পোষাকের নিয়ম
১. এরূপ পোষাক পরিধান করবে যাতে লজ্জা-শরম, মর্যাদাবোধ, আভিজাত্য ও লজ্জা রক্ষার প্রয়োজন পূরণ হয় এবং সভ্যতা সংস্কৃতি, শোভা ও সৌন্দর্য্য প্রকাশ পায়।
কোরআন মাজিদে আল্লাহ পাক নিজের এ নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে ঘোষণা করেছেন।
يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا
“হে আদম সন্তান! আমি তোমাদের জন্য পোষাক প্রদান করেছি যাতে তোমাদের লজ্জা নিবারণ ও রক্ষা পায় এবং তা যেন শোভা ও সৌন্দর্য্যের উপকরণ হয়।”
(সূরায় আরাফ:২৬)
ريش অর্থঃ পাখির পালক। পাখির পালক হলো পাখির জন্য শোভা ও সৌন্দর্য্যের উপায় এবং তার শরীর রক্ষার উপায়ও বটে। সাধারণ ব্যবহারে ريش শব্দটি শোভা সৌন্দর্য্য ও উত্তম পোশাকের জন্য ব্যবহৃত হয়।
পোশাকরে উদ্দেশ্য হচ্ছে সৌন্দর্য্য, সাজ-সজ্জা ও আবহাওয়ার খারাপ প্রতিক্রিয়া থেকে শরীর রক্ষার মাধ্যম। মূল উদ্দেশ্য হলো লজ্জাস্থানসমূহের হেফাজত করা। আল্লাহ আয়ালা লজ্জা-শরমকে মানুষের মধ্যে স্বভাবগত ভাবে সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ) থেকে যখন বেহেশতের গৌরবময় পোষাক ছিনিয়ে নেয়া হলো তখন তাঁরা লজ্জা নিবারণের জন্য বেহেশতী পাতা ছিঁড়ে তাঁদের শরীর ঢাকতে লাগলেন। অতএব পোশাকের এ উদ্দেশ্যটিকে সর্বাধিক অগ্রগণ্য বলে মনে করবে। এরূপ পোষাক নির্বাচন করবে যার দ্বারা লজ্জা নিবারণের মূল উদ্দেশ্য সাধিত হয়। সাথে সাথে এ খেয়াল রাখবে যে, পোষাক যেনো ঋতুর বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচার জন্য উপযোগী হয় আর যে পোষাক পরিধান করলে মানুষ অদ্ভুত অথবা খেলার পাত্রে পরিণত হয় এবং লোকদের জন্য হাসি ও পরিহাসের পাত্র হয়ে দাঁড়ায় সেই পোষাক পরবে না।
২. পোষাক পরিধান করার সময় এ চিন্তা করবে যে, এটা ঐ নেয়ামত যা আল্লাহ তাআলা মানুষদেরকে দান করেছেন। অন্যান্য সৃষ্টি এ নেয়ামত থেকে বঞ্চিত, এ সম্মানিত দান ও পুরস্কারে ভূষিত হয় কখনও অকৃতজ্ঞতা ও নাফরমানী প্রদর্শন করবে না। পোষাক আল্লাহর এক স্মারক চিহ্ন। পোষাক পরিধান করে উপরোক্ত নেয়ামতের কথা নতুন করে স্মরণ করবে এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে এমন দোআ পড়বে যা রাসূল (সাঃ) মুমিনদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন।
৩. সংযমশীলতা হচ্ছে উত্তম পোষাক, সংযমশীলতার পোষাক দ্বারা আধ্যাত্মিক এবং বাহ্যিক পবিত্রতা হাসিল হয়।
অর্থাৎ এরূপ পোষাক পরিধান করবে যা শরীয়তের দৃষ্টিতে সংযমশীলতা প্রকাশ পায়। মহিলাদের পোষাক যেন পুরুষদের সাথে সাদৃশ্যের কারণ না হয় এবং পুরুষদের পোষাক যেন মহিলাদের সাথে সাদৃশ্যের অছিলা না হয়। এমন পোষাক পরিধান করবে যা দেখে পোষাক পরিধানকরীকে আল্লাহ ভক্ত ও ভাল মানুষ মনে হয়। মহিলাগণ পোষাকের বেলায় ঐ সকল সীমারেখার কথা মনে রাখবে যা শরীয়ত তাদের জন্য নির্দ্ধারিত করেছে আর পুরুষগণও পোষাকের বলোয় ঐ সকল সীমারেখার কথা স্মরণ রাখবে যা শরীয়ত তাদের জন্য পূর্বেই নির্দিষ্ট করে দিয়েছে।
৪. নতুন পোষাক পরিধান করার সময় খুশী প্রকাশ করবে যে, আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করে আমাকে এ কাপড় দান করেছেন এবং ঐ দোয়া পাঠ করবে যা রাসূল (সাঃ) পাঠ করতেন।
আবু সায়ীদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলাল্লাহ (সাঃ) যখন কোন নতুন কাপড়, পাগড়ী, জামা অথবা চাদর পরিধান করতেন তখন ঐ নতুন কাপড়ের নাম ধরে বলতেন,
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ ، أَنْتَ كَسَوْتَنِيهِ ، أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِهِ وَخَيْرِ مَا صُنِعَ لَهُ ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهِ وَشَرِّ مَا صُنِعَ لَهُ (ابو دادد)
“হে আল্লাহ!তোমার শোকর, তুমি আমাকে এ কাপড় পরিধান করিয়েছ, আমি তোমার নিকট কল্যাণকারীতার প্রত্যাশী যে কল্যাণের উদ্দেশ্যে এ কাপড় তৈরী করা হয়েছে এবং আমি তোমার আশ্রয় চাচ্ছি, এ কাপড়ের মন্দ থেকে।”
(আবু দাউদ)
দোআর অর্থ এই যে, হে আল্লাহ! আমি যেন তোমার পোষাক ভাল উদ্দেশ্যে পরিধান করতে পারি যে উদ্দেশ্য তোমার নিকট মহৎ ও পবিত্র। তুমি আমাকে তাওফীক দান কর যেন আমি লজ্জা-নিবারণ করতে পারি এবং প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে নির্লজ্জতা থেকে মুক্ত থাকতে পারি আর শরীয়তের গন্ডির ভেতরে থেকে যেনো নিজের শরীরকে রক্ষা করতে পারি এবং যেনো গৌরব ও অহঙ্কার না করি, এ নেয়ামত প্রাপ্তির জন্য শরীয়তের সীমারেখা যেন লংঘন না করি যা তুমি তোমার বান্দাদের জন্য নির্দ্ধারিত করে দিয়েছ।
হযরত ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি নতুন কাপড় পরিধান করবে তার পক্ষে সম্ভব হলে পুরনো কাপড়টি কোন গরীব ব্যক্তিকে দান করে দেবে আর নতুন কাপড় পরিধান করার সময় এই দোয়াটি পড়বে।
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي كَسَانِي مَا أُوَارِي بِهِ عَوْرَتِي , وَأَتَجَمَّلُ بِهِ فِي حَيَاتِي –
“সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ পাকের জন্য যিনি আমাকে কাপড় পরিধান করিয়েছেন এবং যার দ্বারা আমি লজ্জা নিবারণ করি ও আমার জীবনে শোভা ও সৌন্দর্য্য লাভ করি।
যে ব্যক্তি নতুন কাপড় পরিধান করার সময় এ দোআ পাঠ করবে, তাকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে স্বয়ং নিজের নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণে রাখবেন। (তিরমিযী)
৫. কাপড় পরার সময় ডান দিক থেকে আরম্ভ করবে, জামা শেরওয়ানী ও কোট-এর প্রথমে ডান আস্তিন পরবে, পায়জামা-প্যান্ট ইত্যাদিও। রাসূল (সাঃ) যখন জামা পরতেন তখন প্রথমে ডান হাত আস্তিনে প্রবেশ করাতেন, তৎপর বাম হাত বাম আস্তিনে প্রবেশ করাতেন। অনুরূপ প্রথমে ডান পা ডান পায়ের জুতায় প্রবেশ করাতেন অতঃপর বাম পা বাম পায়ের জুতায় প্রবেশ করাতেন। জুতা খুলবার সময় প্রথম বাম পায়ের জুতা খুলতেন তৎপর ডান পায়ের জুতা খুলতেন।
৬. কাপড় পরার আগে ঝেড়ে নেবে। কাপড়ের ভেতর কোন কষ্টদায়ক প্রাণী থাকতে পারে (আল্লাহ না করুন) তা কষ্ট দিতে পারে। রাসূল (সাঃ) একবার এক জঙ্গলে মোজা পরছিলেন। প্রথম মোজা পরিধান করার পর যখন দ্বিতীয় মোজা পরিধান করতে উদ্যত হলেন এমন সময় এটি কাক উড়ে এসে মোজাটি নিয়ে গেল এবং উপরে নিয়ে ছেড়ে দিল, মোজা উপর থেকে নিচে, পড়ার পর মোজা থেকে এক বিষাক্ত সাপ দূরে ছিটকে পড়ল। তা দেখে তিনি আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করে বললেনঃ “প্রত্যেক মুমিনের মোজা পরিধান করার সময় তা ঝেড়ে নেয়া উচিত।”
৭. সাদা রংয়ের পোষাক পরিধান করবে, কেননা সাদা পোষাক পুরুষের জন্য পছন্দনীয়। রাসূল (সাঃ) বলেন, “সাদা কাপড় পরিধান করবে ইহা উত্তম পোশাক। জীবিতাবস্থায় সাদা কাপড় পরিধান করা উচিৎ এবং সাদা কাপড়েই মৃতকে দাফন করা উচিৎ। (তিরমিযী)
তিনি বলেন, “সাদা কাপড় পরিধান করবে। সাদা বেশী পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে এবং এতে মৃতদের দাফন করবে।”
পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার অর্থ হলো, সাদা কাপড়ে যদি সামান্যতম দাগও লাগে তবে তা সহজেই দৃষ্টিগোচরও হবে বলে মানুষ তাড়াতাড়ি তা ধুয়ে পরিষ্কার করে নেবে। আর রঙ্গীন কাপড়ে দাগ পড়লে তা সহজে দৃষ্টি গোচর হয় না তাই তা তাড়াতাড়ি ধুয়ে পরিষ্কার করারও প্রয়োজন হয় না। (তা অপরিষ্কারই থেকে যায়)।
রাসূল (সাঃ) সাদা পোষাক পরিধান করতেন অর্থাৎ তিনি নিজেও সাদা পোষাক পছন্দ করতেন এবং উম্মাতের পুরুষদেরকেও সাদা পোষাক পরতে উৎসাহ দিয়েছেন।
৮. পায়জামা, লুঙ্গি ইত্যাদি গিরা ঢেকে পরবেনা। যারা অহংকার ও গৌরব প্রকাশের ইচ্ছায় পায়জামা, প্যান্ট ও লুঙ্গি ইত্যাদি গিরার নিচে পরিধান করে তারা রাসূল (সাঃ)-এর দৃষ্টিতে বিফল মনোরথ ও কঠিন আযাবগ্রস্থ। রাসূলে আকরাম (সাঃ) বলেনঃ “তিন ধরনের লোক আছে যাদের সঙ্গে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না এবং রহমতের দৃষ্টি দেবেন না। আর তাদেরকে পাক-পবিত্র করে বেহেশতেও প্রবেশ করাবেন না। তাদের কঠিন শাস্তি দেবেন। হযরত আবুযর গিফারী (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! এ হতভাগ্য লোকগুলো কারা? তিনি বললেন-
(ক) যারা গিরার নিচে কাপড় পরে।
(খ) যারা উপকার করে পরে খোটা দেয়।
(গ) যারা মিথ্যা শপথ পূর্বক ব্যবসা বাড়াতে চায়। (মুসলিম)
হযরত ওবাইদ বিন খালেদ (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি একবার মদীনা মুনাওয়ারা রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন। পেছন থেকে বলতে শুনলাম যে, “তহবন্দ ওপরে উঠাও। এর দ্বারা লোকেরা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে অপবিত্রতা থেকে রক্ষা পায়।” আমি পিছনের দিকে মুখ ফিরিয়ে দেখলাম যে, রাসূল (সাঃ)। আমি বললাম, ইয়া রাসূলল্লাহ, এটা তো একটি সাধারণ চাদর। এতে কি আর গৌরব ও অহংকার হতে পারে? রাসূল (সাঃ) বললেনঃ “তোমার জন্য আমার অনুসরণ করা কি কর্তব্য নয়? হুজুরের কথা শুনা মাত্র আমার দৃষ্টি তাঁর তহবন্দের প্রতি পড়ল। দেখতে পেলাম যে, হুজুরের তহবন্দ পায়ের অর্দ্ধেক গোছার উপরে।
রাসূল (সাঃ) বলেনঃ “পায়জামা তহবন্দ ইত্যাদি গিরার উপরে রাখলে মানুষ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সর্ব প্রকার অপবিত্রতা থেকে রক্ষা পায়।”
এ কথাটি বড়ই অর্থবোধক! এর উদ্দেশ্য হলো এই যে, কাপড় নীচের দিকে ঝুলে থাকলে রাস্তার আবর্জনায় কাপড় ময়লা ও নষ্ট হবে। পাক রাখতে পারবেনা। এ কাজটি পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার একান্ত পরিপন্থী। অহংকার ও গৌরবের কারণে এমন হয়, গৌরব ও অহংকার হলো অপ্রকাশ্য আবর্জনা। একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর এ ঘোষণাই যথেষ্ট যে, “আল্লাহর রাসূলের জীবনই তোমাদের জন্য অতি উত্তম আদর্শ।” (আল কোরআন)
আবু দাউদে উল্লেখিত এক হাদীসে তো তিনি ভয়ানক শাস্তির কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ
“মুমিনের তহবন্দ পায়ের গোছা পর্যন্ত হওয়া উচিত এবং তার নীচে গিরা পর্যন্ত হলেও কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু গিরার নীচে যতটুকু পর্যন্ত থাকবে ততোটুকু জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। আর যে ব্যক্তি গৌরব ও অহংকারের কারণে নিজের কাপড় গিরার নীচে লটকাবে তার প্রতি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না।”
৯. রেশমী কাপড় পরিধান করবে না, কেননা এটা মহিলাদের পোশাক। রাসূল (সাঃ) পুরুষদেরকে মহিলাদের মত পোষাক পরিধান করতে আর তাদের মত ছুরত ধারণ করতে নিষেধ করেছেন।
হযরত ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ রেশমী পোষাক পরিধান করো না, যে দুনিয়াতে পরিধান করবে সে আখেরাতে পরিধান করতে পারবে না।” (বুখারী-মুসলিম)
একবার রাসূল (সাঃ) আলী (রাঃ) কে বলেনঃ “রেশমী কাপড়টি[1] কেটে ওড়না তৈরী কর এবং ফাতেমাদের[2] মধ্যে বন্টন করে দাও। (মুসলিম)
উপরোক্ত হাদীসের মর্মানুযায়ী বুঝা যায় যে, মহিলাদের জন্য রেশমী কাপড় পরিধান করা অধিক পছন্দনীয়। সুতরাং তিনি নির্দ্দেশ দিয়েছেন যে, মহিলাদের ওড়না তৈরী করে দাও, অন্যথায় কাপড়খানা তো অন্য কাজেও লাগানো যেতো।
১০. মহিলারা পাতলা কাপড় পরিধান করবেনা যাতে শরীর দেখা যায় আর এরূপ আটসাট পেশাকও পরিধান করবেনা যার মধ্য থেকে শরীরের গঠন প্রকৃতি আরো আকর্ষণীয়ভাবে প্রদর্শিত হয়। আর তারা কাপড় পরিধান করা সত্বেও উলঙ্গ পরিগণিত হবে। রাসূল (সাঃ) এরূপ নির্লজ্জ মহিলাদের পরকালে কঠিন শাস্তির সংবাদ দিয়েছেন।
“যারা কাপড় পরিধান করা সত্বেও উলঙ্গ থাকে, তারা নিশ্চিত জাহান্নামী। তারা অপরকে সম্মোহিত করে আর নিজেরাও অপরের উপর সম্মোহিত হয়। তাদের মাতা প্রসিদ্ধ বুখত নগরের বড় উটের চোঁটের ন্যায় বাঁকা অর্থাৎ এরা চলার সময় অহংকারের কারণ ঘাড় হেলিয়ে দুলিয়ে চলে, এ সকল মহিলা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের সুগন্ধও পাবেনা। বস্তুতঃ জান্নাতের সুগন্ধ বহুদূর থেকে পাওয়া যাবে।
(রিয়াদুস সালেহীন)
একবার হযরত আসমা (রাঃ) পাতলা কাপড় পরিধান করে রাসূল (সাঃ)এর দরবারে উপস্থিত হলে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, আসমা! মেয়েরা যখন যুবতী হয় তখন তাদের জন্য মুখ ও হাত ব্যতীত শরীরের অন্য কোন অংশ দৃষ্টিগোচর হওয়া উচিত নয়।
১১. তহবন্দ ও পায়জামা পরার পরও এমনভাবে বসা বা শোয়া উচিত নয়-যাতে শরীরের গোপনীয় অংশ প্রকাশ হয়ে যাবার বা দেখা যাবার সম্ভাবনা থাকে।
রাসূল (সাঃ)বলেনঃ “এক পায়ে জুতা পরে হাঁটবেনা, তহবন্দ পরিধান করে এক হাটু পর্যন্ত উঠিয়ে বসবে না,বাম হাতে খাবে না, সারা শরীরে চাদর এভাবে পরিধান করবেনা যে, কাজ-কাম করতে, নামায আদায় করহে এবং হাত বের করতে অসুবিধা হয়। চিৎ হয়ে শুয়ে এক পায়ের উপর অন্য পা রাখবে না।
১২. মহিলা ও পুরুষরা এক ধরনের পোষাক পরিধান করবে না। রাসূল (সাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ ঐ সকল পুরুষদের ওপর লা’নত করেছেন যারা মহিলাদের মত পোষাক পরে; আর ঐ সকল নারীদের উপরও লা’নত করেছেন যারা পুরুষদের মত পোষাক পরে।”
(বুখারী)
হযরত আবু হোরাইরা (রাঃ)বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ঐ পুরুষের ওপর অভিশাপ, যে নারীর মত পোষাক পরিধান করে।”
(আবুদাউদ)
একবার হযরত আয়েশা (রাঃ) এর নিকট কেউ বললেন যে, এক মহিলা পুরুষের অনুরূপ জুতা পরিধান করে; তখন তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এসব মহিলাদের ওপর অভিশাপ করেছেন যারা পুরুষ সাজার চেষ্টা করে।”
১৩. মহিলাগণ ওড়না ব্যবহার করবে এবং তা দ্বারা মাথাও ঢেকে রাখবে। এমন পাতলা ওড়না পরবে না যার মধ্যে থেকে মাথার চুল দেখা যায়, উড়না পরিধান করার মূল উদ্দেশ্যই হ’ল সৌন্দর্য্যকে গোপন করা।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেনঃ
وَلْيَضْرِبنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوْبِهِنَّ
মহিলারা নিজেদের বক্ষস্থলের উপর উড়না ফেলে রাখবে।
একবার রাসূল (সাঃ)-এর নিকট মিশরের তৈরী কিছু পাতলা মখমল কাপড় আসল এবং তিনি তা থেকে কিছু কাপড় হাদিয়া স্বরূপ ক্বালবী (রাঃ)-কে দিয়ে বললেন যে, এটা থেকে একাংশ কেটে নিজের জন্যে জামা তৈরী করবে আর একাংশ দিয়ে তোমার স্ত্রীর জন্যে ওড়না তৈরী করতে দাও। কিন্তু তাকে বলে দিবে যে, তার নীচে যেনো একটা অন্য কাপড় লাগিয়ে নেয় যাতে শরীরের গঠন বাহির থেকে দেখা না যায়।
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, “এ নির্দেশ নাযিলের পর মহিলারা পাতলা কাপড় ফেলে দিয়ে মোটা কাপড়ের ওড়না তৈরী আরম্ভ করলেন। (আবু দাউদ)
১৪. পোষাক নিজের ক্ষমতা ও মর্যাদা অনুযায়ী পরিধান করবে। এরূপ পোষাক পরবেনা যা দ্বারা নিজের অহংকার ও আড়ম্বর প্রদর্শিত হয় এবং অপরকে হেয় প্রতিপন্নপূর্বক নিজের অর্থের প্রাচুর্য্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্য হয়। আর নিজের ক্ষমতার বর্হিভূত উচ্চ মূল্যের পোশাকও পরবেনা যদ্দরুন অযথা ব্যয় বাহুল্যের পাপে পতিত হতে হয়। আবার অত্যন্ত নিকৃষ্ট্ মানের পোষাক পরিধান করে সহায়-সম্বলহীনের বেশ ধারণ করে অপরের নিকট হেয় প্রতিপন্ন হবে না বরং সর্বদা নিজের ক্ষমতনুযায়ী রুচিপূর্ণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করবে।
অনেকে এমন আছে যারা ছেড়া কাপড়,তালি দেওয়া কাপড় পরিধান করে সহায়-সম্বলহীনের বেশ ধারণ করে বেড়ায় এবং এটাকে পরহেযগারী বলে মনে করে। এতটুকু যথেষ্ট নয় বরং যারা রুচিশীল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করে প্রকৃতপক্ষে তাদেরকে দুনিয়াদার বলে মনে করাও ভূল।
একবার প্রখ্যাত ছুফী হযরত আবুল হাসান আলী শাযালী অত্যন্ত দামী কাপড় পরিহিত ছিলেন, এক ছুফী তাঁকে এমতাবস্থায় দেখে প্রতিবাদ করে বললেন যে, আল্লাহ ওয়ালাদের এত মূল্যবান জাঁকজমকপূর্ণ পোষাক পরার কি প্রয়োজন? হযরত শাযালী বললেন, ভাই! এটা হলো মহান প্রতাপশালী মহা শক্তিশালী আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। আর তোমার এ সহায়-সম্বলহীনতা হলো ভিক্ষুকদের মতো, তুমি এ অবস্থার দ্বারা মানুষের নিকট ভিক্ষা প্রার্থনা করছ। প্রকৃতপক্ষে ছেড়া-ফাটা পুরনো, তালি দেওয়া নিম্ন মানের কাপড় পরিধান করার মধ্যেই পরহেযগারী সীমাবদ্ধ নয় এবং অত্যন্ত মূল্যবান গৌরবময় পোষাক পরিধান করার মধ্যেও নয়। পরহেযগারী মানুষের নিয়ত ও সার্বিক চিন্তাধারার উপর নির্ভরশীল। প্রকৃত সত্য কথা হলো মানুষ তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের ক্ষমতানযায়ী মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে সমতা রক্ষা করে চলবে। সহায়-সম্বলহীনতার বেশ ধারণ করে নিজের আত্মাকে অহংকারী হওয়ার সুযোগ দিবে না আর চমক লাগানো মূল্যবান চাকিচিক্যময় পোষাক পর গৌরব ও অহংকারও প্রদর্শণ করবে না।
হযরত আবু আহ্ওয়াছ (রাঃ) এর পিতা নিজের একটি ঘটনা বর্ণনা করেন যে, আমি একবার নবী করিম (সাঃ)-এর দরবারে অত্যন্ত নিম্ন মানের কাপড়ে উপস্থিত হয়েছিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কি ধন-সম্পদ আছে?” আমি বললাম, জী আছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন কি ধরনের সম্পদ আছে আমি বললাম, আল্লাহ তাআলা আমাকে উট, গরু, বকরী, ঘোড়া, গোলাম ইত্যাদি সব প্রকার সম্পদই দান করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা যখন তোমাকে সব ধন-সম্পদ দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন তখন তোমার শরীরেও তার দান ও অনুগ্রহের বহিঃপ্রকাশ ঘটে উচিৎ।
অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা যখন তোমাকে পর্যাপ্ত নেয়ামত দান করেছেন তখন তুমি নিঃস্ব ভিক্ষুকদের বেশ ধারণ করেছ কেন? এটাতো আল্লাহ তা’আলার নেয়ামতের না শোকরী!
হযরত জাবের (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, একদা রাসূল (সাঃ) আমাদের বাড়ীতে এলেন, তখন তিনি এক ব্যক্তিকে ধুলাবালি মিশ্রিত এবং তার মাথার চুলগুলো এলোমেলোভাবে দেখতে পেলেন। রাসূল (সাঃ) বললেন, তার নিকট কি একটা চিরুনীও নেই যে, সে মাথার চুলগুলো একটু ঠিক করে নিতে পারে? অন্য এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন যে,সে ময়লা কাপড় পরে আছে।তিনি বললেন, এর নিকট কি সাবান-সোডা জাতীয় এমন কোন জিনিস নেই যার দ্বারা কাপড়গুলো পরিষ্কার করে নিতে পারে? (মেশকাত)
এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)-কে বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার শখ হয় যে আমার পোষাক সুন্দর হোক, মাথায় তেল থাকুক, জুতাগুলোও উত্তম হোক। এভাবে অনেকগুলো জিনিসের কথা বললো। এমন কি সে বললো, আমার হাতের লাঠিটিও অত্যন্ত সুন্দর হোক!রাসূল (সাঃ) তদুত্তরে বললেন, “এসব কথা পছন্দনীয়, আর আল্লাহ তা’আলাও সুন্দর রুচিকে ভালবাসেন।”
হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! আমার উত্তম কাপড় পরাটা কি গৌরব ও অহংকার হবে? তিনি বললেন, “না, ইহা তো সৌন্দর্য্য আর আল্লাহ তা’আলা সৌন্দর্য্যকে ভালবাসেন”
হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “নামাযের জন্যে উত্তম কাপড় পরিধান করে যাবে। আল্লাহর তাআলার নিকট অত্যধিক যোগ্য সেই ব্যক্তি যে তাঁর দরবারে উপস্থিতির সময় (অর্থাৎ নামায আদায় কালে) ভালোভাবে সেজে গুজে যায়।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসুদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “ যার অন্তরে অনু পরিমাণও অহঙ্কার আছে সে বেহেশতে যেতে পারবেনা।” এক ব্যক্তি উঠে বললো, (ইয়া রাসূলাল্লাহ!)প্রত্যেক ব্যক্তিই তো এটা চায় যে, তার কাপড় এবং জুতা জোড়া সুন্দর হোক। (এও কি অহংকারের অন্তর্ভূক্ত?) রাসূল (সাঃ) বলেন, আল্লাহ সুন্দর, সুন্দরকে ভাল বাসেন। (অর্থাৎ উত্তম পোষাক অহংকারের নয় বরং উহা সৌন্দর্য্যের অন্তর্ভূক্ত।) প্রকৃতপক্ষে অহংকার হলো সত্যের পরোয়া না করা আর পরকে হীন ও নিকৃষ্ট মনে করা।” (মুসলিম)
১৫. পোশাক-পরিচ্ছদ সাজসজ্জা ও শালীনতার প্রতিও পূর্ণ দৃষ্টি রাখবে। জামার বুক খোলা রেখে ঘোরা-ফিরা করা, আড়াআড়িভাবে বুতাম লাগান, পায়জামার এক পা ওপরে উঠিয়ে রাখা, অন্য পা নীচে রাখা, অথবা চুল এলোমেলো রাখা ইত্যাদি রুচি ও শালীনতা বিরোধী।
একদিন রাসূল (সাঃ) মসজিদে (নববীতে)ছিলেন, এমন সময় উস্ক খুস্কু চুল দাড়ি নিয়ে এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করলো, রাসূল (সাঃ) তার প্রতি হা দ্বারা চুলদাড়ি ঠিক করে আসতে ইঙ্গিত করলেন। তখন ঘরে গিয়ে চুল-দাড়ি পরিচর্যা করে আসলো। অতঃপর রাসূল (সাঃ) বললেন, “মানুষের চুল এলোমেলো থাকার চাইতে সুন্দর ও পরিপাটি করে রাখা কি উত্তম নয়?
হযরত আবু হোরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ “এক পায়ে জুতা পরে কেউ যেন চলাফেরা না করে, হয়তো উভয়টি পরবে অথবা খালি পায়ে চলবে”।
১৬. লাল, উজ্জল চমৎকার রং, কাল এবং গেরুয়া রং এর পোষাক পরবেনা। লাল উজ্জ্বল ঝিকমিক রং এবং জাঁকজমকপূর্ণ পোষাক শুধুমাত্র মহিলাদের জন্যই শোভা পায়। তবে তাদেরও সীমা লংঘন করা উচিৎ নয়।আশ্চর্য ধরনের হাসির উদ্রেককারী পোষাক পরবে না যা পরিধান করলে অনর্থক বেঢং-অদ্ভুত দেখা যায় আর লোকেরা হাসি-ঠাট্টা ও পরিহাস করার জন্যে উৎসাহিত হয়।
১৭. সাদা, রুচিশীল পোষাক পরিধান করবে। পোশাকের ব্যাপারে বিলাসিতা ও প্রয়োজনের অধিক মাধুর্য্য পরিহার করে চলবে। রাসূল (সাঃ) বলেন, “বিলাসিতা থেকে দূরে থেকো কেননা আল্লাহর নেক বান্দাগণ বেশী বিলাসপ্রিয় হয় না।” (মেশকাত)
রাসূল (সাঃ) আরো বলেছেন, “যে ব্যক্তি শক্তি ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শুধু মিনতি প্রকাশের উদ্দেশ্যে সাদা-সিধা পোষাক পরিধান করে আল্লাহ তাআলা তাকে আভিজাত্যের পোশাকে ভূষিত করবেন। (আবু দাউদ)
সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) একদিন একত্রে বলে দুনিয়া সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন, তখন রাসূল (সাঃ) বললেন, “সাদা-সিধা পোষাক ঈমানের আলামতসমূহের মধ্যে একটি। (আবু দাউদ)
একবার রাসূল (সাঃ) বললেন, “আল্লাহ তা’আলার এমন কিছু বান্দাহ আছে যাদের বাহ্যিক বেশ-ভূষা থাকে অত্যন্ত সাধা-সিধে। তাদের চুলগুলো পরিপাটি, পরনের কাপড়গুলো সাদা-সিধে ও মলিন, কিন্তু তাদের মর্যাদা এত বেশী যে তারা যদি কোন বিষয়ে কসম খেয়ে বসে তবে আল্লাহ তা’আলা তাদের পূর্ণ করে দেন। এ ধরনের লোকদের মধ্যে বারা বিন মালেক একজন”। (তিরমিযী)
১৮. আল্লাহ তা’আলার এ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় স্বরূপ সে সব গরীবদেরকেও বস্ত্রদান করবে, যাদের শরীর ঢাকার মত কোন বস্ত্র নেই। রাসূল (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে বস্ত্র দ্বারা তার শরীর আবৃত করল কাল কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা বেহেস্তের সবুজ পোষাক পরিধান করিয়ে তার শরীরও আবৃত করবেন”। (আবু দাউদ)
তিনি এও বলেছেন যে, “ কোন ব্যক্তি কোন মুসলমান ভাইকে বস্ত্র দিলে যতদিন ঐ বস্ত্র তার পরনে থাকবে ততদিন পর্যন্ত সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তা’আলা নিজের হেফাজতে রাখবেন”।
১৯. যে সকল চাকর দিন রাত আপনার সেবায় নিয়োজিত তাদেরকে আপনার মর্যাদানুযায়ী উত্তম পোষাক পরাবেন।
রাসূল (সাঃ) বলেন, “দাস-দাসীরা তোমাদের ভাই, আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাদেরকে যার অধীনস্থ করে দিয়েছন তার উচিত তাদেরকে তাই খাওয়ান যা সে নিজে খায়, আর তাদেরকে তাই পরাবে যা সে নিজে পরে। তাকে দিয়ে ততটুকু কাজ করাবে যতটুকু তার পক্ষে সম্ভব। অর্পিত কাজ তার পক্ষে করা সম্ভব না হলে নিজেও অংশ করে তাকে সাহায্য করবে”।
শিক্ষা
পড় তোমার প্রভুর নামে , যিনি তোমাকে সৃষ?
25/02/2015
11/02/2015
Want your school to be the top-listed School/college in Dhaka?
Click here to claim your Sponsored Listing.
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Contact the school
Website
Address
Dhaka