন, হে আল্লাহর রসূল ﷺ! নামায কি কমিয়ে দেয়া হয়েছে? নাকি আপনি ভুলে গেছেন? তিনি বললেন, ভুলও হয়নি এবং কমও হয়নি। অতঃপর তিনি সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, যুলইয়াদায়েন কি ঠিক বলছে? সাহাবীরা বললেন, হ্যা। অতঃপর তিনি আগে বাড়লেন এবং ছেড়ে যাওয়া (দুই রাকাআত) নামায পড়ালেন। তারপর সালাম ফিরে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে আগের মত দুটো সিজদা কিংবা তার চেয়েও দীর্ঘ দুটো সিজদা দিলেন তারপর আবার সালাম ফিরালেন। (বুখারী ৬০৫১তা:পা:, মুসলিম, মিশকাত ৯২-৯৩, পৃঃ) এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নামায যদি কম পড়া হয় এবং উঠে চলে গিয়ে কথাবার্তা বলার পর ভুলটা ধরা পড়ে তথাপি পুরো নামায পুনরায় পড়তে হবে না। বরং ছাড় যাওয়া বাকি নামায পড়ে সিজদায়ে সাহও দিলেই যথেষ্ট হবে। কেউ কেউ বলেন যে এ হাদীসটি মানসূখ বা রহিত (মিশকাত ৯৩, পৃঃ ৪র্থ ও ৫ম লাইনের মাঝখানে লেখা আছে যে, হাদীসটি মানসূখ)। এটা তাদের কিয়াসী ও কাল্পনিক কথা। এটা রসূলুল্লাহ ﷺ -এর হাদীস নয়। কিংবা সাহাবায়ি কিরাম অথবা মুহাদিসীনে কিরামের মন্তব্য নয়।
চারের জায়গায় তিন রাক”আত হলে সিজদাহ
'ইমরান ইবনে হুসায়ন বলেন, একদা আল্লাহর রসূল ﷺ আসরের নামায (ভুলে) তিন রাকাআত পড়ে সালাম ফিরে দিয়ে ঘরে চলে গেলেন। তারপর খিরাবাক নামক এক সাহাবী এ ভুলটা ধরিয়ে দেয়ায় এবং অন্যান্য সাহাবীরাও তাঁর কথা সমর্থন করায় তিনি ﷺ এক রাকাআত নামায আবার পড়ালেন। অতঃপর তিনি সালাম ফিরে দুটো সিজদায়ে সাহুও দিলেন এবং আবার সালাম ফিরালেন। (মুসলিম ১১৮০ হা:একা: ১১৭১ ইফা:, মিশকাত ৯৩, পৃঃ)
পাচ রাকা`আতে সিজদাহ
ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, একদা আল্লাহর রসূল = যোহরের নামায পাঁচ রাকাআত পড়ালেন। (ফলে জিজ্ঞেস করা হয়) নামায কি বেশী করা হয়েছে? তিনি ﷺ বললেন,তার মানে? সাহাবীরা বললেন,আপনি পাঁচ রাকাআত পড়েছেন। তারপর তিনি সালামের পর দুটো সিজদা দিলেন। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি বললেন, আমি তোমাদেরই মত মানুষ। আমিও ভুলে যাই যেমন তোমরা ভুলে যাও। সুতরাং আমি যখন ভুল করি তখন তোমরা আমাকে মনে করিয়ে দিও। আর তোমাদের কেউ যখন সন্দেহে পড়বে তখন সে একটা সঠিক রায় কায়িম করবে, তারপর ঐ রায় মোতাবেক নামায পুরো করে সালাম ফিরাবে এবং দু'টো সিজদাও দেবে। (বুখারী ৪০৪ তা:পা:, মুসলিম, মিশকাত ৯২ পৃঃ)
যার নামাযে এ সন্দেহ হয় যে, সে এক রাকাআত পড়েছে,না দুরাকাআত তখন সে ওটাকে এক রাকাআত মনে করবে। আর যার দুই বা তিনের মধ্যে সন্দেহ হবে,সে সেটাকে দুরাকাআত ধরবে। কারো যদি তিন ও চারের মধ্যে সন্দেহ হয় তাহলে সে ওটাকে তিন গণ্য করবে। (অতঃপর বাকীটা পুরো করে) সালাম ফেরানোর আগে দুটো সাহু সিজদা দেবে। (তিরমিয়ী, ৩৯৮ ইফা: ইবনে মাজাহ ১২০৯ তা:পা: নাসবুর রায়াহ ২য় খণ্ড ১৭৪ পৃঃ)
সহীহ মুসলিমে আবু সাঈদ খুদরী (রাযিঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, নামায যদি ভুল না হয় তাহলে সন্দেহের কারণে সিজদায়ে সাহিও দেয়ার ফলে সিজদা দুটি শয়তানের নাকে খত দেয়া হবে। আর যদি রাকাআত বাড়তি হয় তাহলে সেটা আবু দাউদের রিওয়ায়াত অনুযায়ী বেজোড়ের জায়গায় জোড় হয়ে গিয়ে নফলে পরিণত হবে। (মির আতুল মাফাতীহ ২য় খণ্ড ২৯, পৃঃ)
=====================================
সাহও সিজদা কিভাবে দেয়া হবে?
পূর্বোল্লিখিত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নামাযে ভুলত্রুটি হলে শেষ বৈঠকে বসে আত্তাহিয়াতু, দরূদ ও দু'আয়ে মাসূরা পড়ার পর সালাম ফেরানোর আগে “আল্লাহু আকবার’ বলে নামাযে যেমন সিজদা দেয়া হয় সেরূপ দুটি সিজদা দিতে হবে এবং সিজদার দু'আও তাই পড়বে, যা নামাযের সিজদায় পড়া হয়। অতঃপর সিজদা থেকে উঠে সালাম ফিরাতে হবে। এটা হল আহলে হাদীস ও শাফিয়ী মাযহাবের মত এবং মালিকী ও হাঙ্কালীরাও শর্তসাপেক্ষে সালামের আগে ও পরে সাহও সিজদার পক্ষপাতী- (বিদায়াতুল মুজতাহিদ ১ম খণ্ড ১৮৫, পৃঃ) ।
কিন্তু হানাফীরা দুই দিকে সালাম না ফিরে কেবল একদিকে সালাম ফেরানোর পর সাহও সিজদা দেয়। হিদায়ার ব্যাখ্যাকার আল্লামা ইবনুল হুমাম হানাফী বলেন,একদিকে সালাম ফিরানোকে বিদ আতি বলা হয়েছে- (ফাতহুল কাদীর ১ম খণ্ড ২২২, পৃঃ)। তাই হিদায়াওয়ালা বলেন, দুদিকে সালাম ফেরানোই সঠিক- (হিদায়া ১ম খণ্ড ১৩৭ পূঃ) । এ সম্পর্কে হাদীস ও ফিকহের নাড়ীবিদ ভারতের বিখ্যাত মনীষী আল্লামা ‘আবদুল জলীল সামরূদী এবং পাকিস্তানের প্রথিতযশা আহলে হাদীস আলেম মাওলানা সাদেক শিয়ালকোটি (রহঃ) বলেন, শুধুমাত্র একদিকে সালাম ফেরার পর সিজদায়ে সাহিও দেয়া কোন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় না- (যাহরাহ ২২০ পৃষ্ণ ও সলাতুর রসূল ২৯৬ পৃঃ)। তাছাড়াও হানাকীগণ একদিকে সালাম ফিরে দুটো সিজদা দেবার পর আবার তাশাহুদ পড়ে, তারপর দু'দিকে সালাম ফিরায় ॥
এই দ্বিতীয়বার তাশাহুদ পড়া সম্পর্কে হাফিয যায়লায়ী হানাফী বলেন,সাহও সিজদার পর তাশাহুদ পড়ার প্রমাণে কোন সহীহ হাদীস নেই- (নাসবুর রায়াহ, মাসায়িল ও নামায শিক্ষা ৫৩ পৃঃ)। এ ব্যাপারে ইমাম শওকানী বলেন, দ্বিতীয়বার তাশাহুদ সম্পর্কে (০১) ইমরান ইবনে হসায়ন (০২) ইবনে মাসউদ(রাঃ) (০৩) মুগীরাহ (রাঃ),(৪)আয়িশা (রাঃ) বর্ণিত যে হাদীসগুলো পাওয়া যায় সবগুলোই যায়ীফ ও দুর্বল— (নায়লুল আওতার ২য় খণ্ড ৩৭৩ পৃঃ) । তবে হাফিযী ইবনে হাজার আসকালানী বলেন ৪ কেউ কেউ বলেছেন, ইরান, ইবনে মাসউদ ও মুগীরার রিওয়ায়াতগুলো এক জায়গায় করলে হাদীসটি যায়ীফ থেকে হাসানে উন্নীত হয়। (ফাতহুল বারী ৩য় খণ্ড ৯৯, পৃষ্ঠা) নোট ৪ এ কথাটা সবারই জেনে রাখা উচিত যে, হাদীসের বড় বড় পণ্ডিতগণ বলেন, যখন কোন বিষয়ে সহীহ হাদীস পাওয়া যাবে তখন তার মোকাবেলায় যায়ীফ ও হাসান প্রভৃতি হাদীসের উপর আমল করা চলবে না।
মহান আল্লাহ পাক যেন আমাদেরকে সকল কে সহীহ হাদীসের উপর আমল করার তৌফিক দান করেন আমীন !