21/10/2025
হিমু সমগ্র থেকে
িমুর_বিয়ে – হুমায়ূন আহমেদ
এটি আমার অত্যন্ত পছন্দের একটি উপন্যাস। পড়তে পারেন আশা করছি ভালো লাগবে। পর্ব আকারে সম্পূর্ণ উপন্যাস দেওয়া হবে। পরের পর্ব পাওয়ার জন্য লাইক কমেন্ট করে রাখুন।
প্রথম পর্ব
হিমু সমগ্র থেকে
িমুর_বিয়ে – হুমায়ূন আহমেদ
মাজেদা খালাকে আপনাদের মনে আছে তো? কঠিন মহিলা। ইংরেজিতে এই ধরনের মহিলাদের বলা হয় Hard Nut — কঠিন বাদাম। কঠিন বাদাম জাতীয় মানুষদের মাথায় কিছু ঢুকে গেলে বের হয় না। মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে।
মাজেদা খালার মাথায় এখন ‘বিবাহ’ ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনি আমাকে বিয়ে দেবার মহান দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন।
ভোরবেলাতেই টেলিফোন। তাঁর উত্তেজিত গলা—
“হ্যালো! কে হিমু? হিমু শোন, আজ তোর বিয়ে!”
আমি আনন্দে খাবি খাওয়ার মতো করে বললাম, “কখন বিয়ে?”
“রাত ন’টার মধ্যে মগবাজারের কাজি সাহেব চলে আসবেন। লেখালেখিতে পাঁচ-দশ মিনিট যাবে। রাত দশটার মধ্যে কর্ম সমাধান—ইনশাল্লাহ।”
“আমি কখন আসব?”
“তুই অবশ্যই আটটার আগে চলে আসবি। বাসায় এসে হট ওয়াটার শাওয়ার নিবি। পায়জামা-পাঞ্জাবি আমি আনিয়ে রাখব।”
“মেয়ে আসবে কখন?”
“মেয়ে আসবে কখন মানে? মেয়ে তো এসেই আছে। আমার শোবার ঘরে তালাবন্ধ করা আছে। যথাসময়ে খুলে বের করা হবে।”
একটু থমকে যেতে হলো। বিয়ের কনেকে তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছে কেন বোঝা যাচ্ছে না। মাজেদা খালা কোনো একটা প্রকল্প হাতে নিলে তাতে রহস্য থাকবে না—তা হয় না। রহস্য অবশ্যই আছে।
আমি বললাম, “ঠিক সময়ে কবুল বলবে তো?”
“বলবে না মানে? থাপড়ায়ে দাঁত ফেলে দেব না! বদমেয়ে। আমাকে চেনে। সে বুনো ওল, আর আমি ঘেতুল।”
“ঘেতুল কী?”
“ঘেতুল হলো বাঘা তেঁতুলের মা।”
“মেয়ের নাম কী?”
“নাম রেনু।”
“রেনুকে পেয়েছ কোথায়?”
“সে এক বিরাট ইতিহাস। এই মেয়ে ড্রাগ অ্যাডিক্ট এক ছোকরার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। তাকে বিয়ে করার জন্য বাড়ি থেকে পালিয়েছিল। কমলাপুর রেলস্টেশনে ধরা পড়েছে। আমি তালাবন্ধ করে রেখেছি। এখন সেই মেয়ে দরজায় মাথা ঠুকছে। শব্দ শুনতে পাচ্ছিস না?”
কাঠঠোকরা পাখি গাছে ঠোকর দিলে যেমন শব্দ হয়, সে-রকম শব্দ হচ্ছে।
আমি বললাম, “পাত্রী তো খুবই ভালো। আমার পছন্দ হয়েছে।”
“তোর পছন্দ-অপছন্দ ব্যাপার না। মেয়েটাকে বদ ড্রাগ অ্যাডিক্টের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যেই তড়িঘড়ি বিয়ের ব্যবস্থা। বুঝেছিস?”
“বুঝেছি।”
“রেনুর সঙ্গে কথা বলবি?”
“কীভাবে কথা বলব? তুমি না বললে, মেয়ে দেয়ালে মাথা ঠুকাঠুকি করছে?”
মাজেদা খালা বললেন, “আধঘণ্টার মধ্যে তোর সঙ্গে কথা বলিয়ে দেব। Stand by থাক।”
“আমি Stand by।”
মাজেদা খালা কুড়ি মিনিটের মাথায় ব্যবস্থা করে ফেললেন। কিশোরী টাইপ গলায় একটি মেয়ে বলল, “অ্যাই, তুই কে?”
আমি বললাম, “আমার নাম হিমু।”
“ও আচ্ছা, তুই! তুই আমাকে বিয়ে করবি?”
আমি বললাম, “মাজেদা খালা চেপে ধরলে করব। আমি আবার খালার অনুরোধ ফেলতে পারি না।”
রেনু বলল, “আমি তোর চোখ গেলে দেব।”
“বাসররাতেই গেলে দিবে? না এক-দুই দিন পরে গালবে?”
“আমার সঙ্গে ফাইজলামি করিস, শালা!”
মেয়েদের মুখে ‘শালা’ গাল সচরাচর শোনা যায় না। আমি মোহিত হয়ে গেলাম এবং কিছুক্ষণের জন্য চুপ মেরে গেলাম।
রেনু বলল, “এই শালা, কথা বলছিস না কেন?”
আমি গলার স্বর যথাসম্ভব মধুর করে বললাম, “এমন রেগে যাচ্ছ কেন, রেনুসোনা? এস, স্বাভাবিকভাবে কিছুক্ষণ কথা বলি। তোমার পছন্দের রঙ কী? তোমার রাশি কী?”
রেনু বলল, “শালা, তুই একবার আয় আমার সামনে! কামড় দিয়ে তোর কান যদি আমি ছিঁড়ে না আনি, তাহলে আমার নাম রেনু না। আমার নাম কেনু! শালার বাচ্চা শালা!”
“রেনু, তুমি সম্পর্কে গণ্ডগোল করে ফেলছ। ‘শালার বাচ্চা শালা’ হবে না—ভাতিজা হবে। তুমি বলতে পারো, ‘শালার বাচ্চা ভাতিজা।’”
“চুপ!”
“রেনু, ধমকাধমকি করছ কেন? মিষ্টি করে কথা বলো। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হবে বিয়ের পর, বিয়ের আগে না।”
এইটুকু কথার পর বিকট শব্দ করে মোবাইল অফ হয়ে গেল। আমার ধারণা, রেনু মেঝেতে ছুড়ে ফেলেছে। টেলিফোন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবার কথা। তা হলো না—নিশ্চয়ই দামি যন্ত্র।
কারণ কিছুক্ষণের মধ্যেই একই মোবাইল থেকে খালা টেলিফোন করলেন। তাঁর গলা খুশি খুশি, আনন্দ ঝরে পড়ছে।
“হিমু, মেয়েটার তেজ দেখেছিস? বাঙালি মেয়ে হলে এত তেজ হতো না। হাফ বাঙলা বলেই তেজ বেশি।”
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, “হাফ বাঙলা মানে?”
“বাবা আমেরিকান, মা বাঙালি।”
“তোমার সঙ্গে পরিচয় কিভাবে?”
“রেনুর বাবার সঙ্গে তোর খালু সাহেবের পরিচয়। রেনুর বাবা-মা তোর খালুকে খুব মানে।”
“তুমি যে আমার সঙ্গে রেনুর বিয়ের ব্যবস্থা করছ, এটা কি খালু সাহেব জানেন? পাত্র হিসেবে আমি খালু সাহেবের পছন্দের মধ্যে পড়ি না। উনি রাজি হবেন বলে মনে হয় না।”
“তোর খালুকে আমি রাজি করাব। তাকে রাজি করানো কোনো ব্যাপার না। তুই রাজি কি না বল।”
“খালা, আমি চার পায়ে খাড়া।”
“চার পায়ে খাড়া মানে কী? মানুষের পা তো দু’টা!”
“আমি হামাগুড়ি দিয়ে খাড়া।”
“হিমু শোন, আমার সঙ্গে হাংকি-পাংকি কথা বলবি না। তোর হাংকি-পাংকি কথা আমি বছরের পর বছর শুনেছি। এইসব কথায় আমার কিছু হয় না। তুই তোর মোবাইলটা সারাক্ষণ সঙ্গে রাখবি। চার্জ যেন থাকে। আজ দিনের মধ্যে তোর সঙ্গে অনেকবার কথা হবে। আমি এখন রাখলাম।”
#হিমু #হুমায়ূনআহমেদ