18/06/2026
চেক ডিজঅনার মামলার ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের জন্য এক শক্তিশালী সুরক্ষা: ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়
বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড কিংবা প্রাত্যহিক আর্থিক লেনদেনে চেকের গুরুত্ব অপরিসীম। এই চেকের নির্ভরযোগ্যতা ও আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে প্রণীত হয়েছে ‘নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১’ (NI Act)। এই আইনের ১৩৮ ধারার প্রয়োগে চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলাগুলোতে সাধারণত প্রাথমিক অবস্থায় আইন অভিযোগকারীর অনুকূলে থাকে। আইনটি ধরে নেয় যে, চেকটি কোনো বৈধ পাওনা বা ঋণের টাকা শোধ করার জন্যই প্রদান করা হয়েছে।
তবে এই আইনি ধারণা কি চূড়ান্ত? মোটেও নয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট "K. Subramani v. K. Damodara Naidu" [(2015) 1 SCC 99] মামলায় অভিযুক্তদের সুরক্ষা প্রদান এবং আইনি অপব্যবহার রুখতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন।
মামলার পটভূমি ও বিবরণ:
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রতি মাসে ৩% সুদে অভিযোগকারীর নিকট হতে নগদ ১৪ লক্ষ টাকা ধার গ্রহণ করেছিলেন। ঋণের নিশ্চয়তা স্বরূপ তিনি একটি অগ্রিম তারিখযুক্ত (post-dated) চেক প্রদান করেন। পরবর্তীকালে ব্যাংক যখন সেই চেকটি গ্রহণ করতে যায়, তখন "অপ্রতুল তহবিল" (Funds Insufficient) থাকার কারণে তা বাতিল বা ডিজঅনার হয়।
বিষয়টি আদালতে গড়ার পর, আইনের প্রাথমিক অনুমানের কারণে অভিযুক্ত পক্ষ স্বাভাবিকভাবেই প্রতিকূল অবস্থায় ছিল। তবে বিচারিক আদালত সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও যুক্তি পর্যালোচনার পর আসামিকে নির্দোষ ঘোষণা করে। পরবর্তীতে এই আইনি লড়াই সুপ্রিম কোর্টের দোরগোড়ায় পৌঁছায়।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মূল বক্তব্য:
মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট এই মামলায় নিম্ন আদালতের খালাসের সিদ্ধান্তটি বহাল রাখেন। রায় দেওয়ার সময় আদালত দুটি প্রধান আইনি নীতিমালা নির্ধারণ করেন:
১. আয়ের উৎস নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা:
আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, অভিযোগকারী আদালতে এটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, নগদ ১৪ লক্ষ টাকার মতো বিশাল অংকের অর্থ ঋণ হিসেবে প্রদানের মতো তার কোনো বৈধ আয়ের পথ বা পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্য (Financial Capacity) ছিল।
২. আইনি অনুমানের অসারতা প্রমাণ:
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যখন আসামিপক্ষ অভিযোগকারীর অর্থ ধার দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে যুক্তিসঙ্গত সংশয় প্রকাশ করতে সক্ষম হয়, তখনই আইনের প্রাথমিক অনুমানটি (Presumption) বাতিল হয়ে যায়।
আসামিপক্ষের জন্য এই রায়টি কেন একটি ‘প্রবল হাতিয়ার’?
সাধারণত ফৌজদারি মামলায় কোনো অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে সাব্যস্ত’ করার দায়িত্ব থাকে অভিযোগকারীর ওপর। কিন্তু চেক ডিজঅনার মামলার ক্ষেত্রে ধারা ১১৮ ও ১৩৯ অনুযায়ী, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার দায়ভার আসামির ওপর বর্তায়।
এই ঐতিহাসিক রায় অভিযুক্তদের জন্য একটি বড় ধরনের স্বস্তি বয়ে এনেছে। সুপ্রিম কোর্ট সুস্পষ্ট করেছেন যে:
আসামিকে তার নির্দোষতা ‘সন্দেহাতীতভাবে’ প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই; বরং ‘সম্ভাবনার ভারসাম্য’ (Preponderance of probabilities) বজায় রাখাই যথেষ্ট।
যদি আসামিপক্ষ শুনানির সময় অভিযোগকারীর আর্থিক সক্ষমতা বা আয়ের উৎস নিয়ে সফলভাবে প্রশ্ন তুলতে পারেন এবং আদালতে একটি যৌক্তিক সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারেন, তবে প্রমাণের মূল ভার (Legal Burden) পুনরায় অভিযোগকারীর ওপর বর্তায়।
এরপর অভিযোগকারী যদি তার অর্থের বৈধ উৎস প্রদর্শন করতে না পারেন, তবে মামলাটি ভিত্তিহীন হিসেবে গণ্য হয় এবং আসামি মুক্তি পাওয়ার অধিকারী হন।
উপসংহার
এই যুগান্তকারী রায়টি এটিই নিশ্চিত করে যে, আইন যেমন চেকের গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে সচেষ্ট, তেমনি মিথ্যা বা ভিত্তিহীন মামলা দিয়ে কাউকে হয়রানি করার পথও আইন বন্ধ করে দেয়।
Collected
18/06/2026
অপরাধমূলক মন (Mens Rea) না থাকলে কোনো কাজই অপরাধ নয়:
------------
বিখ্যাত মামলার নজির: Sherras v. De Rutzen [1895] 1 QB 918 Sherras v. De Rutzen Case Details
মূল ঘটনা ও রায়: ইংল্যান্ডের এই ঐতিহাসিক মামলায় একজন হোটেল ব্যবসায়ী এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছে মদ বিক্রি করেছিলেন,পুলিশ কর্মকর্তা ডিউটিতে ছিলেন, কিন্তু তিনি তার ডিউটির আর্মব্যান্ড খুলে রেখেছিলেন। ব্যবসায়ী সরল মনে ভেবেছিলেন পুলিশটি ডিউটিতে নেই। আদালত রায়ে বলেন, "আইনে সাধারণ নিয়ম হলো-দোষী মন (Mens Rea) ছাড়া কোনো অপরাধ হতে পারে না।" ব্যবসায়ী যেহেতু জেনেশুনে অপরাধ করতে চাননি, তাই তিনি নির্দোষ。
প্রয়োগ: রায়হান সোবহানের মনে যেহেতু শফিক নজরুলকে ঘুষ দেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট ইচ্ছা বা মোটিভ ছিল না, তাই কেবল ৩ টাকা দেওয়ার জন্য তাকে অপরাধী বলা যাবে না।
২. অতি ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ ঘটনা আইন বিচার করে না (De Minimis Rule):
---------------
বিখ্যাত মামলার নজির: দণ্ডবিধির ৯৫ ধারা ও এর আইনি ব্যাখ্যা Penal Code Section 95 Official Text
মূল নীতি ও নজির: বাংলাদেশ ও ভারতের দণ্ডবিধির ৯৫ ধারার মূল ভিত্তি হলো এই ল্যাটিন ডকট্রিন。 বিভিন্ন উচ্চ আদালত (যেমন-State of Bihar v. Bihar Chamber of Commerce) এই নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, যদি কোনো লেনদেন বা ক্ষতির পরিমাণ এতটাই ক্ষুদ্র হয় যে কোনো সাধারণ সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ তা নিয়ে নালিশ করবে না, তবে আইন সেখানে মাথা ঘামাবে না।
প্রয়োগ: ৩ টাকা বর্তমান অর্থনৈতিক বাজারে এতটাই ক্ষুদ্র একটি অঙ্ক যে, এর পেছনে কোনো অনৈতিক উদ্দেশ্য না থাকলে একে সরাসরি দণ্ডবিধির ৯৫ ধারার "তুচ্ছ বিষয়" হিসেবে গণ্য করে মামলা বাতিল করা হবে।
৩. অবৈধ সুবিধা পাওয়ার চুক্তি বা নিয়ত ছাড়া "ঘুষ" প্রমাণিত হয় না:
--------------
বিখ্যাত মামলার নজির: State of Madhya Pradesh v. J.B. Singh (2000) 2000 CRILJ 4591 State of M.P. v. J.B. Singh On Indian Kanoon
মূল ঘটনা ও রায়: ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এই মামলায় একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ আনা হয়েছিল, কিন্তু আদালত রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে, লেনদেনের পেছনে কোনো অবৈধ সুবিধা আদায়ের সুনির্দিষ্ট দাবি (Demand) বা চুক্তি রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি,ফলে উচ্চ আদালত আসামিকে খালাস দেন।
প্রয়োগ: দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, টাকা দিলেই ঘুষ হয় না, তার বিনিময়ে কোনো "অবৈধ পারিতোষিক" বা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চুক্তি থাকতে হয়。 রায়হান সোবহান কোনো নিয়ম ভেঙে বাড়তি সুবিধা নেননি, তাই এটি ঘুষের সংজ্ঞাতেই পড়ে না।
৪. সরল বিশ্বাসে (Good Faith) করা কাজ অপরাধের আওতামুক্ত:
-------------
বিখ্যাত মামলার নজির: Sukha v. State of Rajasthan (Landmark on Section 52) Good Faith and Indian Penal Code Analysis
মূল নীতি ও রায়: এই মামলায় আদালত পরিষ্কার করেন যে, দণ্ডবিধির ৫২ ধারা অনুযায়ী কোনো কাজ যদি উপযুক্ত সতর্কতা ও সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তাকে "সরল বিশ্বাসে" করা কাজ বলা হবে,আইন সরল বিশ্বাসে করা কাজকে সবসময় সুরক্ষা দেয়।
প্রয়োগ: রায়হান সোবহান ইসলামী মাইন্ডের মানুষ হিসেবে সামাজিক বকশিশ বা ভাঙতি হিসাবের অংশ ভেবে সরল মনে ৩ টাকা দিয়েছিলেন, যার পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না।
৫. মানবিক ভুল বা হিসাবের গড়মিল ফৌজদারি অপরাধ নয়:
-------------
বিখ্যাত মামলার নজির: R. v. Tolson (1889) 23 QBD 168 R. v. Tolson Case Record
মূল ঘটনা ও রায়: এই মামলায় এক নারী তার প্রথম স্বামী সমুদ্রে জাহাজ ডুবিতে মারা গেছেন-এমন যুক্তিসঙ্গত ও সরল বিশ্বাস থেকে ৬ বছর পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন,পরে প্রথম স্বামী জীবিত ফিরে এলে তার বিরুদ্ধে দ্বিপত্নীত্ব বা বিগামির (Bigamy) মামলা হয়。 আদালত রায় দেন যে, সরল বিশ্বাসে কোনো তথ্যের বা বাস্তবতার ভুল (Mistake of Fact) ঘটলে তা অপরাধ নয়।
প্রয়োগ: ৩ টাকার লেনদেনটি কোনো দুর্নীতি নয়, এটি দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ একটি গাণিতিক বা মানবিক অসাবধানতা মাত্র, যা কোনো ফৌজদারি সাজার যোগ্য নয়।
05/06/2026
ধারা ১৬৪ — বিচারিক স্বীকারোক্তি (Judicial Confession)
নথি পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, পুলিশ ৩০.০৮.২০০৮ তারিখ সন্ধ্যা আনুমানিক ৬:১৫ ঘটিকায় দণ্ডিত ব্যক্তিকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এর পরের দিন ৩১.০৮.২০০৮ তারিখে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের জন্য পেশ করা হয়। তবে সেদিন পর্যাপ্ত সময়ের অভাব থাকায় ম্যাজিস্ট্রেট তাকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পরবর্তী দিন অর্থাৎ ০১.০৯.২০০৮ তারিখে তাকে আবারও ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থাপন করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট তাকে নিজস্ব পিয়নের তত্ত্বাবধানে রেখে যথেষ্ট ভাবনার (reflection) সুযোগ দেন এবং পরবর্তীতে তার স্বীকারোক্তি নথিভুক্ত করেন।
স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করার নির্ধারিত ফরমে সকল ঘর আইনি বিধি মেনে পূরণ করা হয়েছিল। বিশেষত ৬ নম্বর কলামের প্রতিটি প্রশ্ন আসামিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল এবং তার জবাবগুলো সঠিকভাবে লিখে রাখা হয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট স্বহস্তে লিখে স্বীকারোক্তির সত্যতা এবং এটি স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে কি না, সেই বিষয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
জবানবন্দি রেকর্ডকারী ম্যাজিস্ট্রেট (PW-12) আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করে স্বীকারোক্তির বৈধতা নিশ্চিত করেছেন। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পরেও তার সাক্ষ্যে কোনো ধরনের অসঙ্গতি বা নেতিবাচক তথ্য পাওয়া যায়নি। এর ফলে আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির স্বীকারোক্তিটি সত্য, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এবং আইনসম্মতভাবে গ্রহণ করা হয়েছে।
..(প্যারা-৩০)
স্বীকারোক্তি জবানবন্দিকে আংশিক নয়, বরং পূর্ণাঙ্গভাবে বিচার করতে হবে
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮
ধারা ১৬৪
এটি একটি প্রতিষ্ঠিত আইনি নীতি যে, কোনো আসামির বিচারিক স্বীকারোক্তি (judicial confession) সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করা আবশ্যক। যদি প্রয়োজনীয়তা থাকে, তবে দেখতে হবে এর কোনো অংশ কি একে অপরের বিপরীতে যাচ্ছে কি না।
State Vs. Lalu Miah মামলায় আপিল বিভাগ এই নীতিটি গ্রহণ করেছে। আসামির পক্ষে সহায়ক স্বীকারোক্তির অংশটি খণ্ডন করার মতো পর্যাপ্ত আইনি প্রমাণ না থাকলে তা বাতিল করা সম্ভব নয়।
কেবলমাত্র অনুমানের ভিত্তিতে সন্দেহ পোষণ করে আসামির অনুকূলে থাকা অংশটিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বরং পুরো স্বীকারোক্তিটি পাঠ করলে যদি তা ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট ও কারণ প্রকাশ করে এবং সত্য বলে মনে হয়, তবে তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
..(প্যারা-৩৩)
আত্মরক্ষার কারণে মৃত্যু ঘটানো কখন আইনত বৈধ
দণ্ডবিধি, ১৮৬০
ধারা ১০০ — ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার (Right of Private Defence)
আত্মরক্ষা করতে গিয়ে কোনো হত্যাকাণ্ড তখনই বৈধ হতে পারে, যখন তা অনিবার্য প্রয়োজন (necessity) থেকে সৃষ্টি হয় এবং সেই প্রয়োজনটি কোনো জোরালো বা গুরুতর অপরাধ রোধ করার জন্য তৈরি হয়।
যিনি যুক্তিসঙ্গতভাবে ভয় পান যে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে অথবা তিনি গুরুতর আঘাত (grievous hurt) পেতে পারেন, তিনি আক্রমণকারীকে হত্যা করার মাধ্যমেও আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
তবে এই অধিকারটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে—
বিপদের আশঙ্কা অবশ্যই যৌক্তিক (reasonable) হতে হবে;
আত্মরক্ষায় প্রয়োগ করা বল বা শক্তি প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া চলবে না;
প্রকৃতপক্ষে গুরুতর আঘাত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই;
এমন আঘাত আসার প্রবল সম্ভাবনা বা যুক্তিসঙ্গত আশঙ্কাই যথেষ্ট।
ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার সেই ব্যক্তির জন্য কার্যকর, যিনি হঠাৎ এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন যেখানে জীবন বা সম্পদের ওপর বাস্তব কিংবা আপাত আসন্ন বিপদ রয়েছে এবং সেই বিপদের জন্য তিনি নিজে দায়ী নন।
কোনো ব্যক্তি যদি গুরুতর আঘাত পান অথবা তেমন আঘাত পাওয়ার যুক্তিসঙ্গত আশঙ্কা করেন—তবে আত্মরক্ষার নিমিত্তে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার তার রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত আক্রমণের ভয় বা আশঙ্কা বজায় থাকবে, ততক্ষণ এই অধিকার বহাল থাকবে।
..(প্যারা-৩৬)
কপি
26/05/2026
অর্থঋণ ও জারি মামলায় তৃতীয় পক্ষের রিট: হাইকোর্টের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত
মোঃ ফজলুর রহমান বনাম বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য
অর্থঋণ আদালতের মামলা ও জারি কার্যক্রমে সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, কেবল ঋণগ্রহীতা, গ্যারান্টর বা মামলার প্রত্যক্ষ পক্ষগণই আদালতের প্রতিকার চাইতে পারেন। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো নিরীহ তৃতীয় পক্ষের বৈধ মালিকানা বা স্বত্ব যদি অর্থঋণ আদালতের কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় পড়ে, তবে তিনি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে সরাসরি রিট পিটিশন দায়ের করতে পারবেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মোঃ ফজলুর রহমান বনাম বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য মামলায়, যেখানে হাইকোর্ট বিভাগ Rule Absolute করে তৃতীয় পক্ষের স্বত্ব রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করেছেন। ব্যাংকিং আইন, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এবং সাংবিধানিক প্রতিকার বিষয়ে কাজ করা আইনজীবী ও আইন শিক্ষার্থীদের জন্য রায়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মামলার সংক্ষিপ্ত ঘটনা (Facts of the Case)
২ নং রেসপন্ডেন্ট ব্যাংক মূল ঋণগ্রহীতা ৩ নং রেসপন্ডেন্টের বিরুদ্ধে ৩৮৩/১৯৯২ নং অর্থঋণ মামলা দায়ের করে। মামলাটি একতরফাভাবে ডিক্রি হয় এবং ব্যাংক ১১,০৭,১১৭/- টাকা আদায়ের জন্য ৩৮/১৯৯৬ নং অর্থ জারি মামলা দায়ের করে।
দেনাদার বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাংক অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩(৭) ধারার অধীনে মালিকানা সনদ (Ownership Certificate) গ্রহণ করে। পরবর্তীতে উক্ত সনদের ভিত্তিতে ব্যাংক “দৈনিক করতোয়া” পত্রিকায় বন্ধকী সম্পত্তি নিলামের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
কিন্তু রিট পিটিশনার মোঃ ফজলুর রহমান দাবি করেন যে, নিলামকৃত ৩৩.৭৫ ডেসিমেল সম্পত্তির প্রকৃত মালিক তিনি। তাঁর পিতা ও চাচার সম্পত্তি বাটোয়ারা মামলার ডিক্রির মাধ্যমে তিনি পৃথক অংশ হিসেবে লাভ করেন এবং পরবর্তীতে সর্বশেষ আর.এস খতিয়ান তাঁর নামে প্রস্তুত হয়। তিনি নিয়মিত খাজনা প্রদান ও দখলে ছিলেন।
আবেদনকারীর অভিযোগ ছিল, মূল ঋণগ্রহীতা প্রতারণার মাধ্যমে তাঁর সম্পত্তি ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখেছেন।
আবেদনকারী কীভাবে সংক্ষুব্ধ (How Aggrieved)
রিট পিটিশনার আদালতে দেখান যে:
তিনি কখনো ঋণগ্রহীতা ছিলেন না;
অর্থঋণ মামলা বা জারি মামলার কোনো পক্ষও ছিলেন না;
তবুও তাঁর বৈধ সম্পত্তি নিলামে তোলা হয়েছে;
সর্বশেষ আর.এস রেকর্ড তাঁর নামে;
তিনি বৈধ মালিক ও দখলদার;
ব্যাংকের কার্যক্রম তাঁর সাংবিধানিক সম্পত্তির অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে।
আবেদনকারী আরও উল্লেখ করেন যে, পূর্ববর্তী এক নিলামে তিনি অংশ নিয়েছিলেন এবং ব্যাংক তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিল যে সম্পত্তিটি তাঁর কাছেই হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু পরবর্তীতে ব্যাংক পুনরায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলে তিনি হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।
রুল জারি ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ
প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিভাগ একটি Rule Nisi জারি করেন এবং প্রশ্ন তোলেন:
ব্যাংকের প্রকাশিত নিলাম নোটিশ কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করা হবে না।
একইসাথে আদালত:
নিলাম নোটিশের কার্যকারিতা ৪ মাসের জন্য স্থগিত করেন;
আবেদনকারীকে ব্যাংকের মোট বকেয়া টাকা ৪ মাসের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেন;
এবং নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হলে Rule discharged হবে বলে উল্লেখ করেন।
আবেদনকারীর পক্ষে মূল আইনি যুক্তি
আবেদনকারীর আইনজীবী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি বলেন:
১. ৩৩(৯) ধারার কারণে জারি মামলা ইতোমধ্যেই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে
অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩(৯) ধারা অনুযায়ী, ৩৩(৫) বা ৩৩(৭) ধারার অধীনে মালিকানা সনদ ইস্যু হওয়ার সাথে সাথেই জারি মামলা আইনগতভাবে disposed of হয়ে যায়।
অতএব, নিলামের সময় কোনো কার্যকর “জারি মামলা” অস্তিত্বে ছিল না।
২. তাই ৩২ ধারার প্রতিকার প্রযোজ্য নয়
আইনের ৩২ ধারায় “উদ্ভূত জারি মামলায়” আপত্তির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখানে কোনো জারি মামলাই বিচারাধীন ছিল না। ফলে আবেদনকারীর জন্য ১০% টাকা জমা দিয়ে Miscellaneous Case দায়েরের সুযোগও ছিল না।
৩. দেওয়ানি কার্যবিধির Order XXI প্রযোজ্য নয়
যেহেতু নিলামটি আদালতের মাধ্যমে নয়, বরং ব্যাংক নিজেই পরিচালনা করছিল, তাই CPC-এর Order XXI Rule 58 বা Rule 90-এর আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
৪. রিটই ছিল একমাত্র কার্যকর প্রতিকার
যখন কোনো কার্যকর বিকল্প প্রতিকার বিদ্যমান নেই, তখন সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিটই একমাত্র remedy।
ব্যাংকের পক্ষে যুক্তি
ব্যাংকের আইনজীবী যুক্তি দেন:
আবেদনকারী মূল মামলার পক্ষ নন;
তাঁর locus standi নেই;
ব্যাংক তাঁর কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করতে বাধ্য নয়;
আবেদনকারীর উচিত ছিল দেওয়ানি আদালতে যাওয়া;
মালিকানা ও জালিয়াতির প্রশ্ন সাক্ষ্যপ্রমাণসাপেক্ষ বিষয়, যা রিটে নিষ্পত্তিযোগ্য নয়।
হাইকোর্ট বিভাগের পর্যবেক্ষণ
মহামান্য হাইকোর্ট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কয়েকটি পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন।
১. বিকল্প প্রতিকার কার্যকর ছিল না
আদালত বলেন, যেহেতু নিলামের সময় কোনো জারি মামলা বিচারাধীন ছিল না, তাই:
অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩২ ধারা,
অথবা CPC Order XXI-এর বিধানসমূহ
কোনোটিই এখানে প্রযোজ্য নয়।
ফলে রিট পিটিশনই ছিল একমাত্র কার্যকর remedy।
২. আবেদনকারীর মালিকানার prima facie প্রমাণ রয়েছে
আদালত লক্ষ্য করেন:
আবেদনকারী আর.এস খতিয়ান দাখিল করেছেন;
বাটোয়ারা মামলার ডিক্রি দাখিল করেছেন;
ব্যাংক কোনো Counter-affidavit দিয়ে তা খণ্ডন করতে পারেনি।
ফলে আদালতের দৃষ্টিতে আবেদনকারীর prima facie title প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
৩. ব্যাংকের আচরণ “অযৌক্তিক”
আদালত বিশেষভাবে উল্লেখ করেন:
আবেদনকারী আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যাংকের মোট পাওনা পরিশোধ করতে প্রস্তুত ছিলেন এবং পে-অর্ডারও নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাংক তা গ্রহণ করেনি।
আদালতের ভাষায়, যখন প্রকৃত মালিক ব্যাংকের জনঅর্থ (public money) পরিশোধ করতে আগ্রহী, তখন ব্যাংকের তা প্রত্যাখ্যান করা ছিল “very unreasonable”.
চূড়ান্ত রায় (Judgment)
শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগ রুল Absolute করেন এবং নির্দেশ দেন:
ব্যাংক আবেদনকারীর দাখিলকৃত পে-অর্ডারের টাকা ১ মাসের মধ্যে গ্রহণ করবে;
ব্যাংকের অতিরিক্ত কোনো দাবি থাকলে তা আবেদনকারীর সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করবে।
আদালত আরও বলেন:
“Accordingly, the Rule is made absolute.”
রায়ের আইনগত গুরুত্ব
এই রায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে:
১. Third Party-র Locus Standi স্বীকৃত
অর্থঋণ ও জারি মামলার পক্ষ না হয়েও, যদি কারও বৈধ স্বত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তিনি রিট করতে পারবেন।
২. ৩৩(৭) ধারার Ownership Certificate ইস্যুর পর Ex*****on Case শেষ হয়ে যায়
এটি অর্থঋণ আদালত আইনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা।
৩. ৩২ ধারার প্রতিকার সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়
যদি কোনো জারি মামলা বিচারাধীন না থাকে, তাহলে ৩২ ধারা invoke করা যাবে না।
৪. ব্যাংকের ক্ষমতা সীমাহীন নয়
Ownership Certificate পেলেই ব্যাংক যে কোনো সম্পত্তি নির্বিচারে বিক্রি করতে পারে না। প্রকৃত মালিকের স্বত্ব আদালত রক্ষা করবেন।
উপসংহার
বাংলাদেশে অর্থঋণ আদালতের কার্যক্রমে প্রায়ই দেখা যায়, প্রকৃত মালিক বা তৃতীয় পক্ষ জটিল প্রক্রিয়ার কারণে প্রতিকারহীন অবস্থায় পড়েন। এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, আইনের প্রক্রিয়া কোনো নিরীহ ব্যক্তির সাংবিধানিক ও বৈধ সম্পত্তির অধিকার বিনষ্ট করতে পারে না।
ব্যাংকিং আইন, অর্থঋণ আদালত আইন ও সাংবিধানিক প্রতিকার বিষয়ে কাজ করা আইনজীবীদের জন্য এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হবে।
26/05/2026
অর্থঋণ ও জারি মামলায় তৃতীয় পক্ষের রিট: “মোঃ ফজলুর রহমান -বনাম- বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য” মামলার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুযায়ী পরিচালিত অর্থঋণ ও জারি মামলায় কোনো ব্যক্তি যদি মূল মামলা বা জারি মামলার পক্ষ না হয়, তাহলেও তার বৈধ স্বত্ব বা মালিকানা ক্ষুণ্ন হলে তিনি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন। সম্প্রতি “মোঃ ফজলুর রহমান -বনাম- বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য” মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ এই নীতিকে পুনর্ব্যক্ত করে রুল অ্যাবসোলিউট ঘোষণা করেছেন।
ব্যাংকিং আইন নিয়ে কাজ করা আইনজীবী, আইনের ছাত্র এবং অর্থঋণ আদালত আইনের ব্যবহারিক দিক নিয়ে আগ্রহীদের জন্য রায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ধারা ৩২, ৩৩(৭), ৩৩(৯) এবং দেওয়ানি কার্যবিধির Order XXI-এর প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একজন নিরীহ তৃতীয় পক্ষের স্বত্ব রক্ষায় সাংবিধানিক প্রতিকারের গুরুত্বও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
মামলার সংক্ষিপ্ত ঘটনা (Facts of the Case)
মামলার ২ নং রেসপন্ডেন্ট ব্যাংক মূল ঋণগ্রহীতা ৩ নং রেসপন্ডেন্টের বিরুদ্ধে ৩৮৩/১৯৯২ নং অর্থঋণ মামলা দায়ের করে। মামলাটি একতরফাভাবে ডিক্রি হয়। পরবর্তীতে ডিক্রিকৃত ১১,০৭,১১৭/- টাকা আদায়ের জন্য ব্যাংক ৩৮/১৯৯৬ নং অর্থ জারি মামলা দায়ের করে।
দেনাদার টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাংক অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ধারা ৩৩(৭) অনুযায়ী মালিকানা সার্টিফিকেট গ্রহণ করে। উক্ত সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে ২৭.১১.২০২৫ তারিখে “দৈনিক করতোয়া” পত্রিকায় বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রয়ের জন্য নিলাম নোটিশ প্রকাশ করা হয়।
এই পর্যায়ে রিট পিটিশনার মোঃ ফজলুর রহমান, যিনি মূল অর্থঋণ মামলা কিংবা জারি মামলার কোনো পক্ষ ছিলেন না, হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেন।
আবেদনকারী কীভাবে সংক্ষুব্ধ হলেন
রিট পিটিশনার দাবি করেন যে বিতর্কিত ৩৩.৭৫ ডেসিমেল সম্পত্তি তাঁর প্রয়াত পিতা ও চাচার মালিকানাধীন ছিল। পিতার মৃত্যুর পর ১৯৭৮ সালের ৬৪ নং বাটোয়ারা মামলার ডিক্রির মাধ্যমে তিনি পৃথক অংশে উক্ত সম্পত্তি লাভ করেন। পরবর্তীতে সর্বশেষ আর.এস খতিয়ানেও সম্পত্তি তাঁর নামে রেকর্ডভুক্ত হয় এবং তিনি নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে বৈধ দখলে ছিলেন।
তাঁর অভিযোগ, মূল ঋণগ্রহীতা সম্পূর্ণ প্রতারণার মাধ্যমে তাঁর সম্পত্তি ব্যাংকের নিকট বন্ধক রাখেন। এর আগেও সম্পত্তিটি নিলামে উঠেছিল, যেখানে আবেদনকারী অংশগ্রহণ করেছিলেন। তখন ব্যাংক তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিল যে সম্পত্তিটি তাঁর কাছেই হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু পরবর্তীতে পুনরায় নিলাম নোটিশ প্রকাশ করা হলে তাঁর স্বত্ব মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ে।
রুল জারি ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ
প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিভাগ একটি Rule Nisi জারি করেন এবং প্রশ্ন তোলেন যে ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত নিলাম নোটিশ কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করা হবে না।
একই সঙ্গে আদালত চার মাসের জন্য নিলাম নোটিশের কার্যকারিতা স্থগিত করেন এবং আবেদনকারীকে চার মাসের মধ্যে ব্যাংকের বকেয়া পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দেন। আদালত আরও বলেন, নির্দেশনা পালনে ব্যর্থ হলে রুল স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ হয়ে যাবে।
আবেদনকারীর পক্ষে উপস্থাপিত যুক্তি
আবেদনকারীর আইনজীবী যুক্তি দেন যে অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ধারা ৩৩(৯) অনুযায়ী ধারা ৩৩(৫) বা ৩৩(৭)-এর অধীনে মালিকানা সার্টিফিকেট ইস্যু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জারি মামলা আইনত নিষ্পত্তি হয়ে যায়। ফলে নিলামের সময় কোনো জারি মামলা বিচারাধীন ছিল না।
এই কারণে ধারা ৩২ অনুযায়ী “উদ্ভূত জারি মামলায়” ১০% টাকা জমা দিয়ে Miscellaneous Case দায়েরের সুযোগও ছিল না। একইভাবে দেওয়ানি কার্যবিধির Order XXI Rule 58 বা Rule 90-এর প্রতিকারও প্রযোজ্য নয়, কারণ নিলামটি আদালতের মাধ্যমে নয়, বরং ব্যাংক নিজেই পরিচালনা করছিল।
আরও বলা হয়, আদালতের নির্দেশনা অনুসারে আবেদনকারী ব্যাংকের বকেয়া অর্থ পরিশোধের জন্য পে-অর্ডার নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু ব্যাংক তা গ্রহণ করেনি। ফলে আবেদনকারীর কোনো গাফিলতি ছিল না।
ব্যাংকের পক্ষে যুক্তি
ব্যাংকের পক্ষে বলা হয়, আবেদনকারী মূল ঋণগ্রহীতা নন এবং তিনি সাজাপ্রাপ্ত দেনাদারও নন। তাই তাঁর কাছ থেকে বকেয়া অর্থ গ্রহণের কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা ব্যাংকের নেই।
ব্যাংক আরও যুক্তি দেয় যে আবেদনকারীর উচিত ছিল অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ধারা ৩২, দেওয়ানি কার্যবিধির Order XXI Rule 58/90 অথবা Transfer of Property Act-এর ধারা ৯১ অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতে প্রতিকার চাওয়া। সরাসরি রিট দায়ের রক্ষণীয় নয়।
এছাড়া ব্যাংক দাবি করে যে এখানে মালিকানা ও জালিয়াতি সংক্রান্ত বিতর্কিত প্রশ্ন রয়েছে, যা সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া নির্ধারণ সম্ভব নয়; ফলে রিট এখতিয়ারে এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তিযোগ্য নয়।
আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট বিভাগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন।
প্রথমত, আদালত বলেন যে নিলাম নোটিশ জারির সময় কোনো জারি মামলা বিচারাধীন ছিল না। ফলে অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ধারা ৩২ কিংবা CPC-এর Order XXI-এর বিধান এখানে প্রযোজ্য নয়। সুতরাং রিট পিটিশনই ছিল আবেদনকারীর একমাত্র কার্যকর ও সম-কার্যকর প্রতিকার।
দ্বিতীয়ত, আবেদনকারী যে আর.এস খতিয়ান ও বাটোয়ারা ডিক্রি দাখিল করেছেন, ব্যাংক কোনো Counter-affidavit দিয়ে তা খণ্ডন করতে পারেনি। আদালত মত দেন যে সর্বশেষ আর.এস রেকর্ড আবেদনকারীর স্বত্বের পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ।
তৃতীয়ত, আদালত বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে আবেদনকারী আদালতের নির্দেশনা মেনে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু ব্যাংক অযৌক্তিকভাবে সেই অর্থ গ্রহণ করেনি। আদালতের ভাষায়, এটি ছিল “very unreasonably declined to receive that public money।”
আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে মূল ঋণগ্রহীতা পলাতক এবং আবেদনকারীই প্রকৃত মালিক হিসেবে প্রতীয়মান। ফলে তাঁর ন্যায়সংগত স্বার্থ রক্ষা করা প্রয়োজন।
চূড়ান্ত রায় (Judgment and Order)
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ রুল অ্যাবসোলিউট ঘোষণা করেন এবং ব্যাংককে আবেদনকারীর জমা দিতে চাওয়া অর্থ এক মাসের মধ্যে গ্রহণ করার নির্দেশ দেন।
আদালত বলেন:
“Accordingly, the Rule is made absolute however without any order as to costs.”
এছাড়া আদালত স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন যে Annexure-F-1-এ উল্লেখিত অর্থ ব্যাংককে গ্রহণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে কোনো অতিরিক্ত দাবি থাকলে তা আবেদনকারীর সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যেতে পারে।
রায়ের গুরুত্ব
এই রায়ের মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—
১. অর্থঋণ ও জারি মামলায় পক্ষ না হয়েও প্রকৃত মালিক বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রিট দায়ের করতে পারেন।
২. ধারা ৩৩(৭)-এর অধীনে মালিকানা সার্টিফিকেট ইস্যুর পর জারি মামলা নিষ্পত্তি হয়ে গেলে ধারা ৩২-এর প্রতিকার আর প্রযোজ্য থাকে না।
৩. সব ক্ষেত্রে “বিকল্প প্রতিকার” থাকলেই রিট অরক্ষণীয় হবে না; যদি সেই প্রতিকার বাস্তবে কার্যকর না হয়, তবে রিট গ্রহণযোগ্য হবে।
৪. ব্যাংক জনঅর্থ আদায়ে কাজ করলেও তা আইন ও ন্যায্যতার সীমার মধ্যে করতে বাধ্য। প্রকৃত মালিক পাওনা পরিশোধে আগ্রহী হলে ব্যাংকের অযৌক্তিক আচরণ আদালত সমর্থন করবে না।
ব্যাংকিং ল’ এবং অর্থঋণ আদালত আইন নিয়ে প্র্যাকটিস করা আইনজীবীদের জন্য রায়টি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
18/05/2026
ধন্যবাদ
দৈনিক স্পষ্টবাদী
তাং- ১৪/০৫/২০২৬
মোটরসাইকেলে বার্ষিক কর: প্রয়োজনের বাহনকে বিলাসিতার কাতারে ফেলা কতটা যৌক্তিক?
10/05/2026
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ
Kamal Miah & others Vs. Lakkatura Tea Co. Ltd and others
11 SCOB [2019] HCD 109 মামলায়
স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, শুধুমাত্র Record of Right (ROR)/খতিয়ান/নামজারি মালিকানা (title) সৃষ্টি করে না; এটি কেবল presumptive value বহন করে।
26/04/2026
পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে আইনজীবীকে দায়ী/অভিযুক্ত করা যায় না
13BLD (AD) 152 (ক)
25/04/2026
২৬ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক স্পষ্টবাদী
দৈনিক স্পষ্টবাদী
শিরোনাম-
"প্রবাসে নাগরিক নিরাপত্তা: ট্যাম্পার ট্রাজেডি থেকে রাষ্ট্রের করনীয়"
25/04/2026
তাং ০৬/০৪/২০২৬
ধন্যবাদ দৈনিক স্পষ্টবাদী
শিরোনাম:
আইন পেশা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সুবিধা ঝুঁকি এবং বাস্তবতা।