31/07/2026
এমন কামব্যাক সত্যিই খুব কম মানুষের জীবনে দেখা যায়!
ছোটবেলা থেকেই মোহাম্মদ ইমানুলহক মেধাবী ছিলেন, কিন্তু প্রচলিত অর্থে পড়াশোনা কখনোই তার ভালো লাগত না। বাবার চাকরির কারণে বিদেশে বড় হওয়ায় নিয়মিত ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ পাননি। বাসায় মায়ের কাছেই পড়াশোনা করতেন, আর পরীক্ষা দিয়ে মোটামুটি ভালো ফল করতেন। তবে সবসময় একজন সহপাঠী তার চেয়ে ভালো ফল করায় আশপাশের মানুষের তুলনা ও চাপ তার শৈশবকে কঠিন করে তোলে। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল তিনি নিজে এসব নিয়ে খুব একটা ভাবতেন না, কিন্তু সমাজ তাকে ভাবতে বাধ্য করেছিল।
গণিত ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। কাজিনের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গণিত নিয়ে প্রতিযোগিতা করতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাকে বলা হতে থাকে গণিত নয়, অন্য বিষয়ে মনোযোগ দাও। একসময় এমন অবস্থায় পৌঁছান যে, প্রিয় বিষয়টিই তার কাছে বিরক্তিকর হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি আরেক বাস্তবতার মুখোমুখি হন। বাংলা ঠিকমতো পারেন না, আগের মতো গণিতেও নেই সেই আত্মবিশ্বাস। নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ, বন্ধু কম, পড়াশোনায় অনাগ্রহ সব মিলিয়ে ফলাফল আরও খারাপ হতে থাকে। শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন সব জায়গা থেকেই শুনতে হতো, ডাক্তারের ছেলের এমন রেজাল্ট হয় কীভাবে?
শেষ পর্যন্ত SSC তে GPA 3.69 নিয়ে পাশ করেন। এরপর শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। নিজের ফলাফল লুকিয়ে রাখতে গিয়ে একের পর এক মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছিল। শুরু হয় মিথ্যার জীবন। বিশ্বাস করেন এটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টদায়ক অধ্যায়। এই এক মিথ্যার জন্য তাকে অনেক গুলো মিথ্যা বলতে হয়েছিল। চট্টগ্রাম কলেজে চান্স না পেলেও বলেছিলেন চট্টগ্রাম কলেজে আছেন। অথচ ছিলেন বি.এফ. শাহীন কলেজে। ওখানে টিকতে না পেরে ট্রান্সফার হন ওমরগণি এমইএস কলেজে। এখানে পড়ালেখা হত না, সারা বছরই কলেজ বন্ধ থাকত। যেহেতু জীবন মিথ্যায় ভরা ছিল সেহেতু লজ্জা জনক পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য কোন বিয়ে, পার্টি বা জনসমাগম এড়িয়ে চলতেন।
এরপর আসে আরও বড় ধাক্কা। HSC পরীক্ষায় ফেল। দুই বছরের পরিবর্তে চার বছরে HSC শেষ করতে হয়। কিন্তু এই সময়েই তার জীবনে আসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। তার বাবা সবকিছু জেনে যান। শাস্তি নয়, তিনি ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন। সেই মুহূর্তেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন জীবনে আর কোনো কিছু লুকাবেন না, আর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নিজের সর্বোচ্চটা দেবেন।
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামে IIUC প্রথমে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না পেলেও সিট সংকুলনে পরে ভর্তি নিতে রাজি হয় । এরপর শুরু হয় সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়। প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করতেন, নিয়মিত ক্লাস নোট তৈরি করতেন, নিজের ওপর কঠোর শৃঙ্খলা আরোপ করেছিলেন। ফলাফলও আসে অবিশ্বাস্যভাবে।
টানা ৮টি সেমিস্টারেই ফাস্ট, প্রতিটি সেমিস্টারে স্কলারশিপ, সিজিপিএ ৩.৯০, থার্ড ইয়ারেই ২টি পাবলিকেশন। স্নাতক শেষ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগও আসে। এরপর দক্ষিণ কোরিয়ায় ফুল ফান্ডেড পিএইচডি এর সুযোগ পান। কিন্তু পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে সেই সুযোগ ছেড়ে দেশে ফিরে আসতে হয়। জীবনের অন্যতম কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল এটি।
এরপর শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার দীর্ঘ সংগ্রাম। একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন, ফান্ডিং ছাড়া এডমিশন, ভিসা রিজেক্ট, ডেফিসিট সবকিছুই তার পথকে আরও কঠিন করে তোলে। অনেকেই হয়তো এখানেই থেমে যেতেন, কিন্তু তিনি থামেননি।
তার কথা অনুযায়ী ৮ বছরে ১১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন, ১৫৫৩ জন প্রফেসরকে ইমেইল, ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিজেকশন, ভিসা রিজেক্ট।
অবশেষে বহু বছরের সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের Texas A&M University-এ Fully Funded PhD-এর অফার পান এবং নিজের স্বপ্নের পথে নতুন যাত্রা শুরু করেন।
লেগে থাকুন। হয়তো আপনার গল্পটাও একদিন হাজারো মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।
© Scholarship Funding with Low CGPA