30/08/2022
এর চেয়ে শান্তির ঘুম আর আছে কি?????
A research center for Family Enterprise Research. Today, family businesses play a crucial role in th
30/08/2022
এর চেয়ে শান্তির ঘুম আর আছে কি?????
উদ্যোক্তা
অর্থনীতির গেম চেঞ্জার–২২
নতুন নতুন শিল্পকারখানা করাই ছিল তাঁর নেশা
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখন অর্থনীতিতে। ৫০ বছরে বাংলাদেশ নামের কথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হয়ে উঠেছে চমকে ভরা জাদুর বাক্স। সাহায্যনির্ভর বাংলাদেশ এখন বাণিজ্যনির্ভর দেশে পরিণত। তবে যাত্রাপথটা সহজ ছিল না। বড় ঝুঁকি নিয়ে অভিনব পথে এগিয়ে গেছেন আমাদের সাহসী উদ্যোক্তারা। এ সাফল্যের পেছনে আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অর্থনীতিবিদ যেমন ছিলেন, আছেন নীতিনির্ধারকেরাও। মূলত অর্থনীতির এসব অগ্রনায়ক, পথ রচয়িতা ও স্বপ্নদ্রষ্টারাই ৫০ বছরে বিশ্বে বাংলাদেশকে বসিয়েছেন মর্যাদার আসনে।
আমরা বেছে নিয়েছি সেই নায়কদের মধ্যে ৫০ জনকে। আমাদের কাছে তারাই অর্থনীতির ‘গেম চেঞ্জার’।
মাসুদ মিলাদ
নতুন নতুন শিল্পকারখানা করাই ছিল তাঁর নেশা
১৯৪৬ সাল। দেশভাগের ঠিক আগের বছর। সে বছরই নোয়াখালীর অজপাড়াগাঁ থেকে প্রায় শূন্য হাতে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় এসেছিলেন এক তরুণ। বয়স তখন ১৭। টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রথম চাকরি নেন মুদিদোকানে। তবে তাঁর স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। চাকরি ছেড়ে পাহাড়তলী বাজারেই চার বছরের মাথায় নিজেই মনিহারি পণ্যের দোকান দিয়েছেন। আবার সেই দোকানের লাভের টাকায় চট্টগ্রামের পাহাড়তলী বাজারে বিড়ির কারখানা গড়ে তোলেন। দুজন কর্মী নিয়ে শুরু করেন হাতে বানানো বিড়ি। পরে চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লায়ও সম্প্রসারণ করেছেন বিড়ি কারখানা।
এভাবে ব্যবসা একটু একটু করে বড় হতে শুরু করে। বিড়ি কারখানার বাইরে ইটভাটা ও লুঙ্গি তৈরির কারখানাও করেছেন। করেছেন সিনেমা হলে বিনিয়োগ। পণ্য বাণিজ্যও শুরু করেছিলেন। আবার শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে জমিও কিনে রেখেছিলেন। বেসরকারীকরণের শুরুর দিকে নতুন নতুন কারখানার জন্য আবেদনও করে রেখেছিলেন। তবে বড় শিল্পের গোড়াপত্তনের আগে ১৯৭৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি আবুল খায়ের গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবুল খায়ের।
মৃত্যুর আগে আবুল খায়ের যেন উত্তরসূরিদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়ার বীজ বুনে গিয়েছিলেন। তাঁর সন্তানেরা সেখান থেকে কঠোর পরিশ্রমে আবুল খায়ের গ্রুপকে নিয়ে গেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) বাংলাদেশের বেসরকারি খাত নিয়ে ২০২০ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে আয়ের দিক থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে এমন ২৩টি কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেই তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপ। ওই প্রতিবেদনে যাদের বার্ষিক আয় দেখানো হয় ১৭০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা। যদিও এখন গ্রুপটির বার্ষিক আয় আরও অনেক বেশি।
আবুল খায়ের গ্রুপ বর্তমানে শিল্পের অনেক খাতেই নেতৃত্ব দিচ্ছে। কয়েকটা উদাহরণই যথেষ্ট। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় সিমেন্ট কারখানা শাহ সিমেন্ট আবুল খায়ের গ্রুপের। ঢেউটিনের বাজারেও তারা শীর্ষে আছে গরু মার্কা ঢেউটিন ব্র্যান্ড নিয়ে। আবার রডের বাজারে একেএস ব্র্যান্ডের অবস্থান দ্বিতীয়। দ্রুততম সময়ে স্যানিটারি পণ্যে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে তাদের ব্র্যান্ড স্টেলা। মার্কস ব্র্যান্ডের গুঁড়ো দুধসহ অনেক খাদ্যপণ্যে শীর্ষ অবস্থানটি তাদের। তাদের চায়ের ব্র্যান্ড সিলন বাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে।
দোকানের চাকরি দিয়ে শুরু
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের নাটেশ্বর গ্রামের সেরাজুল হকের তিন সন্তানের মধ্যে মেজ আবুল খায়ের। ব্রিটিশ আমলে ১৯২৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। গ্রামের স্কুলেই পড়াশোনা করেন। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে নবম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় গ্রামের পরিচিত এক ব্যক্তির হাত ধরে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে আসেন তিনি। সেটি ১৯৪৬ সালে। সেখানে গাফফার সাহেব নামের এক ব্যক্তির মুদিদোকানে চাকরি নেন। মাস শেষে যা বেতন পেতেন, খরচের জন্য রেখে বাকিটা বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। এভাবে কয়েক বছর চাকরি করেন। মুদিদোকানে চাকরি করে নিজের দোকান করার স্বপ্ন জাগে তাঁর। বাবা সেরাজুল হককে সে কথা জানালেন। তাঁর বাবা ছেলের আশা পূরণের জন্য গ্রামে জমি বেচে ছেলের হাতে কিছু টাকা তুলে দেন। ১৯৫০-৫১ সালের দিকে পাহাড়তলী বাজারে মনিহারি পণ্যের দোকান দেন আবুল খায়ের। সে সময় পাহাড়তলীতে হজ ক্যাম্প চালু হয়। হাজিরা ক্যাম্প থেকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে জাহাজে করে হজ করার জন্য সৌদি আরব যেতেন। হাজিদের আনাগোনায় দুই বছরে দোকানের ব্যবসায় বেশ লাভ হয়। তবে তাঁর স্বপ্ন ছিল আরও বড়।
বিজ্ঞাপন
বিড়ি কারখানা দিয়ে শিল্পের হাতেখড়ি
সে সময় পাট, বিড়িশিল্প, ইটভাটা ও হস্তচালিত তাঁতের কারখানার চল। আবুল খায়ের দেখলেন, হাতে বানানো বিড়ির চল সে সময়। দোকানের লাভের টাকায় পাহাড়তলী বাজারেই ১৯৫৩ সালে দুজন কর্মী নিয়ে বিড়ি বানাতে শুরু করেন তিনি। নিজেই আবার সেই বিড়ি বিক্রি করতেন। নাম দেন ‘৪২ নং আবুল বিড়ি’। শুরুতে টেন্ডু পাতা দিয়ে বিড়ি বানানো হতো। পরে কুম্ভ পাতা দিয়ে শুরু হয় বিড়ি বানানো। পাতা সেদ্ধ করে একটু নরম হলে তামাক মুড়িয়ে বিড়ি বানানো হতো। এরপরে কাগজ দিয়ে।
বিড়ির ব্যবসা জমে ওঠে। ধীরে ধীরে চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে ফেনীর পাঁচগাছি, নোয়াখালীর চৌমুহনী ও কুমিল্লার লাকসামেও বিড়ির কারখানা দেন। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় হারাগাছ থেকে তামাকপাতা সংগ্রহ করতেন তিনি। পরে সেখানেও প্রক্রিয়াজাত কারখানা গড়ে তোলেন।
বিড়ির কারখানা সম্প্রসারণের আগে সে সময়ে ইটভাটাও গড়ে তুলেছেন। ১৯৬৪ সালে সীতাকুণ্ডের মাদামবিবির হাট এলাকায় জমি কিনে ইটভাটা গড়ে তোলেন। দুই-তিন বছর পর সেই ইটভাটা বন্ধ করে খুলশীতে মুরগি ফার্মের কাছে ৪৫ একর জমি কিনে ইটভাটা দেন। ২০০৭ সাল পর্যন্ত এই ইটভাটা চালু ছিল।
শিল্পকারখানার পরে আমদানি বাণিজ্যে মনোনিবেশ করেন আবুল খায়ের। ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রামে তখন আমদানি বাণিজ্যে অবাঙালিদের দাপট। বাঙালিরা অবাঙালিদের এজেন্সিতে চাকরি করতেন। সে সময়ে খাতুনগঞ্জের অদূরে জেল রোডে প্রতিষ্ঠান খুলে পণ্য–বাণিজ্যের ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন তিনি।
জেল রোডে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটিতে শুরুতে ৪২ নং আবুল বিড়ি বিক্রি হতো। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে ক্রেতারা পাইকারি দরে বিড়ি নিয়ে যেতেন। ধীরে ধীরে বিড়ির সরঞ্জামও বিক্রি শুরু হয়।
পরে ব্যবসা বড় করার সিদ্ধান্ত নিলেন। করাচি থেকে লাইসেন্স এনে ব্যবসা করতে হতো সে সময়। ধীরে ধীরে আবুল খায়ের ইস্পাতের পাত, সিমেন্ট, নারকেল তেল, গুঁড়ো দুধ, সিগারেটের কাগজ আমদানির ব্যবসায় যুক্ত হন। এখনো গ্রুপের আমদানি বাণিজ্য পরিচালিত হয় পুরোনো এই ভবন থেকে। পুরোনো ভবনটির দোতলায় এখনো গ্রুপটির আমদানি বাণিজ্য পরিচালনা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আবুল খায়ের গ্রুপের ইস্পাত কারখানা। উত্তরসূরিদের হাত ধরেই এ শিল্প গড়ে ওঠে
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আবুল খায়ের গ্রুপের ইস্পাত কারখানা। উত্তরসূরিদের হাত ধরেই এ শিল্প গড়ে ওঠেছবি: কৃষ্ণ চন্দ্র দাস
বিড়ির কারখানা, আমদানি বাণিজ্য কিংবা ইটভাটা গড়ে তুলে থেমে যেতে চাননি আবুল খায়ের। নতুন নতুন শিল্পকারখানা করাই যেন তাঁর নেশা। ১৯৬৮ সালে পাহাড়তলী বাজারের কাছে জমি কিনে লুঙ্গি কারখানা করেন। নাম দেন শিশমহল। সে সময় শিশমহল লুঙ্গি খুব জনপ্রিয় ছিল। তবে ১৯৭৩ সালে সুতার অভাবে লুঙ্গির কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। তবে জায়গা ফেলে রাখেননি। পাহাড়তলী বাজার থেকে বিড়ির কারখানা সরিয়ে কাছাকাছি লুঙ্গির কারখানায় সম্প্রসারণ করেন।
দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৭৪ সালে নোয়াখালীর চৌমুহনীতে সিনেমা হলে বিনিয়োগ করেন। রূপভারতী নামের সেই সিনেমা হল ২০০৩ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। তবে আবুল খায়েরের কনিষ্ঠ সন্তান শাহ্ রফিকুল ইসলামের (টিটু) মৃত্যুর পরদিনই পারিবারিক সিদ্ধান্তে সিনেমা হল ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
অল্প বয়সে ডায়াবেটিস দানা বাঁধে শরীরে। আবুল খায়ের তবু থেমে থাকতে চাননি। সাগরিকায় টেক্সটাইল কারখানা করার জন্য আবেদন করেছিলেন। সে সময় ধীরে ধীরে বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। উদ্যোক্তারা শিল্প খাতে পা রাখতে শুরু করেছিলেন। তবে বড় স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই মাত্র ৪৯ বছর বয়সে ১৯৭৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন আবুল খায়ের। এ সময় বিড়ির চার কারখানা, ইটভাটা, সিনেমা হল ও জেল রোডে ট্রেডিংয়ের ব্যবসা ছিল তাঁর। শিল্পকারখানা গড়ে তোলার জন্য জমিও রেখে যান।
টিকিয়ে রাখার লড়াই
আবুল খায়ের যখন মারা যান, তখন বড় সন্তান আবুল কাশেম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়তেন। আবুল খায়েরের স্ত্রী মাছুদা বেগম তখন দিশেহারা। একদিকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা, অন্যদিকে আট ছেলেমেয়ের পড়াশোনা। সব মিলিয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েন তিনি। এ অবস্থায় বড় ছেলে আবুল কাশেম পড়াশোনার পাশাপাশি যুক্ত হন ব্যবসায়। গৃহিণী থেকে মাছুদা বেগম প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক গাজীউল হক ও আবুল খায়েরের ছোট ভাই আবুল হোসেন ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে পরিবারটির পাশে এসে দাঁড়ান।
কয়েক বছরের মাথায় আবুল খায়েরের রেখে যাওয়া শিল্প ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন উত্তরসূরিরা। এরপর তা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। সে সময় রাষ্ট্রমালিকানাধীন কারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিল। দেশে বেসরকারীকরণ শুরুর দ্বিতীয় ধাপে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের নাছিরাবাদ শিল্প এলাকায় বালাগাম ওয়ালা ভেজিটেবল প্রোডাক্টস কারখানা তাদের মালিকানায় আসে।
উত্তরসূরিদের এগিয়ে যাওয়া
বিড়ির কারখানা মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল আবুল খায়েরের। তাঁর উত্তরসূরিদের ক্ষেত্রে ছিল বালাগাম ওয়ালা ভেজিটেবল প্রোডাক্টস কারখানা। এই কারখানায় সয়াবিন তেল, শর্ষে ও ঘি তৈরি হতো। পরে একই কারখানায় নারকেল মাড়াই করে তেল প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
বড় ছেলে আবুল কাশেম তত দিনে ব্যবসায় বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। সয়াবিন তেলের কারখানায় ভালো মুনাফা হয়। কারণ, সে সময় চট্টগ্রামে ভোজ্যতেলের কারখানা ছিল হাতে গোনা। এক দশকে ভালো আয় হয় এই কারখানা থেকে। বড় সন্তানের পর ব্যবসায় যুক্ত হন আবুল খায়েরের দ্বিতীয় সন্তান আবুল হাশেম। পরবর্তীকালে ব্যবসায় যোগ দেন আবু সাঈদ চৌধুরী, শাহ্ শফিকুল ইসলাম ও শাহ্ রফিকুল ইসলাম। আগের ব্যবসা আর নতুন শিল্প মিলে বড় হওয়ার পথ তৈরি করে দেয় আবুল খায়ের গ্রুপকে।
বিনিয়োগ থেকে লাভের টাকায় নতুন শিল্প গড়ায় মনোযোগ দেন সন্তানেরা। বাবার মতো সন্তানদেরও ছিল শিল্পকারখানা গড়ার অদম্য স্পৃহা। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সালে ফেনীর মহিপালে ইলিয়াছ ব্রাদার্স থেকে ঢেউটিন কারখানা কিনে নেন। এক বছর পর বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের নাছিরাবাদে জি এম স্টিল লিমিটেডের মালিকানা আসে আবুল খায়ের গ্রুপের হাতে। সেখানে কনডেন্সড মিল্ক ও গুঁড়ো দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ হয়। পুরোনো কারখানা সরিয়ে ১৯৯৭ সালে সীতাকুণ্ডের মাদামবিবির হাটে দেওয়া হয় ঢেউটিনের বড় কারখানা। বিড়ির পর ১৯৯৮ সালে সিগারেট উৎপাদন শুরু করে গ্রুপটি।
বড় শিল্পে রূপান্তর
আবুল খায়েরের উত্তরসূরিদের ভারী শিল্পে হাতেখড়ি হয় ১৯৯৩ সালে। ঢেউটিন দিয়ে শুরুর পর সেই দশকে ঢেউটিন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন। কারখানা বড় করেছেন। পুরোনোদের ছাড়িয়ে শীর্ষে নিয়ে গেছেন আবুল খায়ের গ্রুপের ঢেউটিনের ব্র্যান্ড গরু মার্কা ঢেউটিনকে। ২০০২ সালে সিমেন্টশিল্পে যুক্ত হয় এ গ্রুপ। মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুরে সিমেন্ট কারখানায় বিনিয়োগ করে তারা। ২০১৮ সালে ডেনমার্কের এফএলস্মিথ প্রযুক্তিতে বিশ্বের একক বৃহত্তম ভার্টিক্যাল রোলার মিল (ভিআরএম) স্থাপন করে শাহ্ সিমেন্ট গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি পায়। বছরে অর্ধকোটি টন সিমেন্ট উৎপাদিত হয় এই কারখানায়। ২০০৪ সালে চা বিপণনে যুক্ত হয় গ্রুপটি। চায়ের বাজারে শতবর্ষী অনেক প্রতিষ্ঠানকে ছাড়িয়ে খুব দ্রুত দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসে গ্রুপটির সিলন ব্র্যান্ডের চা।
২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি সীতাকুণ্ডে রড তৈরির কারখানায় বিনিয়োগ করে। দেশে প্রথম আন্তর্জাতিক মানের ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস পদ্ধতিতে রড উৎপাদন শুরু করে তারা। বার্ষিক ১২ লাখ টন রড উৎপাদনের এই কারখানার উৎপাদন দিয়ে একেএস ব্র্যান্ড বাজারে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসতে খুব বেশি সময় নেয়নি। ২০১১ সালে সিরামিকস শিল্পেও বিনিয়োগ করে তারা। ফেনীর মহিপালে ঢেউটিনের পুরোনো কারখানায় ম্যাচ কারখানা গড়ে তুলেছেন উত্তরসূরিরা। সমুদ্র ও নৌপথে নিজস্ব জাহাজ ও নৌযানের পাশাপাশি সড়কপথে পণ্য পরিবহনে এই প্রতিষ্ঠানের বড় বিনিয়োগ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
আবুল খায়ের গ্রুপের আমদানি বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার
দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঝে হচ্ছে আ.লীগের কার্যালয়
শূন্য থেকে শীর্ষে
আবুল খায়েরের মৃত্যুর পর থেকে সন্তানেরা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেন। বড় ছেলে আবুল কাশেম এখন গ্রুপ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দ্বিতীয় ছেলে আবুল হাশেম আছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে। তৃতীয় ছেলে আবু সাঈদ চৌধুরী উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং চতুর্থ ছেলে শাহ শফিকুল ইসলাম পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। গ্রুপের হাল ধরা চার সন্তানই পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবুল খায়েরের মৃত্যুর পর পড়াশোনা অবস্থায় যুক্ত হয়েছেন গ্রুপের ব্যবসা-বাণিজ্যে। অক্লান্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও দূরদর্শিতার কারণে তাঁরা যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সফল হয়েছেন।
আবুল খায়ের গ্রুপের হাত ধরে কর্মসংস্থান হয়েছে ৫০ হাজার মানুষের। গত অর্থবছরে গ্রুপটি শুল্ক, কর ও মূসক সব মিলিয়ে সরকারকে রাজস্ব দিয়েছে ৬ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর মিলে গত অর্থবছরের সরকারের যত রাজস্ব আদায় হয়েছে, তার আড়াই শতাংশ দিয়েছে গ্রুপটি। শুধু কর্মসংস্থানই নয়, করোনাকালে পাশে দাঁড়িয়েছে দেশের মানুষের। দেশে যখন অক্সিজেনের সংকট, তখন দ্রুত গ্রুপটি সারা দেশে ১৭টি অক্সিজেন ব্যাংক স্থাপন করে করোনা রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। কারখানায় উৎপাদিত অক্সিজেন বিনা মূল্যে বিতরণ করেছে। সমাজের কল্যাণে কাজের শুরুটাও করেছিলেন আবুল খায়ের। নিজ গ্রামে স্কুল গড়ে তুলেছিলেন।
এত বড় শিল্প গ্রুপ হওয়ার ভিত্তিটা যেন তৈরি করে রেখেছিলেন আবুল খায়ের। ১৯৬৮ সালে পাহাড়তলীতে আবুল খায়েরের গড়ে তোলা লুঙ্গি ও বিড়ি কারখানায় এখন আবুল খায়ের গ্রুপের প্রধান কার্যালয়। ১৯৬৪ সালে তাঁর কেনা জমির সঙ্গে প্রয়োজনীয় জমি কিনে ভাটিয়ারীতে সন্তানেরা পরে প্রতিষ্ঠিত করেন ঢেউটিন কারখানা। আবুল খায়েরের কেনা জমির পাশে ২০০৯ সালে রডের কারখানা গড়ে তুলেছেন সন্তানেরা। কুমিল্লার লাকসামে বিড়ি কারখানার জায়গা সম্প্রসারণ করে ১৯৯৮ সালে সিগারেট কারখানা গড়ে তুলেছেন। খুলশীতে ইটভাটার জায়গায় এখন রড ও চায়ের গুদাম। আবুল খায়ের পণ্যের ট্রেডিং শুরু করেছিলেন ১৯৬৫ সালে, জেল রোডে। তাঁর সন্তানেরা শিল্পের পাশাপাশি এখন বহুগুণ বড় করেছেন ট্রেডিংও। এই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত পাথর আমদানি। শিল্পে রূপ দিতে করেছেন রেডিমিক্স কারখানাও। সবকিছুর যেন বীজ বপন করে দিয়েছিলেন বাবা। সেটিকেই চারাগাছ থেকে মহীরুহে রূপান্তর করেছেন সন্তানেরা।
04/12/2021
লাগামছাড়া নির্মাণসামগ্রীর দাম: স্বল্প সঞ্চয়ীদের বাড়ি বানানো এখন দুঃস্বপ্ন
রেজাউল রেজা
মহামারীর ধকল কাটিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হওয়ার পাশাপাশি চলতি মৌসুমে (অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে) নির্মাণ খাতেও প্রাণ ফিরতে শুরু করে; কিন্তু তাতে বাদ সেধেছে নির্মাণসামগ্রীর চড়া দাম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত ছয় মাসের ব্যবধানে ভবন নির্মাণ ব্যয় বেশ বেড়েছে। শীতের মৌসুম শুরু হলেও দাম এখনো কমছে না। এতে নির্মাণ খাতের সঙ্গে জড়িতরা পড়েছেন বিপাকে। ফ্ল্যাটের দামও বাড়ছে। অন্যদিকে স্বল্প সঞ্চয়ীদের বাড়ি নির্মাণের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সহসভাপতি কামাল মাহমুদ আমাদের সময়কে বলেন, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভবন তৈরির প্রধান মৌসুম। এই সময়ে আবাসন খাতসহ ব্যক্তি পর্যায়েও ভবন নির্মাণের কাজ বেশি হয়ে থাকে। সাধারণত এ সময় নির্মাণসামগ্রীর দামও তুলনামূলক কম থাকে; কিন্তু এবার মৌসুমের দুই মাস পার হয়ে গেলেও দাম কমার লক্ষণ দেখছি না। এ নিয়ে আবাসন শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বাড়তি ব্যয়ের চাপে অনেক ডেভেলপারের কাজ এখন মাঝপথেই বন্ধ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিগত ছয় মাসে রড, সিমেন্ট, ইট, পাথর থেকে শুরু করে প্রতিটি নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে দাম বাড়ার এ হার আরও বেশি। এর মধ্যে সব থেকে বেশি বেড়েছে রডের দাম। ৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে প্রতি টন রডের দাম ৮২ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। পাথরও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া অন্য নির্মাণসামগ্রীতে দাম কমপক্ষে ১০ শতাংশ বাড়তি রয়েছে।
নির্মাণসামগ্রীর দাম লাফিয়ে বাড়তে থাকায় ভবন নির্মাণকাজ অসমাপ্তই রয়ে গেছে রাজধানীর সবুজবাগ দক্ষিণগাঁও এলাকার বাসিন্দা নুরু মোহাম্মদ গাজীর। পেশাজীবনের সবটুকু সঞ্চয় দিয়ে সাড়ে তিন কাঠা জমিতে বসবাসের জন্য স্বপ্নের ভবন নির্মাণের কাজ হাতে নিয়ে কেবল ফাউন্ডেশনের কাজটুকুই শেষ করতে পেরেছেন। নুরু মোহাম্মদ বলেন, ধারণা করেছিলাম সব মিলিয়ে ৪৫ থেকে ৪৮ লাখের মধ্যে ভবনের ফাউন্ডেশন শেষ করতে পারব; কিন্তু নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ হয়ে গেছে ৫৩ লাখের বেশি টাকা।
নুরু বলেন, বাড়ির কাজ শুরুর সময় একেএস রডের টন ৬৮ হাজার টাকায় পেলেও গত মাসে কিনতে হয়েছে ৭৫ হাজার টাকায়। এখন তা আরও বেড়েছে। আগে এক ট্রাক ইট ২৭ হাজার ৫০০ টাকায় পেয়েছি। এখন ৩২ হাজার টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এখন ট্রাকপ্রতি যমুনা বালুর দাম ৫ হাজার ৫০০ টাকা, পাকশি বালুর দাম ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার টাকা। পাথর প্রতি বর্গফুট আগে ১৮৫ টাকায় পেলেও গত মাসে কিনেছি ২১০ টাকায়। এত চড়া বাজারে আমাদের মতো স্বল্পসঞ্চয়ী মানুষের পক্ষে বাড়ির কাজ শেষ করা এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারী, ডিলার-পাইকারি ও খুচরা বাজারমূল্যের পাশাপাশি ইট-বালি-সিমেন্ট ব্যবসায়ী, অন্য নির্মাণসামগ্রী বিক্রয়কারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গেল বছরের চেয়ে বাজার এখন অনেক চড়া। রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকার মেসার্স ফরহাদ এন্টারপ্রাইজের ব্যবসায়ী মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, সবচেয়ে বেশি বেড়েছে রড ও পাথরের দাম। সিমেন্টের দাম তুলনামূলক কম বাড়লেও ইট ও বালুর দাম স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে প্রতি টন রডের দাম ৭৮ হাজার থেকে ৭৯ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছি। আরেকটু ভালো মানের রড কিনতে ৮১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ পড়বে। গত সপ্তাহে ৭৭ হাজার টাকা টন বিক্রি করেছি। ছয় মাস আগে বিক্রি করেছি ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং গত বছর এমন সময় ছিল ৫৪-৫৫ হাজার টাকা।
যাত্রাবাড়ীর বিসমিল্লাহ্ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং করপোরেশনের ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসান মাসুদও বলেন, রডের দাম বেড়ে সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ দামে পৌঁছেছে। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় রডের দাম না হয় বেড়েছে; কিন্তু মৌসুমের মধ্যেও ইটের দাম কমছে না। এখন এক ট্রাক (৩ হাজার পিস) ইটের দাম পড়ছে ৩০ থেকে ৩১ হাজার টাকা, যেখানে এমন সময় দাম আরও কম থাকার কথা। পাথরের দাম প্রতি বর্গফুট ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এখন। ছয় মাস আগে যা ১৭০ টাকায় বিক্রি করেছি।
মাতুয়াইল, রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী ও গাবতলী আমিনবাজারসহ বেশকিছু এলাকার ইট-বালু-পাথর ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আস্তর বালুর ট্রাকপ্রতি (২০০ ফুট) খরচ পড়ছে তিন থেকে তিন হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। তুলনামূলক ভালোমানের আস্তর বালুর ক্ষেত্রে ট্রাকপ্রতি দাম পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু। প্রতি ট্রাক সিলেকশন বালুর (লাল) দাম ৭ হাজার টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে সিমেন্টের দাম তুলনামূলক কম বেড়েছে। প্রতিবস্তা সিমেন্টের (৫০ কেজি) পেছনে এখন খরচ পড়ছে ৪৩০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত। ছয় মাস আগেও পাওয়া গেছে ৪০৫ থেকে ৪২০ টাকার মধ্যে। থাই গ্লাস, অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের দোকানগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১০ থেকে ২০ শতাংশ দাম বেশি রয়েছে এখন।
সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যও বলছে, রডের দাম গত এক মাসেই বেড়েছে ৭ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ। টিসিবির হিসাবে বর্তমানে প্রতি টন এমএস রডের (৬০ গ্রেড) দাম ৭৮ হাজার থেকে ৮১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। গত বছর একই সময়ে এর দাম ছিল ৫৪ হাজার থেকে ৬৬ হাজার টাকা।
নির্মাণসামগ্রীর অব্যাহত দাম বৃদ্ধিতে এ খাতের শিল্পোদ্যোক্তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর নির্মাণ খাতবিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটি। গত ২৮ নভেম্বর খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এক বৈঠকে স্ট্যাডিং কমিটি জানায়, করোনার প্রকোপ কমে আসায় নির্মাণ খাত ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করেছিলেন এ খাতের শিল্পোদ্যোক্তারা; কিন্তু নির্মাণসামগ্রীর অব্যাহত দাম বৃদ্ধিতে উল্টো বিপাকে পড়েছেন। বর্তমানে নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। ফলে খাতসংশ্লিষ্টদের বড় লোকসানে পড়তে হচ্ছে।
এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক এবং জেসিএক্স ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল হোসেন চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, করোনার ফলে এক বছরেরও বেশি সময় ব্যবসা বন্ধ ছিল। ভাইরাসের প্রকোপ কমায় ঠিক যখন ব্যবসায় ফিরতে শুরু করেছি, তখনই নির্মাণসামগ্রীর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। একদিকে করোনায় মানুষের আর্থিক সামর্থ্য হ্রাস পাওয়ায় ফ্ল্যাটের ক্রেতা অর্ধেক কমে গেছে, অন্যদিকে ভবন নির্মাণ খরচ বৃদ্ধির ফলে বিগত ছয় মাসে আমরা ফ্লাটের দাম ১০ শতাংশ বাড়াতে বাধ্য হয়েছি। এতে বিক্রিও কমে যাচ্ছে। ফলে নতুন প্রজেক্ট দূরে থাক, চলমান প্রজেক্ট শেষ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কিচেন ও বাথরুম ফিটিংয়ের দাম অনেক বেড়েছে। ইনডোর ফিটিংসগুলোর দামও ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে। করোনায় পণ্য আমদানি ব্যাহত হওয়ায় বর্তমানে বাজারে অনেক নির্মাণসামগ্রীর ঘাটতি রয়েছে। তা ছাড়া প্রয়োজনীয় অনেক পণ্যও পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের ইনটেরিয়র খরচও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। তাই ভবন নির্মাণ খরচ ও ফ্ল্যাটের দাম দুটোই বেড়ে যাচ্ছে।
02/12/2021
অর্থনীতির গেম চেঞ্জার–১৭
ফলচাষে পালাবদলের নায়ক
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখন অর্থনীতিতে। ৫০ বছরে বাংলাদেশ নামের কথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হয়ে উঠেছে চমকে ভরা জাদুর বাক্স। সাহায্যনির্ভর বাংলাদেশ এখন বাণিজ্যনির্ভর দেশে পরিণত। তবে যাত্রাপথটা সহজ ছিল না। বড় ঝুঁকি নিয়ে অভিনব পথে এগিয়ে গেছেন আমাদের সাহসী উদ্যোক্তারা। এ সাফল্যের পেছনে আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অর্থনীতিবিদ যেমন ছিলেন, আছেন নীতিনির্ধারকেরাও। মূলত অর্থনীতির এসব অগ্রনায়ক, পথ রচয়িতা ও স্বপ্নদ্রষ্টারাই ৫০ বছরে বিশ্বে বাংলাদেশকে বসিয়েছেন মর্যাদার আসনে।
আমরা বেছে নিয়েছি সেই নায়কদের মধ্যে ৫০ জনকে। আমাদের কাছে তারাই অর্থনীতির ‘গেম চেঞ্জার’।
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২১, ১৮: ০০
অ+
অ-
ফলচাষে পালাবদলের নায়ক
দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের কৃষি। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিতে ফল চাষের ক্ষেত্রে এসেছে অসামান্য সাফল্য। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যানুসারে ১৮ বছর ধরে বাংলাদেশে বছরপ্রতি ফলের উৎপাদন গড়ে ১১ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা বিশ্বের আর কোনো দেশ পারেনি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয়, আমে সপ্তম, পেয়ারায় অষ্টম, পেঁপেতে চতুর্দশতম। গত এক দশকে এ দেশের মানুষের ফল খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বাজারে এখন প্রায় সারা বছর পেয়ারা ও তরমুজ পাওয়া যাচ্ছে, যা এক দশক আগেও ছিল কল্পনার বাইরে। দেশে ফল চাষ ও উৎপাদনের এসব সাফল্যের পেছনে রয়েছে ফলবিজ্ঞানীদের গবেষণা, জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সেসব জাত ও প্রযুক্তিকে কৃষকের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম।
ফল চাষে যাঁরা এই অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ড. এম এ রহিম। ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ফলের জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত বিভিন্ন ফলের ১২৩টি উন্নত জাত নিবন্ধিত হয়েছে। এসব জাতের মধ্যে অনেক জাত দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। উদ্ভাবিত এসব জাতের কোনো কোনো ফল চাষ করে অনেক কৃষক বছরে কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা আয় করেছেন। এসব ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় এ দেশের মানুষের ফল খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে গেছে, যা পুষ্টি উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
ড. এম এ রহিম
ড. এম এ রহিমছবি: মো. আনোয়ার হোসেন
জার্মপ্লাজম হলো কোনো একটি জীবের বংশগত সম্পদ বা কৌলিসম্পদ। একই ফলের বিভিন্ন জাতের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। এর প্রতিটি জাত বা প্রকরণই একেকটি জার্মপ্লাজম। গাছের বীজ বা জীবন্ত গাছ জার্মপ্লাজম হিসেবে সংগ্রহ করে তার লালন-পালন করা হলো জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ।
শুরুর কথা
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এম এ রহিম ১৯৯১ সালে মাত্র ১ একর জমি নিয়ে ফল গাছের এই জার্মপ্লাজম সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মত হলো, একসময় বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে এতটা সমৃদ্ধ ছিল না। খাদ্য উৎপাদন কম হলেও তা অন্য দেশ থেকে আমদানি করে তা পূরণ করা সম্ভব। তবে বিদেশ থেকে এত মানুষের জন্য পুষ্টি কেনা সম্ভব নয়। দেশের মানুষকে সুস্থ রেখে মেধাবী জাতি গঠনে পুষ্টি উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস বিভিন্ন ফল ও শাকসবজি। তাই তিনি উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক মো. আজিজুল হককে সঙ্গে নিয়ে ফল গাছের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, উন্নয়ন এবং তা সারা দেশে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে শুরু করেন এই জার্মপ্লাজম সেন্টার।
প্রথমে এম এ রহিম আমের কয়েকটি জাত দিয়ে সেই ছোট জমিতে ফল গাছের জার্মপ্লাজম সেন্টার গড়ে তোলেন। তিন দশকের ব্যবধানে সেই সেন্টার বর্তমানে ৩২ একরে বিস্তৃত হয়েছে। সেখানে রয়েছে বিভিন্ন ফলের ১১ হাজার ৫২৮টি জার্মপ্লাজম। এসব জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করতে দেশের পাহাড়, উপকূল, বন-জঙ্গল যেমন ঘুরে বেড়িয়েছেন এম এ রহিম, সেই সঙ্গে বিশ্বের ৬০টি দেশেও গেছেন। বললেন, প্রায় ৮০ শতাংশ জার্মপ্লাজম তিনি সংগ্রহ করেছেন এ দেশ থেকে, যেগুলোর মধ্যে বেশ কিছু ফল বিলুপ্তির পথে চলে গেছে। যখন যেখানে যে ফলের যে রকম গাছ বা বীজ পেয়েছেন, সেগুলো এনে জার্মপ্লাজম সেন্টারে লাগিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।
এম এ রহিম দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে দেশে চাষের উপযোগী বহু জাত উদ্ভাবন করেছেন। ফলে সেন্টারটি এখন হয়ে উঠেছে বিশ্বের দ্বিতীয় এবং দেশের বৃহত্তম ফল জার্মপ্লাজম সংগ্রহশালায়। তবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ফলের জার্মপ্লাজম সেন্টারের সঙ্গে এর একটি বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। অনেক দেশেই এ ধরনের সেন্টার আছে যেখানে শুধু জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে লালন ও সংরক্ষণ করা হয় অনেকটা বোটানিক্যাল গার্ডেনের ধাঁচে। কিন্তু এই সেন্টারে শুধু সে কাজ না করে সংগৃহীত জার্মপ্লাজম নিয়ে গবেষণা, জাত ও প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং তা সম্প্রসারণ করে দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধি ও ফলচাষিদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে অবদান রাখছে।
বিজ্ঞাপন
সেন্টারের জার্মপ্লাজম বা কৌলিসম্পদ
ফল গাছের এই জার্মপ্লাজম সেন্টারে রয়েছে দেশি-বিদেশি প্রায় ২১০ প্রজাতির ফল গাছের এক সমৃদ্ধ বাগান। দেশি ফল গাছই বেশি। এম এ রহিম বললেন, গ্রামীণ জঙ্গল দিনে দিনে উজাড় হয়ে যাওয়ায় অনেক দেশি ফলের অপ্রচলিত ফল গাছ এখন বিলুপ্তির পথে। অথচ সেগুলো আমাদের মূল্যবান কৌলিসম্পদ। যেকোনো বিদেশি ফলের চেয়ে আমাদের দেশি ফলের পুষ্টি ও স্বাদ অনেক বেশি। তাই এগুলোকে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না।
সে জন্য এম এ রহিম প্রথমেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেশি ফলের যত জাতবৈচিত্র্য বা জার্মপ্লাজম পাওয়া যায়, সেগুলোকে সংগ্রহে করতে নজর দিয়েছেন। যখনই যেখান থেকে সংবাদ পান, সেখানে তা সংগ্রহ করতে ছুটে যান। তাঁর সেন্টারটিতে রয়েছে বিভিন্ন ফল গাছের মোট ১১ হাজার ৫২৮টি জার্মপ্লাজম। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আমের ১ হাজার ৮৫৮টি, লিচুর ৬৫টি, পেয়ারার ১ হাজার ১৬০টি, বিভিন্ন লেবুর ৬৬৯টি, কাঁঠালের ১০৫টি ও অপ্রচলিত ফলের ১ হাজার ২১৮টি জার্মপ্লাজম । বিদেশি ফলের জার্মপ্লাজম রয়েছে ১ হাজার ৯২৫টি।
এ ছাড়া ভেষজ গুণসম্পন্ন ফল গাছের জার্মপ্লাজম রয়েছে ১ হাজার ১৪টি। আছে আম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, পেয়ারা, কুল ইত্যাদি প্রধান বা প্রচলিত ফলের গাছ। পাশাপাশি আছে বৈঁচি, লুকলুকি, দেশি গাব, বিলাতি গাব, অরবরই, আমলকী, আঁশফল, আতা, শরিফা, বেল, কতবেল, কাউফল, কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, বুদ্ধনারকেল, কামরাঙা, করমচা, জাম, কাকজাম, বুটিজাম, ঢেপাজাম, বনজাম, খেজুর, গোলাপজাম, জলপাই, জামরুল, ডালিম, ডেফল, ডেউয়া, তেঁতুল, তৈকর, তুঁতফল, আমড়া, ফলসা, বকুল, পিরালু, বেতফল, মনফল, বিলিম্বি, সফেদা, জাম্বুরা, কালামানসি লেবু, জারা লেবু, লটকন ইত্যাদি অপ্রচলিত দেশি ফল। রক্তগোলা, গুটগুইট্টা, চাপালিশ কাঁঠাল ইত্যাদি পাহাড়ি ফলের গাছও আছে সেখানে। বিদেশি ফল গাছ আছে অ্যাভোকাডো, অলিভ, রাম্বুটান, টক আতা, পার্সিমন, আলুবোখারা, জয়তুন, ত্বীন বা মিসরীয় ডুমুর, ম্যাঙ্গোস্টিন, সালাক বা স্নেকফ্রুট, ড্রাগন ফ্রুট, জাবাটিকাবা, শানতোল, মিষ্টি তেঁতুল, আঙুর, কমলা ইত্যাদি।
স্বীকৃত জাত, কাজের স্বীকৃতি
এই জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে উদ্ভাবিত বিভিন্ন ফলের এ পর্যন্ত মোট ১২৩টি জাত সরকারের স্বীকৃত ও অনুমোদিত জাত হিসেবে এ দেশে চাষের জন্য নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে আমের ২৫টি, কাঁঠালের ১টি, লিচুর ৫টি, পেয়ারার ১০টি জাত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব জাতের মধ্যে রয়েছে বীজশূন্য পেয়ারা ও বীজশূন্য বিলাতি গাব, মিষ্টি কামরাঙা, তিনফলা আম ইত্যাদি। তাঁর এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এম এ রহিম প্রধানমন্ত্রী গোল্ড মেডেল, মাদার তেরেসা গোল্ড মেডেলসহ পেয়েছেন ৬০টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পদক, পুরস্কার ও স্বীকৃতি। এই সেন্টারে এ পর্যন্ত ফল চাষ নিয়ে গবেষণা করে ৪২ জন ডক্টরেট (পিএইচডি) ও ২৫০ জন স্নাতকোত্তর (এমএস) ডিগ্রি পেয়েছেন।
ফলের আলোয়
এম এ রহিমের জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে উদ্ভাবিত অনেক জাতের ফলে আলোকিত হয়েছে বাংলাদেশের বহু ফলের বাগান। আনন্দের সঙ্গে এম এ রহিম বললেন, এই সেন্টার থেকে উদ্ভাবিত ফলের প্রথম জাতটি ছিল ‘বাউকুল ১’। প্রথম নিবন্ধিত সেই জাতের কুল এ দেশে কুল চাষে এক বিপ্লব নিয়ে আসে। শীতকালে যেখানে এ দেশে ফল নেই, সেখানে শীতকালে বাউকুল ফলচাষিদের কাছে বিরাট স্থান করে নেয়। দেশে প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে বাউকুলের বাগান গড়ে উঠেছে, যেখান থেকে বছরে প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ টন কুল উৎপাদিত হচ্ছে। এমনকি এই জাতের চাষ বিদেশেও সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে এই সেন্টার থেকে তাঁর একজন পিএইচডি ছাত্র মনিরুজ্জামান বাউকুল ও আপেল কুলের সংকরায়ণ করে উদ্ভাবন করেছেন হাইব্রিড জাতের ‘বলসুন্দরী কুল’। কুলের এ জাতও সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
উদ্ভাবিত ‘বাউ ড্রাগন ফল ১’ ও ‘বাউ ড্রাগন ফল ২’ প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে; বিশেষ করে বান্দরবানসহ পার্বত্য অঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকা ও উত্তরবঙ্গের খরাপ্রবণ এলাকাতেও এসব জাতের ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে। ড্রাগন ফলের আরও দুটি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। সেগুলোরও সম্প্রসারণ চলছে। ইতিমধ্যে ‘বাউ আম ১৪’ বা ব্যানানা ম্যাঙ্গো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ও শহরে চাষ হচ্ছে, যার মাধ্যমে ফলচাষিরা যথেষ্ট লাভবান হচ্ছেন।
ড. এম এ রহিম
ড. এম এ রহিমছবি: মো. আনোয়ার হোসেন
ফলচাষে বিপ্লব
অনেক ফলচাষি এই জার্মপ্লাজম সেন্টারের উদ্ভাবিত ফলের নতুন নতুন উন্নত জাত চাষ করে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, এর পেছনে রয়েছে এম এ রহিমের অবদান। অনেক গরিব কৃষক ফল চাষ করে ধনী হয়েছেন, আবার অনেক ধনী ব্যক্তিও তাঁদের বিপুল জমি ফেলে না রেখে ফল চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
এম এ রহিম বললেন, চুয়াডাঙ্গার হাফেজ আক্তার হোসেন গত বছর ৩০ বিঘা জমিতে বাউকুল চাষ করে প্রায় ১ কোটি টাকার কুল বিক্রি করেছেন। ঈশ্বরদী, পাবনার শাহজাহান আলী বাদশা ওরফে পেঁপে বাদশা বাউকুল চাষ করে পেয়েছেন ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। নাটোরের গোলাম নবী ৫ হাজার পিলারে ড্রাগন ফলের চাষ করে প্রতি বছর দু–তিন কোটি টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি করছেন। নাটোরের সেলিম রেজা মাত্র ২ একরে ড্রাগন ফলের চাষ করে গত বছর প্রায় ২০ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি করেছেন। এ রকম উদাহরণের যেন শেষ নেই।
এম এ রহিম আরও বলেন, ‘বাউ আম ২৩’ ও ‘বাউ আম ২৪’ নামে আমের দুটি নতুন জাত সম্প্রতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ জাত দুটির আম অনেক বড়, প্রতিটি আমের গড় ওজন দেড় থেকে দুই কেজি, নাবি জাত বিধান। তাঁরা প্রত্যাশা করছেন, এই জাত দুটিও জনপ্রিয় হবে।
02/12/2021
অর্থনীতির গেম চেঞ্জার-২০
কখনো অর্থনীতির নীতিনির্ধারক, কখনো বিশ্লেষক
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখন অর্থনীতিতে। ৫০ বছরে বাংলাদেশ নামের কথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হয়ে উঠেছে চমকে ভরা জাদুর বাক্স। সাহায্যনির্ভর বাংলাদেশ এখন বাণিজ্যনির্ভর দেশে পরিণত। তবে যাত্রাপথটা সহজ ছিল না। বড় ঝুঁকি নিয়ে অভিনব পথে এগিয়ে গেছেন আমাদের সাহসী উদ্যোক্তারা। এ সাফল্যের পেছনে আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অর্থনীতিবিদ যেমন ছিলেন, আছেন নীতিনির্ধারকেরাও। মূলত অর্থনীতির এসব অগ্রনায়ক, পথ রচয়িতা ও স্বপ্নদ্রষ্টারাই ৫০ বছরে বিশ্বে বাংলাদেশকে বসিয়েছেন মর্যাদার আসনে।
আমরা বেছে নিয়েছি সেই নায়কদের মধ্যে ৫০ জনকে। আমাদের কাছে তারাই অর্থনীতির ‘গেম চেঞ্জার’।
প্রতীক বর্ধনঢাকা
প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ২০: ০৪
অ+
অ-
কখনো অর্থনীতির নীতিনির্ধারক, কখনো বিশ্লেষক
অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলামের নাম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার আগে ছয় দফা ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর পরামর্শদাতা। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রথম জীবনে নুরুল ইসলাম পাকিস্তানের উন্নয়নে ইকোনোমেট্রিক মডেল প্রণয়নে কাজ করেছেন। তবে তাঁর মূল আগ্রহের জায়গা নীতি প্রণয়ন। তাত্ত্বিক অর্থনীতিবিদ থেকে তিনি ক্রমে গবেষণাধর্মী অর্থনীতিবিদ হয়ে উঠেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি পাকিস্তানের জন্য উন্নয়ন মডেল তৈরির চেষ্টা করেছেন। ১৯৫০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে শুধু তিনি গবেষণায় জড়িত ছিলেন। এরপর ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন। সেই ব্যুরোর গবেষণা পরিচালক হিসেবে ৪০০ রুপি বেতনে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। তবে তাঁর মূল অবদান হলো, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অভিজ্ঞতাভিত্তিক গবেষণার সংস্কৃতি চালু করেন। এরপর তিনি সিলেবাস আধুনিকীকরণে কাজ করেন।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
স্বাধীনতার পর পাকিস্তান দাবি করেছিল, অখণ্ড পাকিস্তান যে ‘কনসোর্টিয়াম অব ডোনার’ বা সাহায্যদাতাদের মাধ্যমে ঋণ নিয়েছিল, বাংলাদেশকে তার দায় নিতে হবে, যার পরিমাণ ১২০ কোটি ডলার। বাংলাদেশ এর প্রতিবাদ করে। বলা হলো, বাংলাদেশ পাকিস্তানের উত্তরাধিকার রাষ্ট্র নয়। পাকিস্তানের সাহায্যদাতা কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ঋণ নিতে হবে না। এ নিয়ে দাতাদের বৈঠক হলো। পাকিস্তানের সাহায্যদাতাদের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংকের তাতে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হলো, এটা পাকিস্তান কনসোর্টিয়ামের বৈঠক নয়। সুতরাং বাংলাদেশে এতে সভাপতিত্ব করবে। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম সেই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকের পর নুরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। বঙ্গবন্ধুর সামনেও তিনি বলেন, বাংলাদেশ পাকিস্তানের উত্তরাধিকার রাষ্ট্র নয়, সুতরাং আমরা তার রাজনৈতিক বা আইনি দায় নেব না। শেষমেশ বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল এই দাবি ৪০ কোটি ডলারে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়, যেসব প্রকল্প শুধু এ অঞ্চলে হয়েছিল, সেগুলোর দায় বাংলাদেশ নেয়। এ আলোচনায় নুরুল ইসলাম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
নুরুল ইসলামের আরেকটি বড় অবদান হলো বাংলাদেশকে এলডিসিভুক্ত করা। ১৯৭৩ সাল থেকে এলডিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য দর–কষাকষি শুরু করে বাংলাদেশ। অধ্যাপক নুরুল ইসলামের একান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৭৫ সালে প্রথম স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় যুক্ত হয় বাংলাদেশ। এলডিসিভুক্ত দেশ হওয়ার কারণে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যসুবিধাসহ নানা সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশ। বলা যায়, দেশের বর্তমান যে অগ্রগতি, তার মূল কারণ এই এলডিসিভুক্তি।
অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে নিয়ে প্রথম আলোর সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’ প্রচ্ছদ কাহিনি করেছিল ২০১০ সালে। শিরোনাম ছিল ‘ড. নুরুল ইসলাম: একজন অর্থনীতিবিদের প্রতিকৃতি’। সেখান থেকে কিছু অংশ তুলে দেওয়া যেতে পারে। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদন করেন নুরুল ইসলাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের বক্তব্য, প্রথম বর্ষেই ভর্তি হতে হবে। তিনি বললেন, ‘আমি এক বছর কলকাতায় পড়ে এসেছি, তাহলে কেন প্রথম বর্ষে ভর্তি হব?’ শেষ পর্যন্ত উপাচার্যের হস্তক্ষেপে তাঁকে শর্ত সাপেক্ষে ভর্তি করা হয়। শর্তটি হলো, দ্বিতীয় বর্ষে ফল ভালো না করলে পিছিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু পিছিয়ে পড়েননি তিনি। উল্টো দ্বিতীয় বর্ষ তো বটেই, চূড়ান্ত পরীক্ষায়ও তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন।
১৯২৯ সালে চট্টগ্রামের পটিয়ায় নুরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আবদুর রহমান ছিলেন স্কুলশিক্ষক, পরে সিলেট অঞ্চলের শিক্ষা কর্মকর্তা হয়েছিলেন। ১৯৪৫ সালে চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক (এসএসসি সমমানের) পাস করেন। এরপর চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন। উচ্চমাধ্যমিকে অবিভক্ত বাংলায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে তিনি ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সি কলেজে ৩০ শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র তিনজন ছিল মুসলমান। প্রথম বর্ষ শেষ করতেই কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। নুরুল ইসলাম ফিরে আসেন ঢাকায়।
বিজ্ঞাপন
অধ্যাপক নুরুল ইসলাম
অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ছবি–জিয়া ইসলাম
ঢাকায় এসে ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনুষদে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে লাভ করেছিলেন কালী নারায়ণ বৃত্তি। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর নুরুল ইসলাম পাকিস্তান সরকারের বৃত্তি নিয়ে হার্ভার্ডে চলে গেলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। চার বছর পর ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে রিডার (সহযোগী অধ্যাপক) পদে যোগ দিলেন। তা নিয়েও বিরোধিতা দেখা দিল। ২৬ বছরের তরুণ কী করে রিডার হবেন? কেউ কেউ উপাচার্য জেনকিনের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আনলেন। জবাবে উপাচার্য বললেন, ‘আমি তো নুরুল ইসলামকে চিনিই না, স্বজনপ্রীতি করব কীভাবে? পরীক্ষার ফল দেখেই আমি তাঁকে নিয়েছি।’
শিক্ষকতা পেশায় তিনি নিয়োজিত ছিলেন ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। দীর্ঘ ১১ বছর কাটিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। শিক্ষকতা, পরিকল্পনা কমিশন গড়ে তোলা এবং দেশি-বিদেশি সংস্থায় গবেষণা—এই তিন পর্বে তাঁর কর্মজীবন বিভক্ত হলেও শিক্ষকতা পেশাটি তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। শিক্ষকতা পেশায় থাকা অবস্থায় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বিভিন্ন কমিশনের সঙ্গে যুক্ত হন। তখন দেশে বেশি অর্থনীতিবিদ ছিলেন না। তাঁকে মূল্য কমিশন, প্রথম ও দ্বিতীয় অর্থ কমিশনের সদস্য করা হয়। কিন্তু এসব কমিশনে কাজ করে এই চৌকস অর্থনীতিবিদ বুঝতে পারলেন, পশ্চিম পাকিস্তানিরা সব ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানিদের ঠকাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই।
১৯৫৬ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত অর্থনীতিবিদদের সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে যোগ দেন ড. এম এন হুদা, এ এফ এ হুসেইন, মাজহারুল হক, এম টি হক, এ সাদেক, আবদুর রাজ্জাক, আবদুল্লাহ ফারুক ও নুরুল ইসলাম। ওই সম্মেলনে তাঁরা প্রথম দ্বৈত অর্থনীতির ধারণা উত্থাপন করেন। ষাটের দশকের শুরুতে সামরিক শাসক আইয়ুব খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপককে ডেকে পাঠান অর্থনৈতিক বিষয়ে তাঁদের মতামত জানার জন্য। এ দলেও ড. নুরুল ইসলাম ছিলেন, আরও ছিলেন এস এম হুদা, এ এফ এ হুসেইন ও আবদুল্লাহ ফারুক। তাঁদের বক্তব্য আইয়ুব খান ধৈর্যসহকারে শোনেন, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেননি।
১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস (পিআইডিই)। প্রথমে এর প্রধান ছিলেন একজন আমেরিকান। পরে সিদ্ধান্ত হয়, দেশীয় অর্থনীতিবিদকেই এ পদ দেওয়া হবে। ১৯৬৫ সালে বন্ধুদের পরামর্শে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম সেখানে যোগ দেন। এ প্রতিষ্ঠানে যেসব গবেষণা হয়েছে, তাতে পূর্ব-পশ্চিমের বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানে আইয়ুব খান বিদায় নেওয়ার পর তিনি ছয় দফা অর্থনৈতিক রূপরেখা প্রণয়নে সহায়তা করেন। মার্চ-এপ্রিলের দিকে তৎকালীন স্টেট ব্যাংকে চাকরিরত তাঁদের বন্ধু রশিদ এসে জানালেন, বঙ্গবন্ধু দেখা করতে বলেছেন। এরপর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর দেখা হতো বিভিন্ন স্থানে। কখনো ঢাকার বাইরেও তাঁরা বৈঠক করেছেন।
আরও পড়ুন
দুই অর্থনীতি তত্ত্বের অন্যতম প্রবক্তার সঙ্গে দুই ঘণ্টা
দুই অর্থনীতি তত্ত্বের অন্যতম প্রবক্তার সঙ্গে দুই ঘণ্টা
বঙ্গবন্ধু তাঁকে বললেন, ‘ছয় দফা বাস্তবায়ন করতে হলে এর অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা কীভাবে সাজানো যায়, সে ব্যাপারে সহযোগিতা করুন।’ এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন আরও কয়েকজন অর্থনীতিবিদ। তাঁরা কাজ করলেন। নির্বাচনের আগেই তাঁরা খসড়া সংবিধান তৈরি করেছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকেও সেই রূপরেখা পেশ করা হয়। প্রথম থেকেই নুরুল ইসলামের ধারণা ছিল, আলোচনা সফল হবে না। কেননা, পাকিস্তানিরা এটা মেনে নেবে না। আক্ষরিক অর্থে ছয় দফা বাস্তবায়ন হলে দেশ এক থাকে না। কিন্তু তারা এভাবে গণহত্যা চালাবে, সেটি ভাবেননি তিনি।
এপ্রিলের শুরুতে তিনি আগরতলা হয়ে দিল্লিতে যান। সেখানে গিয়ে শুনতে পান, তাজউদ্দীন আহমদ কলকাতায়। প্রধানমন্ত্রীর সচিব পি এন ধরের সহায়তায় নুরুল ইসলাম আমেরিকায় চলে যান। ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে এক বছরের জন্য নিয়োগ পান। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য রাখেন তিনি। নিক্সন প্রশাসন প্রচণ্ডভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করলেও শিক্ষাবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন তাঁরা পান। স্বাধীনতার পরপরই তিনি দেশে ফিরে আসেন।
দেশে ফিরে চট্টগ্রামে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করে ঢাকায় এসেই শুনতে পেলেন, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছেন। তখন তিনি ভাবলেন, ‘দেখা করে যাই।’ তাঁর সঙ্গে দেখা হতেই তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘লন্ডনেই আপনার খোঁজ করেছি। আপনাকে পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব নিতে হবে। কীভাবে করবেন, কাদের নিয়ে করবেন, তার একটি রূপরেখা দিন।’
বঙ্গবন্ধুর কথায় নুরুল ইসলাম কাজে লেগে পড়লেন। কমিশনের সদস্য হিসেবে যাঁদের নাম তিনি দিলেন, বঙ্গবন্ধু তা মেনে নিলেন। একটি নতুন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ খুবই কঠিন কাজ হলেও সানন্দে তাঁরা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। তাঁরা প্রথমে দুই বছরের জন্য একটি পুনর্বাসন কর্মসূচি নিলেন (১৯৭২-১৯৭৩)। এরপর পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করলেন (১৯৭৩-১৯৭৮)। এসব কাজে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে যথেষ্ট সহায়তা পেয়েছেন। কিন্তু অনেক সরকারি কর্মকর্তাই নতুন ধারণা ও প্রতিষ্ঠানকে সহজে গ্রহণ করতে পারলেন না। পরিকল্পনা কমিশনকে সমান্তরাল ক্ষমতাকেন্দ্র ভাবতে শুরু করলেন। সরকারের সমর্থক ও বিরোধী উভয় শ্রেণির পত্রিকায় তাঁদের বিরুদ্ধে লেখালেখি হতে থাকে। ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারলেন, জাতীয় নীতি গ্রহণে তাঁদের গুরুত্ব থাকছে না। তখন সিদ্ধান্ত নিলেন, পরিকল্পনা কমিশন ত্যাগ করবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে সে কথা সরাসরি বললেন না। বললেন, কিছুদিনের জন্য ছুটি চাই। তিনি প্রথমে রাজি হলেন না, পরে তাঁর পীড়াপীড়িতে রাজি হলেন। বললেন, ‘এক বছর পর আপনাকে ফিরে আসতে হবে।’ সেটি ১৯৭৫ সালের মার্চ-এপ্রিলের ঘটনা। কিন্তু আর ফেরা হলো না। ১৫ আগস্ট বিপথগামী সেনাসদস্যদের হাতে বঙ্গবন্ধু নিহত হন।
আরও পড়ুন
নুরুল ইসলামের আত্মজীবনী একটি আলোকবর্তিকা
নুরুল ইসলামের আত্মজীবনী একটি আলোকবর্তিকা
আত্মজীবনী ‘অ্যান অডিসি জার্নি অব মাই লাইফ’–এর প্রচ্ছদ
আত্মজীবনী ‘অ্যান অডিসি জার্নি অব মাই লাইফ’–এর প্রচ্ছদ
নুরুল ইসলামের গবেষণার ক্ষেত্র বিশাল। ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়ন, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নীতিমালা নিয়ে তাঁর অসংখ্য নিবন্ধ ছাপা হয়েছে বিদেশি পত্রিকায়। বর্তমানে তিনি বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। কিন্তু বিদেশে বসবাস করলেও তিনি দেশকে কখনোই ভোলেননি। আর তাই সুযোগ পেলেই তিনি ছুটে আসেন দেশে। এ দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সব সময় পরামর্শ দেন তিনি।
‘অ্যান অডিসি জার্নি অব মাই লাইফ’ নামে অধ্যাপক নুরুল ইসলামের একটি আত্মজীবনী প্রকাশ করেছে প্রথমা। ২০১৮ সালে বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে দেশের আরেক কৃতী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছিলেন, ‘নুরুল ইসলাম একজন পরিপূর্ণ অর্থনীতিবিদ। আমি মনে করি, বাংলাদেশের অমর্ত্য সেন (ভারতের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ) হতে না পারার কোনো কারণ তাঁর ছিল না। তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখবেন, নাকি পেশাদার অর্থনীতিবিদ হবেন—এ বিষয়ের দ্বন্দ্ব তিনি সারা জীবনে কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এ দ্বন্দ্বের কারণে একজন বিশ্বমানের বাঙালি অর্থনীতিবিদ পাওয়া থেকে বিশ্ব বঞ্চিত হয়েছে বলে আমি মনে করি।’ রেহমান সোবহানের মতে, বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণী ক্ষমতা কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের চেয়ে বেশি। আর্থসামাজিক বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণ অসাধারণ। জীবনের একটি বড় সময় বাংলাদেশের বাইরে কাটানোর পরও তিনি দেশের জন্য গভীরভাবে ভাবেন, চিন্তা করেন। কিন্তু ওয়াশিংটনে বসে তিনি যা ভাবেন, ঢাকায় বসে ভাবতে পারলে তা আরও বেশি ফলপ্রসূ হতে পারত। সবকিছুর পর এ বয়সেও বাংলাদেশকে নিয়ে তাঁর চিন্তা অব্যাহত আছে।
অনুষ্ঠানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছিলেন, ‘৩০ বছর ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে বসবাস করেন। ওখানে বসে প্রতিনিয়ত দেশের খোঁজ রাখেন। তাহলে কেন দেশে আসছেন না, এমন প্রশ্ন আমি তাঁকে করেছিলাম। উত্তরে তিনি বলেন, নীতিনির্ধারকেরা যখন চাইবেন, তখনই উপদেশ দেবেন। নিজ উদ্যোগে দিতে যাবেন না। গত ৩০ বছরে কেউ ওনার কাছে উপদেশ চাননি। যখন যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তাঁদের নীতিনির্ধারকদের একজনের সঙ্গেও তিনি সরাসরি আলোচনায় বসার সুযোগ পাননি। একবার তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ২-৩ পৃষ্ঠার একটি লিখিত পরামর্শ দিয়েছেন। পরে তিনি জেনেছেন, সেটা কেউ পড়েও দেখেননি।’
অধ্যাপক নুরুর ইসলাম দেশে থাকেন না ঠিকই। কিন্তু স্বাধীনতার আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে তাঁর গবেষণা ও স্বাধীন দেশের পুনর্গঠনে তাঁর অবদানের কারণে দেশের অর্থনীতির পথরচয়িতার একজন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম।