31/12/2023
ালের_সর্বশেষ_দিন।
একটি বছরের সমাপ্তি এবং আরেকটি বছরের সূচনালগ্ন। বছরের শেষ দিনে দাঁড়িয়ে একজন ঈমানদার, আল্লাহ প্রেমিক বান্দার অনুভূতি কি হওয়া দরকার। আসুন পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ এ বিষয়ে আমাদেরকে কি নির্দেশনা দেয় একটু খুঁজে দেখি।
প্রত্যহ যখন দিন আর রাত অতিবাহিত হয়, একটি বছর সমাপ্ত হয় তখন মুসলমানদের অনুভূতি কি আনন্দের? না বেদনার? না চিন্তার? একজন আরবী কবি বিষয়টি তার একটি পংক্তিতে খুব চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আরবী কবি তাঁর কবিতায় বলেন-
يسر الناس ماذهب الليالي.
ولكن ذهابهن له ذهابا
মানুষকে আনন্দিত করে দিনের পর দিন ও রাতের পর রাতের আগমন। একটি রাতের প্রান্তে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ আনন্দিত হয়, নতুন একটি ভোর আসবে, নতুন একটি প্রভাতে সূর্য উদিত হবে। নতুন সূর্যোদয়কে দেখার জন্য মানুষ আনন্দ চিত্তে অপেক্ষা করে। কিন্তু কবি বলেন- “আমার অনুভূতি একটু ব্যতিক্রম। রাত শেষ হওয়ার পরে নতুন এক ভোর দেখার জন্য প্রফুল্লচিত্তে আমি অপেক্ষা করতে পারিনা। বছর শেষে নতুন আরেকটি বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য আমি আনন্দ-উল্লাস করতে পারি না। আমার অন্তরের অনুভূতি হল এটাই, যেদিনগুলো আমার শেষ হয়ে গেল তা তো আমার জীবনেরই একটি অংশ। আমার জীবনের একটি ক্যালেন্ডার যে শেষ হয়ে গেল, আমার জীবনের দালান থেকে ৩৬৫দিনের ৩৬৫টি পাথর যেন খসে পড়ে গেল। আমার জীবন ছোট হয়ে এলো। আমার জন্য এ-তো আনন্দের ব্যাপার নয়, আমার জন্য তা চিন্তার ব্যাপার। আমার হিসাবের ব্যাপার, আমার জীবনের একটি বছরকে অতিক্রম করেছি। আনন্দ-উল্লাসের সময় নয় বরং সময় হল হিসাব-নিকাশের, আমি যে দিনগুলো কাটালাম, যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমি দুনিয়াতে প্রেরিত হয়েছি, সে উদ্দেশ্যকে আমি কতটুকু সফল করতে পারলাম, আমার জীবনকে সে পথে কতটুকু পরিচালিত করতে পারলাম, এই হিসাব কষার সময় আমার এসেছে। কাজেই একটি বছরের সর্ব শেষ দিনে দাঁড়িয়ে মু'মিনের অন্তরে, আল্লাহ প্রেমিক অন্তরে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, একটি বছরকে তো আমি শেষ করেছি, কিন্তু যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাকে দুনিয়াতে পাঠালেন সে পথে কতটুকু অগ্রসর হয়েছি?
আজকের এই দিনে, এ মুহুর্তে আমি একজন মু'মিন হিসেবে আমার আমল নামার ব্যালেন্সশীট তৈরি করা দরকার, কিভাবে গত জীবনকে কাটিয়েছি। আমি একদিকে বয়সে বড় হচ্ছি, অন্যদিকে আমার জীবন ছোট হচ্ছে। বলা যায় আমার বয়স বাড়েনি, বরং আমার জীবন ছোট হচ্ছে। একটি সেগারেটে মানুষ যেমন টান দেয়ার কারণে ছোট হয়ে যায়, দিনের আগমন ও রাতের গমনে আমাদের জীবনের সিগারেটও শেষ হয়ে যাচ্ছে। যুগে যুগে নবী-রাসূরলগণ মানব জাতিকে এটাই বুঝানোর চেষ্টা করেন। হে মানুষ! তোমাকে অল্প কয়েকদিনের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। যা করবে তাই মাপা হবে। সূরা ঝিলঝালে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ومن يعمل مثقال ذرة خيرايره
ومن يعمل مثقال ذرة شرايره
সামান্য ভাল করলে তার ফলাফল অবশ্যই পাবে, সামান্য খারাপ করলে তার ফলাফলও অবশ্যই তুমি পাবে। আল্লাহ কারো সাথে অন্যায় করবেন না, বে-ইনসাফ করবেন না, তার আমলের পুরাপুরি প্রতিদান আল্লাহ বুঝিয়ে দেবেন। বিচার করবেন। কাজেই প্রতিদিন আমাদের জিবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, আমাদের জিবন কিভাবে আমরা ব্যয় করছি তার হিসাব আমাদেরকে করতে হবে।
হাদীসগ্রন্থ তিরমিযি শরীফের মাঝে এসেছে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “প্রতিদিন কবর মানুষদেরকে ডাকতে থাকে।”
যার অন্তরে ইমানের সামান্য আলো আছে থার্টি ফাস্ট নাইট তাদের জন্য নয়। এই দিন উল্লাসের জন্য নয়। এই দিন হচ্ছে হিসাব নিকাশের দিন। যারা ইসলামের অনুসারি, আল্লাহকে যারা ভয়করে, রাসূলকে যারা ভালবাসে; বিগত বছরের প্রান্তে নতুন বছরের সূচনায় তারা নিজেদের দফতর খুলে বসে হিসাব নেয়, কি করেছি, কি করা উচিত ছিল, খারাপ কাজের জন্য তওবা করে এবং ভাল কাজের জন্য প্রতিজ্ঞা করে। সৎ পথে ধাপিত হওয়ার জন্য নতুন ভাবে সংকল্প নেয়, উদ্ধীপ্ত হয়।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদেরকে যে ধাক্কা দিচ্ছেন, যে নাড়া দিচ্ছেন, সে ধাক্কায়, সে নাড়ায়, আমাদের বিবেক জাগ্রত হয় না? ইন্দোনেশিয়াতে সমুদ্রতলে সামন্য যে কাঁপন তিনি দিয়েছিলেন মাত্র দেড় মিনিটে, দু' লক্ষ বনি আদম মারা গিয়েছিল। লাশ আর লাশ, দাফনের কেউ নেই। প্লাষ্টিকে ভরে ভরে তাদেরকে গর্ত করে দাফন করা হয়েছিল। শ্রীলংকা,ভারত এবং থাইল্যান্ড সহ বিভিন্ন জায়গায় সমুদ্র তীরে, পর্যটন কেন্দ্রে আনন্দ উল্লাস করছিল মানুষ। আল্লাহ পাক বলেন, তোমাদের আনন্দঘণ এই মুহুর্তে আমি একটু ধাক্কা দিয়ে দেখতে চাই- কুরআনে আল্লাহ বলেছেন-
ان زلزلةالساعةشيء عظيم يوم ترونها تذهل كل مرضعة عما ارضعت وتضع كل ذات حمل حملها وترى الناس سكرى وماهم بسكرى ولكن عذاب الله شديد
(সুরা হজ্ব-১-২)
তোমাদেরকে সতর্ক করার জন্য জমিনকে আমি একটু নাড়া দিতে পারি, এমন নাড়া দিতে পারি যার কারণে, যে মহিলা দুধ পান করায় তার বাচ্চার কথা ভুলে যাবে, আল্লাহ বলেন- আমি এমন ভূমিকম্ম দিতে পারি যার কারণে গর্ভধারিণী মহিলার গর্ভপাত হয়ে যাবে, মানুষ নেশা খোরের মত ছোটাছুটি করবে। অথচ তারা মদ খেয়ে নেশা চুর হয়নি। কিন্তু আল্লাহর শাস্তি, সামান্য নাড়া এত কঠিন যে কেউ কারও কথা মনে রাখবে না। কয়েক সেকেন্ডের নাড়ার কারনে সমুদ্রের তলদেশ ছিঁড়ে আল্লাহ পানিকে যেভাবে উপরে স্ফীত করেছেন, বিশ-ত্রিশ ফুট উচু জলোচ্ছাস হবে কেউ কল্পনাও করেনি। আল্লাহর নির্দেশকে ভুলে গিয়ে, বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে, চ্যালেঞ্জ করে যারা উৎসব, উল্লাস করবে আল্লাহ তাদেরকে সতর্ক করেছেন। ইন্দোনিশিয়ার আচেহ প্রদেশ থেকে আরম্ভ করে থাইল্যান্ড এবং আফ্রিকার সোমালিয়া পর্যন্ত ৮/১০ টি দেশকে আল্লাহ কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।
তাই আমি বলতে চাই, মুসলমান ভাই-বোন-বন্ধুরা! একটি বছরের শেষ দিনে দাঁড়িয়ে উৎসবে মেতে উঠা নয়, চিৎকার করা নয়, আতশবাজির উৎসব নয়। আমাদের হিসাব করা উচিত।
থার্টি ফাস্ট নাইট মুসলমানদের উৎসব নয়। এটা বিজাতিয় উৎসব। বিজাতিয় উৎসবে যারা অংশগ্রহন করবে, তারা তাদের দলভুক্ত হয়ে যাবে। এটা রসূলের কথা, তিনি বলেন-
من تشبه بقوم فهو منهم
যে অন্য জাতির সাথে আচার-আচরণে, কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে সামঞ্জ্যস্যতা গ্রহন করবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে। আপনি কি চান? থার্টি ফাস্ট নাইট উদযাপনের সময় আপনার কাছে 'মালাকুল মাউত' আসুক? আপনার কাছে কি কোন গ্যারান্টি আছে যে আপনি যখন উল্লাসে, মদ পানে নাচানাচি অবস্থায় আপনার মৃত্যু হবে না?
যদি আপনি চান পবিত্র অবস্থায় আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবেন তাহলে আপনার জন্য এই ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহনের কোন সুযোগ নেই। কারণ, আল্লাহ তো থার্টি ফাস্ট নাইট উদযাপনের সময়ও তো একটু কাঁপন দিতে পারেন। কাজেই আল্লাহকে পুরাপুরি ভয় করুন। হে মহিমাময়! তুমি আমাদেরকে তোমার যথাযথ ভয় করার তাওফিক দান করুন।
আমিন।